তাহাদের কথা পর্ব ২৬ তবুও ভালোবাসি: শ্যাডো চাইল্ড পরাগ সঞ্চিতা কানেকটিকাট

কোর্ট রুমে বসে আছি, হিয়ারিং চলছে। লম্বা ছিপছিপে তরুণ এটর্নি রাসেল জিম্বারলিন হন হন করে আমার দিকে এগিয়ে এলেন আর ফিসফিস করে বললেনএখন ওয়ানঅনওয়ান জিজ্ঞাসাবাদ চলবে, আপনি ওয়েটিং রুমে অপেক্ষা করতে পারেন মনে হলো দম ফেলে বাঁচলাম। সেই সাত সকালে উঠে কনকনে ঠান্ডার মধ্যে হার্টফোর্ডের এই কোর্টে হাজির হয়েছি লেসলির উইটনেস হতে। এখনো সাক্ষী দিতে ডাক পড়েনি। কিন্তু যদি আমার সাক্ষী লাগে এই ভেবে বসে ছিলাম। সচরাচর আমি কোর্টে আসিনা, বা আসতে হয়না। কিন্তু লেসলি বার বার এমন অনুনয় বিনয় করে গোঁ ধরলো যে না এসে পারিনি। ওর তিন কূলে কেউ নেই, বাবা গত হয়েছেন, আশি বছরের মা থাকেন কানাডার উত্তর উপকূলে, ভাই বোনের কোনো হদিস নেই, এক নড়বড়ে সম্পর্কের বয়ফ্রেন্ড থেকেও নেই। ওর কথা শুনে মনে হয় ওর একমাত্র মানব সম্পর্ক এই আমি। ওর অসহায়ত্ব দেখে একটু সাপোর্ট দিতে নৈতিক দায়িত্ববোধ থেকেই আমার আসতে হলো। ভাবলাম এটর্নি রাসেল জিম্বারলিনের কথা মতো ওয়েটিং রুমে কিছুক্ষণ অপেক্ষা করে বিদায় নেবো। ওয়েটিং রুমে বসে ফোন চেক করছি। এমন সময় হঠাৎ দমকা হাওয়ার মতো বয়সী এক তরুণী হুড়মুড় করে সমস্ত মনোযোগ কেড়ে নিয়ে ওয়েটিং রুমে ঢুকে পড়লো। কোর্টের এই প্রাইভেট ওয়েটিং রুমের নীরবতা ভেঙে মুহূর্তের মধ্যে পুরো পরিবেশ পাল্টে গেল! কখনো কখনো এমন কিছু লোকের দেখা মেলে, এরা যেখানেই যায় কিভাবে যেন সবটা মনোযোগ কেড়ে নেয়। এধরনের মানুষের আগমনে মুহূর্তের মধ্যে পরিবেশটি আলোকিত হয়ে যায়। তরুণী বললাম কেননা হাব ভাবে তরুণী, বোহেমিয়ান স্টাইলে ডিজাইনার ব্র্যান্ডের পোশাক, মনে হলো এক্ষণি হাওয়াই দ্বীপ থেকে এক ঝলক সূর্যের ছটা নিয়ে ঢুকলেন। ওমা হুড়মুড় করে ঢুকেই কেমন আছেন, ভালো আছি বলেকোনো ভূমিকা ছাড়াই শুরু করে দিলো রাজ্যের আলাপ! ‘এটর্নি জিম্বারলিন বললেন তুমি আমার বোনের সাক্ষী দিতে এসেছো, তোমার কথা অনেক শুনেছি লেসলির কাছে, আমার বদরাগী একগুঁয়ে বোন লেসলি তোমার অনুপ্রেরণাতে রীতিমতো নিজেকে বদলাতে শুরু করেছে, তুমি যা করছো তা কেউ শুধু কাজের জন্য করেনা, তোমরা হেলথ কেয়ারে, বিশেষ করে মানসিক রুগীদের জন্য যারা কাজ করছো তাদের কোনো তুলনা হয়না। তোমরা নিজেদের অজান্তে কত মানুষের জীবন বদলে দিতে কত যে প্রভাব রাখছো, তোমাদের কাজের মূল্য কেউ দিতে পারবেনা। আমি কিভাবে তোমাকে কৃতজ্ঞতা জানাবো জানিনা। মাই গড, মাই গড ইউ গায়েস আর আমাইজিং ... ইত্যাদি ইত্যাদি অবাক হয় ভাবলাম মা আবার কে? লেসলির কোনো বোন আছে বলে তো শুনিনি। লেসলি বলেছিলো ওর বার্থ মা বা জন্মদানকারী মায়ের এক মেয়ের খোঁজ পাওয়া গেছে যার সাথে লেসলির তেমন কোনো যোগাযোগ নেই। আর যোগাযোগ রাখতেও চায় না। তাহলে এই চিড়িয়া আবার কোন বোন? কোর্টের পাট চুকিয়ে তাড়াতাড়ি অফিসে ফিরতে চেয়েছিলাম, কিন্তু লিন্ডার কথা আমাকে চুম্বকের মতো ধরে রাখলো, মনে হলো আরো শুনি, আরো জানি আমার ছাপান্ন বছর বয়সী ক্লায়েন্ট লেসলির না বলা অধ্যায়গুলো। 

