গুজবের গণতন্ত্রে বারুদের বিলাসিতা ড. জীবন বিশ্বাস
বসন্তের বাতাস যখন ওয়াশিংটনের পটোম্যাক নদীর তীরে মৃদু হিল্লোল তুলে বয়ে যায়, তখন কেউ কি ভেবেছিল সেই নিস্তরঙ্গ সন্ধ্যায় বারুদের কটু গন্ধ মিশে থাকবে? ২৫ এপ্রিলের সেই ব্ল্যাক—টাই রজনী, যেখানে ওয়াশিংটন হিলটনের আলোকোজ্জ্বল বলরুমে আমেরিকার রথী—মহারথীরা সমবেত হয়েছিলেন, তা কেবল একটি সান্ধ্যকালীন প্রথা ছিল না, তা ছিল মার্কিন গণতন্ত্রের এক অগ্নিপরীক্ষা। ওয়াশিংটন হিলটনের সেই সুসজ্জিত কক্ষে উপস্থিত ছিলেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প, ফাস্টর্ লেডি মেলানিয়া ট্রাম্প, ভাইস প্রেসিডেন্ট জে. ডি. ভ্যান্স এবং মন্ত্রিসভার দিকপাল সদস্যবৃন্দ। অনুষ্ঠানটি যখন তার নিজস্ব ছন্দে গতিশীল, ঠিক তখনই বলরুমের বাইরে থেকে ভেসে আসা গুলির শব্দ সমস্ত আবহ পাল্টে দিল। সিক্রেট সার্ভিসের তৎপরতায় প্রেসিডেন্ট ও তাঁর সঙ্গীরা দ্রুত নিরাপদ আশ্রয়ে স্থানান্তরিত হলেন, কিন্তু বাতাসে রয়ে গেল এক অসহ্য উৎকণ্ঠা। এবিসি নিউজের ভাষ্যমতে, দুই সহস্রাধিক সাংবাদিক, সরকারি আমলা ও বিশিষ্ট ব্যক্তিদের সেই জমায়েত মুহূর্তেই এক অস্থির রণক্ষেত্রে পরিণত হলো। রাজনীতির এই জটিল দাবার ঘুঁটিগুলো যখন নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে বিভ্রান্তের মতো ছুটছে, তখন ইতিহাসের পাতায় আরও একবার প্রশ্নবিদ্ধ হলো নাগরিক নিরাপত্তার সেই অমোঘ অলংকার। মূলত, রাজনৈতিক মেরুকরণ এবং তথ্যের অবাধ প্রবাহ যখন সত্যের চেয়ে গুজবকে অধিক মোহনীয় করে তোলে, তখন আধুনিক গণতন্ত্রের ভঙ্গুরতা এবং এর নৈতিক অবক্ষয় নিয়ে নির্মোহ বিশ্লেষণ করা সময়ের দাবি হিসেবে দেখা দেয়। আর সেই দাবির নিরিখেই আজকের এই উপসম্পাদকীয়।
ফেডারেল কর্তৃপক্ষের তদন্তের জাল ক্যালিফোর্নিয়ার টরেন্স নিবাসী কোল টোমাস অ্যালেন নামক এক যুবকের গ্রীবা আটকে ধরে। ৩১ বছরের এই যুবকের বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগগুলো যেন কোনো এক হাড়হিম করা থ্রিলার উপন্যাসের পটভূমিকেও হার মানায়। প্রেসিডেন্টকে হত্যার কু—প্রচেষ্টা থেকে শুরু করে এক রাজ্য থেকে অন্য রাজ্যে মারণাস্ত্র পরিবহনের মতো গুরুতর অপরাধ একের পর এক ঘটাতে থাকে এই সন্দেহভাজন খুনী। মার্কিন বিচার বিভাগ এবং রয়টার্সের ভাষ্য অনুযায়ী, এই সহিংস অপরাধের দায় প্রমাণিত হলে যুবকের বাকি জীবনটা জেলের চার দেয়ালের দীর্ঘশ্বাস গুনেই অতিবাহিত করতে হবে। আইনের এই কঠোর শাসন হয়তো অপরাধীকে দন্ড দেবে, কিন্তু সমাজের গভীরে প্রোথিত সেই যে অন্ধ আক্রোশ আর অস্থিরতা, তাকে সমূলে উপড়ে ফেলতে পারবে কি? নাকি বরাবরের মত আমেরিকান জনগণ কেবল ঘটনার উপরিভাগ নিয়ে নাড়াচাড়ার কসরতই দেখতে থাকবে?
