কাগজের ক্যানভাসে পৃথিবীর গল্প—পাঁচ ব্যাংকনোটের পাতায় বিশ্বজয়ী অভিযাত্রী || আখতার আহমেদ রাশা নিউজার্সি

অজানাকে জানার চিরন্তন তৃষ্ণা থেকেই জন্ম হয়েছে পৃথিবীর বড় বড় সব আবিষ্কারের। সেই অদম্য কৌতূহল থেকে ঘরছাড়া অভিযাত্রীরা কখনো পাড়ি দিয়েছেন উত্তাল সমুদ্র, আবার কখনো পা রেখেছেন বরফে ঢাকা দুর্গম মেরু অঞ্চলে। ইতিহাসের পাতায় আমরা যেসব দুঃসাহসী নাবিক অভিযাত্রীদের নাম পড়ি, বিশ্বের অনেক দেশ তাদের সম্মান জানাতে স্থান দিয়েছে নিজেদের ব্যাংকনোটে। এই কাগজের নোটগুলো হাতে নিলে মনে হয়, আমরা কেবল মুদ্রা নয়, বরং মানবসভ্যতার প্রসারের এক একটি মানচিত্র ধরে আছি।

পর্তুগিজ রাজপুত্র হেনরি, যিনি ইতিহাসে দহেনরি দ্য নেভিগেটরনামে অমর হয়ে আছেন, তাকে বলা হয়অমব ড়ভ উরংপড়াবৎু’— প্রধান স্থপতি। ১৫শ শতাব্দীতে পর্তুগিজ সাম্রাজ্যের বিস্তার এবং ইউরোপীয় সামুদ্রিক অভিযানের পেছনে তাঁর অবদান অনস্বীকার্য। যদিও তিনি নিজে খুব বেশি সমুদ্রযাত্রা করেননি, কিন্তু তাঁর দূরদর্শী পৃষ্ঠপোষকতায় পর্তুগাল জাহাজ নির্মাণ নৌবিদ্যায় শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন করে। ১৯৯৮ সালে পর্তুগাল থেকে ইস্যু করা অত্যন্ত দামী নান্দনিক ১০,০০০ এসকুডো (ঊংপঁফড়ং) নোটে ডিউক অব ভিসিউ হিসেবে প্রিন্স হেনরির (১৩৯৪১৪৬০) প্রতিকৃতি দেখা যায়। এই নোটটি পর্তুগালের গৌরবময় নৌইতিহাস এবং অজানাকে জয় করার রাজকীয় সংকল্পের এক জ্বলন্ত প্রমাণ।

এর পরেই আসে ক্রিস্টোফার কলম্বাসের নাম। স্পেনের সহায়তায় ১৪৯২ সালে তিনি আমেরিকা মহাদেশ আবিষ্কার করেন। কলম্বাসের সম্মানে এল সালভাদর এবং কোস্টারিকার মুদ্রার নামই রাখা হয়েছিলকোলন’ (ঈড়ষড়হ) ১৪৯২ সালের আগস্ট স্পেনের পালোস ডি লা ফ্রন্টেরা বন্দর থেকে তিনটি জাহাজে ভর করে তাঁর সেই ঐতিহাসিক যাত্রা শুরু হয়েছিল। ব্যাংকনোটের নকশায় এই জাহাজগুলোর বর্ণনা প্রায়ই দেখা যায়। সান্তা মারিয়া (খধ ঝধহঃধ গধৎরধ) ছিল বহরের সবচেয়ে বড় ফ্ল্যাগশিপ, যা আমেরিকায় পৌঁছানোর পর চরে আটকে যায় এবং আর ফিরে যায়নি। লা নিনা (খধ ঘরহধ) তুলনামূলক হালকা এবং এই জাহাজে করেই কলম্বাস স্পেনে ফিরে যান। লা পিন্টা (খধ চরহঃধ) সবচেয়ে দ্রুতগামী জাহাজ। এই জাহাজের নাবিক রদ্রিগো ডি ত্রিয়ানাই (জড়ফৎরমড় ফব ঞৎরধহধ) ১৪৯২ সালের ১২ অক্টোবর প্রথম নতুন ভূখনেমবর দেখা পান।

কলম্বাস যে পথ দেখিয়েছিলেন, সেই পথ ধরেই পরবর্তীকালে অন্য স্প্যানিশ অভিযাত্রীরা বিশ্বজয়ের নেশায় বের হন। তাদেরই একজন হার্নান কোর্তেস (ঐবৎহধহ ঈড়ৎঃবং) ১৪৮৫ সালে স্পেনে জন্ম নেওয়া এই অভিযাত্রী শুরুতে আইন নিয়ে পড়াশোনা করলেও অ্যাডভেঞ্চারের নেশায় বিশ্ববিদ্যালয় ছেড়ে পাড়ি জমান আমেরিকায়। তিনি মূলত একজন বিজেতা হিসেবে পরিচিত, যিনি মধ্য আমেরিকার বিশাল অ্যাজটেক সাম্রাজ্য জয় করেছিলেন। ১৯৯২ সালে স্পেনে ইস্যু করা ১০০০ পেসেতাস (চবংবঃধং) নোটে তাঁর প্রতিকৃতি দেখা যায়, যা কলম্বাসের আমেরিকা আবিষ্কারের ৫০০ বছর পূর্তি উপলক্ষে ডিজাইন করা হয়েছিল।