কিভাবে যে এক ঘন্টার উপরে সময় পার হয় গেল টেরই পাইনি। এই হঠাৎ ঝলক লাগানো লেসলির ছোট বোন পঞ্চাশ উর্ধ লিন্ডা আজ সকালে ফ্লোরিডার মায়ামি থেকে প্লেনে করে হার্টফোর্ডের এয়ারপোর্টে নেমেছে। আর সোজা চলে এসেছে কোর্ট রুমে লেসলির সোশ্যাল সিকিউরিটি হিয়ারিং উইটনেস হবার জন্য। লিন্ডা গড়গড় করে নিজের পরিচয় দিয়েই ক্ষান্ত হলোনা, শুরু করলো ওর একান্ত নিজের জমানো কথা, আমি হতবিহ্বল হয়ে শুধু শুনে গেলাম। হিপা প্রাইভেসির জন্য আমার মুখ বন্ধ রাখলাম, কিন্তু শুনতে তো বাঁধা নেই। 

লিন্ডার গল্প জমতে থাকলোÑ লিন্ডা লেসলির পালিত বাবা মায়ের জৈবিক বা জন্মসূত্রে একমাত্র সন্তান। লেসলি আর লিন্ডার বাবামায়ের বিয়ের দশ বছর পর্যন্ত কোনো সন্তানাদি হচ্ছিল না। তাই উনারা ম্যানচেস্টারের সরকারি এডাপশন এজেন্সি থেকে লেসলিকে দত্তক বা এডাপশন করেছিলেন। তখন লেসলির বয়স ছিল দুই সপ্তাহ। আর লেসলিকে এডাপশনের দুই বছর পরেই লিন্ডার জন্ম হয়। গল্পের মধ্যে লিন্ডা বার বার একটি কথা বলছিলোআমি ছিলাম ছায়াসন্তান, আমি আমার বোনের ছায়ায় বাবা মায়ের অবহেলায় বেড়ে ওঠা এক হতভাগা সন্তান শ্যাডোচাইল্ড বা ছায়াসন্তান শব্দটির সাথে আপনারা অনেকেই হয়তো পরিচিত নন। ছায়াসন্তানরা ভাইবোনের ছায়ায় জীবন কাটায়, —এমনটা সচরাচর তখনই ঘটে যখন ভাইবোনদের মধ্যে একজন অসাধারণ প্রতিভাধর, অত্যন্ত সফল, কিংবা বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন হয়ে থাকেন। যেমন শারীরিকমানসিক অসুস্থতার জন্য, কখনো অতিরিক্ত মেধাবী হবার জন্য, অথবা কখনো অন্য কোনো বিশেষ পরিস্থিতির কারণে বাবামায়েরা একটি সন্তানের থেকে অন্য সন্তানকে বেশি অগ্রাধিকার দিয়ে থাকেন, বা দিতে বাধ্য হন। আর তখন অন্য সন্তানটি বা সন্তানরা অবহেলিত বোধ করে। ছায়াসন্তানের ভাইবোনের ছায়ায় জীবন কাটানোর অভিজ্ঞতার সাথে জড়িয়ে থাকে নিজের অযোগ্যতা বোধ, ক্ষোভ এবং উপেক্ষিত হওয়ার অনুভূতি। এই ধরনের পারিবারিক পরিস্থিতির ফলে সেইছায়াবৃত সন্তানবাশ্যাডো চাইল্ড’—এর আত্মসম্মানবোধ কমে যেতে পারে; আবার নিজেকে অন্যদের চেয়ে আলাদা করে তুলে ধরার প্রচেষ্টায় তারা অনেক সময়বিদ্রোহীকিংবাঅকৃতকার্যবাঅনগ্রসরহিসেবে নিজেদের উপস্থাপন করতে শুরু করে। যার পরিণামে প্রায়শই তাদের মনে হতে থাকে যে, তাদের নিজেদের অর্জনগুলোর কোনো গুরুত্বই নেই। 