আশ্চর্যের বিষয় হলো, এই হামলার সময় তথ্যের কোনো খরা ছিল না। বরং তথ্যের প্রবল প্রাচুর্যই এখানে এক বড় বিভ্রান্তি হয়ে দাঁড়ায়। দেশের তুখোড় সাংবাদিক ও প্রখর ধীসম্পন্ন সম্পাদকদের চোখের সামনে যখন এই কান্ডটি ঘটল, তখন খবরের তোড়ে ভেসে যাওয়ার কথা ছিল সব সংশয়। কিন্তু দেখা গেল এক বিপরীত ও কৌতুকপূর্ণ চিত্র। অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস উল্লেখ করেছে যে, নির্ভরযোগ্য সংবাদমাধ্যমগুলো থেকে তথ্যের নিরবচ্ছিন্ন প্রবাহ থাকা সত্ত্বেও মানুষের মনে কোনো স্বস্তি ফেরেনি। বাম ও ডান উভয় শিবিরের রাজনীতির কারবারিরা তথ্যের চেয়ে তত্ত্বে বেশি মনোযোগী হলেন। ‘সাজানো নাটক’ বা ‘মঞ্চায়ন’—এর মতো বিষাক্ত শব্দগুলো যখন জনমানসে বাতাসের বেগে ঘুরপাক খেতে শুরু করল, তখন বোঝা গেল আধুনিক রাজনৈতিক যোগাযোগের গভীর সংকটটি আসলে কোথায়। তথ্য এখন আর কেবল সংবাদের বাহক নয়, তাকে এখন গল্পের উত্তেজনা, সন্দেহের আদিম আনন্দ এবং পরিচয়—রাজনীতির তীব্র আবেগের সঙ্গে অসম প্রতিযোগিতায় নামতে হচ্ছে।
ইউনিভার্সিটি অব মেরিল্যান্ডের অধ্যাপক জেন গোলবেক এই মনস্তাত্ত্বিক সংকটের এক চমৎকার ব্যাখ্যা দিয়েছেন। তাঁর মতে, প্রতিষ্ঠানের প্রতি গভীর আস্থাহীনতা এবং সত্য—মিথ্যা পৃথক করার সহজাত অক্ষমতা গুজবের জন্য এক ‘পাঠ্যপুস্তকীয় রেসিপি’ তৈরি করে। ষড়যন্ত্রচিন্তার ভেতরে নাকি এক ধরনের বিচিত্র আবেগীয় পুরস্কার লুকিয়ে থাকে। মানুষ অসংলগ্ন সূত্রের মধ্যে ‘ইঙ্গিত’ খুঁজতে বড় ভালোবাসে, কারণ তাতে তারা নিজেদের অনন্য বুদ্ধিমান এবং ইতিহাসের সক্রিয় অংশীদার বলে অনুভব করে। এই যে এক ধরনের মিথ্যা ‘পন্ডিতি’ করার আনন্দ, এটিই গুজবের পালে হাওয়া দেয়। তথ্য যেখানে একঘেয়ে, গুজব সেখানে রঙিন; আর মানুষ বরাবরই ধূসর সত্যের চেয়ে রঙিন মিথ্যার মোহে আচ্ছন্ন হতে পছন্দ করে।
এই পর্যবেক্ষণটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ ওয়াশিংটন হিলটনের সেই গুলির শব্দগুলো মুহূর্তের মধ্যে পুরনো ও জীর্ণ রাজনৈতিক বয়ানের ভেতরে ঢুকে পড়ল। ট্রাম্পের কট্টর সমালোচকদের একটি অংশ কোনো প্রমাণ ছাড়াই দাবি করতে শুরু করলেন যে, প্রেসিডেন্টের পড়ন্ত জনপ্রিয়তা কিংবা ইরান যুদ্ধের দামামা থেকে বিশ্ববাসীর মনোযোগ সরাতেই এই নাটকের অবতারণা। আবার বিপরীত মেরুর অতি—ডানপন্থী কণ্ঠগুলোও একই