যা দেখেছি যা বুঝেছি—২৮ || মনিরুল ইসলাম
সুখ—দুঃখ
শুনলাম বিবিসি—র সাংবাদিক সিরাজুর রহমান মারা গেছেন ৮১ বছর বয়সে (১/৬/১৫)। উনার এক ছেলে এক মেয়ে ছিল যারা আগেই মারা গেছে, কেন? আমার এক ছেলে নেই বলে দুঃখে বাঁচি না, আমার চেয়েও বড় দুঃখী তাহলে আছে? অগ্নি ধ্বংস বিধ্বস্ত বিনাশের এত দুঃখ দেখি আজকাল খবরে, মনে হয় দুঃখ কোনো ব্যাপারই না। আমি একটা মৃত্যু সহ্য করতে পারি না, মানুষ এতসব মৃত্যুর মধ্যে কিভাবে বাস করে? এত শোকের ভিড়ে আমার শোক কেন চাপা পড়ে না? আফগানিস্তান ইরাক সিরিয়া সুদান লিবিয়া ইয়ামেন প্যালেস্টাইনে মানুষ মরছে অকারণে নির্দোষে, আফ্রিকায় গৃহযুদ্ধ অথবা সাগর মহাসাগরে ভাসমান ডুবন্ত মানুষের চেহারা দেখলে মনে হয়, আমি তো ভালই আছি।
পৃথিবীর সব মানুষ যেমন নিজেকে সুখী করতে চায়, তেমনি সে নিজেকে দুঃখীও কল্পনা করে। দুঃখী না হলে হয়ত তার পূর্ণতা আসে না। সুখের ক্ষণে দুঃখ এসে উঁকি মারে। যখনই কোনো সুখের খবর আসে, পুরনো দুঃখরা চুপটি করে মনে এসে বসে যায়। তাই হাসির ভিড়েও কান্নারা এসে জড়ো হয়।
সুখ—দুঃখ দুইধরনের: মনের এবং দেহের। বস্তুগত দিক দিয়ে আসে ভোগের সুখ, উপলব্ধির সুখ আসে মানসিকভাবে। শারীরিক সুখ—দুঃখ ছাড়াও মানবমনের চিন্তা—ভাবনা থেকেও সুখ—দুঃখের উৎপত্তি হয়। অ—মানুষ প্রাণীদের চিন্তাশক্তি নেই বা কম বলে তাদের ব্যথা আছে, সুখ—দুঃখ নেই বা সামান্য। মানুষ কেন এত ভয়ে কুঁকড়ে থাকে! মৃত্যুভয়, পরকালচিন্তা, ঈশ্বরভীতি, পাপ—পুণ্যের ভারসাম্য, স্বর্গ—নরকের অনিশ্চয়তা তার সুখ কেড়ে নেয়।
দুঃখ মানুষকে যতখানি কষ্ট দেয়, সুখ তারচেয়েও বেশি খেঁাটা দেয়। সুখী মানুষেরা মাঝেমধ্যে তাই দুঃখকে আহ্বান করে। ছোটছোট দুঃখ তার সুখের ঔজ্জ্বল্য বাড়ায়, সুখানুভূতি তীব্রভাবে উদ্রেক করে। মিষ্টি বেশি হলে যেমন তিতা লাগে, তেমনি সুখ বেশি হলে অস্বস্তি লাগে। সুখের কি যন্ত্রণা আছে? আনন্দে যেমন কান্না আসে, সুখেও তেমনি যন্ত্রণা আসে, বিড়ম্বনা আসে। যত মজারই হোক, একই সুখাদ্য বা একই সুন্দরকাহিনী যেমন প্রতিদিন উপভোগ্য হয় না, নিরবচ্ছিন্ন সুখও আমাদের ভাল লাগে না। নিরন্তর দুঃখশোকও সে সহ্য করতে পারে না। অব্যাহতভাবে আসতে থাকলে সুখ কিংবা দুঃখ দুটোই একঘেয়ে বিস্বাদ বিরক্তিকর ঠেকে। যে কারণে পালাক্রমে মানুষ টক ঝাল মিষ্টি লবণাক্ত খায়, সে কারণেই তার জীবনে দরকার সম্মান মহিমার সাথে বিরহ বিগ্রহ বঞ্চনা লাঞ্ছনা।
