হঠাৎ বুক জ্বালা

ডা. খাজা নাজিমউদ্দীনঃ বুক জ্বালা বা এসিড রিফ্লাক্স বর্তমান সময়ে একটি অত্যন্ত পরিচিত শারীরিক সমস্যা। কমবেশি সব বয়সের মানুষকেই জীবনের কোনো না কোনো সময়ে এই অস্বস্তিকর অনুভূতির মুখোমুখি হতে হয়। সাধারণত বুকের মাঝখানে বা বুকের হাড়ের ঠিক পেছনে একটি জ্বালাপোড়া বা অস্বস্তিকর অনুভূতির সৃষ্টি হয়, যা অনেক সময় গলা পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ে। হঠাৎ করে কেন এই সমস্যা দেখা দেয় এবং এর পেছনের চিকিৎসা বিজ্ঞানভিত্তিক কারণগুলো নিচে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো।

বুক জ্বালা হওয়ার মূল কারণ

আমাদের খাদ্যনালি পাকস্থলীর সংযোগস্থলে একটি পেশির বলয় বা ভালভ থাকে, যাকেলোয়ার ইসোফেজিয়াল স্ফিংটার' বলা হয়। খাবার খাওয়ার সময় এই ভালভটি খুলে যায় এবং খাবার পাকস্থলীতে প্রবেশ করার পর তা শক্তভাবে বন্ধ হয়ে যায়, যাতে পাকস্থলীর এসিড খাবার ওপরে উঠে আসতে না পারে। কোনো কারণে এই ভালভটি দুর্বল হয়ে পড়লে বা ঠিকমতো কাজ না করলে পাকস্থলীর শক্তিশালী এসিড খাদ্যনালিতে ওপরে উঠে আসে। খাদ্যনালির ভেতরের দেয়াল পাকস্থলীর মতো এসিডপ্রতিরোধী নয়, ফলে এসিডের সংস্পর্শে এলে সেখানে জ্বালাপোড়ার সৃষ্টি হয়।

যেসব কারণে হঠাৎ বুক জ্বালা হতে পারে

খাদ্যাভ্যাস অতিরিক্ত খাওয়া: অতিরিক্ত তেলযুক্ত, ভাজাপোড়া, অধিক মসলাযুক্ত খাবার, চকলেট, পেঁয়াজ কিংবা ক্যাফেইনযুক্ত পানীয় কোকজাতীয় পানীয় গ্রহণ করলে এলইএস পেশি দুর্বল হয়ে পড়ে। এছাড়া অতিরিক্ত পেট ভরে খাবার খেলে পাকস্থলীতে প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি হয়, যা এসিড ওপরে ঠেলে দেয়।

খাওয়ার পরপরই শুয়ে পড়া: খাবার খাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে শুয়ে পড়লে মাধ্যাকর্ষণের টানে খাবার এসিড সহজে খাদ্যনালিতে ওপরে চলে আসার সুযোগ পায়। বিশেষ করে রাতের ভারী খাবারের পর দ্রুত ঘুমাতে গেলে এই সমস্যা বেশি দেখা দেয়।

শারীরিক ওজন গর্ভকালীন অবস্থা: অতিরিক্ত ওজন বা স্থূলতার কারণে পেটের ভেতরের অংশে বাড়তি চাপ পড়ে, যা পাকস্থলীর এসিডকে ওপরের দিকে ঠেলে দেয়। এছাড়া গর্ভাবস্থায় হরমোনজনিত পরিবর্তনের কারণে শরীরের পেশিগুলো কিছুটা শিথিল হয় এবং বর্ধিত জরায়ুর চাপে প্রায়ই গর্ভবতী নারীর বুক জ্বালার সমস্যা দেখা দেয়।

ধূমপান অ্যালকোহল: ধূমপান এবং অতিরিক্ত মাত্রায় অ্যালকোহল গ্রহণ করলে এলইএস পেশি শিথিল হয়ে যায় এবং স্বাভাবিক কার্যক্ষমতা হারিয়ে ফেলে, যা এসিড রিফ্লাক্সের ঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়।

নির্দিষ্ট কিছু ওষুধ: ব্যথানাশক ওষুধ, উচ্চ রক্তচাপ বা পেশি শিথিল করার কিছু নির্দিষ্ট ওষুধ নিয়মিত সেবন করলে পাকস্থলীতে এসিডের পরিমাণ বেড়ে যায় কিংবা খাদ্যনালির ভালভ ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

হায়াটাল হার্নিয়া: এটি একটি শারীরিক অবস্থা, যেখানে পাকস্থলীর ওপরের অংশ ডায়াফ্রামের ছিদ্র দিয়ে বুকের ভেতরে ওপরে উঠে আসে। এর ফলে স্বাভাবিক নিয়ন্ত্রণ নষ্ট হয়ে খুব সহজেই এসিড ওপরে উঠে আসে এবং তীব্র বুক জ্বালা অনুভূত হয়।

ঘরোয়া প্রতিকার প্রতিরোধ উপায়

হঠাৎ বুক জ্বালার সমস্যা থেকে দ্রুত উপশম পেতে কিছু সাধারণ নিয়ম মেনে চলা যেতে পারে:

অতিরিক্ত ভারী খাবার না খেয়ে অল্প অল্প করে বারবার খাবার গ্রহণ করা উচিত।

খাবার খাওয়ার অন্তত থেকে ঘণ্টা পর্যন্ত বিছানায় শুয়ে পড়া থেকে বিরত থাকা উচিত।

হঠাৎ করে বুক জ্বালা হওয়ার কারণ অতিরিক্ত টাইট বা আটোসাঁটো পোশাক পরা এড়িয়ে চলা ভালো, যা পেটে চাপ সৃষ্টি করে।

ঘুমানোর সময় মাথার দিকটা সামান্য উঁচু করে (১০ থেকে ২০ সেন্টিমিটার) ঘুমালে এসিড সহজে ওপরে উঠতে পারে না।

কখন চিকিৎসকের কাছে যাওয়া জরুরি?

মাঝে মাঝে বুক জ্বালা হওয়া খুব সাধারণ একটি বিষয় হলেও যদি এই সমস্যা সপ্তাহে দুই বা তার বেশিবার দেখা দেয়, তবে তা ক্রনিক বা জিইআরডি এর লক্ষণ হতে পারে। এছাড়া বুক জ্বালার সঙ্গে যদি তীব্র বুকে চাপ ধরা, খাবার গিলতে কষ্ট হওয়া, বিনা কারণে ওজন হ্রাস পাওয়া কিংবা বমির সঙ্গে রক্ত যাওয়ার মতো লক্ষণ প্রকাশ পায়, তবে অবহেলা না করে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।

Related Posts