হাসানআল আব্দুল্লাহর কবিতা
কবি
আমরা কবিতা লিখি
কেউ কেউ এখনও কবি,
কেউ কেউ উটপাখি,
পাতিহাঁস ও ধনেশ!
আমরা কবিতা লিখি
কেউ কেউ খাদ্য,
কেউ কেউ তোষামোদি,
অথর্ব, নির্বোধ!
জীবনানন্দ ও কাজী নজরুল,
কেউ কেউ এডাম মিসকোভিস!
আমরা কবিতা লিখি
কেউ কেউ বন্ধু বৎসল,
মা ও বাবা; ভ্রাতা—ভগ্নি,
কেউ কেউ এডোনিস, হৃদয়ের একান্ত কাছের।
দীর্ঘশ্বাস, দীর্ঘ পথ, পাহাড়, সমুদ্র
খানাখন্দ কাদামাটিজল।
কেউ কেউ গাছ, ফুল, বীজ, ফল।
আমরা কবিতা লিখি
কেউ কেউ ভ্যাম্পায়ার
শেয়াল, কুকুর, শকুন, হায়েনা;
কেউ কেউ জেনারেল;
হত্যাকারী, নপুংসক, কেঁচো, কুমির, হাঙর।
আমরা কবিতা লিখি
কেউ কেউ বাঘ,
অজস্র্র বিড়াল;
পুরস্কার, পরিপূর্ণ পরশ্রীকাতর!
সন্তরণ
গন্তব্যের দিকে ছুটছি অনিশ্চিত
আমাদের জীবনের ভিত
এইভাবে আস্তে আস্তে শক্ত হয়ে ওঠে।
গোলাপ জবারা ফোটে
মহাকাশে, গ্যালাক্সি নেবুলা বড়ো
বড়ো সূর্যের কোনায়, আমাদের নড়োবড়ো
ঘরের কানাচে।
সেখানেও আছে
কিছু সুখ, নিদারুণ দুঃখের বসত, হয়তো বা
তাই বাড়ে দিনে দিনে বিকেলের শোভা!
মানুষ হারেনি
যুদ্ধটা চলছে, কিন্তু
মানুষের চলাচল থামানো যায়নি।
প্লেনে যদিও অনেকগুলো সিট খালি,
যদিও আগের মতো
ভরাট আহ্বান নেই, তথাপি সমস্ত ঝঞ্ঝা
অতিক্রম করে অনেকেই ছুটছে গন্তব্যে।
আমার পাশের সিটে সিরিয়ান ভদ্রলোক,
সামনের তিন সিট খালি পেয়ে
তেরো—চৌদ্দো বছরের সুবোধ বালক, বাবা—মার
কাছ ছেড়ে সেখানে একাকী
শুয়ে শুয়ে আইপ্যাডে সময় কাটায়।
ডান দিকে আরব দম্পতি বয়সের ভারে
শুধুই ঘুমান। আর আমি
হরকাইয়ের উপন্যাসে
চোখ রেখে ওয়াইট ওয়াইনে
চিবোই স্টেলার প্রিটজেল।
বিমানবালারা যথেষ্ট বন্ধু বৎসল। যুদ্ধ তাদের লাবণ্যে
একটুও ছাপ ফেলতে পারেনি।
মানুষের মতন দেখতে পশুগুলো কিছুটা হেরেছে,
কিন্তু এই যুদ্ধে মানুষ হারেনি।
ব্যবধান
তোমার রাত আর আমার রাত
এক নয়। তোমার দিন আর আমার দিনে
কোনো মিল থাকে না।
আমার রাতে মাঝে মাঝে পটকা ফোটে
দু’একটা গুলির শব্দও শোনা যায়।
তোমার রাতে এখনও শেয়াল ডাকে,
ডাকাতের আতঙ্ক দেখা দেয়।
ধর্ষকেরা বাচ্চা মেয়েদের
মুখে গামছা গুঁজে পাশের বাগানে টেনে নিয়ে যায়।
অতঃপর গলা কেটে মাথা আর
ধড় আলাদা করে রাখে। সকালে ধর্ষিতার বাসায়
প্রধানমন্ত্রী আসেন, আসেন স্বরাষ্ট্র।
মৃতের পিতার হাতে
দুই চার হাজার টাকা গুঁজে দিয়ে
সব ফয়সালা করে যান।
বিচার হয় না ধর্ষকের, বিচার হয় না
মাদ্রাসায় নিয়মিত বলাৎকারের।
তোমার রাতগুলো অন্ধকার, আমার রাতেও
অন্ধকার নামে। কিন্তু এই দুই অন্ধকারে ফারাক
দেখা যায়। তোমার নিকষ কালো,
আর আমার নিয়ন বাতির। কিছু কিছু ইঁদুর অবশ্য
ইদানীং আমার রাতকে একটু একটু করে কাটে।
ছোটো বড়ো গর্তে
দিনে ঘুমায়, বংশবৃদ্ধি করে।
আমার সময় ও তোমার সময়ের
ব্যবধান দেখে আজকাল আমি আর
অবাক হই না।
পরিক্রমা
শুনছি তুমি চলছো এখন
গভীর জলের মাছের সাথে,
সখ্যতাও আছে তোমার
নানারকম গাছের সাথে।
লাশের সাথ তাসের সাথে
ঝুলিয়ে দেয়া মাসের সাথে,
চলছো নাকি জলে ভেসে
অনেক পাতিহাঁসের সাথে।
তোমার বুদ্ধি সাপের মতো
বাঁকা সিঁড়ির ধাপের মতো
তলোয়ারের খাপের মতো
সুসংহত,
আছো তুমি দারুণ মোজে
যেটা শুধু কোকিল বোঝে
মাঝে মাঝে কাকও খোঁজে:
যা সংগত!
আমি শুধু আতকে উঠি
বুঝতে যে চাই মানুষগুলো
কেমনে বানাও দাবার ঘুঁটি!