পর্তুগিজ নাবিক পেড্রো আলভারেস ক্যাব্রাল ১৫০০ সালে ভারতের উদ্দেশে যাত্রা করে পথ ভুলে ব্রাজিলে পৌঁছে যান। ব্রাজিলের ৫০০ বছর পূর্তি উপলক্ষে ইস্যু করা বিশেষ ব্যাংকনোটে (১০ রেয়াইস) ক্যাব্রালের সেই ঐতিহাসিক সমুদ্রযাত্রার চিত্র ফুটে উঠেছে। অন্যদিকে, স্কটিশ মিশনারি ডেভিড লিভিংস্টোন বিখ্যাত হয়ে আছেন ভিক্টোরিয়া জলপ্রপাত আবিষ্কার এবং আফ্রিকার মানচিত্র তৈরির জন্য। ১৯৮৯ সালের স্কটল্যান্ডের ১০ পাউন্ডের নোটে তাঁর প্রতি সম্মান প্রদর্শন করা হয়েছে।

ভারতীয় উপমহাদেশের বাণিজ্যের ইতিহাসে পর্তুগিজদের ভূমিকা অনস্বীকার্য। পর্তুগিজ ভারতের ৩০ এসকুডো বিলের দিকে তাকালে আমরা দেখতে পাই বিখ্যাত জেনারেল অভিযাত্রী আলফনসো ডি আলবুকার্ককে। ১৫১০ সালে গোয়া এবং ১৫১১ সালে মালাক্কা জয় করে তিনি ভারতে পর্তুগিজ আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। তাকেপর্তুগিজ ভারতের দ্বিতীয় গভর্নরবলা হয়। 

১৫শ শতাব্দীর পর্তুগিজ অভিযাত্রী এবং নাবিক নুনো ত্রিস্তাও (ঘঁহড় ঞৎরংঃধড়) ছিলেন আফ্রিকা অভিযানের শুরুর দিকের অন্যতম প্রধান ব্যক্তিত্ব। ১৪৪০এর দশকে তিনি সমুদ্রপথে গিনি অঞ্চলে পৌঁছানো প্রথম ইউরোপীয় হিসেবে ঐতিহাসিকভাবে স্বীকৃত। লোকগাথা অনুযায়ী তিনি গিনিবিসাউ পর্যন্ত পাড়ি জমিয়েছিলেন বলে মনে করা হতো, তবে আধুনিক ইতিহাসবিদদের মতে তাঁর যাত্রা গাম্বিয়া নদীর বেশি দূর এগোতে পারেনি। অভিযাত্রী হওয়ার পাশাপাশি তিনি সেই সময়ের দাস ব্যবসার সাথেও যুক্ত ছিলেন, যা মানব ইতিহাসের এক অন্ধকার অধ্যায়কে তুলে ধরে। ১৯৭১ সালে পর্তুগিজ গিনি থেকে ইস্যু করা ৫০ এসকুডো নোটে নুনো ত্রিস্তাওএর প্রতিকৃতি দেখা যায়। এই নোটটি আফ্রিকার মানচিত্র সীমানা নির্ধারণে পর্তুগিজদের প্রভাবের এক ঐতিহাসিক দলিল হয়ে আছে। আফ্রিকার উপকূল ঘেঁষে পর্তুগিজদের এই জয়যাত্রা শুরু হয়েছিল আরও আগে। 

