অনিয়ন্ত্রিত ডায়াবেটিসে যত জটিলতা

লে. কর্নেল ডা. নাসির উদ্দিন আহমদ: ডায়াবেটিসের একটি মারাত্মক জটিলতা হলো ডায়াবেটিক কিটোঅ্যাসিডোসিস। যখন রক্তে চিনির মাত্রা অত্যধিক বেড়ে যায়, তখন এই জটিলতা তৈরি হতে পারে। সাধারণত টাইপ ডায়াবেটিসে এই জটিলতা সবচেয়ে বেশি হয়। কিন্তু টাইপ ডায়াবেটিসেও ক্ষেত্রবিশেষে এমন জটিলতা তৈরি হতে পারে।

এমনটি হলে রোগীর তৃষ্ণা বেড়ে যায়। মূত্র নিঃসরণ অনেক বৃদ্ধি পায়। পায়ে চাবানোকামড়ানো ব্যথা, পেটে ব্যথা, অরুচি, বমি, প্রচণ্ড ক্লান্তি, ঝাপসা দৃষ্টি এসে ভর করে। পানিশূন্যতা সৃষ্টি হয়, রোগীর রক্তচাপ কমে যায়, তাপমাত্রা কমে যায়, হাতপা ঠান্ডা হয়ে আসে, শ্বাসকষ্ট শুরু হয়। রোগীর শরীরে লবণ কমে যায়। হৃদস্পন্দন বেড়ে যায়। কথাবার্তা হয়ে পড়ে অসংলগ্ন। এক সময় রোগী অজ্ঞান হয়ে যেতে পারে। বয়স্কদের রোগে মৃত্যুহার ৫০ শতাংশ।

ইনসুলিনের পরিমাণ কমে গেলে রক্তে চিনির মাত্রা অনেক বেড়ে যায়। ফলে দেহকোষে চিনি প্রবেশ করতে পারে না। তখন দেহকোষের জ্বালানি চাহিদা পূরণ করার জন্য দেহের চর্বি এবং আমিষ ভাঙতে শুরু করে। তৈরি হয় কিটো এসিড। দেহের জন্য এই এসিডীয় বা অম্লীয় পরিবেশ মোটেও সুখকর নয়। দীর্ঘদিনের অনিয়ন্ত্রিত ডায়াবেটিস এমন পরিস্থিতি সৃষ্টি করতে পারে। যে কোনো ধরনের ইনফেকশন, শল্যচিকিৎসা, শারীরিক মানসিক অভিঘাত, গর্ভাবস্থায় এমন জটিলতা সৃষ্টির পেছনে ঝুঁকি হিসেবে কাজ করে।

রোগীর ডায়াবেটিস অনেক বেড়ে গেলে এবং উপরোক্ত লক্ষণগুলো প্রকাশ পেলে তাৎক্ষণিকভাবে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া দরকার। দেহে গ্লুকোজ এবং অম্লের আধিক্যের পাশাপাশি প্রস্রাব কিংবা রক্তে কিটোন বডির উপস্থিতি থাকলে নিশ্চিতভাবে প্রমাণ হবে, রোগী ডায়াবেটিক কিটো অ্যাসিডোসিসে আক্রান্ত।

এটি প্রতিরোধের জন্য অবশ্যই ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে। যাপিত জীবনে শৃঙ্খলা আনা, ওষুধ সেবন এবং নিয়মিত গ্লুকোজ পরখ করে ডায়াবেটিস বাগে রাখতে হবে। ঝুঁকিপূর্ণ সময়ে ডায়াবেটিস যাতে নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে না যায় সেদিকে নজর রাখতে হবে। এটি হচ্ছে একটি মেডিকেল ইমার্জেন্সি। এমনটি হলে নিবিড় তত্ত্বাবধান কেন্দে্র রোগীর চিকিৎসা নেওয়া প্রয়োজন।

রোগীর পানিশূন্যতা দূর করার পাশাপাশি পটাশিয়াম জাতীয় লবণশূন্যতা দূর করার জন্য তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নিতে হবে। শিরাপথে ইনসুলিন দিতে হবে। রোগীর ইনফেকশন দূর করার জন্য প্রয়োজনীয় অ্যান্টিবায়োটিকের দ্বারস্থ হতে হবে। 

