গল্প || বায়োস্কোপ || শফিউল আলম, নিউইয়র্ক
কে দেখবে বায়োস্কপের খেলা, মাত্র দুই আনা। এসো নায়ক নায়িকাদের দেখে যাও। দেখে যাও গুলিস্তানের কামান। এ সুযোগ হেলায় হারাবেন না। বাচ্চারা, বড়রা, এসো এসো, মাত্র দুই আনায় দেখবে তোমাদের মনের মত জিনিস।
অতনু বসে দুধ খাচ্ছিল। ফেলে দিয়ে দিলো দৌড়। ততক্ষণে অনু, জাবেদা, খোকন, সেলিম এসে গেছে।
গফুর চাচা, আজকে নতুন কি আছে, জিজ্ঞাসা করল খোকন।
—আছে সুজাতার গলায় জড়িয়ে আছে সাপ।
—তাই? ভয়ে ভয়ে বলল, অতনু। কামড়াবে নাতো।
— না, ভয় নেই। কামড়াবে না।
কোথা থেকে রহমত এসে বলল, এই নাও দুই আনা।
—এই খানে চোখ রাখো। কি দেখতে পাচ্ছ? চলছে আজিম ঘোড়ায় চড়ে। চলে গেল গুলিস্তানের সামনে কামান।
কি মামুনি, বাবারা দেখবে যদি আনো দুআনা।
—আমার কাছে পয়সা নাই। কাঁদো কাঁদো করে বলল অনু।
অতনু দৌড়ে গেল মা’র কাছে।
—মা, চার আনা পয়সা দাও, বায়োস্কোপ দেখবো।
—চার আনা কেন, দুই আনা তো।
—অনুও দেখবে।
দৌড়ে ফিরে এলো অতনু।
—এই নাও চার আনা গফুর চাচা, আমার আর অনুর।
— চোখ লাগাও এইখানে। বলে গফুর ডুগডুগি বাজাতে থাকল, আর বলতে থাকলো বিভিন্ন নায়ক—নায়িকার নাম।
গফুরের জীবনটা কাটল এই ছোট্ট মহকুমা শহরে। নাম তাঁর গোপালপুর। বাবা—মার একমাত্র ছেলে। বাবা ছিল বাসের কন্ডাক্টর। সকালে বেরিয়ে যেতো। ফিরত রাতে। গফুর ঘুমিয়ে পড়তো।
মা জেগে থাকতো। বাবা এলে মা সামনে বসে বাবাকে খাওয়াত।
গফুর তখন পঞ্চম শ্রেণীর ছাত্র। একরাতে বাবা ফিরল না। মা সারারাত বসেছিল বারান্দায়। গফুর ঘুমিয়ে পড়েছিল। সকালে উঠে দেখে মা উঠানে বসে কাঁদছে। বাসায় বেশ কিছু লোকজন, এসেছে শান্তির মা, দাঁড়িয়ে আছে বাদল চাচা।
গফুর আস্তে আস্তে এগিয়ে গেল। ওকে দেখে মা জড়িয়ে ধরে আরও জোরে কেঁদে উঠলো।
গফুর কিছুই বুঝতে পারছিল না। শান্তির মা এসে গফুরকে নিয়ে এলো পাশে।
—এসো বাবা আমার সাথে।
—কি হয়েছে, মা কাঁদছে কেন। বাবা কোথায়?
শান্তির মা গফুরকে বুকে চেপে ধরে বলল, তোমার বাবা আর নেই। বাস অ্যাকসিডেন্টে মারা গেছে।
গফুর কিছুক্ষণ চুপ করে থাকলো। দশ বছর বয়সের গফুরের বুঝতে কিছুটা সময় লাগল। তাকিয়ে রইল শান্তির মার দিকে। নিথর হয়ে রইল। চোখে পানি এলো না। শুধু আস্তে আস্তে বলল, বাবা আর আসবে না, চাচী। বাবা বলেছিল আমাকে ঘুড়ি কিনে দেবে।
শান্তির মা ওকে চেপে ধরল বুকের মাঝে।
স্কুলে আর যাওয়া হলো না গফুরের। মা কাজ নিলো সবুর চাচার বাসায়। বড়লোক। পাটের ব্যবসা আছে। দুটো ট্রাক আছে। সবুর চাচী মাকে বলেছিল, আমার বাসায় ঠেকা কাজ কর। আমি তো চারিদিক সামলিয়ে উঠতে পারিনা।
সেই থেকে মা কাজ করতে যেতো আর গফুর যেতো মার সাথে মাকে সাহায্য করতে।
সামান্য পয়সায় সংসার কোন রকমে চলত। দিনের খাওয়া ঐ বাসাতে খেয়ে আসতো। রাতে আধা পেট খেয়ে মা ছেলে শুয়ে পড়তো।
গোপালপুরে তখনও সিনেমা হল আসেনি। নেই কোনো কলেজ। কলেজ ছিল ২৮ মাইল দূরে নবাবগঞ্জ জেলায়।
তবে দুটো সাংস্কৃতিক সংঘ ছিল। ওরা মাঝেমধ্যে গান বাজনা নাটকের ব্যবস্থা করতো।
আর ছিল করিমের বায়োস্কোপ।
কাঠের বাক্স। তাঁর মাঝে তিনটা চোঙ্গা। চোখ লাগিয়ে দেখবে। ভিতরে সাদা কালো ছবি আসতে থাকবে যখন করিম পাশে লাগান হাতল ঘুরাতে থাকে, আর গান গায়,
‘এই তারপরেতে দেখ ভাল
ঢাকা শহর চলে এলো
দালানকোঠা দেখা গেল’
ছোট ছোট ছেলে মেয়েরা এসে জড়ো হতো। পয়সা দিয়ে চোখ লাগিয়ে দেখত।
গফুর দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখত। মনটা পড়ে থাকত বায়োস্কোপের ভিতরের ছবিগুলো দেখার জন্য।
করিম লক্ষ্য করতো, তাকাত গফুরের দিকে। মলিন চেহারায় দাঁড়িয়ে আছে। মনে পড়তো তার ছেলের কথা।
অতি অল্প বয়সে ওলাওঠাতে মারা গেল। নিঃসন্তান। স্ত্রী মারা গেছে আজ দু’বছর হলো।
ডাক দিলো গফুরকে।
—এই খোকা দেখবে বায়োস্কোপ?