অভিযাত্রীদের এই তালিকায় যার নাম না থাকলে ইতিহাস অপূর্ণ থেকে যায়, তিনি হলেন ভাস্কো দা গামা। ১৪৯৭৯৯ সালের ঐতিহাসিক সমুদ্রযাত্রার মাধ্যমে তিনিই প্রথম ইউরোপীয় হিসেবে সমুদ্রপথে ভারতে পৌঁছান। তিনি ছিলেন সেই ব্যক্তি যিনি সমুদ্রপথে ইউরোপের সাথে ভারতের সরাসরি সংযোগ স্থাপন করেছিলেন। ১৯৯৬ সালে পর্তুগাল থেকে ইস্যু করা ৫০০০ এসকুডো নোটে এই মহান নাবিকের প্রতিকৃতি দেখা যায়। এই নোটটি কেবল একটি মুদ্রা নয়, বরং মানব সভ্যতার নৌচলাচল এবং ভৌগোলিক জ্ঞান বিস্তারের এক অনন্য স্মারক। ২০১০ এবং ২০১১ সালে ইস্যু করা ব্যাংকনোটগুলোতে মেরু অভিযানের কিংবদন্তিদের ছবি বীরত্বগাথা তুলে ধরা হয়েছে। পোলার ডলার (২০১১) নোটটি উৎসর্গ করা হয়েছে বিখ্যাত নরওয়েজীয় অভিযাত্রী রোয়াল্ড আমুন্ডসেনকে (১৮৭২১৯২৮) তিনি ছিলেন আন্টার্কটিকা অভিযানের স্বর্ণযুগের অন্যতম প্রধান নায়ক এবং ১৯১১ সালের ১৪ ডিসেম্বর ইতিহাসে প্রথম ব্যক্তি হিসেবে দক্ষিণ মেরুতে পৌঁছান। মেরু বিশেষজ্ঞ বাপোলার স্কলারস্যার ওয়ালি হার্বার্টের সম্মানে ৫০ ডলার নোটটি ইস্যু করা হয়। ২০ ডলার নোটে স্থান পেয়েছেন বিখ্যাত ক্যাপ্টেন ফ্রাঙ্ক ওয়ার্সলি এবং ব্রিটিশ নৌঅফিসার অভিযাত্রী ক্যাপ্টেন রবার্ট ফ্যালকন স্কটের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে ১০ ডলার নোটটি তৈরি করা হয়েছে। দক্ষিণ মেরুতে আমুন্ডসেনের পৌঁছানোর শতবর্ষ উপলক্ষে ডলার (২০১১) নোটটি ইস্যু করা হয়। নোটটির বিশেষত্ব হলো এতে আন্টার্কটিকার প্রতীক হিসেবে পেঙ্গুইনের ছবি রয়েছে।

পাহাড় জয়ের ইতিহাসে ১৯৫৩ সালের ২৯ মে এক অনন্য অধ্যায়। নিউজিল্যান্ডের স্যার এডমন্ড হিলারি এবং শেরপা তেনজিং নরগে প্রথমবারের মতো মাউন্ট এভারেস্ট জয় করেন। ১৯৯২ সালে প্রকাশিত নিউজিল্যান্ডের ডলারের নোটে স্যার এডমন্ড হিলারির ছবি সগৌরবে স্থান পেয়েছে। সাধারণত জীবিত ব্যক্তিদের ছবি ব্যাংকনোটে দেখা যায় না, কিন্তু হিলারি ছিলেন এর ব্যতিক্রম।

অষ্টাদশ শতাব্দীর ব্রিটিশ অফিসার মানচিত্রকার ক্যাপ্টেন জেমস কুক প্রশান্ত মহাসাগরে তিনটি বিশাল অভিযান পরিচালনা করেন। তিনিই প্রথম ইউরোপীয় হিসেবে নিউজিল্যান্ড অস্ট্রেলিয়ার নিখুঁত মানচিত্র তৈরি করেন। নিউজিল্যান্ডের ১৯৪০ সালের পাউন্ডের নোটে তাঁর প্রতিকৃতি দেখা যায়। এটি কেবল একটি মুদ্রা নয়, বরং দক্ষিণ গোলার্ধের মানচিত্র বদলে দেওয়ার এক ঐতিহাসিক স্মারক।

ক্যাপ্টেন কুক যখন উত্তাল সমুদ্রের ঢেউয়ের সাথে লড়াই করে নতুন মহাদেশের সন্ধান করছিলেন, কিংবা এডমন্ড হিলারি যখন বরফাবৃত এভারেস্টের চূড়ায় পা রাখছিলেনতাদের সেই অদম্য জেদই আজকের আধুনিক পৃথিবীর ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেছে। এই ডলার বা পাউন্ডের নোটগুলো হাতবদল হওয়ার সময় হয়তো অনেকেই খেয়াল করেন না, কিন্তু একজন সংগ্রাহক হিসেবে আমি দেখি সেখানে লুকিয়ে আছে শত বছরের সাহস আর সংগ্রামের কাহিনী। জীবন আসলে কেবল গন্তব্যে পৌঁছানোর নাম নয়, বরং হিলারি বা কুকের মতো সেই রোমাঞ্চকর যাত্রার নামই জীবন। ব্যাংকনোটে এই অভিযাত্রীদের উপস্থিতি আমাদের মনে করিয়ে দেয় পৃথিবীটা একসময় কত বিশাল আর রহস্যময় ছিল। আজকের জিপিএসএর যুগে বসে এই নোটগুলোর দিকে তাকালে সেই সব অসীম সাহসী মানুষদের প্রতি শ্রদ্ধায় মাথা নত হয়ে আসে।


Related Posts