আনন্দ আর বেদনা সমান দুনিয়াতেÑহয়ত কারো কোনোটা কম বা বেশি। জগতে তাদের সমান দাপট অথচ আনন্দ প্রকাশের এত মাধ্যম, এত বৈচিত্র্য, এত সুযোগ কিন্তু দুঃখ প্রকাশের উপায় কেন এত কম? আর যাই বা আছে দু’চারটাÑকান্না, হইচই, হাহাকার, হা—হুতাশা, দীর্ঘশ্বাসÑকেউ তা শুনতে চায় না, শেয়ার তো নয়ই। অথচ আনন্দের ভাগীদার সবাই হতে চায় সাগ্রহে। মানুষ দুঃখের কথা অল্প শুনতে চায় সেই দুঃখ পরিহার করার জন্য, সুখের কথা বেশি শুনতে চায় সেই সুখ নিজে অর্জন করার জন্য। মানুষ চায় আপনি বিপদে পড়–ন, একটা অন্যায় অপরাধ করুন, কী পরিণতি হয় দেখতে চায়, আপনার অধঃপতন থেকে শিখতে চায়। শোক কতটুকু আচ্ছন্ন করে বুঝতে চায়। এমন কি একজন দুঃখী মানুষও আরেকজন দুঃখীর গল্প শুনতে আগ্রহী নয়। তাহলে সংসারের এই অপার দুঃখ কোথায় রাখি?
‘আমার কেহ নাই’ বলে কেঁদে লাভ নেই, কারো—ই কেহ নাই। আর যাকে আপন ভাবছেন, সে—ও সম্পূর্ণ আপন নয়, কেউ কারো সম্পূর্ণ আপন হতে পারে না, প্রত্যেকেরই নিজস্ব একটা হিসাব আছে যা আপনার হিসাবের সাথে হুবহু মিলবে না। সুতরাং সবাই একা, আবার সবাই সবার। আপনি পৃথিবীতে সবার চেয়ে বড়/ সুখী হতে পারবেন না, সবার চেয়ে ছোট/ দুঃখীও আপনি নন। কারো হয় অনন্ত সুখতৃষ্ণা, কারো হয় সবকিছুতেই বিষণ্ণতা। আমি আর সুখ—দুঃখের পার্থক্য বুঝতে পারি না, সব যেন একাকার পিঠাপিঠি। বরং সুখের স্পর্শে দুঃখবোধ তীব্রতর হয়Ñস্বাদ যত বেশি, বিস্বাদ তত তীক্ষè। হয়ত এরই নাম বিষণ্ণতা। সেদিন পড়লাম, ঢাকা শহরের ৬৭% লোক নাকি বিষণ্ণতায় ভোগে।
পৃথিবীতে সুখ এবং দুঃখ আধাআধি করে মানবজীবনকে ঘিরে ধরে। তাই পৃথিবী সুন্দর এবং কুৎসিত, দুইভাগে বিভক্ত। কোন ভাগটাকে আমি বড় করে দেখি, সেটাই প্রশ্ন। কারো এত আনন্দ, কারো এত বেদনা কীসের? জগতে আনন্দ চাইলে শুধুই আনন্দ, দুঃখের দিকে তাকালে শুধুই দুঃখ। ভালর দিকে তাকালে মনে হয় সবাই আমার চেয়ে ভাল, খারাপের দিকে তাকালে দেখি সবাই বুঝি খারাপ। আমি কোনদিকে তাকাব? একদিকে চোখ রাখা যায় না, ভারসাম্যের জন্য দু’দিকেই তাকাই। আমি প্রাণপণে চেষ্টা করেছি সুন্দর ভাগটায় থাকতে, কে যেন ধাক্কিয়ে আমাকে কুৎসিত ভাগটায় নিয়ে আসে। আমার মনও দুইভাগে আধাআধি বিভক্তÑসুন্দর মন, কুৎসিত মন। এরা নিজেরাও আমাকে নিয়ে টানাটানি করে। একপক্ষে দূরের কথা, মাঝামাঝিও থাকতে দেয় না।