—আমার কাছে পয়সা নেই। কাঁচুমাচু করে বলল গফুর।
—লাগবে না পয়সা। এসো।
গফুর একটু আমতা আমতা করে এসে দাঁড়ালো। তাকাল করিমের দিকে।
—এই খানে চোখ দাও।
গফুর দেখতে পেলো ঢাকা শহর। দেখল সুন্দর সুন্দর মেয়েদের। কেউ বা কলস মাথায়, কেউ বা ফুলের বাগানে।
দেখা শেষ হলে করিম জানতে চাইল ওর নাম।
—তা গফুর তোমরা থাকো কোথায়? কে কে আছে?
গফুর বলল, মা ছাড়া তাঁর আর কেউ নেই।
দুদিন পরে করিম এক বিকেলে এলো গফুরদের বাসায়। গফুরের মা সবে ফিরেছে কাজ থেকে।
—বোন গো বাসায় আছো? বলে ডাক দিলো করিম।
ডাক শুনে গফুরের মা বেরিয়ে এলো। অচেনা লোককে সন্ধ্যার আগে বাসার উঠানে দেখে একটু ঘাবড়িয়ে গেল।
—কে আপনি, কি চান? কথা শেষ না হতেই গফুর দৌড়ে এলো কলপাড় থেকে।
—বায়োস্কোপ চাচা, মা, বায়োস্কোপ চাচা।
—বায়োস্কোপ চাচা? মানে?
করিম এগিয়ে এসে বুঝিয়ে বলল, সে কে। কোথায় থাকে, কি করে।
জানতে চাইল, যদি গফুরকে তার সাথে নেয় বায়োস্কোপ দেখিয়ে বেড়ানোর জন্য, সে কি অনুমতি দেবে?
অবশ্য তার পরিবর্তে সে গফুরকে পয়সা দেবে।
গফুরের মা তাকিয়ে রইল কিছুক্ষণ করিমের দিকে। চেনে না করিমকে। যেতে দেবে কি না। আবার ভাবে কিছু পয়সা যদি আসে তবে সংসারের কাজে লাগবে।
—বোন, জানি আমাকে চেননা তুমি। তবে সারা শহরের বাচ্চারা আমাকে বায়োস্কোপ চাচা বলে ডাকে। তুমি ভাবো। আমি কাল আসব। আমার তো বয়স হয়েছে। বেশিক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকতে পারিনা। তাই চাইছিলাম তোমার ছেলেটাকে। ওকে আমি শিখিয়ে পড়িয়ে নিতাম। আচ্ছা, আমি কাল আসবো।
এই বলে করিম বিদায় নিলো।
গফুরের মা রাজি হয়েছিল। গফুর ঘুরত করিমের সাথে। মাঝে মধ্যে করিম বলত গফুরকে, পারবি, বাক্সটা কাঁধে নিতে। গফুর চেষ্টা করত। একটু ভারি। কিছুটা নিয়ে দাঁড়িয়ে পড়ত।
করিম হেসে বলত, থাক আর কিছুদিন পরে পারবি।
তারপর অনেকগুলো বছর পেরিয়ে গেল। গফুরের বয়স সতের। করিম আর হাঁটতে পারে না। গফুর একাই বাক্সটা নিয়ে যায়।
ডুগডুগি বাজাতে বাজাতে জোরে ডাক দেয়, কে দেখবে বায়োস্কোপের খেলা। নতুন অনেক কিছু সে জোগাড় করে লাগিয়েছে বায়োস্কোপের ভিতরে।
করিম একদিন গফুরের মাকে বলেছিল, আমি চলে গেলে এই বায়োস্কোপ গফুরের। ও আমার হারিয়ে যাওয়া ছেলে।
সময় পেরিয়ে গেল। একদিন গফুরের মা, করিম দুজনাই বিদায় নিলো পৃথিবী থেকে। গফুর আজ একা।
বদলীর চাকরি। অতুনুর বাবার পোস্টিং হলো গোপালপুরে। অতনু তখন ক্লাস ফোরে পড়ে।
রোজ বিকেল বেলা গফুর তার বায়োস্কোপ নিয়ে বেরিয়ে পড়ে। তখন স্কুল থেকে বাচ্চারা এসে গেছে বাসায়।
গফুর জানে কোন কোন বাসায় বাচ্চা আছে। ডাক দেয় সেই বাসার সামনে এসে, কে দেখবে বায়োস্কোপের খেলা।
দৌড়ে আসে বাচ্চার দল। মাঝে মাঝে কারো পয়সা না থাকলে বিনে পয়সায় দেখতে দেয়।
করিম তাকেও পয়সা ছাড়া দেখতে দিয়েছিল।
বাচ্চাদের সে বায়োস্কোপ চাচা।
একদিন অতনুর মা অতনুকে বলল, তোর বায়োস্কোপ চাচাকে আসতে বলিস। বলবি, আমি বায়োস্কোপ দেখতে চাই। অতনু বলেছিল, মা তোমাকে যেতে বলেছে। আজকে যাবে।
—চলো, বলে এসে দাঁড়ালো অতনুদের বাসার উঠানে। মা, ডেকেছ আমাকে?
