হাসানআল আব্দুল্লাহর কবিতা

হারানো সাম্রাজ্য

সাম্রাজ্য হারিয়ে ফেলি বারবার

একটা একটা করে গড়ি

একটা একটা করে হাতছাড়া 

হয়ে যায়।

আবার নতুন করে গড়ার আনন্দে

বিভোর, সমস্ত শক্তি দিয়ে লেগে পড়ি।

আমার হারিয়ে যায় শিশুকাল,

যৌবনে পা রাখতে না রাখতেই

দড়ি ছেঁড়া বলদের মতো

ছুটে চলে যায়।

স্কুলের বন্ধুরা, কলেজের

করিডোর, চৌরাস্তার চেনা 

চানাচুর বিক্রেতাও

একে একে অজান্তে হারিয়ে যায়।

বাড়ির উঠোন, রাস্তা, রেস্তোরাঁয় পরিচিত মুখ,

ভাবীর দেবর, বাদামের খোঁসা,

নদীর ভাঙন, পাশের বাড়ির পিসিমার মেয়ে,

আর চিরচিরে জলে পুঁটি মাছের নাচন।

চৈত্রের প্রলয়ঙ্কারী ঝড়,

আষাঢ়ের বৃষ্টি, ভাদ্রের উত্তাল ঢেউ,

সাজানো পানশি, গামছা সমেত দই,

পুকুর জুড়ানো গরু...

একে একে আমার সাম্রাজ্য 

হারিয়ে ফেলতে থাকি,

অতঃপর শুরু থেকে নতুন সাম্র্রাজ্য গড়ি।


এস্রাজ

সময়টা রপ্ত হয়ে গেছে 

রোদ্দুরের তেরছা আঘাতে

পাথরের ত্বকে বসে থাকা দিন

ধুলোর মতন ক্ষয়ে গেছে,

সময়টা রপ্ত হয়ে গেছে।


উদভ্রান্ত যুগ

দিগ্বলয়হীন রাত

মানুষের বুদবুদে ফিরে আসা স্রোত

কাকের বাসায় বসে কোকিলের সাথে

অবশিষ্ট দুটি কথা কয়ে গেছে,

সময়টা রপ্ত হয়ে গেছে।


জান্থপির স্মৃতিতে সক্রেটিসের

যতোটুকু প্রেম, হতাশার গুহাগাত্রে

শিশিরের যতোটা প্রলেপ,

তার থেকে বেশি সুখ

গুঁড়ো হয়ে বাতাসের পিঠে রয়ে গেছে,

সময়টা রপ্ত হয়ে গেছে। 


জ্যাক দেরিদাকে যারা কখনো দেখেনি,

এমনকি নিৎসে বা ভলতেয়ার;

বেটোফেনের সিম্ফনি না শুনেও যারা

গুনগুন করে অঝোরে কেঁদেছে;

বাস্তবতা তাদেরকে সয়ে গেছে,

সময়টা রপ্ত হয়ে গেছে।


বসবাস 

বাড়ির রাস্তাটা চিনে নিতে হয়।

বৃষ্টিতে বরফে রোদে ঝড়ে 

দ্রুতগামী অসংখ্য গাড়ির পাশ দিয়ে

আঁকাবাঁকা পথ ধরে 

বাড়ির রাস্তাটা চিনে নিতে হয়।


ট্রেন থেকে নেমে

মানুষের ভিড়ে কখনো সামান্য থেমে

জোড়া গেট চকিতে পেরিয়ে

সিঁড়ি দিয়ে গ্রোসারির ধার ঘেঁষে 

আরেকটু হেঁটে বাড়ির রাস্তাটা চিনে নিতে হয়।


মুখোমুখি দুটি ব্যাঙ্ক রাস্তার দুধারে,

বাঙালি দোকান, ফাস্টফুড রেস্তোরাঁর সামনে দাঁড়ানো

ফুডকার্টে বিশাল লাইন, কিম্বা হা হা শূন্যতা, নীরব,

নিস্তব্ধতা ঠেলে, পোস্ট অফিসের কাজ সেরে,

পাবলিক লাইব্রেরি ঘুরে

বাড়ির রাস্তাটা চিনে নিতে হয়।


বসন্তে কি শীতে, পার্কে কবুতর, ঘুঘু,

কাঠবিড়ালির সাথে মধুর আলাপ সেরে

নতুন শাখায় প্রজাপতি কিম্বা মৌমাছির মৈথুন দেখেও

পুলকিত হয়ে বাড়ির রাস্তাটা চিনে নিতে হয়।


মাঝে মাঝে আনাচ পিঁয়াজ লঙ্কা 

ধনেপাতা বেগুন ঢেঁড়স বরবটি 

আরো সব কি কি কিনে

বাড়ির রাস্তাটা চিনে নিতে হয়। 


সল্টলেকে সন্ধ্যা

সল্টলেকে সন্ধ্যা নেমে গেছে

আমি বারান্দায় এসে নিঃশব্দে দাঁড়াই

দুই একটি অপরিচিত মশা

আমার কানের কাছে গান গাইতে গাইতে

বুঝে নিতে চায় আমার রক্তের রঙ;

মানুষের রক্ত লাল

তা কি তাদের জানার বাকি আছে!


নাচতে নাচতে

একটি পাতাও ঝরে পড়ে

আমার হোটেল ঘেঁষা

সোমত্ত কাঁঠাল গাছ থেকে।

আমের মুকুল আনন্দিত হয়

দূর থেকে ছুটে আসা ল্যাম্পোস্টের 

বাতির আহ্বানে। আর গত রাতে

ঠিক চারটের সময় যে কুকুরটি

আমাকে জাগিয়ে দিয়েছিলো, সে আবারো

ঘেউ ঘেউ করে ওঠে। আইল্যান্ডে ভূত

না মানুষ বুঝতে পারি না। অনেকক্ষণ তাকিয়ে থেকে

শেষ পর্যন্ত সাঁ করে চলে

যাওয়া গাড়ির আলোতে

প্রসারিত হয় আমার মধ্যবয়সী দৃষ্টি।

মহাকাল আমাকে নাচায়

কিন্তু আমি নিমগ্ন কবিতা

তার সৌন্দর্যে; ঘরে ঢুকে লাইট জ্বালাই।


একাকিত্বের আসর

প্রকাশের বারো তলা; একা একা থাকি

সারাদিন অনন্ত ভ্রমণ, বন্ধুদের

সাহচার্য, ভক্তদের ভিড়, পায়ে হাত দিয়ে

কতো যে নিবিড় সুখে

কেউ কেউ প্রশান্তি জানায়! তারপর

সব শূন্য; হেঁটে হেঁটে যাই 

মেট্রো ইস্টিশনে, শূন্যতা গোগ্রাসে খায়।

কবিতার ছাঁইপাশ লাইন হয়তো

মনে আসে, হয়তো আসে না;

চেনা

রাস্তাও অচেনা মনে হয়;

কতো কতো দিন 

মানুষের কথার প্রখর তেজ আর

হৃদয়ে বসে না। নেমে পড়ি

নিজ ঘাটে, একাকী আমার

শুরু হয় বিরুদ্ধ সময়;

ঘরের জানলা দিয়ে হু হু করে

আকাশ পেরিয়ে যায়;

মহাবিশ্বের মতন আমি

পড়ে থাকি: অন্তহীন, একা।


Related Posts