বাঙালি হারেনি। হারবেও না

বাঙালিরা হারেনি। বাঙালিরা হারে না। আগের কথা থাক। সেসব কথা প্রতারণার। ১৭৫৭ সালের। অনেকেই ধরে নিয়েছিলেন মীর জাফর একবারই আসে। ১৯৪৭এর পরে বাঙালির মুখের ভাষা কেড়ে নেয়ার যে ষড়যন্ত্র হয়, সেই ষড়যন্ত্র জয়ী হলে আজ বাঙালিরা কোন্ ভাষায় কথা বলত তা ধারণা করতে ভয় হয়। কী হতো বাংলাদেশের সাহিত্যের চেহারা তাও অকল্পনীয়। বাংলা গান (বাংলাদেশের), নাটক, চলচ্চিত্রের কী চেহারা দাঁড়াত তা বোধগম্য। অথচ কিছু তরুণ, কিছু রাজনীতিক, কিছু সংস্কৃতিকমীর্, লেখক সেদিন ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি মৃত্যু নিশ্চিত জেনেও ১৪৪ ধারা ভেঙে আত্মাহুতি দিতে পিছ পা হয়নি। বাঙালিরা তখন এবং তারপর বিষয়টি অনুধাবন করেছিল বলেই নিজ দেশ, নিজের সংস্কৃতির প্রতি তাদের ভালোবাসা বিপুলভাবে বেড়ে গিয়েছিল। তারা ভেতরে ভেতরে যুথবদ্ধ হচ্ছিল। একদিকে মিলিটারি ব্যুরোক্রেসির উত্থান যখন হয়, তখন সরাসরি মিলিটারিরা ক্ষমতার স্বাদ পাওয়ার স্বপ্নে বিভোর। তারা অত্যন্ত সুচারু মিটিক্যুলাস পরিকল্পনা করে রবীন্দ্রনাথের জন্ম শর্তবর্ষের অনুষ্ঠানে বাধা দিয়ে হেরে যায়। বাঙালিরা হারেনি। এরপর রবীন্দ্রসংগীত নিষিদ্ধ করার ষড়যন্ত্র নিয়ে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান সরকারের গবেট প্রশাসন মাঠে নেমে বাঙালিদের কাছে ধাক্কা খেয়ে চরম হাসির পাত্রে পরিণত হয়। এর প্রতিফল হিসাবে জন্ম নেয় ছায়ানটের মত প্রতিষ্ঠান যারা বিপুল সংখ্যক রবীন্দ্রসংগীত শিল্পী তৈরি করে। সেই সময় আতিকুল ইসলাম, ওয়াহিদুল হক, সনজিদা খাতুন, ফাহমিদা খাতুন, হামিদা আতিক, মাহজাবিন খান, বিলকিস নাসিরুদ্দিন, জাহিদুর রহিম, অজিত রায়ের মত শিল্পীর সৃষ্টি হয়। মাথার ওপর অবশ্য আগে থেকেই ছিলেন আবদুল আহাদ। ১৯৬৯ সালে পাকিস্তান সরকার তাদের একচোখা দৃষ্টিতে লেখা বিভ্রান্তিমূলক বইপাকিস্তানঃ দেশ কৃষ্টিস্কুলের পাঠ্যসূচিতে বাধ্যতামূলকভাবে চাপিয়ে দেয়। কিন্তু ছাত্ররা মানবে কেন? সেই অপচেষ্টা শুধু বাতিলই করেনি, বরং গণঅভ্যুত্থানে তা তলিয়ে যায়। আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলাও প্রত্যাহার করতে বাধ্য হয় পাকিস্তানের মিলিটারি সরকার। তুমুল আন্দোলনর মুখে বঙ্গবন্ধুকে ছেড়ে দেয়। বঙ্গবন্ধু জেল থেকে বেরিয়ে আসেন আরো প্রচন্ড শক্তিশালী হয়ে। তিনি আঙুল তুলে পশ্চিম পাকিস্তানের মিলিটারি জান্তাদের হুমকি দিতেন। আর ১৯৭১ সালের কথা নতুন করে বলার প্রয়োজন নেই।আমি যদি হুকুম দিবার নাও পারি..’ সেইভাবেই মুক্তিযুদ্ধ শুরু হয়। নেতৃত্ব দেন বঙ্গবন্ধুর সতীর্থ রাজনীতিকরা।

১৯৭১এ বাঙালিরা যুদ্ধ করেছে সম্মুখ সমরে এবং গেরিলা কৌশলে। কিন্তু আজ পর্যন্ত জানা যায়নি, ধরা পড়া কোনো মুক্তিযোদ্ধা তাদের সহযোদ্ধাদের নাম বলে দিয়েছে হানাদার বাহিনীর কাছে। অর্থাৎ বেঈমানি করেনি। অসহনীয় নির্যাতন সহ্য করেছে, আত্মীয় স্বজনদের ধরে নিয়ে গেছে, হত্যা করেছে, ধর্ষণ করেছেÑ তা সত্ত্বেও নতি স্বীকার করেনি তারা।