—হ্যাঁ, বলে অতনুর মা বেরিয়ে এলো। তুমি তো সবার বায়োস্কোপ চাচা। আমার ছেলে তো শুধু তোমার কথা বলে।
বলে মা, একদিন তুমি বায়োস্কোপ দেখো, কতকিছু আছে ওর মধ্যে। তা আজ আমাকে তোমার বায়োস্কোপ দেখাও।
—এই যে মা, এসো, চোখ রাখো। শুরু হলো———
দেখা শেষে অতনুর মা বলল, বাহ, খুব ভাল তো। ঢাকা শহর ঘুরে এলাম। দাঁড়াও, বলে ভিতরে গেল অতনুর মা। ফিরে এসে তিনটা টাকা ওর হাতে দিয়ে বলল, এই নাও।
গফুর অবাক হয়ে বলল, এতো অনেক টাকা।
—রাখো, আর শোন প্রতিদিন দুপুরে তোমার জন্য আমি খাওয়া বেড়ে রাখব। খেয়ে যেও।
গফুর তাকিয়ে রইল অতনুর মার দিকে। দুচোখ দিয়ে অঝোরে পানি ঝরতে থাকলো। বলল, আজ কতদিন পরে আমি আমার মাকে ফিরে পেলাম।
গফুর আসে প্রতিদিন, বসে গল্প করে। খাওয়া শেষে অতনুর মা দুই টাকা দিয়ে দেয়।
একদিন খেতে খেতে হঠাৎ করে কাশি উঠলো গফুরের। থামতে চায় না। অবশেষে থামতেই গফুর বলল। মা, আমি আসি আজ শরীরটা ভাল লাগছে না।
তারপর তিনদিন গফুর এলো না। অতনুর মা ওর বাবাকে বলল, আচ্ছা, তোমার একটা পিয়ন পাঠিয়ে দেখবে গফুর কেন আসছে না।
—হয়তো কোন কাজে আটকে গেছে,
—কাজ মানে? ওর আবার কি কাজ? বায়োস্কোপ নিয়ে ঘুরে বেড়ানোটাই তো ওর কাজ। তুমি একটু দেখ না?
—ঠিক আছে। বলে অতনুর বাবা বেরিয়ে গেল।
দুদিন পেরিয়ে গেছে। অতনুর বাবা বাসায় আসতেই জিজ্ঞাসা করল, পাঠিয়েছিলে?
—ওহ, ভুলে গেছি, এখনি পাঠাচ্ছি।
যে লোক গেল, সে ফিরে এসে খবর দিলো, গফুর একটা মাদুরের উপর শুয়ে আছে। পাশে চাপ চাপ রক্ত।
—কি বললে? আমাকে নিয়ে চলো। একটা রিক্সা ডাক দাও। আর তুমি চলো আমার সাথে। অতনুর মা অস্থির হয়ে বলল।
অতনুর বাবা বুঝে উঠতে পারলো না।
—কি বললে, ঐ বাসায় যাবে? মানে—
—কোনো মানে না, আমাকে যেতেই হবে, ও আমাকে মা বলে ডেকেছিল।
অতনুর বাবা জানে বাঁধা দিয়ে লাভ নেই।
অতনুকে সঙ্গে এনেছিল।
গফুর শুয়ে আছে, দুর্বল। উঠতে চাইল, পারলো না।
অতনু এসে বসল পাশে।
সেই কাশি। কাশতে কাশতে দম বন্ধ হওয়ার উপক্রম।
কাশি থামলও। থুথু ফেলল পাশে রাখা পাত্রে।
শুধু রক্ত। শুধু রক্ত।
