ডয়চে ভেলের সংবাদ বিশ্লেষণ || আবার আলোচনায় জঙ্গি হামলার আশংকা
ডয়চে ভেলে প্রতিবেদনঃ গত বৃহস্পতিবার পুলিশ সদরদপ্তর থেকে গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলোতে হামলার আশঙ্কা করে চিঠি দেয়ার পর জঙ্গি ও উগ্রবাদ ইস্যু সামনে এসেছে। এরপর মঙ্গলবার এই বিষয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও প্রধানমন্ত্রীর তথ্য উপদেষ্টার দুই ধরনের বক্তব্য পাওয়া গেছে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্যের পর পুলিশের গোয়েন্দা ইউনিট ডিবি ঢাকার দুটি স্থান থেকে চারজনকে গ্রেপ্তারের খবর প্রচার করা থেকে বিরত থেকেছে। মঙ্গলবার কামরাঙ্গীরচর ও কেরানিগঞ্জ থেকে তাদের গ্রেপ্তার করা হয়। এ সময় তাদের কাছ থেকে আগ্নেয়াস্ত্র, গুলি ও ড্রোন ও বিস্ফোরক উদ্ধার করা হয়।
গ্রেপ্তারকৃতরা হলেন মো. ইমরান চৌধুরী (২৯), মো. মোস্তাকিম চৌধুরী (২৫), রিপন হোসেন শেখ (২৮) ও আবু বক্কর (২৫)। তারা নিষিদ্ধ সংগঠন ‘আকসা’র সক্রিয় সদস্য এবং বিভিন্ন স্থানে নাশকতামূলক কর্মকান্ড ও হামলার পরিকল্পনায় জড়িত ছিলেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র নিশ্চিত করেছে। তাদের সঙ্গে তেহেরিক—ই—তালিবান অব পাকিস্তানের (টিটিপি) যোগাযোগের তথ্যও পাওয়া গেছে।
এর আগে চট্টগ্রামের একটি ঘাঁটি থেকে নিখোঁজ হওয়া বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর এক ওয়ারেন্ট অফিসারের সন্ধান মেলে নিষিদ্ধ ঘোষিত জঙ্গি সংগঠন তেহরিক—ই—তালেবান পাকিস্তানের (টিটিপি) এক ডেরায়। ঐ ঘটনার পর সশস্ত্র বাহিনীর অভ্যন্তরে উগ্রপন্থি নেটওয়ার্কের উপস্থিতি নিয়ে অভ্যন্তরীণ তদন্ত শুরু হয়। পাকিস্তান সরকার সম্প্রতি বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষকে জানিয়েছে, তাদের সামরিক বাহিনীর সঙ্গে যুদ্ধে লিপ্ত টিটিপির পক্ষে বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর ওই সদস্য কাজ করছেন।
বাংলাদেশে টিটিপির উপস্থিতি নতুন নয়। ২০১৩ সালে মার্কিন পররাষ্ট্র দফতরের প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, ওই বছরের জানুয়ারিতে বাংলাদেশে তিন টিটিপি সদস্যকে গ্রেফতার করা হয়েছিল। এমনকি গতবছর পাকিস্তানের সামরিক অভিযানে অন্তত চার জন বাংলাদেশী টিটিপি যোদ্ধা হিসেবে নিহত হওয়ার খবর পাওয়া যায়।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও প্রধানমন্ত্রীর তথ্য উপদেষ্টা যা বলেছেন
মঙ্গলবার ঢাকায় কোস্টগার্ডের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর অনুষ্ঠানে দেশে জঙ্গি উত্থান বিষয়ে এক প্রশ্নের জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, ‘আমি আপনাদের প্রশ্নগুলো বুঝতে পেরেছি। কিন্তু আমি ওই শব্দকে রিকগনাইজ (স্বীকৃতি দেওয়া) করি না। আমাদের দেশে এ রকম কোনো তৎপরতা নেই। কিছু এক্সট্রিমিস্ট গ্রুপ (উগ্রপন্থি গোষ্ঠী) থাকে, পৃথিবীর সব দেশেই এ রকম অ্যাকটিভ (সক্রিয়) থাকে, র্যাডিক্যাল কিছু ফোর্স থাকে, ফান্ডামেন্টাল কিছু পলিটিক্যাল পার্টি থাকে, এগুলোতে আমরা ইউজড টু, এগুলো থাকে। কিন্তু সেই বিষয়ে আপনি যে শব্দ উচ্চারণ করলেন আমাদের দেশের বর্তমান কালচারে (সংস্কৃতি) সেটা এখন আর নেই। আগে সেই শব্দটা উচ্চারিত হতো ফ্যাসিবাদী আমলের সময়, তারা নিজস্ব রাজনৈতিক ফায়দা হাসিলের জন্য এগুলোকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করত। বর্তমানে বাংলাদেশে সেগুলোর এক্সিসট্যান্স (অস্তিত্ব) নেই।’
একইদিন সচিবালয়ে দেশে জঙ্গি রয়েছে স্বীকার করে প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচারবিষয়ক উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান বলেন, ‘সরকার এটাকে শূন্যে নামিয়ে আনার চেষ্টা করছে।’ তিনি বলেন, ‘এটা ফ্যাক্ট, বাংলাদেশে জঙ্গি আছে। কিন্তু এখানে দুটো এক্সট্রিম (চরমপন্থা) আছে, আমি দুটো এক্সট্রিমের কথা বলি। আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে জঙ্গি সমস্যা যেই স্কেলে দেখানো হয়েছে, এটা তাদের ক্ষমতায় থাকার একটা ন্যারেটিভ হিসেবে তারা ব্যবহার করেছিলেন যে বাংলাদেশে জঙ্গি আছে, জঙ্গিরা সব দখল করবে। আবার অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে এই আলাপ কেউ কেউ করার চেষ্টা করেছেন যে, বাংলাদেশে কোনো জঙ্গি নেই। এটাও আরেকটা এক্সট্রিম, এটাও ভুল কথা। বাংলাদেশে একটা পর্যায়ে মিলিট্যান্সি, জঙ্গিবাদ ছিল, আছে। সেটাকে আমরা আসলে কমব্যাট করতে চাই।’
বোমা তৈরির সময় বিস্ফোরণ কীসের আলামত?
