সরকার চালায় বিএনপি, সংস্কৃতি চালায় ‘মব’? মোশতাক আহমেদ

বাংলাদেশে এই সময়ে সবচেয়ে বেশি আলোচিত রাজনৈতিক ইস্যু কোনটি? আওয়ামী লীগের কার্যক্রমের ওপর নিষেধাজ্ঞা বহাল রয়েছে। মাঠে দলটি না থাকলেও আলোচনায় আছে সবখানে। টেলিভিশন সামাজিক মাধ্যমের টক শো এবং স্ট্যাটাসে বিষয়টি নিয়ে আলোচনাসমালোচনা হচ্ছে বিস্তর। আওয়ামী লীগকে নিয়ে পলিটিক্স জমেছে বেশ। যে বিএনপি অতীতে বহুবার বলেছে যে তারা নির্বাহী আদেশে কোনো দল নিষিদ্ধ করার পক্ষপাতী নয়। সেই দলটিই পার্লামেন্টে দুইতৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে দ্রুততম সময়ের মধ্যে অন্তর্বর্তী সরকারের নিষেধাজ্ঞা বহাল রেখে আইন পাস করেছে। পক্ষান্তরে যে জামায়াতে ইসলামী আওয়ামী লীগকে ব্যান করার দাবিতে সোচ্চার ছিল, তারা এখন বলছে যে তারা চায় সব দল দেশে রাজনীতি করুক। বর্তমানে আওয়ামী লীগ প্রশ্নে বিএনপির যে অবস্থান, জামায়াতে ইসলামী তার পক্ষে নয়। সরকারি বিরোধীউভয় পক্ষের কাছে আওয়ামী লীগ যেন ইস্কাপনের টেক্কা। শেষ পর্যন্ত কে কার ওপর টেক্কা মারে সেটাই দেখার বিষয়।

আওয়ামী লীগ প্রশ্নে বিএনপির মনের কথা কী, আর জামায়াতই বা আওয়ামী লীগ ইস্যুটিকে কীভাবে কাজে লাগাতে চায় সে এক চিন্তার বিষয়। আগস্টের আগে পর্যন্ত বিএনপির মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা ছিল আওয়ামী লীগের সঙ্গে। জামায়াতে ইসলামী ছিল বিএনপির কৌশলগত সহযাত্রী। এখন বিএনপির প্রতিদ্বন্দ্বিতা জামায়াতের সঙ্গে। আওয়ামী লীগ মাঠে নেই। কিন্তু এই দলটির হাজার হাজার কর্মীসমর্থক আছেন। ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে বিএনপি জামায়াত উভয় দলই আওয়ামী লীগ ঘরানার ভোট নিজেদের বাক্সে টানার কৌশল করেছিল। নানাভাবে আওয়ামী লীগমনাদের কাছে টানার চেষ্টা করেছে। বাস্তবে বিএনপি আওয়ামী লীগের ভোট বেশি টানতে পেরেছে। ক্ষেত্রে বিএনপির নিজস্ব কৌশলের চেয়ে আওয়ামী লীগ ঘরানার ভোটারদের স্বপ্রণোদিত আদর্শিক নৈকট্যবোধ বেশি কাজ করেছে। তারা মনে করেছে, বিএনপি আর যা হোক স্বাধীনতাবিরোধী দল নয়, বাহাত্তরের সংবিধানের প্রতিও বিদ্বিষ্ট নয়, ধর্মনিরপেক্ষতার নীতি পুরোপুরি উপেক্ষা করে না, মৌলবাদী চিন্তার ধারকও নয়Ñইত্যাদি বিবেচনায় আওয়ামী লীগের ভোটাররা মন্দের ভালো হিসেবে বিএনপিকে বেছে নিয়েছে। তার সর্বোৎকৃষ্ট প্রমাণ ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে গোপালগঞ্জসহ বৃহত্তর ফরিদপুর অঞ্চলে বিএনপির নিরঙ্কুশ বিজয়। বৃহত্তর এই অঞ্চলের মানুষ স্বাভাবিক কারণেই আওয়ামী মনোভাবাপন্ন। সেই জনগণ এবার বিএনপিতে আস্থা রেখে নৈকট্যবোধের পরিচয় দিয়েছেন। সমীকরণটি বিএনপির নীতিনির্ধারকদের না বোঝার কোনো কারণ নেই। তাহলে বুঝেশুনেও দলটি আওয়ামী লীগের কার্যক্রমের ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞা এনডোর্স করল কেন! প্রশ্নটি জটিল, উত্তর সম্ভবত আরও বেশি জটিল। এখানে মনে রাখা দরকার যে দল হিসেবে আওয়ামী লীগ কিন্তু নিষিদ্ধ নয়। তার কার্যক্রম নিষিদ্ধ, তা বিচার সম্পন্ন না হওয়া পর্যন্ত। কার বিচার? আওয়ামী লীগের? যতদূর জানি এখন পর্যন্ত আওয়ামী লীগের নামে কোনো মামলা হয়নি।

