মধ্যবর্তী নির্বাচনে পরাজয়ের ভয়ে প্রাপ্তবয়স্কদের ৫,০০০ ডলার করে দিতে চান প্রেসিডেন্ট
বিবিসি বাংলা প্রতিবেদনঃ ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রচলিত রাজনৈতিক প্রচারণার নিয়মকানুন মেনে চলতে পছন্দ করেন না। কিন্তু মধ্যবর্তী নির্বাচনে জয়ী হলে প্রত্যেক নাগরিককে পাঁচ হাজার ডলার দেওয়ার যে প্রতিশ্রুতি তিনি দিয়েছেন, সেটিকে বেশ অদ্ভুত হিসেবেই দেখা হচ্ছে। বুধবার মিডটার্ম রিপাবলিকান কনভেনশনের উদ্বোধনী রাতে তার মূল বক্তব্যে এটি প্রধান শিরোনাম ছিল না। কিন্তু নিজের দীর্ঘ ভাষণের প্রায় এক ঘণ্টা পর তিনি এমন এক সময়ে বিষয়টি তোলেন, যখন শ্রোতাদের মনোযোগ কিছুটা কমতে শুরু করেছিল। যদিও এক ট্রিলিয়ন ডলারের বেশি অর্থের এই প্রতিশ্রুতি কীভাবে বাস্তবায়ন করা হবে বা অর্থ কীভাবে বিতরণ করা হবে, সে বিষয়ে কোনো বিস্তারিত বিবরণ তিনি দেননি। এ বিষয়ে আরও তথ্য চাওয়া হলে হোয়াইট হাউস এক বিবৃতিতে জানায়, ‘এই ঘোষণাটি আবারও প্রমাণ করে যে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এমন কাজ করেন যা তথাকথিত ‘বিশেষজ্ঞরা’ অসম্ভব বলে মনে করেন। তিনি আমেরিকান জনগণের জন্য তা বাস্তবায়ন করেন।’
তবে এটি কীভাবে কার্যকর করা হবে, সে বিষয়ে কোনো সুনির্দিষ্ট বিবরণ দেওয়া হয়নি।
টেক্সাসের ডালাসে রিপাবলিকান কনভেনশন অ্যারেনায় উপস্থিত সমর্থকদের কাছ থেকে এই ঘোষণার সময় তুমুল করতালির মাধ্যমে স্বাগত জানানো হয়। কিন্তু নভেম্বরের নির্বাচনে তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতার মুখে থাকা রিপাবলিকানরাÑ যাদের স্বাধীন ভোটারসহ সংশয়ে থাকা ভোটারদের মনও জয় করতে হবে, তাদের বেশিরভাগই এই অনুষ্ঠান থেকে দূরে ছিলেন।
এছাড়াও ট্রাম্পের অনেক রিপাবলিকান সহকর্মীও এই ঘোষণায় অবাক হয়েছিলেন। কেউ কেউ এটিকে স্বাগত জানালেও, যারা ট্রাম্পের সমালোচক, তারা দ্রুতই এর তীব্র নিন্দা জানান। যে রক্ষণশীলরা এর আগে ট্রাম্পের সঙ্গে বিরোধে জড়িয়েছিলেন, বিশেষ করে তার প্রেসিডেন্সিতে ফেডারেল ঋণের লাগামহীন বৃদ্ধির বিষয়টি নিয়ে, তারাও এই প্রতিশ্রুতির কড়া সমালোচনা করেছেন।
কেন্টাকির রিপাবলিকান প্রতিনিধি থমাস ম্যাসি সামাজিক মাধ্যম এক্স—এ লিখেছেন, ‘আপনাদের কথা জানি না, তবে খোলামেলাভাবে বলতে গেলে এই নভেম্বরে আমার ভোটটি পাঁচ হাজার ডলারে কেনা যেতে পারেÑ এই ধারণায় আমি অপমানিত বোধ করছি।’
‘তাছাড়া এটি যে মুদ্রাস্ফীতি ঘটাবে, তা তো বলাই বাহুল্য।’
সিনেটর সুসান কলিন্স বলেন, ‘ট্যাক্স ও ব্যয়ের সিদ্ধান্তগুলো আমেরিকান জনগণের প্রয়োজন এবং অর্থনীতির অবস্থার ওপর ভিত্তি করে নেওয়া উচিত, এগুলো যেন কোনোভাবেই নির্বাচনী ফলাফলের সঙ্গে যুক্ত বলে মনে না হয়।’
এদিকে, ডেমোক্র্যাটরা ট্রাম্পের এই ঘোষণাকে একটি ‘ফাঁকা প্রতিশ্রুতি’ বলে অভিহিত করেছে।
আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প নির্বাহী আদেশের মাধ্যমে এত বিশাল পরিমাণ অর্থ অনুমোদন করাতে পারবেনÑ এমন সম্ভাবনা কম। তবে বৃহস্পতিবার প্রেসিডেন্ট সিবিএস—এর মার্কিন অংশীদারকে ইঙ্গিত দিয়ে বলেছেন যে, এ জন্য তার কংগ্রেসের অনুমোদন নেওয়ার প্রয়োজন হবে না।