সুরে প্রশ্ন তুলল, যদিও তাদের উদ্দেশ্য ছিল নিরাপত্তার কড়াকড়িকে আরও কঠোর করার পক্ষে যুক্তি সাজানো। ওয়াশিংটন পোস্টের এক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, এই ‘সাজানো ঘটনা’র তত্ত্বটি মতাদর্শিক সীমানা অতিক্রম করে প্রো—ট্রাম্প মহল থেকে ট্রাম্প—বিরোধী শিবিরের ড্রয়িংরুমেও পৌঁছে গেছে। সত্য যখন বহুমুখী আক্রমণের শিকার হয়, তখন যুক্তি কেবল কোণঠাসা হয়ে পড়ে থাকে। এ যেন যুক্তিহীনতার আধিপত্যের এক অনন্য গবেষণাপত্র।
ট্রাম্পের ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তা বা অ—জনপ্রিয়তা নিয়ে তর্কের বিস্তর অবকাশ থাকতে পারে, কিন্তু সেই অ—জনপ্রিয়তা কি কোনো মানবিক অবমাননা বা সহিংসতার নাগরিক অনুমতিপত্র হতে পারে? রয়টার্স—ইপসোস জরিপ বলছে, তাঁর অনুমোদন হার এখন মাত্র ৩৪ শতাংশে এসে ঠেকেছে, যা তাঁর রাজনৈতিক জীবনের এক চরম দুর্দিন। জীবনযাত্রার আকাশচুম্বী ব্যয় নিয়ন্ত্রণ কিংবা ইরান সংঘাত, সবক্ষেত্রেই সাধারণ মানুষের আস্থা আজ টালমাটাল। এমনকি ইকোনমিস্ট—ইউগভ জরিপে দেখা যায়, অর্ধেকের বেশি মানুষ তাঁর কাজকে প্রবলভাবে অসমর্থন করেন। কিন্তু গণতন্ত্রের শক্তি ও সৌন্দর্য তো এখানেই যে, ক্ষমতার সর্বোচ্চ শিখরে আসীন ব্যক্তির নীতি, চরিত্র বা শাসনভঙ্গির কঠোরতম সমালোচনা করতে পারে যে কেউ, কিন্তু তাঁর বিরুদ্ধে সহিংসতাকে কখনোই ‘স্বাভাবিক’ বা ‘অনিবার্য’ বলে যুক্তি দিতে পারে না। ট্রাম্প অ—জনপ্রিয় হতে পারেন কিন্তু তাকে আঘাত করার চেষ্টাকে সমর্থন করাও একটি অপরাধ। প্রকৃতপক্ষে তা কারো জন্যই প্রযোজ্য হতে পারে না।
বিশ্ব জানে, ডোনাল্ড ট্রাম্পের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক সহিংসতা এখন আর কোনো দূরবর্তী দুঃস্বপ্ন নয়, বরং এক নির্মম ও বারবার ঘটে চলা বাস্তবতা। ২০২৪ সালের ১৩ জুলাই পেনসিলভেনিয়ার বাটলারের সেই জনসভার কথা কি ভোলা যায়? যেখানে নিশ্চিত মৃত্যুর হাত থেকে অলৌকিকভাবে রক্ষা পেলেও প্রাণ হারান কোরি কমপেরাতোরে নামক এক ব্যক্তি। এরপর ১৫ সেপ্টেম্বর ফ্লোরিডার গলফ ক্লাবের ঘটনা কি কেবল কাকতালীয়? ২০২৬—এর ফেব্রুয়ারিতে রায়ান ওয়েসলি রাউথের যাবজ্জীবন দন্ড সেই দীর্ঘ অপরাধনামারই একটি অংশ মাত্র।