সাবেক স্পিকার . শিরীন শারমিনকে গ্রেপ্তার এবং দ্রুত সময়ের মধ্যে তাঁকে জামিনে মুক্তি দেওয়ায় জনমনে সম্ভবঅসম্ভব নানারকম চিন্তা ঘুরপাক খাচ্ছে। অনুমান বাতাসে ভাসে। এর ভিত্তি থাকতেই হবে এমন কোনো বাঁধাধরা নিয়ম নেই। ইচ্ছামতো অনুমান তো করাই যায়। প্রকৃতপক্ষে কী ঘটবে, সময় হলে তা স্পষ্ট বোঝা যাবে।

রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধকরণ, দমনপীড়ন, এগুলো দেশ বিদেশের ইতিহাসে নতুন নয়। কখনো কখনো গণতন্ত্র স্বাধীনতাসার্বভৌমত্ব সুরক্ষিত রাখতে নিয়মতান্ত্রিক পন্থায় রাজনৈতিক দলবিশেষের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ জরুরি হয়ে পড়ে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে জার্মানির নাৎসি পার্টি নিষিদ্ধ করার কোনো বিকল্প ছিল না। নাৎসি মতাদর্শের ওপর নিষেধাজ্ঞা জার্মানির গণতান্ত্রিক সমাজ রাজনীতিতে উল্লেখ করার মতো কোনো নেতিবাচক অভিঘাত সৃষ্টি করেনি। তা না করলেও দুনিয়ার বহু দেশে কালের বিচারে দল বা মতাদর্শ অবদমনের পন্থা সুফল দেয়নি। উল্টো গণতন্ত্রকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। যে শাসক দল গণতন্ত্রের কথা বলে কিংবা নিজের শ্রেণি বা বর্ণের স্বার্থে রাজনৈতিক মতাদর্শ বর্জিতকরণের নীতি গ্রহণ করেছে আখেরে তাদেরই সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত এবং চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হয়েছে। কোনো দল বা দলের অনুসৃত মতাদর্শ চিরকাল মাটিচাপা দিয়ে রাখা যায় না। বাংলাদেশের ইতিহাসেও তার নজির রয়েছে। যখন কোনো দল বা মতাদর্শ নিষেধাজ্ঞা দমনপীড়নের শিকার হয়, রাজনৈতিক রসায়নে তখন এমন কিছু বিক্রিয়া ঘটে, যা নিয়ন্ত্রণ করা শাসনপ্রশাসনের পক্ষে সম্ভব হয়ে ওঠে না। নিষিদ্ধ পার্টি পরিস্থিতির চাপে