৯/১১ উত্তর আমেরিকা
যদি ২০০০ সালের নির্বাচনে জিতে আল গোর প্রেসিডেন্ট হতেন, তাহলে কি ৯/১১ এর মত এত ভয়ংকর ঘটনা ঘটত? এমন প্রশ্ন অনেকের মনেই ঘুরে ফিরে আসে। ঘুরে ফিরে আসার কারণ, কতগুলো প্রশ্নের আজো সদুত্তর পাওয়া যায়নি। কারা এই দুর্ভাগ্যজনক ঘটনা ঘটিয়েছে সে বিষয়ে যে তথ্য প্রমাণ আছে, তদন্তের প্রতিবেদন আছে, সেটাও এক শ্রেণির মানুষ বিশ্বাস করতে চায় না। এমন কি যে ব্যক্তিকে মাস্টারমাইন্ড মনে করা হয়, তাকেও বাঁচিয়ে রাখা সম্ভব হলে অনেক কিছু জানা যেত। সবচেয়ে অবিশ্বাসযোগ্য এখনো অনেক আমেরিকানদের কাছে, তাহলো টুইন টাওয়ারে হামলার পরে এই দুটি টাওয়ার ধসে পড়ার ঘটনা। যেভাবে ধসে পড়েছে তা সরাসরি নেমে গেছে নিচে। বামে বা ডানে হেলে পড়লে আরো অবিশ্বাস্যরকম ক্ষতি হতো পার্শ্ববতীর্ ভবনগুলোর। এইভাবে ওপর থেকে নিচে নেমে যাওয়ার প্রক্রিয়া দেখা যায় কেবলমাত্র নিচে ডিনামাইট পেতে রেখে তার বিস্ফোরণ ঘটলে। যেভাবে অনেক ভবন প্রেকৌশলীরা ডেমোলিশ করে থাকে। আরেকটি প্রশ্নের উত্তরও পাওয়া যায়নি, তাহলো পার্শ্ববতীর্ তৃতীয় একটি ভবন একই প্রক্রিয়ায় ধসে পড়ল কেন?
এই ঘটনা যারাই ঘটিয়ে থাকুক তারা কেবল সন্ত্রাসী নয়, তারা গণহত্যাকারীও। পৃথিবীর ইতিহাসে হিরোশিমা—নাগাসাকি ছাড়া আর কোনো এমন ঘটনার কথা মানুষ জানে না। টুইন টাওয়ারের ঘটনায় ২,৯৭৭ নিরীহ নিরপরাধী নারী—পুরুষ মারা গেছে। এর মধ্যে ৩৪৩ জন ফায়ার ফাইটার্স ও এফডিএনআই’র প্যারামেডিক্স, নিউইয়র্ক পুলিশ ডিপার্টমেন্টের ২৩ অফিসার, পোর্ট অথরিটি পুলিশ ডিপার্টমেন্টের ৩৭ জন অফিসার প্রাণ দিয়েছেন। মানুষ ছাড়াও, আমেরিকার তো বটেই পৃথিবীর প্রথম সর্বোচ্চ দুটি ভবন ধ্বংস হয়। এই ভবন দুটির স্থপতি মিনোরু ইয়ামাসাকি এর ডিজাইনকে আর্কিটেকচারাল মিনিমালিস্ট মডার্নিজম স্টাইল বলে উল্লেখ করেছেন। ফলে এটি পৃথিবীর স্থাপত্য শিল্পের একটি ব্যাকরণ এবং সম্পদ। এই ভবন দুটিতে ছিল আমেরিকার অনেকগুলি ব্যাংক এবং কর্পোরেট হাউজ। সেসব অফিসে ছিল অনেক মূল্যবান পেইন্টিং বা শিল্পকর্ম। এরমধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে অগাস্ত রদাঁর প্রায় ৩০০ ড্রইং এবং ভাস্কর্যকর্ম (ক্যান্টর ফিটজেরাল্ডের অফিসে ছিল), হোয়ান মিরোর ২০ী৩৫ ফুটের বিশাল ট্যাপেস্ট্রি টাঙানো ছিল সেকেন্ড ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারের