হোসাইন কবিরের কবিতা রূপান্তর

মানুষ প্রত্যহ একটু একটু করে ছাই হয়ে যায়

আগুন হয়ে জ্বলে, আলো ফেলেÑ নিঃশেষ হয়ে যায়

কেউবা থাকে আকাশে

কেউ নামে জলে, স্মৃতির ঢেউয়ে


ছায়া যখন শরীরকে ছেড়ে

আকাশে... 

 শূন্যে...অদৃশ্যে

 সর্বত্র মিলিয়ে যায়

তখন বাতাস আরেক গল্প বুনে যায়

জানি

কাউকে হারানো মানে মৃত্যু নয়,

বরং অস্তিত্বের অপর বিন্যাস, অবিরাম রূপান্তর


বৃষ্টিস্নাত সার্সন রোড

সার্সন রোড

সন্ধ্যার নিবিড় অনুভবে

জেগে থাকে সারা রাত

অথচ তখন পৃথিবীতে কতো কী যে ঘটে যায়।


ভাবি

গতকালও এখানে ছিল সে

ধ্যানী এক ঋষি কাক

 ঘোরগ্রস্ত মানুষের অবিকল

খুঁজছিল শোকার্ত পালক

অঘোর বর্ষণে মেঘরঙ আলপনায়


তবু

কান পেতে রাখি

এসব নির্জন পথে অতীতঘণ্টার ধ্বনি

 যদি ফিরে আসে


শুনি

দূরেকোথাও

বাতাসের কোমল ছোঁয়ায়

নদী হয়ে কারা যেন গান গায়

 অনুচ্চস্বরেবালকবেলায়


যুদ্ধ মানে মানুষের হেরে যাওয়া

এখন যুদ্ধের ময়দানে

পক্ষ কিংবা বিপক্ষ বড় কথা নয়

এখন যুদ্ধ মানে

মানুষের হেরে যাওয়া

এখন যুদ্ধ মানে

প্রাণসংহারী নিউক্লিয়ার ওয়ারহেড

পারমাণবিক অস্ত্রের মহাপ্রদর্শনী

মারণাস্ত্রের বাণিজ্য


এখন যুদ্ধ মানে

মানুষের কোলাহল থেকে মানুষের হারিয়ে যাওয়া

মানুষকে থামিয়ে দেওয়া

এখন যুদ্ধ মানে

লক্ষকোটি নিরপরাধ মানুষের প্রাণসংহার

এখন যুদ্ধ মানে

জলহীন, বায়ুহীন আগুনের খেলা

আকাশজুড়ে ধাতব পাখির হিংস্র থাবা

পৃথিবীর শিরাউপশিরায়

পারমাণবিক চুল্লীর তাপদহন, আর

জলেস্থলে, বৃক্ষহীন মরুর প্রান্তরে

শতকোটি মানুষ পশু পাখির যন্ত্রণাকাতর আর্তনাদ


এখন যুদ্ধ মানে

জীবনের সকল আয়োজন

শিশুদের জন্মের প্রহর চিরতরে থামিয়ে দেয়া


এসো

যুদ্ধ নয়

সহজ মানুষ হয়ে মানুষের পাশে দাঁড়াই

অস্ত্র নয়, সংঘাতসংঘর্ষ নয়,

নয় কোনো দ্বেষবিদ্বেষের উচ্চারণ,

এসো

যুদ্ধের ভাষা ভুলে

মানুষের ভাষা শিখি, জীবন প্রকৃতির ভাষা শিখি

অস্ত্র নয়, মানুষের কাঁধে হাত রাখি

এসো

প্রাণময় প্রাণপ্রকৃতির সপক্ষে দাঁড়াই

মানুষের সপক্ষে দাঁড়াই


এসো

মানুষ হয়ে উঠি

মানুষেরই প্রয়োজনে


অনুচ্চারিত শব্দবেদনা

আকাশের আগুনমেঘ

তোমাকে নিয়ে যাবে কোথাও

সেখানে ঘাসের ডগায় 