আন্ডারগ্রাউন্ডে চলে যেতে পারে। আর যখন কোনো পার্টি প্রকাশ্য রাজনীতির পথ পরিহার করে গোপন তৎপরতায় লিপ্ত হয়, তখন সে কী ধরনের রণকৌশল গ্রহণ করে তার কোনো ঠিক নেই। গুপ্তপন্থার রাজনীতি সামাজিক সুস্থিতি গণতন্ত্রের পথকে কণ্টকিত করতে পারে। কখনো কখনো তারা শাসক দলের ভিতরেও ছদ্মবেশে অবস্থান নিতে পারে। যেসব বুর্জোয়া দলের মিছিলে গেলেই সেই দলের সঙ্গে মিশে যাওয়া যায়, সেসব দলে অনুপ্রবেশ করা মোটেও কোনো কঠিন কাজ নয়। আওয়ামী লীগ ছাত্রলীগের ভিতরে নিষিদ্ধ বা অত্যাচারিত দলের বহু অ্যাকটিভিস্ট ছদ¥বেশে আশ্রয় নিয়েছিল। শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর তারা তাদের প্রকৃত চেহারা দেখিয়েছে সগৌরবে। এনসিপির অনেক নেতা ছাত্রলীগের ভিতরে থেকেই পরিপুষ্ট হয়েছেন। এসব চোখে আঙুল দিয়ে দেখানোর প্রয়োজন পড়ে না। স্বাধীনতার অব্যবহিত পরে আত্মপ্রকাশ করা রাজনৈতিক দল জাসদকে কঠোর হস্তে দমন করার পন্থা শেখ মুজিব সরকারের জন্য গলার কাঁটা হয়ে উঠেছিল। জাসদের জন্য প্রকাশ্য রাজনীতি কঠিন হয়ে পড়লে দলের ভিতরে উগ্রপন্থিরা শক্তিশালী হয়ে ওঠে। গণবাহিনীর মাধ্যমে দলটি সশস্ত্র পথে পা বাড়ায়। অনেকে মনে করেন ১৯৭৫ সালের পটভূমি তৈরিতে জাসদের অবদান নেহাত কম নয়। ১৯৭২ সালের সংবিধানে ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধ করা হলেও ধর্মাশ্রিত রাজনীতি নিঃশেষিত হয়নি। পঁচাত্তরের পট পরিবর্তনের পর অনেক দিন পর্যন্ত জামায়াতে ইসলামী দেশে নিষিদ্ধই ছিল। জামায়াতের অনুপস্থিতিতে আইডিএলের আত্মপ্রকাশ ঘটেছিল মাওলানা রহিমের নেতৃত্বে। আইডিএল জামায়াত অন্য ইসলামপন্থিদের একত্র করেছিল। এগুলো ইতিহাসের সত্য। পরে জামায়াতে ইসলামী অন্যান্য ইসলামিক দল নিজেদের নামে দল করার সুযোগ পেলে আইডিএলের প্রয়োজনীয়তা ফুরিয়ে যায়।

