গানের ভেলায় স্মৃতির খেয়ায়— আট অবিনাশী সুরের কণ্ঠলিপি ফিরোজা বেগম

শরৎকালের ভোরে শিউলি তলার সেই স্নিগ্ধ ঘ্রাণ যেমন মনকে এক নিমেষে ভাল করে দেয়, ফিরোজা বেগমের কণ্ঠস্বর ছিল ঠিক তেমনÑশুভ্র, ঋজু এবং আভিজাত্যে মোড়া। মঞ্চে যখন তিনি এসে দাঁড়াতেন, সাদা সিল্কের শাড়ি সংগে গায়ে জড়ানো শুভ্র শাল আর কপালে সেই পরিচিত টিপ, মনে হতো কোনো এক সুরের মন্দিরের প্রধান পূজারিণী সংগীত পিপাসুদের সামনে উপস্থিত। নজরুলসংগীতের শুদ্ধতা বজায় রাখতে তিনি সারাটি জীবন যে লড়াই করেছেন, তা কেবল সংগীত নয়, বরং এক মহাকাব্যিক সাধনা। ফিরোজা বেগম ১৯৩০ সালের ২৮ জুলাই ফরিদপুরে জন্মগ্রহণ করেন এবং ২০১৪ সালের সেপ্টেম্বর ঢাকায় মৃত্যুবরণ করেন। তাঁর প্রস্থানে বাংলা সংগীতের এক যুগের অবসান ঘটেছে ঠিকই, কিন্তু তাঁর রেখে যাওয়া সেই শুদ্ধ সুরের পরম্পরা আজও বাঙালিদের দিশার নিশানা দেয়।

দশ বছরের সেই কিশোরী কবির আশীর্বাদ

ফিরোজা বেগমের সংগীত জীবনের শুরুটা ছিল অনেকটা রূপকথার মতো। মাত্র দশ বছরের এক কিশোরী, যার কণ্ঠে স্বরলিপিগুলো তখনো ঠিকমতো খেলা করতে শেখেনি, সেই বয়সে তিনি সান্নিধ্য পেলেন খোদ বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামের। কবির সেই জহুরি চোখ চিনে নিয়েছিল এই রত্নটিকে। ১৯৪২ সালে যখন তাঁর প্রথম ইসলামি গানের রেকর্ড প্রকাশিত হলো, তখন বাংলা গানের আকাশে এক নতুন সূর্যোদয় ঘটল। সেই শৈশবে নজরুল তাঁর গান শুনে মুগ্ধ হয়েছেন। শিখিয়ে দিয়েছেন সুরের সেই সূক্ষ¥ কারুকাজ যা সমসাময়িক অন্য অনেক প্রতিষ্ঠিত শিল্পীর পক্ষে কন্ঠে তোলা ছিল প্রায় অসম্ভব। ফিরোজা বেগম কেবল নজরুলের শিষ্যা ছিলেন না, তিনি ছিলেন কবির সেই অবিনাশী সুরের প্রাণভোমরা।

শুদ্ধতার অতন্দ্র প্রহরী

নজরুলসংগীতের বিকৃতি যখন চারদিকে ছড়িয়ে পড়ছিল, তখন ফিরোজা বেগম হয়ে উঠলেন এক অতন্দ্র প্রহরী। তিনি বিশ্বাস করতেন, নজরুলসংগীতের সুর আর স্বরলিপি হলো এক পবিত্র সংবিধান, যার এক বিন্দু পরিবর্তনও অন্যায়। তাঁর কণ্ঠের সেই বিশেষগামকআরআন্দোলনশুনলে মনে হতো কবি নিজেই বুঝি তাঁর কলম দিয়ে সুরের প্রতিটি ভাঁজ এঁকে দিয়েছেন। তিনি যখন গাইতেন—‘মোর ঘুমঘোরে এলে মনোহর’—তখন শ্রোতার মনে হতো এক অলৌকিক প্রশান্তি নেমে এসেছে চরাচরে। তাঁর গায়কিতে যে গাম্ভীর্য আর পান্ডিত্য ছিল, তা নজরুলসংগীতকে সেই সময় এক অনন্য সম্মানের আসনে বসিয়ে দিয়েছিল যা এখনও চলমান।

