যে কারণে কানাডায় ডলির জয়জয়কার

মুনজের আহমদ চৌধুরীঃ কানাডার ফেডারেল রাজনীতির মানচিত্র বদলে দেওয়ার কারিগর হিসেবে আবির্ভূত হলেন মৌলভীবাজারের কন্যা ডলি বেগম। গত সোমবার রাতে অনুষ্ঠিত উপনির্বাচনে ডলি তার স্থানীয় জনপ্রিয়তাকে কাজে লাগিয়ে এক শক্তিশালী জাতীয় ম্যান্ডেটে রূপান্তর করেছেন, যা প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নিকে উপহার দিয়েছে একটি স্থিতিশীল সংখ্যাগরিষ্ঠ সরকার।

ডলি বেগমের এই অভাবনীয় জয়ের পেছনে রয়েছে এক দীর্ঘ সংগ্রাম অদম্য ইচ্ছাশক্তির গল্প। তার এই রাজনৈতিক দর্শনের ভিত্তি রচিত হয়েছিল বাংলাদেশের মৌলভীবাজারের সাধারণ পরিবেশে, যা তাকে প্রতিকূলতার সঙ্গে লড়াই করার সাহস জুগিয়েছে। সমর্থকদের মতে, ডলির সাফল্যের প্রধানম্যাজিকহলো তার ব্যক্তিত্ব। ২০২৪ সালের শেষের দিকে স্বামী ব্যারিস্টার রিজুয়ান রহমানকে ক্যানসারে হারানোর পর যে গভীর ব্যক্তিগত শোকের মধ্য দিয়ে তিনি গেছেন, তাকেই তিনি জনসেবার শক্তিতে রূপান্তরিত করেছেন। এই মানবিক গুণ স্বচ্ছতা তাকে সাধারণ মানুষের কাছে একজন নির্ভরযোগ্য এবং আপনজন হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।

বিশ্লেষকদের মতে, তৃণমূল পর্যায় থেকে উঠে আসা ডলি বেগমের সবচেয়ে বড় সক্ষমতা হলো সাধারণ মানুষের প্রাত্যহিক সমস্যাগুলোকে নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে তুলে আনা। এক দশকেরও বেশি সময় ধরে স্কারবরো হেলথ কোয়ালিশনের সহসভাপতি এবং অন্টারিও এনডিপির ডেপুটি লিডার হিসেবে তার কাজের অভিজ্ঞতা তাকে সাধারণ ভোটারদের হৃদয়ে জায়গা করে দিয়েছে। চলতি বছর এনডিপি ছেড়ে লিবারেল দলে যোগ দেওয়া নিয়ে রাজনৈতিক মহলে কানাঘুষা থাকলেও, স্কারবোরো সাউথওয়েস্টের ভোটাররা প্রায় ৭০ শতাংশ ভোট দিয়ে বুঝিয়ে দিয়েছেন, তারা দলের চেয়ে ডলির ব্যক্তিত্ব নেতৃত্বের ওপরই বেশি আস্থাশীল।

পরিসংখ্যান বলছে, ডলি বেগমের বিজয় ছিল রীতিমতো ল্যান্ডস্লাইড বা ভূমিধস জয়। ২০,১১৪ ভোট পেয়ে তিনি তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী কনজারভেটিভ প্রার্থী ডায়ানা ফিলিপোভাকে (১৮.%) যোজন যোজন পেছনে ফেলেছেন। এনডিপি প্রার্থীর ভোট মাত্র শতাংশে নেমে আসায় এটি স্পষ্ট যে ডলি একাই পুরো রাজনৈতিক সমীকরণ বদলে দিয়েছেন। এই জয়ের ফলে হাউজ অফ কমন্সে লিবারেলদের আসন সংখ্যা এখন ১৭৪ পৌঁছেছে, যা মার্ক কার্নি সরকারকে শক্তিশালী অবস্থানে দাঁড় করিয়েছে।

কিউএসএসআইএস ব্যাঙ্কুয়েট হলে সমর্থকদের উল্লাসের মাঝে ডলি বেগম এক সাংবাদিককে বলেন, এই বিজয় কেবল আমার নয়, এটি স্কারবোরোর প্রতিটি মানুষের বিজয় যারা বিভাজনের বিপরীতে বেছে নিয়েছেন ঐক্যকে। উৎসবের সেই পরিবেশ ছিল এক টুকরো বাংলাদেশ আর বহুসংস্কৃতির কানাডার মেলবন্ধন।

ডলি বেগমের এই জয় প্রধানমন্ত্রীর জন্য আইনসভার সব বাধা দূর করে দিয়েছে। প্রথমবারের মতো মার্ক কার্নিকে এখন কোনো বিল পাস করার জন্য বিরোধী দলের ওপর নির্ভর করতে হবে না। নির্ভরযোগ্য সূত্রগুলো বলছে, সরকার এখন আবাসন সংকট নিরসন এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্য সম্পর্কের ক্ষেত্রে কঠোর দ্রুত পদক্ষেপ নিতে শুরু করবে।

ফেডারেল পার্লামেন্টে প্রথম বাংলাদেশী বংশোদ্ভূত নারী সদস্য হিসেবে ডলি বেগমের ভূমিকা এখন কেবল একটি আসনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। রাজনৈতিক মহলে গুঞ্জন রয়েছে, আন্তর্জাতিক উন্নয়ন ক্ষেত্রে তার অভিজ্ঞতা এবং অভিবাসী সমাজে তার ব্যাপক গ্রহণযোগ্যতার কারণে আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই তিনি মন্ত্রিসভায় কোনো গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব বা বড় কোনো সংসদীয় সচিবের পদ পেতে পারেন।

এখন সবার দৃষ্টি অটোয়ার দিকে, যেখানে ডলি বেগমসহ নতুন বিজয়ী সদস্যরা লিবারেল ককাসে যোগ দেবেন। সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জিত হওয়ায় ২০২৯ সাল পর্যন্ত কানাডায় আর কোনো আগাম নির্বাচনের সম্ভাবনা নেই, যা সরকারকে দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা বাস্তবায়নের সুযোগ করে দিল।

অন্যদিকে, অন্টারিও প্রাদেশিক আইনসভা থেকে ডলি বেগমের পদত্যাগের ফলে সেখানেও একটি শূন্যতা তৈরি হয়েছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের ধারণা, ডলির রেখে যাওয়া সেই আসনে আবারও এক হাড্ডাহাড্ডি লড়াই দেখা যাবে। তবে আপাতত আলোচনার কেন্দ্রে কেবল ডলি বেগম, যিনি মৌলভীবাজারের মাটি থেকে উঠে এসে এখন অটোয়ার ক্ষমতার রাজনীতির একজন ফ্যাক্টর হয়ে উঠছেন ক্রমশই।

Related Posts