দল বা মতাদর্শ নিষিদ্ধ হলে বা দমনপীড়ন নেমে এলে আন্ডারগ্রাউন্ডে চলে যাওয়ার আশঙ্কা ছাড়াও বিবিধ সিনড্রোম দেখা দিতে পারে। বাহ্যিক রূপান্তর ঘটতে পারে। অভিন্ন মতাদর্শের নেতাকর্মীরা ভিন্ন নামে সক্রিয় হতে পারেন। আইডিএল তার প্রকৃষ্ট প্রমাণ। নিবর্তনের শিকার দলের প্রতি জনগণের মধ্যে সহানুভূতির মনোভাব তৈরি হতে পারে। যার ফলে ফিনিক্স পাখির মতো নিপীড়িত দলটির পক্ষে আরও বেশি শক্তিশালী হয়ে আত্মপ্রকাশ করতে পারা বিচিত্র নয়। দক্ষিণ আফ্রিকায় নেলসন ম্যান্ডেলার পার্টি ত্রিশ বছর নিষিদ্ধ ছিল। যখন দলটিকে শ্বেতাঙ্গ শাসক গোষ্ঠী নিষিদ্ধ করে তখন এএনসি খুব বেশি শক্তিশালী ছিল না। কিন্তু নব্বই সালে ফিরে আসে অনেক বেশি শক্তি নিয়ে। অবসান ঘটে বর্ণবাদী শ্বেতাঙ্গ শাসনের। দীর্ঘ সাতাশ বছর কারান্তরিন থেকে নেলসন ম্যান্ডেলা তাঁর জনগণের কাছে ফিরে আসেন জাতির অবিসংবাদিত নেতা হয়ে। তুরস্কে মোস্তফা কামাল পাশা ধর্মভিত্তিক সব দল নিষিদ্ধ করেছিলেন। বছরের পর বছর সে দেশে ধর্মভিত্তিক কোনো রাজনৈতিক দল মাথা তুলতে পারেনি। কিন্তু ধর্মভিত্তিক রাজনীতির মৃত্যু ঘটেনি। বরং ইসলামিস্ট দলগুলোর সমন্বয়ে গড়ে ওঠে জাস্টিস ডেভেলপমেন্ট পার্টি, যার নেতা রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ান। জাস্টিস পার্টিই এখন ক্ষমতায় এবং বলা চলে অপ্রতিদ্বন্দ্বী। মিসরে মুসলিম ব্রাদারহুডকে নিষিদ্ধ করেও কোনো সুফল পাওয়া যায়নি। বাংলাদেশের নিকট প্রতিবেশী নেপালে কমিউনিস্ট পার্টি বছরের পর বছর নিষিদ্ধ ছিল। দলটি সশস্ত্র সংগ্রাম চালিয়ে শেষ পর্যন্ত জনগণের সমর্থন নিয়ে সরকার গঠন করতে পেরেছিল। পুষ্পকমল দহল প্রচন্ড, কমিউনিস্ট নেতা নেপালের ইতিহাসে অন্যতম জনপ্রিয় প্রধানমন্ত্রী ছিলেন।

বস্তুত দল নিষিদ্ধ করে বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই কোনো ভালো ফল পাওয়া যায়নি। মাঝখান থেকে দুর্বল হয়েছে গণতন্ত্রের ভিত। কার্যত অন্তর্ভুক্তিমূলক রাজনীতি গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করে। আর গণতন্ত্রই হচ্ছে সুশাসন সামাজিক সুস্থিরতার চাবিকাঠি। আমরা যখন বহুদলীয় গণতন্ত্রের কথা বলি, তখন কোনোমতেই রাজনৈতিক দলবিশেষকে আইন দ্বারা বর্জিতকরণের নীতি গ্রহণ করা উচিত নয়। শত ফুল ফুটতে দাও। রাজনৈতিক দল বা মতাদর্শকে গ্রহণবর্জনের দায়ভার সরকারের নিজের কাঁধে তুলে নেওয়ার চেয়ে জনগণের ওপর ছেড়ে দেওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ। কোনো রাজনৈতিক দলীয় সরকারের নিজের সঙ্গে নিজের বিরোধ করা উচিত নয়। স্ববিরোধিতা সব সময়ই বিপজ্জনক। শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ দিনবদলের স্লোগান দিলেও নিজের মন বদলায়নি। গণতন্ত্রের কথা বলে কৌশলে মানুষের ভোটের অধিকার কেড়ে নিয়েছিল। পরিণাম ভালো হয়নি। আব্রাহাম লিঙ্কনের সেই অবিস্মরণীয় বাণীটি সবারই মনে রাখা দরকার। তিনি বলেছিলেন, দেশের সব মানুষকে কিছুদিন ধোঁকা দেওয়া যায়, কিছু মানুষকে সব সময়ই বোকা বানিয়ে রাখা যায়। কিন্তু সব মানুষকে সব সময় বোকা বানিয়ে রাখা যায় না।

Related Posts