ভদ্রবেশি মানুষ অন্যায় অত্যাচার করবে, আর পার পেয়ে যাবে, তা হতে দেয়া যায় না। মানুষকে বলতে পারি না দত্তের প্রতারণার কথা, অনির শোকের কথা, মিলনের বিশ্বসঘাতকতার কথা। ছোটকথা বলা যায়, বড়কথা প্রকাশ করার বড়শক্তি হয় না মানুষের। শিল্পে সাহিত্যে সঙ্গীতে মানুষের বড়দুঃখ নয়, ছোটখাট দুঃখগুলোই প্রকাশ পায়Ñএতবড় ক্যানভাস হয়ত মানুষের মন ধারণ করতে পারে না।
মানুষ কি প্রকৃতিগতভাবেই চিরদুঃখী? কেন? জীবনব্যাপী তো নয়ই, প্রতিদিনই একজন মানুষ সুখী বা দুঃখী হতে পারে না। তবে নির্বোধরাই সার্বক্ষণিক সুখী বা সার্বক্ষণিক দুঃখী। কোনো একজন মানুষ সর্বক্ষণ সর্বসুখী নয়। পৃথিবীর সব মানুষ সুখী নয়, সব মানুষ দুঃখী নয়। তবে এর মানে এই নয় যে পৃথিবীর কেউ সুখী নয়। কিছু মানুষ সুখী, কিছু আছে দুঃখী।
দুঃখ দীর্ঘায়িত হলে দুঃখই বাড়ে কিন্তু আনন্দ/সুখ দীর্ঘায়িত হলে সেটার আর ইউটিলিটি থাকে না। সেজন্য ‘আকস্মিক/ক্ষণিক আনন্দ’ই প্রকৃত আনন্দ। সুখ বোধ হয় নিরবচ্ছিন্নভাবে ভোগ করে যাবার মতো কিছু নয়। এটা জ্যোৎস্নার মতো যা বারবার মেঘে ঢেকে যায়, দখিনা হাওয়ার মতো যা অচিরেই গুমোট বেঁধে ঝঞ্ঝা হয়ে যায়, যেন ক্ষণিকে দেখা ক্ষণিক পাওয়ার জিনিস। যাকে সারাক্ষণ হাতের কাছে পাই, তা মহামূল্যবান হলেও মূল্যহীন হয়ে যায়। যাকে পাওয়ার জন্য নিরন্তর আরাধনা করি, পাই দীর্ঘ সাধনার পর, সেই আরাধ্যও নগণ্য হয়ে পড়ে যদি তা পেয়ে যাই স্থায়ীভাবে।
চারদিকে কেন এত কান্না শুনতে পাই? কান পাতলেই শুনি অথৈ দুঃখের সাগরে ভাসমান মানুষের হৃদয়মথিত কান্না। একেক জন কাঁদে একেক কারণে। মর্যাদাহানির ভয়ে ও লজ্জায় অনেকেই অনেক সময় তা প্রকাশ করতে চায় না। পৃথিবীর দুঃখগুলি যেন পরাজয়ের প্রতীক, প্রকাশক। কেউ পরাজয় মেনে নিতে চায় না, স্বীকারও করে না। যদি না মানুষের দুঃখগুলো এভাবে চাপা পড়ত, দেখা যেত দুঃখের পরিমাণও সুখেরই সমান। আমার কী অপরিমেয় দুঃখ, আগে বুঝিনি। এমনি আরো কত মানুষের দুঃখ আমারই মতো, যোগ করলে কত বড় যে দুঃখের সাগর। তেমনি সুখÑকত মানুষ যে কত সুখী, সব যোগ করলে সুখের অথৈ বারিধি। তারপর সুখ—দুঃখ পাল্লায় উঠালে সমান সমান অর্থাৎ ব্যালেন্সড, অর্থাৎ আধাআধি।
