সময় কাউকে ক্ষমা করে না
এ বছর আমেরিকার স্বাধীনতার ২৫০ বছর পূর্তি। আমেরিকা স্বাধীনতা অর্জন করেছিল যে বিপ্লবের মধ্য দিয়ে, তার নাম ছিল আমেরিকান রেভোল্যুশন। গ্রেট বৃটেন ও আমেরিকার যে ১৩টি কলোনি ছিল সেখানকার বিদ্রোহীরা এইসব কলোনির সংস্কার চেয়ে রাজনৈতিক আন্দোলন শুরু করে। সেই আন্দোলন পরিণত হয় বৃটেনের বিরুদ্ধে আমেরিকার যুদ্ধ। সেই যুদ্ধের নামকরণ করা হয় আমেরিকান রেভোল্যুশনারি ওয়ার। বিপ্লব থেকে যুদ্ধের মধ্য দিয়ে আমেরিকা স্বাধীনতা অর্জন করে ১৭৭৬ সালে ৪ জুলাই। স্বাধীনতা ঘোষিত হলেও চূড়ান্ত বিজয় অর্জিত হয় ১৭৮১ সালে। সেই পথ ধরেই সার্বভৌমত্বের লক্ষ্যে ১৭৮৩ সালে ট্রিটি অব প্যারিস স্বাক্ষর হয়। ১৭৮৯ সালে আমেরিকার সংবিধান গৃহীত হয় আর বিল অব রাইটস ১৭৯১ সালে।
আমেরিকার ইতিহাসের এইসব ফিরিস্তি তুলে দেয়ার কারণ হলো, বিংশ শতকে এসে প্রথম রাশিয়ায়, তারপর চীনসহ এশিয়া ও ল্যাটিন আমেরিকার বিভিন্ন দেশে কম্যুনিজম ও সোশালিজমের প্রভাবে বিপ্লব নতুন স্বরূপে আবিভূর্ত হয়ে বিপুল সাফল্য অর্জন করে। মাক্সের্র উৎপাদন ব্যবস্থার সমবন্টন, সাম্য, অসাম্প্রদায়িকতার বাণী বিশ্বজুড়ে তরুণ সমাজকে বিপুলভাবে প্রভাবিত ও উদ্বুদ্ধ করে। ফলে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে পূর্ব ইয়োরোপ থেকে এশিয়া ও ল্যাটিন আমেরিকার দেশগুলোতে সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব সংঘটিত হতে থাকে। কিন্তু আধুনিক পৃথিবীর প্রথম বিপ্লবের পথিকৃত আমেরিকা নিজেদের লিগাসিকে জলাঞ্জলি দিয়ে দাঁড়িয়ে যায় বিপ্লবের বিরুদ্ধে। যেসব দেশে সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব হয়েছে বা হওয়ার পথে, কিংবা যেসব দেশ প্রো—সোভিয়েট এবং প্রো—চাইনিজ রেভোল্যুশনের পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে বা বিপ্লব হয়েছে সেসব দেশে আমেরিকা কাউন্টার রেভোল্যুশন করিয়েছে। এই কাউন্টার রেভোল্যুশনের পথটিও অনেকের কাছে বেশ পরিচিত। যেমন দেশের ভেতর থেকে একজন নেতা গোছের কাউকে বেছে নিয়ে তার অপরাপর সাঙ্গপাঙ্গ দিয়ে কিছু মানুষকে পথে নামিয়ে সরকার বিরোধী আন্দোলন নামক একটি হটকারি কার্যক্রম শুরু করে। এর জন্য বেশির ভাগ ক্ষেত্রে একটি দেশের রাজনৈতিক দলকেই বেছে নেয়া হয় গোপনে। তবে রাজনৈতিক দল না পেলে খুব কমন প্র্যাকটিস হলো সেনাবাহিনীকে হাত করা। সেনা প্রধান সাহসী না হলে তরুণ সেনা কর্মকর্তাদের নানা কায়দায় ও লোভ দেখিয়ে সম্মত করা হতো। তবে একই ফমুর্লা সব দেশে বা সর্বক্ষেত্রেই ব্যবহার করা হয় না।
বাংলাদেশে ১৯৭৫ সালে ‘বাকশাল’ গঠিত হলে দেশ একদলীয় সমাজতান্ত্রিক ব্লকে ঢুকে পড়ার আশংকায় তরুণ সেনা কর্মকর্তাদের দ্বারা হত্যা করা হয় বঙ্গবন্ধুসহ তার পরিবারের প্রায় সকল সদস্যকে। যে সেনা কর্মকর্তারা এই হত্যায় জড়িত ছিল তারা ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ চলার মাঝামাঝি সময় পাকিস্তান থেকে সীমান্ত অতিক্রম করে পালিয়ে আসে ভারতে। যোগ দেয় মুক্তিযুদ্ধে। স্বাধীনতার পর তারা বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে যোগ দেয় এবং ভেতরে ভেতরে আওয়ামী লীগ ও বাংলাদেশের ঘরের শত্রু বিভীষণ খন্দকার মোশতাকের সাথে যোগসাজশ করে এই হত্যাকান্ড ঘটিয়ে নিজেরাই স্বীকার করে তারা হত্যাকারী।
