৫০ রাজ্যের ৫০ ভালোবাসার গল্প ঃ ক্যালিফোর্নিয়া ডটার অব ফরচুনঃ ইসাবেল আয়েন্দে || আবদুল্লাহ জাহিদ নিউইয়র্ক

ঊনবিংশ শতকের মাঝামাঝি সময়। পৃথিবীর নানা প্রান্তে ছড়িয়ে পড়ে এক বিস্ময়কর সংবাদআমেরিকার পশ্চিম উপকূলে সোনা পাওয়া গেছে। সেই সংবাদে উদ্বেল হয়ে হাজার হাজার মানুষ পাড়ি জমায় দূরদেশে, অজানা এক স্বপ্নের সন্ধানে। ইতিহাসে এই ঘটনাই ক্যালিফোর্নিয়া গোল্ড রাশ নামে পরিচিত।

এই বিশাল ঐতিহাসিক ঘটনার পটভূমিতে চিলিয়ানআমেরিকান কথাসাহিত্যিক ইসাবেল আয়েন্দে রচনা করেছেন তাঁর এই উপন্যাস ডটার অব ফরচুন। ইতিহাস, প্রেম, অভিবাসন, সামাজিক বৈষম্য এবং নারীর আত্মপরিচয়ের প্রশ্নÑসব মিলিয়ে এই উপন্যাস এক গভীর মানবিক কাহিনী।

উপন্যাসটি শুধু একটি প্রেমের গল্প নয়; বরং এক তরুণীর আত্মান্বেষণের দীর্ঘ যাত্রাÑযে যাত্রা চিলির বন্দরনগরী থেকে শুরু হয়ে ক্যালিফোর্নিয়ার স্বর্ণখনির উত্তাল পৃথিবীতে পৌঁছে যায়।

উপন্যাসের সারসংক্ষেপ:

উপন্যাসের সূচনা চিলির সমুদ্রবন্দর শহর ভালপারাইসোতে। উনিশ শতকের এই শহর ছিল আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। ইউরোপ, আমেরিকা এবং এশিয়ার নানা দেশের জাহাজ এখানে ভিড়ত। ফলে শহরটি ছিল বহুজাতিক সংস্কৃতির এক মিলনক্ষেত্র।

এই শহরেই ইংরেজ ব্যবসায়ী জেরেমি সোমারসের পরিবারে আশ্রয় পায় এক অনাথ কন্যাযার নাম রাখা হয়, এলিজা সোমারস। সোমারস পরিবার তাকে কুড়িয়ে পায়। তাকে পরিত্যক্ত অবস্থায় পাওয়া গিয়েছিল এক ঝুড়িতে। সোমারস পরিবার তাকে লালনপালন করে নিজেদের মেয়ের মতোই।

তবে পরিবারের প্রকৃত অভিভাবক হয়ে ওঠেন জেরেমির বোন রোজ সোমারস, যিনি এক কঠোর, সংযত কিন্তু অন্তরে গভীর স্নেহময়ী ইংরেজ মহিলা। তিনি এলিজাকে ইংরেজ সমাজের আদবকায়দা শেখান, সংগীত শিক্ষার মাধ্যমে তাকে এক পরিশীলিত তরুণী হিসেবে গড়ে তোলেন।

কিন্তু এলিজার স্বভাব ছিল অন্যরকম। তার মধ্যে ছিল স্বাধীনচেতা মন, অজানাকে জানার আকাক্সক্ষা এবং নতুন পৃথিবীর প্রতি গভীর কৌতূহল।

এলিজার জীবনে এক গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ঘটে যখন সে পরিচিত হয় তরুণ অভিযাত্রী জোয়াকিন আন্দিয়েতার সঙ্গে।

জোয়াকিন ছিল এক সাহসী স্বপ্নবাজ যুবক। সে নতুন পৃথিবীতে নিজের ভাগ্য নির্মাণ করতে চায়। এই সময়েই ক্যালিফোর্নিয়ায় সোনা আবিষ্কারের খবর ছড়িয়ে পড়ে।

এই সংবাদ বহু মানুষের মতো জোয়াকিনের মনেও নতুন স্বপ্ন জাগায়। সে সিদ্ধান্ত নেয়ক্যালিফোর্নিয়ায় গিয়ে ভাগ্য পরীক্ষা করবে।

এদিকে এলিজা তার প্রেমে গভীরভাবে আবদ্ধ হয়ে পড়ে। কিন্তু তাদের সম্পর্ক সামাজিকভাবে গ্রহণযোগ্য ছিল না। ফলে প্রেমটি রয়ে যায় গোপন।

জোয়াকিন ক্যালিফোর্নিয়ায় চলে গেলে এলিজার জীবনে নেমে আসে শূন্যতা। কিন্তু সে হাল ছাড়ে না।

প্রেমিককে খুঁজে পাওয়ার আশায় সে এক সাহসী সিদ্ধান্ত নেয়গোপনে একটি জাহাজে উঠে বসে, যার গন্তব্য ক্যালিফোর্নিয়া।

