অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি হলেন স্পিকার || অসুস্থতার কথা জানিয়ে || রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দিনের পদত্যাগ
বিবিসি বাংলা প্রতিবেদনঃ কয়েকদিন ধরে নানা গুঞ্জনের পর অবশেষে পদত্যাগ করলেন বাংলাদেশের ২২তম রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন। আপাতত অস্থায়ীভাবে এই দায়িত্ব পালন করবেন জাতীয় সংসদের স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ। শুক্রবার বিকেলে জাতীয় সংসদে পৌঁছে দেওয়া হয় রাষ্ট্রপতির পদত্যাগপত্র। যেখানে নিজের ‘গুরুতর শারীরিক অসুস্থতার” কারণে দায়িত্ব থেকে সরে যাওয়ার কথা জানিয়েছেন মো. সাহাবুদ্দিন। সংবিধানের ৫০(৩) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী স্পিকারের কাছে চিঠি পাঠিয়ে পদত্যাগ করতে পারেন রাষ্ট্রপতি। আর ৫৪ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত না হওয়া পর্যন্ত স্পিকার রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করবেন।
এর আগে রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের পদত্যাগ নিয়ে আলোচনার মধ্যেই নির্ধারিত বিদেশ সফর সংক্ষিপ্ত করে শুক্রবার সকালে দেশে ফেরেন জাতীয় সংসদের স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ।
রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ এই পদে নতুন করে কে দায়িত্ব পাচ্ছেন এটি এখনো নিশ্চিত নয়। তবে সাংবিধানিক নিয়ম অনুযায়ী জাতীয় সংসদে পরবর্তী ৯০ দিনের মধ্যে পরবর্তী রাষ্ট্রপতি নির্বাচন করতে হবে।
কী বলা হয়েছে পদত্যাগপত্রে
বিভিন্ন ধরনের রোগের কারণে “শারীরিক ও মানসিক অসামর্থ্যতার” কারণে রাষ্ট্রপতির মতো গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক পদের দায়িত্ব পালন করা সম্ভব হচ্ছে না বলে পদত্যাগপত্রে লিখেছেন মো. সাহাবুদ্দিন।
‘নিষ্ঠা, সততা ও সংবিধানের প্রতি পূর্ণ আনুগত্যের সঙ্গে’ দায়িত্ব পালন করেছেন বলেও তিনি উল্লেখ করেছেন।
২০২৪ সালের ৫ই অগাস্ট তৎকালিন সরকারের পতন হলে শাসনতান্ত্রিক ও সাংবিধানিক সংকটের সৃষ্টি হয় উল্লেখ করে পদত্যাগপত্রে তিনি লিখেছেন, ‘াংবিধানিক সংকট থেকে উত্তরণের অভিপ্রায়ে সংবিধানের ১০৬ অনুচ্ছেদের ক্ষমতাবলে আমি রাষ্ট্রপতি হিসেবে বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের মতামত কামনা করি। অতঃপর বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের পরামর্শক্রমে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠন করি।’
অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ও রাজনৈতিক দলগুলার সঙ্গে পরামর্শ করে সংসদ নির্বাচনের আয়োজন করেন উল্লেখ করে তিনি লিখেছেন, ‘বর্তমানে সরকারি দল ও বিরোধী দল গণতান্ত্রিক চর্চার মধ্য দিয়ে জাতীয় সংসদে নিজ নিজ দায়িত্ব পালন করছে। আমার সুদৃঢ় ও ইতিবাচক ভূমিকার কারণে দেশে কোনো সাংবিধানিক বিপর্যয় ঘটেনি।’
শুক্রবার বিকাল সাড়ে পাঁচটার দিকে জাতীয় সংসদ ভবনে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ তার চিঠির অংশবিশেষ পড়ে শোনান।
তিনি জানান, নিজেকে ‘গুরুতর অসুস্থ’ দাবি করে মো. সাহাবুদ্দিন লিখেছেন, হৃদরোগ, উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস ও কিডনি জটিলতায় ভুগছেন।