লবিতে, রয় লাইচটেনস্টাইনের এন্টাব্লাচার সিরিজের একটি শিল্পকর্ম, লুইস নেভেলসনের ১৯৭৮ সালের ভাস্কর্য ‘স্কাইগেট নিউইয়র্ক’, মাসায়ুকি নাগারের ১৪ী৩৫ ফুটের ব্লাক গ্রানাইট ভাস্কর্য ক্লাউড ফট্রেস, জেমস রোজাটির বিশাল ভাস্কর্য ‘ইডিওগ্রাম’। এছাড়াও এই ভবনের অভ্যন্তরে সিটি গ্রুপের সংগ্রহে ছিল ১,১১৩টি শিল্পকর্ম ও একটি ওয়াল স্ট্রিট ম্যুরাল। আরো ছিল বিখ্যাত আলোকচিত্রী জ্যাক লো’র ফটোগ্রাফের প্রায় ৪০,০০০ নেগেটিভ। ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টার ধ্বংসের পরে ইন্সু্যরেন্স কোম্পানিগুলোর হিসাব অনুযায়ী প্রায় ১০০ মিলিয়ন ডলার মূল্যের শিল্পকর্ম নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে। এসবও মানবসভ্যতার বড় সম্পদ।
অনেক ক্ষেত্রেই সভ্যতার এইসব মাইলফলককে উপেক্ষা করা হয়। ফ্রান্স, ইতালি, স্পেন, জার্মানি, গ্রিস, আমেরিকা যে কারণে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দেশ, তার অন্যতম এইসব দেশের মিউজিয়ম ও আর্ট গ্যালারি। যাদের অর্থবিত্ত এবং মননশীল হৃদয় আছে, তারা অন্য দেশে বা অন্য শহরে যান মিউজিয়ম বা আর্ট গ্যালারি ভিজিট করতে। প্যারিসকে যেমন চিন্তা করা যায় না ল্যুভর মিউজিয়ম ছাড়া, তেমনই রোম বা মিলানকে বা ভ্যাটিকানকে সেসব শহরের শত শত বছরের প্রাচীন মিউজিয়ম ছাড়া। নিউইয়র্ক সিটিও শত মিউজিয়মের এবং আর্ট গ্যালারির শহর।
৯/১১ এর ঘটনা মানবসভ্যতায় কত বিশাল ক্ষত সৃষ্টি করেছে, তা ক্রমশ স্পষ্ট হচ্ছে। এই ঘটনা আমেরিকার রাজনীতির খোলনলচে পাল্টে দিয়েছে। একদিকে রক্ষণশীলরা আরো প্রকাশ্যে চলে এসে তাদের নখ—দাঁত উন্মোচন করছে, অন্যদিকে লিবারেলরাও আরো শক্তিশালী হয়েছে। আর পপুলিস্টরা আরো আত্মকেন্দ্রিক ও স্বার্থান্বেষী হয়ে উঠেছে। ফলে আমেরিকার রাজনীতিতে বেড়ে গেছে অসহিষ্ণুতা ও সংঘাত। যে দেশের সংবিধানের প্রথম সংশোধনীতে এ দেশে সব মানুষকে ধর্মচর্চার অধিকার দেয়া হয়েছে, সেখানে আসতে থাকে বাধা। আক্রমণ করা হয় সিনাগগ, মসজিদে। ধমীর্য় পোশাককে কটাক্ষ করা হয়, র্যাবাইদের টুপি, মুসলিম নারীদের হিজাব ধরে টান দেয়া হয়। শিখ ধর্মাবলম্বীরাও নিস্তার পায় না। এই সিটিতে ধমীর্য় সংঘাত নতুন মাত্রা পায়। ইসলামোফোবিয়া শব্দটির ব্যবহার ইদানিং অর্থাৎ ৯/১১ এর পর থেকে অনেক বেশি বেড়ে গেছে।