এই বিপজ্জনক যাত্রাপথে তার জীবন প্রায় বিপন্ন হয়ে পড়ে। দীর্ঘ সমুদ্রযাত্রা, অসুস্থতা এবং অনিশ্চয়তার মধ্য দিয়ে সে এগিয়ে চলে।

এই সময় তার জীবন রক্ষা করেন এক চীনা চিকিৎসকতাও চিয়েন। তিনি শুধু এলিজার চিকিৎসাই করেন না; বরং তার জীবনের পথচলায় গুরুত্বপূর্ণ সহচর হয়ে ওঠেন।

ক্যালিফোর্নিয়ায় পৌঁছে এলিজা যে সমাজ দেখেতা তার কল্পনার চেয়ে সম্পূর্ণ ভিন্ন।

সোনার খনির সন্ধানে পৃথিবীর নানা দেশ থেকে মানুষ এখানে এসেছেচিলি, মেক্সিকো, চীন, ইউরোপ এবং আমেরিকার পূর্বাঞ্চল। কিন্তু এই বহুজাতিক সমাজের ভেতরে রয়েছে তীব্র প্রতিযোগিতা, সহিংসতা এবং বর্ণবৈষম্য।

অনেকেই সোনা খুঁজে পায় না; বরং দারিদ্র্য হতাশার মধ্যে পড়ে। খনি শিবিরগুলো অস্থায়ী, শহরগুলো অগোছালো, আইনশৃঙ্খলা দুর্বল।

ক্যালিফোর্নিয়ায় এসে এলিজার প্রধান লক্ষ্য হয়ে ওঠে জোয়াকিনকে খুঁজে বের করা।

সে বিভিন্ন খনি শিবিরে ঘুরে বেড়ায়, নানা মানুষের সঙ্গে দেখা করে, অসংখ্য গল্প শোনে। কিন্তু জোয়াকিন যেন এক রহস্যে পরিণত হয়।

কিছু গুজব শোনা যায়জোয়াকিন হয়তো এক বিদ্রোহী নেতায় পরিণত হয়েছে, যে অত্যাচারের বিরুদ্ধে লড়ছে।

কিন্তু এই অনুসন্ধানের মধ্যেই এলিজা উপলব্ধি করতে শুরু করেতার জীবনের অর্থ শুধু একটি প্রেমের গল্পে সীমাবদ্ধ নয়।

উপন্যাসের শেষদিকে এলিজার ভেতরে এক গভীর পরিবর্তন ঘটে।

প্রেমিককে খুঁজে পাওয়ার আকাক্সক্ষা ধীরে ধীরে রূপ নেয় আত্মপরিচয়ের অনুসন্ধানে। তাও চিয়েনের সহমর্মিতা এবং জীবনের নানা অভিজ্ঞতা তাকে নতুনভাবে ভাবতে শেখায়।

সে বুঝতে পারেতার যাত্রা আসলে নিজের স্বাধীনতা শক্তিকে আবিষ্কার করার পথ।

এই উপলব্ধিই তাকে এক আত্মনির্ভর শক্তিশালী নারী হিসেবে গড়ে তোলে।

এই উপন্যাসে ক্যালিফোর্নিয়া একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতীক।

সোনার লোভ মানুষকে যেমন আকৃষ্ট করে, তেমনি তা মানুষের প্রকৃত চরিত্রকেও উন্মোচিত করে। ক্যালিফোর্নিয়া হয়ে ওঠে এমন একটি মঞ্চ যেখানে মানুষের স্বপ্ন, লোভ, সংগ্রাম এবং বেঁচে থাকার লড়াই স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

এই পটভূমি ছাড়া এলিজার আত্মঅন্বেষণের গল্প এত গভীর হয়ে উঠত না।

অতএব ক্যালিফোর্নিয়া এখানে শুধু একটি স্থান নয়; এটি উপন্যাসের অন্যতম প্রধান চরিত্র। ইসাবেল আয়েন্দে এই পরিবেশকে অত্যন্ত জীবন্তভাবে তুলে ধরেছেনযেখানে মানুষের লোভ, স্বপ্ন, হতাশা এবং সংগ্রাম একসঙ্গে মিশে আছে।

লেখিকার সংক্ষিপ্ত পরিচয়:

ইসাবেল আয়েন্দে জন্মগ্রহণ করেন ১৯৪২ সালে পেরুর লিমা শহরে। তিনি চিলির কূটনৈতিক পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন এবং পরবর্তীকালে সাংবাদিকতা সাহিত্যচর্চার মাধ্যমে আন্তর্জাতিক খ্যাতি অর্জন করেন।

তার প্রথম উপন্যাসহাউস অব দি স্পিরিটপ্রকাশিত হওয়ার পর তিনি বিশেষ পরিচিতি লাভ করেন।

ইসাবেল আয়েন্দের সাহিত্যকর্মে ইতিহাস, রাজনীতি, স্মৃতি এবং নারীর জীবনসংগ্রাম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে উঠে আসে। তার বই বিশ্বের বহু ভাষায় অনূদিত হয়েছে এবং লক্ষ লক্ষ পাঠকের কাছে জনপ্রিয় হয়েছে।

Related Posts