এইসব বলার উদ্দেশ্য একটু ইতিহাস স্মরণ করিয়ে দেয়া। যারা আজো মনে করে বাঙালির প্রাণ ভোমরা কেড়ে নিয়ে তাকে সংস্কৃতিহীন জাতিতে পরিণত করবে, তাদের যেন এই ঘটনাগুলো মনে থাকে। স্বাধীনতাউত্তরকালে রাজাকারআলবদর, তাদের সাঙ্গপাঙ্গ, আত্মপরিচয়হীন ইতিহাসজ্ঞানহীন, বাঙালি সংস্কৃতির শক্তি সম্পর্কে যাদের ন্যূনতম ধারণা নেই তারা মাঝে মাঝে যখন ঠোকর দিতে চেয়েছে জাতীয় সংগীত আর জাতীয় পতাকায় তখনই বাঙালিরা ফুঁসে উঠেছে। আর তখনই লেজ গুটিয়ে পালিয়েছে ষড়যন্ত্রকারীরা। কারণ তারা জানেই না রক্তদানের শক্তি। তারা জানেই না এই সবের আতুরঘর ১৯৭১ সাল, আমাদের মুক্তিযুদ্ধকালে সৃষ্টি। তারা জানেই না আমাদের জাতীয় সংগীত আমাদেরই মাটির বাতাসের, জল বৃষ্টির ভেতর থেকে উঠে আসা বাউল সংগীত (বাউল গগন হরকরার) এর কথা রচনা করেন রবীন্দ্রনাথ বাংলাদেশের শিলাইদহ কুঠিবাড়িতে।

আজ যারা পহেলা বৈশাখের নানা অনুষ্ঠানের নাম পরিবর্তন করতে চায়, তাদের উদ্দেশ্য সম্পর্কে বাঙালিরা সচেতন। যদি ভাল উদ্দেশ্য নিয়ে নাম পরিবর্তন করা হয়, যেমন আগেও হয়েছে, তাহলে সমস্যা হওয়ার কথা নয় কিন্তু শব্দের নানা কুঅর্থ দাঁড় করিয়ে দিয়ে যারা নাম পরিবর্তন করার ধূয়া তুলেছে, আশা করি ইতোমধ্যেই তারা টের পেয়েছেন নিউটনের সেই বৈজ্ঞানিক তত্ত্বথার্ড অব মোশনে মতÑ ‘প্রতিটি এ্যাকশনেরই সমান রিএ্যাকশন আছে’?

বছর বাংলা নববর্ষ উদযাপিত হয়েছে দেশে এবং দেশের বাইরে। বাংলাদেশে আগের যে কোনো সময়ের চেয়ে ছায়ানট সুরের ধারার অনুষ্ঠান হয়েছে অনেক বেশি গোছানো, সুশৃঙ্খল নিরেট। গায়কী এবং গানের নির্বাচনও সুষম। প্রবাসে অর্থাৎ এই নিউইয়র্কে এই বর্ষবরণ শুরু হয়েছে মাসের শুরু থেকেই। বিপা এর সূচনা করে। তারপর মঙ্গলবার পর্যন্ত চলছে। হয়েছে একাধিক বর্ষবরণ ম্যানহ্যাটানের টাইমস স্কয়ারে এবং জ্যাকসন হাইটসে ডাইভারসিটি প্লাজায়, ব্রংক্সের পার্কচেস্টারে। হয়েছে একাধিক মঙ্গল শোভাযাত্রা। আনন্দধ্বনি ইনক করেছে তাদের যাবতকালের স্মরণীয় সর্ববৃহৎ অনুষ্ঠান। অনুষ্ঠান শেষ হয়নি, শেষ হয়নি মঙ্গল শোভাযাত্রা। আজ শনিবার হবে ডায়াসপোরা ইনকের অনুষ্ঠান। আগামী সপ্তাহে শনি রবিবার হবে প্রবাসের দৃষ্টান্ত সৃষ্টিকারী সংগঠন বিপার বর্ষবরণ।

বোঝাই যায় মানুষের প্রাণস্পশীর্ সংস্কৃতির গায়ে যখন কেউ আঘাত হানার চেষ্টা করে, তখন সৈন্যসামন্ত, পাইকপেয়াদা লাগে না, মানুষই জেগে ওঠে। একটি জাতি যখন তার সংস্কৃতির শক্তি নিয়ে জেগে ওঠে তখন তাকে রোধ করা কঠিন। এবারের বর্ষবরণ সেই কথাটি চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল আবার। কারণ সংস্কৃতির মূল শক্তি যখন জেগে ওঠে তখন, অপশক্তির জন্য তা স্পষ্ট বার্তাই পৌঁছে দেয়।

না, বাঙালি হারেনি, হারবেও না।

Related Posts