সিবিএস—কে তিনি বলেন, কংগ্রেসের অনুমোদন ছাড়াই এটি করা সম্ভব হবে বলে তিনি মনে করেন, এরপর তিনি যোগ করেন, ‘যদি আমাদের প্রয়োজন হয়, আমি মনে করি তারা এটি করবে।’
কিন্তু অর্থনৈতিকভাবে রক্ষণশীল অনেক রিপাবলিকান প্রতিনিধি এই ধরনের ব্যয়কে সমর্থন করতে অস্বীকৃতি জানাবেন বলেই মনে হয়।
সাবেক রিপাবলিকান প্রতিনিধি বব গুড এটিকে ‘ট্রাম্প ডিভিডেন্ড’ বলে উল্লেখ করেছেন এবং ‘সমাজতান্ত্রিক ভোট কেনার স্কিম’ বলে উড়িয়ে দিয়েছেন।
তবে এই ঘোষণা এই বিষয়টিও স্মরণ করিয়ে দেয় যে, ট্রাম্প এখনো নিজের দলের ওপর আধিপত্য বজায় রেখেছেন এবং অন্তত কংগ্রেসে তিনি এর আগেও তার দলের ঐতিহ্যগত রক্ষণশীল অবস্থানের সঙ্গে মেলে না এমন নীতির ক্ষেত্রেও প্রতিনিধিদের নত করেছেন।
ভোটারদের নগদ অর্থ দেওয়ার এই ধরনের প্রতিশ্রুতি প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এবারই প্রথম দিলেন না। তার বাণিজ্য শুল্কের মাধ্যমে পাওয়া রাজস্ব থেকে আমেরিকানরা প্রত্যেকে যে দুই হাজার ডলারের চেক পাবেন বলে তিনি বলেছিলেন, যার অপেক্ষায় তারা এখনো বসে আছেন। আর ডজ ব্যয় সংকোচন নীতি থেকে যে পাঁচ হাজার ডলার আসার কথা ইলন মাস্ক প্রস্তাব করেছিলেন, সেটিও কখনো বাস্তবায়িত হয়নি। অবশ্য, ট্রাম্প তার আমলে জন্ম নেওয়া শিশুদের জন্য এক হাজার ডলার সরকারি অনুদানে ট্রাম্প সেভিংস অ্যাকাউন্ট খোলার প্রতিশ্রুতি রক্ষা করেছেন। এছাড়া আমেরিকার ২৫০তম বার্ষিকী উদযাপনের জন্য সমস্ত মার্কিন সামরিক সদস্য এক হাজার ৭৭৬ ডলার করে একটি বরাদ্দ পেয়েছেন।
নভেম্বরে বড় ধরনের পরাজয়ের মুখে পড়ার আশঙ্কায় ডোনাল্ড ট্রাম্প কি এমন আকর্ষণীয় নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি দেওয়া জরুরি মনে করছেনÑএটি কি তারই কোনো লক্ষণ?
ব্যালটে প্রেসিডেন্টের নাম না থাকলেও মার্কিন ভোটাররা মধ্যবর্তী নির্বাচনগুলোকে বর্তমান প্রেসিডেন্টের ওপর এক ধরনের গণভোট হিসেবে বিবেচনা করেন, আর তাতে ক্ষমতাসীন দলের জন্য লড়াই করা কঠিন হয়ে দাঁড়ায়।
নির্বাচনের দুই মাসেরও কম সময় বাকি থাকতে, ট্রাম্প ঐতিহাসিকভাবে কম অনুমোদন রেটিং বা জনপ্রিয়তার মুখোমুখি হচ্ছেন। ইরানের সঙ্গে তার যুদ্ধ ধারাবাহিকভাবে অজনপ্রিয় হয়ে উঠেছে এবং এর বিরূপ প্রভাবে সাধারণ আমেরিকানরা পেট্রল পাম্পে গিয়ে চরম ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন।
ভোটারদের কাছে জীবনযাত্রার ব্যয় বহন করার বিষয়টি এখনো একটি শীর্ষ ইস্যু এবং জো বাইডেনের আমলের কোভিড—পরবর্তী অবস্থা থেকে মূল্যস্ফীতি কিছুটা কমলেও তা এখনো বেশ উঁচুতেই রয়েছে।
তাহলে এই প্রতিশ্রুতি কি এমন ইঙ্গিত দেয় যে, তার ঘনিষ্ঠ সহযোগীদের অনেককে জানানোর আগেই তিনি নিজের পকেট থেকে এই নীতিটি বের করে এনেছিলেন, যার পেছনে এক ধরনের আতঙ্ক কাজ করেছে? পরাজয়ের আশংকা?
একটি বড় নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি ঘোষণার এটি নিঃসন্দেহে একটি অত্যন্ত অভিনব উপায়। কিন্তু ট্রাম্পের রাজনৈতিক সাফল্য দাঁড়িয়ে আছে তার এই নিয়ম ভাঙার ব্যবসায়িক পদ্ধতির ওপরই।
তার এই নতুন চাল হয়তো সফল হতে পারেÑ কিন্তু কেবল তখনই, যদি ভোটাররা বিশ্বাস করেন যে তিনি তাদের হাতে চেক তুলে দেওয়ার বিষয়ে আন্তরিক।