সবচেয়ে গভীর বিপদটি লুকিয়ে আছে অন্যখানে। ষড়যন্ত্রতত্ত্ব যখন মানুষের দুঃখ বা মৃত্যুকে বিনোদনের উপাদানে রূপান্তরিত করে, তখন সমাজের নৈতিক ভিত্তিটিই নড়বড়ে হয়ে যায়। যখন প্রতিটি জাতীয় ট্র্যাজেডিকে এক—একটি সাজানো নাটক হিসেবে দেখা হয়, তখন প্রকৃত ভুক্তভোগীরা হয়ে যান মঞ্চের সামান্য প্রপস, সরকারি কর্মকর্তারা হয়ে যান মেলোড্রামার সস্তা চরিত্র, আর সাধারণ নাগরিকরা সত্যের সন্ধানী না হয়ে বরং সন্দেহের অপেশাদার গোয়েন্দায় রূপান্তরিত হন। রাজনৈতিক ভুলতথ্য নিয়ে গবেষক এমিলি ভ্রাগা সতর্ক করেছেন যে, তথ্যের অতি—প্রাচুর্য মানুষকে ক্লান্ত করে দেয়, আর সেই ক্লান্তির সুযোগ নিয়ে মানুষ সরলীকৃত কিন্তু বিষাক্ত বয়ানের প্রতি ঝুঁকে পড়ে। এই সরলীকরণই গণতন্ত্রের জন্য দীর্ঘমেয়াদী বিষফোঁড়া হিসেবে স্থায়িত্ব পায়।
এই ঘোর অমানিশা থেকে মুক্তির জন্য প্রতিটি নাগরিককেই দুই স্তরে দায়িত্বশীল হতে হবে। প্রথমত, আইন—প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোকে কেবল শুষ্ক তথ্য নয়, বরং প্রমাণভিত্তিক ও স্বচ্ছ বয়ান পেশ করতে হবে যা রাজনীতির মারপ্যাঁচ থেকে মুক্ত। দ্বিতীয়ত, সাংবাদিক ও সাধারণ নাগরিকদের তথ্যের অসম্পূর্ণতাকে ষড়যন্ত্রের রসে জারিত করার প্রলোভন ত্যাগ করতে হবে। হোয়াইট হাউস করেসপন্ডেন্টস’ ডিনারের গুলির ঘটনা বিবেকবান ও সচেতন আমেরিকানদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়েছে যে, আমেরিকার মূল সংকট তথ্যের ঘাটতি নয়, বরং সংকটটি হলো পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ, আস্থা এবং গণতান্ত্রিক শৃঙ্খলার। ডোনাল্ড ট্রাম্পের অ—জনপ্রিয়তা এক রূঢ় বাস্তবতা সন্দেহ নেই, কিন্তু তাঁর জীবনের ওপর এই পুনঃপুনঃ আক্রমণচেষ্টাও এক অনস্বীকার্য ধ্রুবক। একটি পরিপক্ব ও সভ্য পরাশক্তিকে একই সঙ্গে এই দুই বিপরীতমুখী সত্যকে ধারণ করার ক্ষমতা অর্জন করতে হবে। গণতন্ত্র কেবল ব্যালট বক্সের সংখ্যাতত্ত্ব নয়, এটি বারুদ আর গুজবের বিভীষিকা পেরিয়ে সত্যকে সাহসের সাথে আলিঙ্গন করার এক নিরন্তর আত্মিক সাধনা। এই সাধনায় বারুদের বিলাসিতা নয় কিংবা একজন অজনপ্রিয় প্রেসিডেন্টের জীবনাবসানের চেষ্টাও নয়, বরং মানবতা ও সততায় বিশ্বাসী একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থার গুরুত্ব অপরিসীম। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প দয়াপরবশ হয়ে সেই অদেখা দিকটিতে একবার দৃষ্টি নিক্ষেপ করবেন কি?