‘আমার হৃদযন্ত্রে বাইপাস সার্জারি হয়েছে। ইদানিং স্বাস্থ্য পরীক্ষায় অটোনোমিক নিউরোপ্যাথি নামক রোগ শনাক্ত হয়েছে। এই রোগের কারণে আমি মাঝে মাঝে ক্ষণিক অচেতন হয়ে যাই। রোগ সমূহের প্রাদুর্ভাবে শারীরিক ও মানসিক অসামর্থ্যতার কারণে রাষ্ট্রপতির মতো গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক পদের দায়িত্ব পালন করা আমার পক্ষে সম্ভব হচ্ছে না। আমার দীর্ঘমেয়াদে চিকিৎসা প্রয়োজন”।
সংবিধানের ৫০ (৩) অনুচ্ছেদের বিধান অনুযায়ী রাষ্ট্রপতির পদ থেকে পদত্যাগের কথা লিখেছেন মো. সাহাবুদ্দিন।
স্পিকার শুক্রবার বিকেল ৫টা ১ মিনিটে পদত্যাগপত্রটি গ্রহণ করেছেন বলে রাষ্ট্রপতির প্রেস সচিব মো. সরওয়ার আলমকে উদ্ধৃত করে জানিয়েছে রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা বাসস।
সংবাদ সম্মলনে স্পিকার বলেন, সংবিধান অনুযায়ী স্পিকার হিসেবে শপথ নেওয়ার পাশাপাশি ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি হিসেবেও শপথ নিয়েছেন তিনি। যার ফলে মো. সাহাবুদ্দিনের পদত্যাগের ফলে পরবর্তী রাষ্ট্রপতি নির্বচিত হওয়ার আগ পর্যন্ত তিনিই ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন।
এসময় রাষ্ট্রপতির পদত্যাগ নিয়ে কোনো ধরনের বিভ্রান্তি না ছড়ানোরও আহ্বান জানান স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ।
তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতির পদত্যাগ একটা গুরুতর ঘটনা। এর সাথে দেশের ভালোমন্দও জড়িত। রাষ্ট্রপতি একজন মানুষ, তিনি অসুস্থ হতেই পারেন।’ এর মধ্য দিয়ে সকল ধোঁয়াশা পরিষ্কার হয়েছে বলেও মন্তব্য করেন স্পিকার। তিনি (বিদায়ী রাষ্ট্রপতি) মাফিয়া সরকারের আমলে নির্বাচিত হলেও বর্তমানে জনগণের ভোটে যে সরকার নির্বাচিত হয়েছে তার প্রতি তিনি সমর্থন এবং সম্মান প্রকাশ করেছেন সবসময়, মন্তব্য করেন মি. আহমদ।
কদিন ধরেই চলছিল গুঞ্জন
২০২৩ সালের ২৪শে এপ্রিল বাংলাদেশের ২২তম রাষ্ট্রপতি হিসেবে শপথ নেন মোহাম্মদ সাহাবুদ্দিন। সেসময় আওয়ামী লীগের মনোনয়নে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হয়েছিলেন তিনি।
সময়ের হিসাবে তিন বছর তিন মাস ধরে এই পদে ছিলেন তিনি। তার পাঁচ বছরের মেয়াদ শেষ হওয়ার কথা ছিল ২০২৮ সালের এপ্রিলে।
কিন্তু জুলাই আন্দোলনে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর থেকেই রাষ্ট্রপতির পদ থেকে তাকে সরিয়ে দেওয়ার বিষয়টি নানা সময় আলোচনায় এসেছে। নানা পক্ষ থেকে তাকে অপসারণের দাবি উঠলেও বিএনপি তাকে রাখার পক্ষেই যুক্তি দিয়েছে।
রাষ্ট্রপতির পদত্যাগে সাংবিধানিক জটিলতা তৈরি হবে বলে তারা যুক্তি তুলে ধরে সেসময়।
সরকার গঠনের পরও মো. সাহাবুদ্দিনকে দায়িত্ব থেকে সরায়নি বিএনপি।
কিন্তু এখন তাহলে কেন রাষ্ট্রপতি পদত্যাগ করছেন এমন প্রশ্ন সামনে আসে।
বিএনপি সরকারে আসার পর সেই সরকারের সঙ্গে রাষ্ট্রপতির একটা সম্পর্ক তৈরি হয়েছিল এবং কিছু ক্ষেত্রে তা দৃশ্যমান হয়েছিল বলে বিশ্লেষকেরা মনে করেন।
তারা বলছেন, বিএনপি সরকার গঠনের পরই রাষ্ট্রপতিকে বঙ্গভবনের বাইরে বিভিন্ন অনুষ্ঠানে যেতে দেখা গেছে। এমনকি তিনি চিকিৎসার জন্য যুক্তরাজ্য গিয়েছিলেন গত মে মাসে।
তবে রাষ্ট্রপতি পদ থেকে মো. সাহাবুদ্দিন পদত্যাগ করছেন— হঠাৎ করে এই আলোচনা কদিন ধরেই নানা মাধ্যমে ঘুরেফিরেই চলছিল। এমনকি রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ এই পদে কাকে পরবর্তী দায়িত্ব দেওয়া হচ্ছে এ নিয়েও শুরু হয় নানা গুঞ্জন।