বৈচিত্র্যের আঙিনায় এক অপ্রতিদ্বন্দ্বী সুর

ফিরোজা বেগম কেবল নজরুলসংগীতের মাঝেই নিজেকে সীমাবদ্ধ রাখেননি। তাঁর কণ্ঠে আধুনিক গান, গজল আর ভজন এক অন্য উচ্চতা লাভ করেছিল। বিশেষ করে তাঁর গাওয়া গজলগুলো শুনলে মনে হয় কোনো এক পারস্যের কবি বুঝি বাংলায় কথা বলছেন। সুরের প্রতিটি মীড় আর তানে তিনি যে মুন্সিয়ানা দেখাতেন, তা ছিল বিস্ময়কর। কমল দাশগুপ্তের সেই জ্যামিতিক সুরের ব্যাকরণকে তিনি ধারণ করেছিলেন তাঁর হৃদয়ে। সংগীত আর জীবন যেখানে মিলেমিশে একাকার হয়ে যায়, ফিরোজা বেগম ছিলেন সেই মোহনার সার্থক রূপকার।

বাঙালি যেখানে প্রতিনিয়ত নিজেদের শেকড় আর সংস্কৃতির অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার লড়াই করছে, সেখানে ফিরোজা বেগম এক বড় অনুপ্রেরণা। ব্যস্ত জীবনের ভীড়ে যখন ফিরোজা বেগমের কন্ঠে বেজে ওঠে গান, শোনা যায় তাঁর সেই জ্যামিতিক কণ্ঠের প্রতিধ্বনি, তখন প্রতিটি বাঙালি মুহূর্তের জন্য হলেও ফিরে যাবেন সেই দিনগুলোতে, যেখানে আভিজাত্য মানে ছিল পরিচ্ছন্ন সংস্কৃতি আর শুদ্ধ সুরের চর্চা। তিনি শিখিয়েছেন যে, সস্তা জনপ্রিয়তা নয়, বরং ধ্রুপদী গুণমানই একজন শিল্পীকে অমর করে রাখে। ফিরোজা বেগম মানুষ হিসেবে ছিলেন অত্যন্ত দৃঢ়চেতা। তাঁর ব্যক্তিত্বের সেই তেজ তাঁর গানেও ফুটে উঠত। তিনি যখন মঞ্চে গাইতেন, তখন পিনপতন নীরবতায় মানুষ আবিষ্ট হয়ে থাকত। তিনি কেবল গান শোনাতেন না, তিনি সুরের মাধ্যমে এক ধরনের আধ্যাত্মিক সংযোগ তৈরি করতেন। 

ফিরোজা বেগমের বিখ্যাত কয়েকটি গান

১। মোর ঘুমঘোরে এলে মনোহর, ২। দূর দ্বীপবাসিনী চিনি তোমারে চিনি, ৩। শাওন রাতে যদি, ৪। ভরিয়া পরাণ শুনিতেছি গান, ৫। শূন্য বুকে পাখী মোর, ৬। যত ফুল তত ভুল কণ্টক জাগে, ৭। এমনি বরষা ছিল সেদিন, ৮। তুমি কি এখন দেখিছো স্বপন, ৯। খেলিছ বিশ্ব লয়ে, ১০। গভীর নিশীথে ঘুম ভেঙে যায়, ১১। তুমি হাতখানি যবে রাখ মোর হাতের পরে, ১২। এই কি গো শেষ দান, ১৩। বুলবুলি নীরব নার্গিস বনে, ১৪। আমি বনফুল গো, ১৫। আমি চাঁদ নহি অভিশাপ, ১৬। আমার ভূবন কান পেতে রয়, ১৭। ওরে নীল যমুনার জল, ১৮। তব গানের ভাষায় সুরে, ১৯। কলঙ্ক আর জোছনায় মেশা, ২০। কেউ ভোলে না কেউ ভোলে, ২১। যদি আপনার মনে মাধুরী মিশায়ে, ২২। তুমি এসেছিলে জীবনে আমার, ২৩। পথহারা পাখী কেঁদে ফেরে একা, ২৪। জনম জনম গেল আশা পথ চাহি, ২৫। আমার যাবার সময় হল।

পরিশেষ

ফিরোজা বেগম মানেই হলো নজরুলসংগীতের এক জীবন্ত এনসাইক্লোপিডিয়া। তিনি সেই দীপশিখা, যা নজরুলসংগীতের সুরকে বিস্মৃতির তল থেকে আলোর পথে নিয়ে এসেছিলেন। সুরের এই মহীয়সী শিল্পী বাঙালির হৃদয়ে বেঁচে থাকবেন তাঁর সেই শ্বেতশুভ্র আভিজাত্য আর শুদ্ধ স্বরলিপি নিয়ে। যতদিন বাংলা ভাষা থাকবে, যতদিন নজরুলের গান আমাদের হৃদয়ে প্রতিধ্বনিত হবেততদিন ফিরোজা বেগম প্রাসঙ্গিক হয়ে থাকবেন। ফিরোজা বেগম কেবল একটি নাম নয়, ফিরোজা বেগম মানে এক অবিনাশী সুরের উপাসনা, যা সময়ের ধুলোয় কখনো ম্লান হওয়ার নয়।

Related Posts