পিত্তথলির পাথর ফেলতে গলব্লাডার ফ্লাশ কার্যকর?
ডা. সজল আশফাক: অনেকেই বিশ্বাস করেন জলপাই তেল, লেবুর রস বা বিভিন্ন ভেষজ উপাদান দিয়ে ‘লিভার—গলব্লাডার ফ্ল্যাশ’ করলে পিত্তথলির পাথর গলে যায় বা শরীর থেকে বের হয়ে যায়। ফ্ল্যাশ করার পর মলের সঙ্গে সবুজ বা হলদেটে পাথরের মতো কিছু দলা বের হতেও দেখা যায়। আর সেগুলো দেখেই অনেকে মনে করেন, পিত্তথলির পাথর বের হয়ে গেছে!
কিন্তু বিজ্ঞান বলছে, বিষয়টি আসলে তা নয়।
তাহলে ওই সবুজ দলাগুলো কী?
গবেষণায় দেখা গেছে, ফ্ল্যাশের পর বের হওয়া এসব নরম, সবুজাভ ‘পাথর’ অনেক ক্ষেত্রেই প্রকৃত পিত্তথলির পাথর নয়। ফ্ল্যাশে ব্যবহৃত প্রচুর পরিমাণ তেল পরিপাকতন্ত্রে ভেঙে এবং বিভিন্ন রাসায়নিক পরিবর্তনের মাধ্যমে নরম, সাবানের মতো দলা তৈরি করতে পারে। এগুলো দেখতে পিত্তথলির পাথরের মতো হওয়ায় সহজেই বিভ্রান্তি তৈরি হয়।
প্রকৃত পিত্তথলির পাথর সাধারণত কোলেস্টেরল অথবা বিলিরুবিনজাতীয় পদার্থ থেকে পিত্তথলির ভেতরে তৈরি হওয়া কঠিন বা জমাট পদার্থ। এক রাতের জলপাই তেল ও লেবুর রসের পদ্ধতি দিয়ে এসব পাথর ‘গলিয়ে’ শরীর থেকে বের করে দেওয়া যায়Ñএমন নির্ভরযোগ্য বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই।
ফ্ল্যাশ কি নিরাপদ?
এটিকে নিরীহ ঘরোয়া চিকিৎসা মনে করাও ঠিক নয়।
খাবার, বিশেষ করে বেশি পরিমাণে চর্বিজাতীয় খাবার গ্রহণ করলে পিত্তথলি সংকুচিত হয়ে পিত্তরস বের করে। যাদের আগে থেকেই পিত্তথলিতে পাথর রয়েছে, তাদের ক্ষেত্রে কোনো পাথর নড়ে পিত্তনালীতে চলে গিয়ে আটকে গেলে পিত্তপ্রবাহে বাধা, তীব্র পেটব্যথা, জন্ডিস, সংক্রমণ কিংবা পিত্তপাথরজনিত অগ্ন্যাশয়ের প্রদাহের মতো গুরুতর জটিলতা সৃষ্টি হতে পারে।
এ ছাড়া এ ধরনের শরীর ‘পরিষ্কার’ করার ফ্ল্যাশ পদ্ধতি থেকে বমি, বমিভাব, ডায়রিয়া ও পেটব্যথা হতে পারে।
অর্থাৎ, ‘প্রাকৃতিক’ হলেই কোনো পদ্ধতি নিরাপদ বা ঝুঁকিমুক্ত,এ ধারণা ঠিক নয়।
এই ধারণা জনপ্রিয় হলো কীভাবে?
বিকল্প চিকিৎসার বিভিন্ন বই ও প্রচারণার মাধ্যমে লিভার—গলব্লাডার ফ্ল্যাশ ব্যাপকভাবে জনপ্রিয় হয়েছে।
হুলদা ক্লার্ক তাঁর বিভিন্ন লেখা ও বইয়ে শরীর পরিষ্কার করার বিভিন্ন পদ্ধতি এবং বিকল্প চিকিৎসার মাধ্যমে গুরুতর রোগ, এমনকি ক্যানসার সম্পর্কেও বৈজ্ঞানিকভাবে অপ্রমাণিত বিভিন্ন দাবি করেছিলেন। তাঁর এসব চিকিৎসা—তত্ত্ব মূলধারার চিকিৎসাবিজ্ঞানে গ্রহণযোগ্যতা পায়নি।
অন্যদিকে আন্দ্রেয়াস মরিৎস তাঁর দ্য অ্যামেজিং লিভার অ্যান্ড গলব্লাডার ফ্ল্যাশ বইয়ের মাধ্যমে এই পদ্ধতিকে বিশ্বজুড়ে আরও জনপ্রিয় করে তোলেন।
তবে কোনো বই জনপ্রিয় হওয়া, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অসংখ্য মানুষের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার কথা থাকা কিংবা ফ্ল্যাশের পর ‘পাথরের মতো’ বস্তু দেখাÑকোনোটিই কোনো চিকিৎসাপদ্ধতির কার্যকারিতার বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নয়।
পিত্তথলির পাথরের প্রচলিত ও বৈজ্ঞানিকভাবে স্বীকৃত চিকিৎসা হিসেবে এই ফ্ল্যাশ পদ্ধতিকে গ্রহণ করার মতো উচ্চমানের ও নির্ভরযোগ্য চিকিৎসাবিষয়ক গবেষণার প্রমাণ এখনো নেই।
