নাহার মনিকা’র কবিতা
সামরিক
দিন দিন খাকি রং ফিকে হয়
আকাশের গাঢ় ভেদ করে থিক থিকে হয়
চারপাশে হিমাগার
ডাবের শাঁসের মত ঘন জলাধার
ঢেকে দিচ্ছে রোদ নীল জনস্রোতে,
অঙ্গারশীলা মানুষের লেজ,
নিষ্ক্রিয় উঠে পড়ছে পাতাহীন ডালে।
ভরে উঠছে রোমকূপে ভয়,
ভীড়ে ভীড়ে ফুলে উঠছে পথ
মানুষের অবিরত ভন্ডামির নথ
উদ্বেগে দুলে উঠছে।
ব্যর্থতার দায়ভার গলে যায় নুন,
চেষ্টাহীন সংলাপে ঠাঁই পাচ্ছে খুন।
দিকচিহ্ন ভুল হওয়া ভ্রম্নণ থেকে
জন্মাচ্ছে মাছি, ভীষণ ব্যাঙ্গাচি
হ্রস্য হচ্ছে নদী, লাল হচ্ছে পথ
বিষ থেকে ফুঁড়ে উঠছে নকল হলফ,
দল হচ্ছে, ছল হচ্ছে, শুষে নিচ্ছে শ্বাস
বেপরোয়া জন্মাচ্ছে মৃতদেহাচারী,
তুমি আমি ভাগ হচ্ছি অসংগত লাশ।
দিনপঞ্জি
মৃত্যুর পরেই বুঝি দিনপঞ্জি ডানা ঝাপ্টায়!
ডায়েরির পাতা থেকে প্রবাহ সংকেত
সুদূর অতীত থেকে দিন ফিরে আসে,
অনায়াস বসে থাকি একটা জীবন।
ক্ষুদে কালো বীজখোর মাঠের চড়ুই
লুকিয়ে রেখেছে গাঢ় রঙ্গের বেদনা
যাবতীয় নীল,
অবরুদ্ধ থেকে যাওয়া হাড়ের সন্তাপ
বার বার ঘুরে ফিরে একই কথা বলে—
সকাল—দুপুর আর দিনান্তের তাপ
রাত আনে ততোধিক দাহ’র অধিক।
ডায়েরির সাদা পাতা প্রাণময় হলে
দিনলিপি পাখা মেলে শরগের দিকে
তারাপুঞ্জ খুঁড়ে আনে দিশাহীন রাত,
জলের প্রপাতে তোলা কম্পমান ছবি
উড়ে যাওয়া পরাশ্রয়ী স্থবির স্মৃতিরা—
ডায়েরির কাছে নত, বিহবল থাকে।
দাগ
অঙ্গের দাগ লোপ না পেলেও অপেক্ষা থাকে।
প্রণয়ের মত ক্লিশে শব্দের আগে, বেপরোয়া ঢেউ
রিলেশনশীপে, বাধ্য প্রেমের সমীপে সমীপে—
জুড়ে দিক, ত্রস্ত আঙ্গুল দিয়ে মুড়ে দিক কেউ!
‘পথ চিনি না’র মত এ ভাঙ্গা দেউল, রথভাঙ্গা মেলা
‘তোমা বই কারে মানি না’র ডাক, বাজনা বাজাক
কুঞ্জের বউল নিয়ে অবাধ ঝিঁঝোটি, বিহাগ ধরুক।
অঙ্গের দাগে বাটখারা আছে, এপাশে ওপাশে,
হাঁটাপথে—ত্রাস, নদীক্ষয়ী ঘাসÑ, রেলের স্লিপার
কত কত মাঠ খালি পরে থাকে—
মুঠি মুঠি প্রেম, রাঙ্গা হাসির পরাগ ছুঁড়েছে—
আবীর, অধরা রাধাকে।
ছক
সম্পাদ্য ঘুমঘুম দিন, উপপাদ্যে অশ্রুত সুর,
জেগে থেকে কত রাতÑ, ভোরেও উঠেছি
না ছোঁয়া নিকট একই থেকে গেছে, সে—ই বহু দূর!
মনে না থাকাকে বুঝি প্রবঞ্চনা ভুলে যাওয়া বলে!
অচল সিকির ছক চালুমাল দোকানে কে তোলে?
বাজার ধ্বসের হাওয়া তল পায় রেখায় রশ্মিতে।
বিন্দু রেখা খাটো হলে শূন্যের কাছে হেরে যায়,
সঞ্চারপথ দাগে ভরা, অনুশয়ে শুধু কাটাকুটি
শতসিদ্ধে হাতে শুধু ধোঁয়াটে ছাইয়ের নীল মুঠি!
এইসব রাত
এইসব রাত নিয়ে আমি কিছু বলি না।
অভাবিত দৈত্যের গ্রাসে—
নিজেকে গিলতে দেখি পিচ্ছিলতায়।
গ্রহের বাইরে থেকে আচ্ছন্ন চোখ
নেমে আসে চোখের কোটরে,
আমার ভেতরে ঢুকে আমাকেই দেখে,
দেখে নেয় ফাঁদ—
সোনার দেয়ালে জমা চেনাশোনা খাদ।
খসখসে
গোলাপের মত ফুটে আছে যেন আসল গোলাপ
কোন দিন ঝরে পড়বে না তবু চোখেমুখে ভয়
রোদ থেকে লুকোলেই যেন ওদের মতন
কোমল কোড়ক হয়ে সুবাস ছড়াবে বর্ষায়
সুরে গেয়ে যেন ওরা আপনার জন
মেঘ মল্লারে দেবে নিখাদ বিলাপ।
মানুষের চাতুরীতে প্রেমের মিশেল,
তটে এসে ঝুঁকে থাকা ঢেউয়ের মতন
ভান করে উঠে আসে মৎসনারীরা—
কাগজের ফুলের মতন নিজেদের মন
আমরাও সরাসরি বুঝতে পারি না।
আকাশ জমাই
এ যাবত জমিয়েছি আমার আকাশ
আরো জমে সকাল আর সন্ধ্যার মাঝখানে
পূর্ণিমার রাতে যেটা জমে ক্ষীর হয়, ঐ—
যার বুকে নিঃস্বতা, নিজস্বতা ঢেলে দেয়া চলে!
ক্লান্তিহীন পাখি উড়ে গেলে থামতে বলি না
যার ছায়া জলের ওপরে পড়ে স্থির হয়—
বড় নার্সিসাস!
নদীর বিকল্প নেই, তবু জানি
আকাশেই ডুব দেয়া ভালো
পথ ও পাখীর মধ্যে সুতোময় সাঁকো—
ধরে ফেলা মরিচায় মোলায়ম ছোপ,
আকাশই তো সমূহ নিঃশ্বাস!
বুকের ভেতরে তাকে জমাবো না তো কাকে?