গত ১৪ ফেব্রুয়ারি ভোরে চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর উপজেলার চরবাগডাঙ্গায় বোমা তৈরির সময় একটি বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। এতে আল আমিন ও জিহাদ আলী নামে দুই তরুণ নিহত হন। আহত হন বজলুর রহমান, শুভ ও মিনহাজ আলী। এই ঘটনায় পুলিশ সাত জনকে গ্রেফতার করে তাদের কাছ থেকে তথ্য পাওয়ার দাবি করেছে। পুলিশ জানায়, বিস্ফোরণের ঘটনাটি ঘটে শরিফ উদ্দীনের ভাই আবুল কালামের বাড়িতে। তদন্তে উঠে এসেছে, দুলালের তত্ত্বাবধানে সেখানে বোমা তৈরির কাজ চলছিল। ঘটনার পর ওই দিন রাতে সদর থানার উপপরিদর্শক বেলাল হোসেন বাদী হয়ে ১০ জনের নাম উল্লেখ করেন এবং অজ্ঞাতপরিচয় আরও ৮ থেকে ১০ জনকে আসামি করে মামলা করেন।
এর আগে গত ২৭ ডিসেম্বর ঢাকার দক্ষিণ কেরানিগঞ্জের হাসনাবাদ এলাকায় একটি মাদ্রাসায় বিস্ফোরণে একতলা ভবনের পশ্চিম পাশের দুটি কক্ষের দেয়াল উড়ে যায়। এতে নারী, শিশুসহ চারজন আহত হন। ঘটনাস্থলে ককটেল, রাসায়নিক দ্রব্য ও বোমা তৈরির বিভিন্ন সরঞ্জাম পাওয়া গেছে বলে প্রত্যক্ষদর্শী ও পুলিশ জানিয়েছে। উম্মাল কুরা ইন্টারন্যাশনাল মাদ্রাসা নামে একতলা ভবনে এ বিস্ফোরণ ঘটে। দক্ষিণ কেরানীগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সাইফুল আলম তখন বলেছিলেন, ঘটনাস্থল থেকে ককটেল, দাহ্য পদার্থ ও বোমা তৈরির সরঞ্জাম উদ্ধার করা হয়েছে। এ ঘটনায় মাদ্রাসার পরিচালক শেখ আল আমিন (৩২), তার স্ত্রী আছিয়া বেগম (২৮) এবং তাদের তিন সন্তানের মধ্যে দুই ছেলে উমায়েত (১০) ও আবদুল্লাহ (৭) আহত হন। এর মধ্যে আছিয়া ও তার দুই সন্তানকে প্রথমে স্থানীয় হাসপাতালে নেওয়া হয়। কর্তব্যরত চিকিৎসক উন্নত চিকিৎসার জন্য তাদের ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠান।
ভবন মালিক পারভীন বেগম তখন বলেছিলেন, ‘তিন বছর ধরে আমার বাড়ি ভাড়া নিয়ে মুফতি হারুন মাদ্রাসা পরিচালনা করতেন। হারুন তার শ্যালক আলামিন ও শ্যালকের স্ত্রী আছিয়াকে মাদ্রাসা পরিচালনার দায়িত্ব দেন। তিনি মাঝেমধ্যে মাদ্রাসায় আসতেন। আমি নিয়মিত খোঁজখবর নিতাম। কিন্তু মাদ্রাসার আড়ালে কী কার্যক্রম চলছিল, তা বুঝতে পারিনি। আজ এসে দেখি, ভবনের চারপাশ উড়ে গেছে। পুলিশ ভবনের ভেতর থেকে কেমিকেল, ককটেল ও বোমা তৈরির সরঞ্জাম উদ্ধার করেছে। আমি এগুলো দেখে বিস্মিত।’
পুলিশের চিঠিতে যা বলা হয়েছে
বৃহস্পতিবার পুলিশ সদরদপ্তরের ডিআইজি (গোপনীয়) কামরুল আহসানের সই করা একটি চিঠি সব রেঞ্জ ডিআইজি, মেট্রোপলিটন কমিশনার ও জেলা পুলিশ সুপারসহ পুলিশের সব ইউনিটে পাঠিয়ে নিরাপত্তা জোরদারের নির্দেশে দেওয়া হয়েছে। চিঠিতে বলা হয়, সম্প্রতি গ্রেফতার হওয়া নিষিদ্ধ ঘোষিত উগ্রবাদী সংগঠনের সদস্য ইসতিয়াক আহম্মেদ সামী ওরফে আবু বক্কর ওরফে আবু মোহাম্মদের সঙ্গে সেনাবাহিনীর চাকরিচ্যুত দুই সেনাসদস্যের নিয়মিত যোগাযোগের তথ্য পাওয়া গেছে। এই চক্রটি জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা যেমন, জাতীয় সংসদ ভবন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর স্থাপনা ও সদস্য, ধর্মীয় উপাসনালয়, বিনোদনকেন্দ্র এবং শাহবাগ ম্যুরালসহ গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় হামলার পরিকল্পনা করতে পারে। বোমা বিস্ফোরণের পাশাপাশি দেশীয় ধারালো অস্ত্র বা আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহার করে হামলার আশঙ্কার কথা বলা হয়েছে চিঠিতে।