১৯৮১ সালে প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানকে চট্টগ্রাম সার্কিট হাউজে হত্যা করে কতিপয় তরুণ সেনা কর্মকর্তা। এই ঘটনার তদন্ত করেনি বিএনপি বা এরশাদ, পরে আওয়ামী লীগ। তড়িঘড়ি করে প্রেসিডেন্ট সাত্তারের শাসনামলে জিয়া হত্যার সাথে জড়িত সেনা কর্মকর্তাদের কোর্ট মার্শালে মৃত্যুদন্ড দেয়া হয়। কিন্তু জিয়াউর রহমানকে হত্যার পরোক্ষ বেনিফিশিয়ারি তৎকালীন সেনাপ্রধান নিজেকে আড়ালে রেখে পরে নিজেই ক্ষমতা দখল করেন। তবে তার পতন হয় দেশের রাজনৈতিক দলগুলোর সম্মিলিত আন্দোলনে।
১৯৯৬ সালে তৎকালীন সেনাপ্রধান জেনারেল নাসিম একটি ব্যর্থ অভ্যুত্থান করেন। তার আগে তিনি কয়েকবার পেন্টাগনে বৈঠক করেন বলে পত্রিকায় খবর প্রকাশিত হয়। এরপর পুনরায় সেনা ছত্রছায়ায় অভ্যুত্থান হয় ২০০৬ সালের ১১ জানুয়ারি। অর্থনীতিবিদ ফখরুদ্দিন আহমেদকে প্রধান উপদেষ্টা করা হলেও পর্দার আড়ালে কলকাঠি নাড়েন জেনারেল মঈন ইউ আহমেদ। সেই শাসনামলের মূল এজেন্ডা গোপন থাকেনি। গ্রামীণ ব্যাংকের প্রধানকে এর আগের বছর শান্তিতে নোবেল প্রাইজ দিয়ে বাঙালিদের ‘গৌরবের’ জায়গায় উন্নীত করা হয়। মঈনুদ্দিন—ফখরুদ্দিন সরকার আইন ভেঙে জরুরী অবস্থা চলাকালে তাকে রাজনৈতিক দল গঠন করার সব সুযোগ দেয়। উদ্দেশ্য ছিল তিনি সফল হলে মাইনাস টু ফমুর্লা অনুযায়ী শেখ হাসিনা এবং বেগম জিয়াকে রাজনীতির মাঠ থেকে সরিয়ে দেয়া হবে। কিন্তু এই অরাজনৈতিক ব্যক্তি সেই টোপে পড়ে নিজেই পিছলে পড়েন। জেল থেকে ছেড়ে দেয়া হয় দুই নেত্রীকে। বেগম জিয়া বিষয়টি বুঝতে না পারলেও শেখ হাসিনা বুঝে ফেলেন। ফলে তিনি ২০০৮ সালে নির্বাচনে জয়ী হয়ে সরকার গঠন করে তদন্ত শুরু করেন মুহাম্মদ ইউনুসের। তদন্তে অনেক অজানা তথ্য বেরিয়ে আসে।
মুহাম্মদ ইউনুস তার বিদেশী বন্ধুদের কাছে, বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্র ও সরকার প্রধানদের কাছে শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে লবিং করে। সে সময় তিনি আমেরিকা বা বৃটেনের প্রভাবশালী পত্রিকায় কভারেজ না পেয়ে ওয়াশিংটন পোস্ট এবং ওয়াল স্ট্রিট জার্নালে পুরো পৃষ্ঠার বিজ্ঞাপন দিয়ে নিজের ঢাক পেটান।
২০২৪ সালে জেনারেল ওয়াকারুজ্জামানকে দিয়ে অভ্যুত্থান ঘটানো হয়। মুহাম্মদ ইউনুস প্যারিস থেকে ফিরে গিয়ে পূর্ব পরিকল্পনামত ক্ষমতায় বসে দেশ বিক্রির চুক্তির খসড়া তৈরি করতে থাকেন। তাকে কি সুস্থ বা বুদ্ধিমান বা মেধাবী মানুষ বলা যাবে? যে ব্যক্তি দেশের ক্ষতি করার চুক্তি করতে পারেন জেনেশুনে, তিনি অত্যন্ত নিকৃষ্ট স্তরের মানুষ। তিনি কি জানেন না সাদ্দাম হোসেন, জেনারেল মার্কোস, ওসামা বিন লাদেন, হোসনি মোবারকদের কে বানিয়ে গাছে তুলে দিয়ে মই কেড়ে নিয়েছিল?
আমেরিকা ‘রেভোল্যুশনের’ পথিকৃত। কিন্তু বিংশ শতকের সব রেভোল্যুশনে তারা বিরোধিতা করেছে। তাদের কাছে রেভোল্যুশন অর্থই জনগণের বিপ্লব। কিন্তু তারা জনগণের বিপ্লবে বিশ্বাস করে না। তারা গণতন্ত্রের ধুয়া তুলে বিভ্রান্ত করে প্রথমে বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফকে দিয়ে ঋণে ঋণে জর্জরিত করে, পরে সেনাবাহিনীকে দিয়ে রেজিম চেঞ্জের তৎপরতা শুরু করে। ২০২৪ সালে বাংলাদেশে ‘রেভোল্যুশন’ বা ‘বিপ্লব’ হয়েছে বলে যারা দাবি তোলে তারা আমেরিকার রাজনীতির সহজপাঠ সম্পর্কে সম্পূর্ণই অজ্ঞ। মুহাম্মদ ইউনুস আমেরিকার তরিকায় ২০২৪ এর তৎপরতায় নেতৃত্ব দিয়েছেন দূর থেকে ‘মিটিকিউলাস’ চাতুর্যে। তার জানা উচিত তার গায়েও তার প্রভু রাষ্ট্র থুতু ছিটিয়ে দিয়ে ছুঁড়ে ফেলে দেবে যেমন করে সাদ্দাম, মার্কোস, লাদেনদের ফেলা হয়েছে।
বাংলাদেশে কেউই ইতিহাস থেকে শিক্ষা নেয় না, কেউ না। সময় বড় নিষ্ঠুর। সময় কাউকে ক্ষমা করে না।