অবদমন কোনো সমস্যার সমাধান নয়। বরং নদীর যাত্রাপথে বাধা দিলে নদী এক পথ ছেড়ে অনেক পথ তৈরি করে নেয়। এটা প্রকৃতির নিয়ম। মানুষও প্রকৃতির নিয়মের বাইরে নয়। তাদের বিশ্বাসকে অবদমন করার চেষ্টা হলে তা নানা পথে বিস্তৃত হয়। ৯/১১ পরবতীর্ সময়কালে তৎকালীন রক্ষণশীল সরকারের নীতিও ছিল এমন। অর্থাৎ একটি ধর্মের কতিপয় তরুণ যদি এই সন্ত্রাসী কাজ করে তবে এই ধর্মের সকল মানুষ কেন এই দায় নেবে? কিন্তু তৎকালীন সরকার তাই করেছে। ফল কী হয়েছে? ঐ ধর্মের মানুষজন আত্মরক্ষার্থে বেরিয়ে এসেছে। মার খেয়েও গর্তে ঢুকে লুকায়নি, মাথা নত করেনি। এর প্রতিফল পাওয়া গেল সঙ্গে সঙ্গেই। মাত্র তিন বছরের মাথায় এক মুসলিম কৃষ্ণাঙ্গ তরুণ বারাক হোসেন ওবামা ইলিনয় স্টেট থেকে ইউএস সিনেটর নির্বাচিত হলেন। এর চার বছর পর হলেন পুরো আমেরিকার প্রেসিডেন্ট। তারও আগে ২০০৩ সালে মিনেসোটা থেকে কনভার্টেড মুসলিম কিথ এলিসন কংগ্রেসম্যান পদে নির্বাচিত হন। এই ধারা আর থেমে থাকেনি। কংগ্রেসসদস্য ইলহান ওমর, রাশিদা তস্নাইবের কথা অনেকেই জানেন। সর্বশেষ জোহরান মামদানি। নিউইয়র্ক সিটির মেয়র।
২০০১ সালের ভয়াবহ ঘটনার পর ধর্মের পরিচয়ে মানুষকে বিভাজন করার রাজনীতি আমেরিকার সেক্যুলার ডেমোক্রেসিতে আঘাত হানতে থাকে। গায়ের রং, ধর্ম পরিচয়, কোন্ দেশ থেকে আসা ইমিগ্রান্ট ইত্যাদি পরিচয় বড় হতে থাকে।
আমেরিকা ইমিগ্রান্টদের দেশ। যখনই অন্য কোনো দেশের সাথে এ দেশের সমস্যা হয়েছে, তখনই সেইসব দেশের ইমিগ্রান্টদের ওপর নানা মাত্রায় শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ শুরু হয়ে যায়। যেমন সোভিয়েট ইউনিয়ন, জাপান, ইরান এবং সম্প্রতিকালে মুসলমানরা। স্বীকার করতে হবে, রাজনীতির উদ্দেশ্য সমাজ ও রাষ্ট্রকে সংবিধান—মোতাবেক সুচারুভাবে পরিচালিত করা, জনগণের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি না করে সকলকে একই পতাকার নিচে নিয়ে আসা। ইমিগ্রান্টরা সিটিজেন হিসাবে শপথ গ্রহণের সময় সংবিধানের প্রতি সর্বোচ্চ সম্মান প্রদর্শনের প্রতিজ্ঞা করে। এরপরও যদি কেউ অপরাধ করে, এদেশের প্রচলিত আইনে তার বিচার করতে হবে। একজনের অপরাধে অন্য কাউকে বা তাদের ধর্ম, বর্ণ, জাতি পরিচয়ে কোনো গোষ্ঠীকে যেন ঢালাওভাবে শাস্তির আওতায় আনা না হয়। প্রশাসনের সিদ্ধান্ত যদি ভুল হয়, তার খেসারত সমাজ ও রাষ্ট্রতে দিতে হয় অদূর অথবা সুদূর ভবিষ্যতে। অতএব সঠিক সিদ্ধান্তই কাম্য সকলের।
