গানের ভেলায় স্মৃতির খেয়ায়— ছয় সহস্র সুরের এক ইন্দ্রজাল: আশা ভোঁসলে এক চিরযৌবনা কণ্ঠের মহাকাব্য

জীবন বিশ্বাসঃ কোনো সুরের কথা ভাবলে মনের ভেতর যখন হঠাৎ করে এক চিমটি দুষ্টুমি আর এক চিলতে বর্ষার অভিমান খেলা করে, তখন বুঝে নিতে হবে সেখানে আশা ভোঁসলের কণ্ঠের কারসাজি আছে। যদি লতা মঙ্গেশকর হন হিমালয়ের শান্ত শুভ্র ঝরনা, তাহলে আশা ভোঁসলে হবেন সেই অশান্ত আর উদ্দাম নদী, যা সমতলের বাঁকে বাঁকে অজস্র প্রাণের মেলা বসিয়ে মেশে গিয়ে সাগরে। গানের এই সুরসাম্রাজ্ঞী সুরের সরোবরে ছড়িয়ে দিয়েছেন শিশিরকণার পাগল করা পেলবপ্রপাত; ক্লান্তি ঝেড়ে সেই চিরযৌবনা কণ্ঠের মায়াজালে অবগাহন করে অযুত শ্রোতা বুঁদ হয়ে রয়েছেন যুগ যুগ ধরে। আশা তাঁর কণ্ঠের সেই সম্মোহনী শক্তিতে নেশাগ্রস্ত সকল সুরমাতালদের সাকিতে সুরা ঢেলে গেছেন অবলীলায়। শ্রোতাদের সেই ঢুলু ঢুলু লোহিতচোখে আশা ভোঁসলে নির্দয়ভাবে ঢেলে দিয়েছেন আরও রক্তিম সুরের সুরা। আশা ভোঁসলে ১৯৩৩ সালের সেপ্টেম্বর মুম্বাইতে জন্মগ্রহণ করেন এবং ২০২৬ সালের ১২ এপ্রিল ৯২ বছর বয়সে তিনি পরলোকগমন করেন।

সুরের সেই অবাধ্য ঝোড়ো হাওয়া

আশা ভোঁসলের গায়কির সবচেয়ে বড় বৈচিত্র্য হলো তাঁর কণ্ঠের অবাধ ব্যাপ্তি, যেন কোনো সীমানা নেই। তিনি যখন গাইতে শুরু করেন, তখন ব্যাকরণ হার মানে তাঁর প্রাণের আবেগের কাছে। বড় বোন লতা মুঙ্গেশকরের ছায়ায় ঢাকা না পড়ে তিনি নিজেই হয়ে উঠেছেন এক ভিন্ন ধারার মহীরুহ। তাঁর কণ্ঠে বিরহ আছে, কিন্তু সেই বিরহ কেবল কান্নাকাটি নয়তা এক ধরনের আত্মমর্যাদা। আবার যখন তিনি চটুল গান গাইতে শুরু করেন, তখন মনে হয় বসন্তের সবটুকু রঙ কেবল তাঁর গলার স্বরক্ষেপণেই মিশে আছে। তাঁরমুড়কিআরতানদেওয়ার ভঙ্গি এতটাই সাবলীল যে, মনে হয় সুর বুঝি তাঁর কথাতেই ওঠাবসা করে।

বাংলার নাড়ি আশার সুর

হিন্দি প্লেব্যাকে তিনি আকাশসমান জনপ্রিয় একজন অপ্রতিদ্বন্দ্বী শিল্পী। বাংলা আধুনিক গানেও তাঁর অবদান বিশাল। ওপি নাইয়ার বা রাহুল দেব বর্মণের সুরে তিনি যখন হিন্দিতে ঝড় তুলেছেন, ঠিক সেই সময়েই সুধীন দাশগুপ্ত বা নচিকেতা ঘোষের সুরে বাংলার ঘরে ঘরে তিনি পৌঁছে গিয়েছেন মায়ার এক অপূর্ব আবেশ নিয়ে। বাংলা ভাষার প্রতি তাঁর যে টান, তা কেবল সুরের টানে নয়তা যেন এক হৃদয়ের গভীর অনুরাগ। মান্না দে সুরে এবং পুলক বন্দোপাধ্যায়ের কথায় তাঁর গাওয়াআমি খাতার পাতায় চেয়েছিলাম’—গানটি শুনলে মনে হয় না তিনি বাংলা ছাড়া অন্য কোনো প্রদেশের মানুষ। সলিল চৌধুরীর কথা সুরে ঘুমের ময়না পাখিগানটিও সাক্ষ্য দেয় যে আশা ছিলেন এক জাত বাংলা ভাষার শিল্পী। জন্মসূত্রে অবাঙালি হলেও, আশা ভোঁসলে বাঙালির হৃদয়ে ঠাঁই করে নিয়েছিলেন পরম আত্মীয়ের মতো। তাঁর সেই মখমলি কণ্ঠের ঐশ্বর্য আর অক্ষরের শুদ্ধতায় গাঁথা নিখুঁত উচ্চারণের রবীন্দ্রসংগীতগুলো আজও আপামর সুরপিপাসুদের হৃদয়ে এক গভীরতম অনুরাগের আসন দখল করে আছে। বাংলার বিরহী দুপুরের শান্ত বাতাস যেন তাঁর কণ্ঠে এসে বাসা বাঁধে। তিনি যখন গেয়ে ওঠেন—‘আছে গৌর নিতাই নদীয়াতে’—তখন সেই সুরের প্রতিটি ভাঁজে এক অদ্ভুত নস্টালজিয়া কাজ করে। বাংলা গানের স্বর্ণালি সময়ে তিনি ছিলেন এমন এক ধ্রুবতারা, যাঁকে ছাড়া বাংলার সংগীতের আকাশ অসম্পূর্ণ থেকে যেত।