লিন্ডার ভাষ্য মতে ওর বাবা লেসলিকে পালক বা দত্তক নেবার পর লিন্ডার জন্ম হয়, কিন্তু লিন্ডা খুব অবহেলায় বেড়ে ওঠে, কারণ ওদের বাবামায়ের সমস্ত মনোযোগ থাকতো ওর বড় বোন লেসলির ওপর। লেসলির মানসিক রোগের নানাবিধ উপসর্গের কারণে ওদের বাবামা সব সময় লেসলিকে সামলাতে ব্যাতিব্যস্ত থাকতেন। লিন্ডার বেড়ে ওঠার দিকে উনারা তেমন মনোযোগ দিতে পারেননি। সবসময় জেদ করা, সবার মনোযোগ আকর্ষণের চেষ্টা করা, চিৎকার করে কান্নাকাটি করা, মনের মতো কিছু না পেলে সেই জিনিসটি পাবার জন্য মাটিতে শুয়ে পড়ে হাত পা ছুঁড়ে জেদ করাখুব ছোট বয়স থেকেই লেসলির মানসিক রোগের এই উপসর্গগুলো চোখে পড়তো। তারপর শিশু মনোবিদের ডায়াগনোসিসে চার বছর বয়সেই লেসলির এডিএইচডি ধরা পড়ে। শিশুদের ক্ষেত্রে অউঐউ (মনোযোগের ঘাটতি অতিসক্রিয়তাজনিত ব্যাধি) হলো একটি স্নায়ুবিকাশজনিত ব্যাধি, যার প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো দীর্ঘস্থায়ী অমনোযোগিতা, অতিসক্রিয়তা এবং অস্থিরতা; সাধারণত ১২ বছর বয়সের আগেই এর লক্ষণগুলো প্রকাশ পায়। এই লক্ষণগুলো প্রায়শই একাধিক পরিবেশে, যেমনবাড়ি স্কুলে দেখা দেয় এবং তা শিশুর প্রাত্যহিক জীবন, শিক্ষা সামাজিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে ব্যাঘাত সৃষ্টি করতে পারে। এর সাধারণ লক্ষণগুলোর মধ্যে রয়েছে কোনো নির্দিষ্ট কাজে মনোযোগ ধরে রাখতে অসুবিধা, সবসময় অস্থির থাকা, অতি চঞ্চলতা থাকা, অন্যদের কথার মাঝখানে বাধা দেওয়া, অনবরত মনোযোগ আকর্ষণের চেষ্টা। 

লিন্ডা বলে চললোদিন যত গড়ালো ওর বড় বোন লেসলির মানসিক রোগের উপসর্গগুলো তত জটিল হতে থাকলো। অন্য সব বাচ্চাদের সাথে সাধারণ পাবলিক স্কুলে লেসলিকে পাঠানো ছিল ওর বাবামায়ের জন্য এক নিত্য দিনের যন্ত্রণাআজকে কোনো বাচ্চাকে ধাক্কা দিয়েছে, নয়তো কামড়ে দিয়েছে, কালকে কোনো টিচারের মুখে থুতু দিয়েছে এগুলো ছিল প্রতিদিনের ঘটনা। তখন পাবলিক স্কুলে স্পেশাল এড টিচার খুব তেমন ছিলোনা এবং সুযোগ সুবিধাও এখনকার মতো এতটা পাওয়া যেতোনা। তাই বাধ্য হয়ে লেসলির পালিত বাবামা লেসলিকে ম্যানচেস্টারের সেইন্ট ব্রিজেট প্রাইভেট স্কুলে ভর্তি করে দিলো। প্রাইভেট স্কুল প্রচুর খরচের ব্যাপার। বেচারা নিম্ন মধ্যবিত্ত বাবামা সপ্তাহের রোজগার ঢেলে দিতেন প্রাইভেট স্কুলে লেসলিকে পড়াতে, যেখানে লিন্ডা যেত বিনা বেতনের পাবলিক স্কুলে। তারপর হাই স্কুলে উঠে লিন্ডা রয়ে গেলো পাবলিক স্কুলে, কিন্তু লেসলি গেলো ব্যায়বহুল ইস্ট ক্যাথলিক হাই স্কুলে। কারণ পাবলিক স্কুলের ছেলেমেয়েদের মধ্যে লেসলির মানসিক স্বাস্থ্যের ক্ষতি হতে পারে ভেবে ওদের বাবামা অতিরিক্ত খরচের বোঝা বয়ে চললেন। কিন্তু হাই স্কুল পড়ালেখা শেষ করে গ্রাজুয়েশনের আগেই লেসলির মানসিক রোগ আরো প্রকট হয়ে উঠলো। নতুন নতুন উপসর্গ আর ওষুধের প্রতিক্রিয়াতে লেসলিকে নিয়ে বাড়িতে সবসময় অশান্তি লেগেই থাকতো। লেসলি যখন শরীরে বেড়ে উঠলো তখন মাঝে মাঝে রেগে গিয়ে বাবামাকে ধাক্কা দিতো, হাতের কাছে যা পেতো তাই ছুঁড়ে মারতো। প্রতিবেশীরা আর ওদের পারিবারিক বন্ধুবান্ধবরা ওদের বাবামাকে লেসলিকে কোনো প্রতিষ্ঠানে পাঠাতে বহুবার পরামর্শ দিয়েছে, কিন্তু উনারা রাজি হননি। কারণ উনাদের বিশ্বাস ছিল লেসলি বড় হলে কোনো একদিন হয়তো এইসব উপসর্গগুলো কমে যাবে, চিকিৎসা দিয়ে ওর রোগ নিয়ন্ত্রণে থাকবে, আর দশটা মেয়ের মতো উনাদের পালিত মেয়ে লেসলিও স্বাভাবিক জীবন কাটাবে। কিন্তু উনাদের সেই প্রত্যাশা পূরণ হয়নি। 