চিঠিতে আরও বলা হয়, তারা বিভিন্ন বাহিনীর অস্ত্রাগারে হামলার পরিকল্পনাও গ্রহণ করে থাকতে পারে বলে গোয়েন্দা তথ্যের ইঙ্গিত রয়েছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর মতে, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা দেশের সার্বিক নিরাপত্তার জন্য উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ। এই পরিপ্রেক্ষিতে চিঠিতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলোর নিরাপত্তা জোরদারের পাশাপাশি নজরদারি বৃদ্ধি এবং সন্দেহভাজনদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য অনুরোধ জানানো হয়েছে।
এই চিঠির পর গত সোমবার রাজধানীর হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরসহ ৮টি বিমানবন্দরে নিরাপত্তা জোরদার করা হয়।
মৃত্যুদন্ডপ্রাপ্ত ৯ জঙ্গি এখনও পলাতক
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তথ্য অনুযায়ী দেশে ১ হাজার ৬১১ জঙ্গির নাম তালিকাভুক্ত রয়েছে। এই জঙ্গিদের বেশিরভাগ বিভিন্ন সময় জামিনে মুক্ত হয়েছে। তালিকা অনুযায়ী, ২০২১ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত এক হাজার ২৩১ জন জঙ্গি জামিনে কারাগার থেকে মুক্তি পেয়েছে। আর ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ২০২৫ সালের জুলাই পর্যন্ত জামিন পেয়েছে আরো ৩৮০ জন।
এই ৩৮০ জনের মধ্যে সাতজন আনসার আল ইসলাম, চারজন এবিটি, ৬৮ জন জেএমবি, ছয়জন নব্য—জেএমবি, ছয়জন হিযবুত তাহরীর, চারজন ইমাম মাহমুদের কাফেলা, চারজন হুজি, ১৫ জন জেএএফএইচএস এবং ২৬৫ জন নাম—উল্লেখ না থাকা সংগঠনের সদস্য। এর মধ্যে ১১৪ জন জামিন পাওয়ার পর থেকে আর কখনো আদালতে হাজিরা দেননি। আবার সন্ত্রাসবিরোধী আইনে করা মামলায় অভিযুক্ত অন্তত ৩৭০ জন জঙ্গি এখনো গ্রেপ্তার হয়নি।
দেশের ১৬টি কারাগারে গত বছরের জুন পর্যন্ত ১৬২ জন জঙ্গি বন্দি রয়েছেন। এর মধ্যে বিচারাধীন আছেন ৩২ জন, মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ৫৯ জন, যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্ত ৪৬ জন ও অন্যান্য ২৫ জন। এছাড়া ২০২৪ সালের আগস্টে কারাগার ভেঙে পালিয়ে যাওয়া জঙ্গিদের মধ্যে ৭৯ জনকে এখনও ধরা যায়নি। এদের মধ্যে ৯ জন মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত।
বৃহস্পতিবার ঢাকা মেট্টোপলিটন পুলিশের কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম ইউনিটের প্রধান (সিটিটিসি) যুগ্ম কমিশনার মুনশী শাহাবুদ্দীন সাংবাদিকের প্রশ্নের জবাবে বলেছেন, ‘আমরা তথ্য পেয়েছি, কাজ করছি।’