আশা ভোঁসলে আর. ডি. বর্মণের সুরের বিপ্লব

আশা ভোঁসলে এবং রাহুল দেব বর্মণÑএই দুইয়ের রসায়ন ভারতীয় সংগীতের ইতিহাসকে নতুন করে লিপিবদ্ধ করেছে। তাঁরা সংগীতকে ড্রয়িংরুমের আরামদায়ক আসবাব থেকে বের করে নিয়ে এসেছিলেন রাজপথের মিছিলে আর তারুণ্যের উন্মাদনায়। আর. ডি. বর্মণের সৃষ্টিতে পপ, জ্যাজ কিংবা ক্যাবারেÑযেকোনো আধুনিক তালের গানে আশার যে পারদর্শিতা, তা আজও বিস্ময় জাগায়। অথচ এই একই মানুষ যখন আবার ধ্রুপদী ঢঙে ঠুমরি বা গজল গাইতে বসেন, তখন তাঁর গাম্ভীর্য দেখে মনে হয় তিনি বুঝি সংগীতের কোনো এক কঠোর তপোবনে আজীবন কাটিয়েছেন। এই যে সুরের বৈপরীত্যকে জয় করা, এটাই আশা ভোঁসলের আসল আভিজাত্য এবং কঠোর বিপ্লব।

জীবনবোধ এক অনন্ত লড়াইয়ের গল্প

আশা ভোঁসলের ব্যক্তিজীবনও তাঁর সুরের মতোই চড়াইউতরাইয়ে ভরা। কিন্তু প্রতিটি আঘাতকে তিনি জয় করেছেন গানের সুরে। তাঁর কণ্ঠে কোনো জরা নেই, কোনো ক্লান্তি নেই। নব্বই পেরিয়েও তিনি যখন মাইকের সামনে দাঁড়িয়েছেন, তখন তাঁর কণ্ঠ থেকে যে তেজ বিচ্ছুরিত হত, তা আজকের তরুণ প্রজন্মের সংগীতশিল্পীদের কাছেও এক পরম বিস্ময়। তিনি সত্যি সত্যি জানিয়ে গেছেন যে, বয়স কেবল একটা সংখ্যা মাত্র, যদি কণ্ঠ অন্তরের সুরটি সতেজ থাকে। আশা ভোঁসলের গান যেমন সংগীতপ্রেমীদের একাকিত্বের সঙ্গী, তেমনি তা প্রথম যৌবনের গোপন আবেগের এক বিশ্বস্ত প্রতিধ্বনিও বটে।

আশা ভোঁসলের বিখ্যাত কয়েকটি গান

১। আমি খাতার পাতায় চেয়েছিলাম, ২। যেতে দাও আমায় ডেকো না, ৩। কথা হয়েছিল তবু কথা হল না, ৪। তারে ভোলানো গেল না, ৫। আমার কাঁধের আঁচল, ৬। মনের ময়ূর, ৭। কে যায় রে, ৮। নাচ নাচ মন, ৯। যৌবন জ্বালা করে, ১০। এই বুকে ধরে জ্বালা, ১১। মেহেদির রং মাখানো, ১২। ঘুমের ময়না পাখি, ১৩। জানি না জানি না, ১৪। একটু বসো চলে যেও না, ১৫। তুই যত ফুল দিস না কিনে, ১৬। ময়না বলো তুমি কৃষ্ণ রাধে, ১৭। বধুয়া রিমিঝিমি এই শ্রাবণে, ১৮। মহুয়ায় জমেছে আজ মৌ গো, ১৯। সন্ধ্যাবেলা তুমি আমি বসে আছি দুজনে, ২০। মন আমার হারিয়ে যায়, ২১। তোলো ছিন্নবীণা, ২২। কোন সে আলোর স্বপ্ন নিয়ে, ২৩। কোথা কোথা খুঁজেছি তোমায়, ২৪। এমন মধুর সন্ধ্যায়, ২৫। চোখে চোখে কথা বলো।

পরিশেষ

আশা ভোঁসলে কেবল একজন শিল্পী ছিলেন না, তিনি ছিলেন সুরের এক জীবন্ত ইতিহাস। তিনি সুরের এক এমন ইন্দ্রজাল বুনেছেন, যার ভেতরে ডুবলে সময় থমকে যায়। নতুন প্রজন্মের শিল্পীদেরকে তিনি শিখিয়েছেন যে, স্নিগ্ধতার পাশাপাশি শক্তিরও এক নিজস্ব ছন্দ আছে। সুরের এই সম্রাজ্ঞী বেঁচে থাকবেন তার চিরসবুজ এবং চিরযৌবনা মায়াবী কণ্ঠ নিয়ে। যতদিন পৃথিবীতে প্রেম থাকবে, যতদিন মানুষের মনে সুরের তৃষ্ণা থাকবেÑততদিন আশা ভোঁসলে প্রাসঙ্গিক হয়ে থাকবেন। আশা মানে কেবল একটি নাম নয়, আশা মানে এক অবিনাশী সুরের বসন্ত, যা সময়ের প্রলেপেও ম্লান হয় না কখনো।

Related Posts