প্রতিদিন লেসলিকে নিয়ে বাবামায়ের ব্যস্ততা দেখতে দেখতে কখন যেন অবহেলাতে লিন্ডাও বড় হয়ে যায়। লিন্ডার ভাষ্যমতে, ওর আপন বাবামায়ের চেয়ে ওর প্রতিবেশী বন্ধুদের বাবা মায়েরাই ওর বেশি কাছের ছিল, সময়ে অসময়ে বাড়ির আশেপাশের আন্টআংকেলরাই লিন্ডাকে দেখে রেখেছেন, নিজের বাড়ির চেয়ে প্রতিবেশীদের বাড়িতেই লিন্ডা পড়ে থাকতো, সময় কাটাতো। লিন্ডা হাই স্কুল থেকেই বার্গার কিং, ম্যাকডোনাল্ড, বিভিন্ন গ্রোসারি স্টোরে কাজ করেছে। শুধু পয়সা ইনকাম না, বরং কাজ করে বাড়ির বাইরে থাকার উসিলা খুঁজতো লিন্ডা। কারণ বাড়িতে ঢুকলেই সেই চেঁচামেচি, ধাক্কাধাক্কি, জিনিসপত্র ছোড়াছুড়ি, মায়ের কান্না, বাবার আক্ষেপ, কখনো কখনো হাসপাতাল, নার্স ইত্যাদি। আর এইসব থেকে পালিয়ে থাকার জন্য লিন্ডা নিজের স্বাবলম্বী জীবন বেঁচে নিলো। মাত্র ষোলো বছর বয়সে নিজের চেষ্টাতে আর প্রতিবেশী পরিবারের সাহায্যে ড্রাইভার লাইসেন্স নিয়ে ফেলে, যোগ হয় লিন্ডার স্বাধীনতার আরেক মাত্রা। এদিকে লেসলির রোগ দিন দিন বেড়েই চললোএকদিন উত্তেজনাতে লেসলি ওর বাবাকে ধাক্কা দিয়ে সিঁড়ি থেকে ফেলে দেয়, ওদের বাবা রবার্টের কোমরের হাড় ভেঙে যায়। এই ঘটনায় লেসলির ওপর ছোট বোন লিন্ডার ক্ষোভ আরো তীব্র হয়। আর বাবামায়ের ওপর অভিমানে, রাগ করে সতেরো বছর বয়সে বাড়ি থেকে চলে যায় লিন্ডা। এক বন্ধুর সাথে আলাদা বাসা ভাড়া নিয়ে নিজের খরচে কলেজে ভর্তি হয়। শুরু হয় লিন্ডার একাকী জীবন। এর পরে আর কখনো বাড়ি ফেরা হয়নি লিন্ডার। 