গর্ভকালীন ডায়াবেটিক

গর্ভকালীন ডায়াবেটিস অন্তঃসত্ত্বা মা তাঁর অনাগত সন্তানের জীবনের ওপর বিশাল বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে। অনাকাক্সিক্ষত গর্ভপাত, গর্ভস্থ শিশুর মৃত্যু, একলামশিয়া, গর্ভাশয়ে পানির পরিমাণ বৃদ্ধির পাশাপাশি সিজারিয়ান অপারেশনের হার বৃদ্ধির পেছনে ডায়াবেটিসের বিরাট ভূমিকা রয়েছে। এর পাশাপাশি গর্ভস্থ শিশুর ওজন বৃদ্ধি, হৃৎপিণ্ড কিডনির জন্মগত ত্রুটি, জন্মের পর শ্বাসকষ্ট, নবজাতকের হাইপোগ্লাইসেমিয়া, খিঁচুনি, জন্ডিস, রক্তে ক্যালসিয়ামের মাত্রা কমে যাওয়া, লোহিত রক্তকণিকা বেড়ে যাওয়ার মতো মারাত্মক জটিলতার জন্ম দিতে পারে মায়ের ডায়াবেটিস। 

চিনির মাত্রা নিয়ন্ত্রণ: সন্তান নেওয়ার পরিকল্পনা থাকলে গর্ভধারণের তিন মাস আগে থেকেই রক্তে চিনির মাত্রা নিয়ন্ত্রণের প্রস্তুতি নিতে হবে। ডায়াবেটিসের জন্য যারা ইনসুলিন নিচ্ছিলেন, তাদের ইনসুলিনের ধরন বদলে ফেলতে হবে গ্লুকোজের মাত্রা নিয়ন্ত্রণের জন্য। 

চোখের সমস্যা: গর্ভধারণের পর ডায়াবেটিস রোগীদের চোখের সমস্যা বেড়ে যেতে পারে। কারণে গর্ভধারণের আগে অবশ্যই ডায়াবেটিস রোগীরা তাদের চোখ পরীক্ষা করিয়ে নেবেন। চোখে জটিলতা বেশি থাকলে গর্ভধারণ করা অনুচিত। রেটিনোপ্যাথি থাকলে গর্ভধারণের পর অন্তত তিনটি পর্যায়ে চক্ষু বিশেষজ্ঞের শরণাপন্ন হতে হবে চোখের জটিলতা পরখ করার জন্য। ছাড়া সন্তান প্রসবের তিন মাস পর চোখের পরীক্ষা করিয়ে নিতে হবে রেটিনার অবস্থা জানার জন্য।

কিডনি সমস্যা: গর্ভকালীন সময় ডায়াবেটিস রোগীর কিডনি জটিলতা বেড়ে যেতে পারে। ডায়াবেটিস রোগীর মূত্রের সঙ্গে অতিরিক্ত এলবুমিন বা আমিষ বেরিয়ে যেতে পারে। ছাড়া তাদের কিডনি পরিস্রাবণ ক্ষমতা কমে যেতে পারে। সে কারণে কিডনির অবস্থা পরীক্ষা করে নিতে হবে।

আনুষঙ্গিক রোগ নিয়ন্ত্রণ: ডায়াবেটিস রোগীর অনেকেরই উচ্চ রক্তচাপের সমস্যা থাকে। গর্ভধারণের আগে রক্তচাপ অবশ্যই নিয়ন্ত্রণের মাঝে রাখতে হবে। এই হরমোনের ঘাটতি মা শিশুর ওপর মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব তৈরি করে। সে জন্য থাইরয়েড হরমোন পরীক্ষা করা এবং প্রয়োজনীয় চিকিৎসা নেওয়া জরুরি।

পরামর্শের জন্য যোগাযোগঃ মেডেক্স ডায়াগনস্টিক এন্ড ট্রিটমেন্ট সেন্টার৭১৮২৭৫৮৯০০

Related Posts