জোনাকিরা উড়ে উড়ে আলো ছড়ায়

যেখানে সময় বুঝি এক ফোঁটা বৃষ্টিজলে স্থির


রোদের নূপুর হতে চেয়ো না

রোদ, সে তো দিনের সন্তান

তুমি জলের নৌকো হও

সে তার আকাশ

প্রতিদিন নতুন করে সাজায়

আর নিজের গভীরে লুকিয়ে রাখে

সমুদ্রের নীল, অনুচ্চারিত শব্দবেদনা


সাদা রঙে ভেসে যাই উড়ে যাই

এখনও ধবধবে সাদা বিছানার পাশ দিয়ে

হেঁটে যাই কিংবা শুয়ে থাকি— 

 চেতনঅবচেতনে প্রতিটি ক্ষণে


আহা মানবজীবন, দেহ মনে বেঁচে থাকার লড়াই....

একা একা নিজেকেই লড়ে যেতে হয়


আঙিনার পরিচিত কোলাহল

নির্জন প্রান্তরে শুকনো পাতার মর্মরে

 সাদা রঙে ভেসে যায় উড়ে যায় 


ভাবি,

বয়স হলে মানুষ বাড়িঘর সবই হারায়

শৈশব.... কৈশোর.... যৌবনের বিবর্ণ স্মৃতি

সাদাকালো রঙে একাকার.....

 পরিত্যক্ত বিবর্ণ ছবিরগার্বেজক্যান

ঝাপসা......অচেনা ঠেকে

 সব স্মৃতিরেখা অবয়ব.....


ওঁরা ফিরবে না

'ওরা আসবে চুপিচুপি.... '

না! ওঁরা কখনোই আসবে না ফিরে আর

লাখো শহিদ ফিরিয়ে নিয়েছে মুখÑ সেই কবে

ওঁরা ফিরবে না, ওঁরা ফিরবে নাÑ এই দেশে আর

যেখানে কবরে পোড়ে

মৃতের লাশ, শহিদের সমাধিচিহ্নÑ হরহামেশা

সেই দেশে ওঁরা সরবে নীরবে

কখনোই ফিরবে না আর


যেখানে ভোরের আলো 

সন্ধ্যার ধূসরতায় ঢেকে যায়

সেইখানে সেই দেশে

 ওঁদের ফিরতে বলো না আর

 ওঁরা ফিরবে না 


যেখানে বিজয়ের গান

বেদনার সংগীত হয়ে বাজে

আর ধোঁকাবাজ সঙ সাজে

লালসবুজের পতাকায়

সেইখানে সেই দেশে

 ওঁদের ফিরতে বলো না আর

 ওঁরা ফিরবে না 


যেদেশ এক বধ্যভূমি একাত্তরের

কান পেতে শোন

সেখানে আজো হাজারো ধর্ষিতার আর্তনাদে

 বাতাস ভারী হয়ে আসে 

সেই দেশে ধর্ষিতা মায়ের সন্তান

উলঙ্গউল্লাসে

সসম্মানে মালা পরায় ধর্ষকের গলায়

সেই দৃশ্যভারে

আকাশ নুয়ে পড়ে লজ্জায়

বাতাসও মুখ ঢাকে অদৃশ্য কফিনে

 সেইখানে সেই দেশে

 ওঁদের ফিরতে বলো না আর

 ওঁরা ফিরবে না 


'ওরা আসবে চুপিচুপি.... '

না! ওঁরা কখনোই আসবে না ফিরে আর

লাখো শহিদ ফিরিয়ে নিয়েছে মুখÑ সেই কবে

ওঁরা ফিরবে না, ওঁরা ফিরবে নাএই দেশে আর

যেখানে কবরে পোড়ে

মৃতের লাশ, শহিদের সমাধিচিহ্নÑ হরহামেশা

সেই দেশে ওঁরা সরবে নীরবে

 কখনোই ফিরবে না আর


Related Posts