লিন্ডা এইটুকু বলে দম নিলো। আমি একটি পানির বোতল এগিয়ে দিলামতারপর? আমার দিকে বন্ধুত্বের হাসি হেসে লিন্ডা আবার শুরু করলোÑ তো জল অনেক গড়ালো, লিন্ডা ওর স্বাধীন জীবন শুরু করলো, এক পর্যায়ে ইউ এস নেভিতে যোগ দিলো। ফ্লোরিডাতে ওর পোস্টিং হয়, লিন্ডা সহজেই ফ্লোরিযার প্রেমে পড়ে যায়। কানেকটিকাটের মতো এই শীত প্রধান অঞ্চলের বরফের কবল থেকে মুক্তি পেলো লিন্ডা। তেইশ বছর বয়সে জীবন সঙ্গী খুঁজে পেলো নেভিতেই। লিন্ডা এখন তিন সন্তানের মা। স্বামী আর তিন সন্তান নিয়ে ওর সাজানো সংসার মায়ামিতে। ওর কাছে জীবন সুন্দর। আর কখনো পেছনে ফিরে তাকায়নি লিন্ডা। লিন্ডার পরিপাটি সাজগোজ, সুখী চেহারা, আর মুক্ত মনের রহস্য। নিজেই গড়গড় করে বললো— ‘ইউ হ্যাভ টু লেট্ গো... তোমাকে তোমার অতীত ভুলে যেতে হবে, যে অতীত তোমাকে শুধু কাঁদাবে সেই অতীত মুছে ফেলতে হয়! আমার বাবা পক্ষাঘাতে মারা গেছেন। আজ আমার মা বয়সের ভারে আর লেসলির জন্য সারাটা জীবন উৎসর্গ করে ক্লান্ত। এই বৃদ্ধ বয়সে কানাডাতে নিজের বাপের বাড়িতে ফিরে গেছে! দেখো আমিেতো তাদের কাছ থেকে পর্যাপ্ত আদর ভালোবাসা পাইনি। আসলে কিছুই পাইনি অবহেলা ছাড়া! কিন্তু জানো আমি ওদের ক্ষমা করে দিয়েছি! আমি একজন মা, আমি এখন জানি সন্তানকে ভালোবেসে বাবামা কিভাবে অন্ধ হয়ে যেতে পারে, উচিত অনুচিতের বিবেচনা হারিয়ে ফেলতে পারে। আমি আমার ছেলেমেয়েদের সমানভাবে দেখি। কিন্তু এটাও জানি, থ্যাঙ্কস গড, আমার বাচ্চাদের কারো কোনো স্পেশাল নিড নেই। থাকলে হয়তো আমার নিজের বাবামায়ের মতোই আমিও একজনকে রেখে অন্যজনকে বেশি মনোযোগ দিতাম। বেশি টানতাম। শ্যাডো চাইল্ড হবার যন্ত্রণা আমি জানি। তাই আমি খুব খেয়াল রাখি আমার তিন সন্তান যেন সমান মনোযোগ পায়...’ এভাবে গড়গড় করে কথার ফুলঝুরি ছুটে যাচ্ছে আর আমি হতবাক হয় ভাবছি এতো কিছুর পরেও বোনের জন্য এতো দূরে ফ্লাই করে কেন আসলো লিন্ডা? সেই বোনের জন্য যে কিনা বাবামায়ের সবটা আদর ভালোবাসা দখল করে নিয়েছিল? আমি না পেরে জিজ্ঞেস করেই বসলামতো তুমি বললে তুমি পেছনে ফিরে তাকাওনা, তাহলে এতো দূর থেকে কাজে ছুটি নিয়ে বোনের জন্য স্বেচ্ছায় সাক্ষী হয় হাজিরা দিতে এলে কেন?’ লিন্ডা মিষ্টি হেসে যা বললো তা আমাকে আরো বিস্মিত করলো।এসেছি কারণ তো আমার বোন, তাই না? আমি আমার বোনকে তবুও ভালোবাসি, অনেক ভালোবাসি। যদি আমার সাক্ষীতে ওর ডিসএবিলটি বেনিফিট কেস জোরালো হয় তবে আমার বোনটার উপকার হবে।পালিত বোন লেসলির জন্য সারাজীবন বাবা মায়ের ভালোবাসা থেকে বঞ্চিত লিন্ডার এই ভালোবাসা দেখে আমার চোখ ভিজে এলো। লিন্ডা উঠে দাঁড়িয়ে আমাকে জড়িয়ে ধরলো। আমার মনে হলো আমরা মানুষেরা সব ভুলে তবুও ভালোবাসি, আর এই ভালোবাসাই আমাদের বেঁধে রাখে সম্পর্কের সুতোতে, সে সুতো ধরে আমরা পথ চলি, বেঁচে থাকি। আমার ক্লায়েন্ট ছাপান্ন বছর বয়সী লেসলির বাকি গল্প আরেকদিন বলবো। (চলবে)

কানেক্টিকাট থেকে

Related Posts