যা দেখেছি যা বুঝেছি—২৫ || মনিরুল ইসলাম

হত্যালীলা

আত্মহননের কারণ কী?

ক্স মানসিক বিপর্যয়: চিন্তাচ্ছন্ন হয়ে জীবনের অর্থ খঁুজে না পেয়ে বিষণ্ণতা থেকে বের হতে পারে না।  

ক্স স্বজনের বিয়োগশোক: তাকে ছাড়া সব অর্থহীন বিস্বাদ বিষম ঠেকে, তার কাছে চলে যেতে চায়।

ক্স তাৎক্ষণিক প্রভাব: কোনো নেতিবাচক ঘটনার আকস্মিক তীব্র প্রভাবে যদি মন ভারাক্রান্ত হয়ে পড়ে।

ক্স দৈহিক অসুস্থতা: দুরারোগ্য কষ্টকর রোগযন্ত্রণা যখন মানসিক স্বাস্থ্য ভেঙে দেয়।

ক্স আসক্তি: মদ মাদকের অত্যধিক সেবনে যখন হিতাহিত জ্ঞান লুপ্ত করে দেয়।

ক্স কর্মক্ষেত্রের সমস্যা: যদি অনাকাঙ্খিত দীর্ঘস্থায়ী প্রকট দুরতিক্রম্য হয়।

ক্স প্রতিকূলতা: যদি আর্থিক সামাজিক অবস্থা প্রাত্যহিক জীবনকে দুর্বহ বিষাক্ত করে তোলে।

ক্স পরিবেশ: পরিবার সমাজ যদি অন্যায্য অসম্মানজনক অবমাননাকর বৈষম্যমূলক হয়।

ক্স প্ররোচণা: যখন আগুনে ঘৃতাহুতি বা কাটা ঘায়ে নুনের ছিটা পড়ে।

ক্স ধাক্কাখেঁাটা: গঞ্জনাঅপবাদে অভিমান যদি অসহনীয় অপ্রতিরোধ্য হয়।

ক্স স্বজনবঞ্চনা: প্রাপ্য আস্থা দাবি ভালবাসা নির্ভরতা থেকে বঞ্চিত হলে ভাবে, মরে যাওয়াই শ্রেয়।

ক্স মনস্তাপ: মনের ক্ষোভ কাউকে বলতে না পারলে বাড়তে বাড়তে বিস্ফোরিত হয়।

ক্স স্বপ্রণোদিত সমস্যা: রাগ অপরাধবোধের অবসান ঘটাতে চায়।

ক্স স্বেচ্ছামৃত্যু: ঈপ্সিত অবস্থায় ফিরে যাবার পথ রুদ্ধ হলে জেনেবুঝে অন্যের সাহায্যে মরা।

প্রতিরোধ 

দেহের রোগ পরীক্ষা করে ঔষধ দেয়া সহজ কিন্তু মনের রোগ খুঁজে বের করা কঠিন, চিকিৎসা আরও কঠিন। তবু কাউন্সেলিং কেন্দ্রে প্রশিক্ষিত মনোচিকিৎসক মানসিকভাবে বিপন্ন মানুষকে ধীরে ধীরে সুস্থসবল করে তুলতে পারে। পরিবারে হৃদয়বান ধৈর্যশীল প্রিয়জনদের নিবিড় ভালবাসা মনের ক্ষত শুকিয়ে আনে। মানসিক একাকিত্বে দরকার অন্তরঙ্গ হয়ে মুখোমুখি বসা, চাপাপড়া হৃদয়ের ভার শেয়ার করা। সংসারী মানুষ তার প্রতিদিনকার জীবনে মনের গহিনে যে অফুরন্ত কামনাবাসনা স্নেহপ্রেম সুখদুঃখ একা বয়ে নিয়ে জীবনের পথ চলতে পারে না। উপচেপড়া আবেগগুলি অর্পণের জন্য তার দরকার একটি স্বচ্ছ শূন্যপাত্র, অর্থাৎ একজন অন্তরঙ্গ বন্ধু। তাই একাকিত্ব, সুযোগ, দুঃখভার ইত্যাদির মধ্যে কাউকে বেশিদিন থাকতে/দিতে নেই। মানুষকে শৃঙ্খলিত করোÑদয়ায় মায়ায়, স্নেহ ভালবাসায়, সঙ্গেরঙ্গে, দায়ে কর্তব্যে, লোভ লালসায়, মুগ্ধে মোহে।

আত্মহত্যাপ্রবণ ব্যক্তিকে নিম্নোক্ত উপদেশ দেয়া যায়:

ক্স মরার আগে মরো নাÑপুরোজীবনের স্বরূপ দেখো। সূর্যাস্তের মতো দেখো জীবনের শেষসীমা কোথায়।  

ক্স এখনও অনেক বাকি। জীবনের এক ক্ষুদ্র খণ্ডিত ক্ষণিকের চেহারা দেখে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিয়ো না। 

ক্স ধর্ম দর্শনের আশ্রয় নাও, বৃহত্তর জীবনের স্বরূপ দেখো। 

ক্স দৃষ্টি উন্মুক্ত প্রসারিত করো, নূতন পথের উপায় বের করো। 

ক্স নতুন সঙ্গী খেঁাজো, নতুন উদ্দেশ্য নতুন ঠিকানা বের করো।

ক্স মরলে তো শেষ! সময় নাও, আকস্মিক নয়Ñধীরে বহো।

ক্স মরে যাববললেও মরো না, ভীতু মরণকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখাও, পরাজিত করো।

ক্স মৃত্যুর নয়, বেঁচে থাকার বিকল্প পথ খেঁাজো। 

ক্স পৃথিবীতে আসার কারণ খেঁাজো, একটা নয়Ñবহুবিধ বহুমুখী। 

ক্স ঈশ^ বা নিয়তির খেলা পর্যবেক্ষণ করো, পৃথিবী সংসারের বিচিত্র রূপ দেখো। 

ক্স তুমি মরলে কারো কিছু আসে যায় নাÑতুমিই ঠকলে, নিজেকে নিজে পরাজিত করলে।

ক্স তুমি চলে গলে তোমার শত্রুর লাভ হবে, নিজের স্বজনের ক্ষতি হবে। 

ক্স যার সাথে রাগঅভিমান, নিজে মরে তোমার অবর্তমানে তাকে শাস্তি দিয়ে তোমার কী লাভ

ক্স তুমি অপসৃত হলেও তোমার শূন্যতার ক্ষত রয়ে যায় গভীরে সুদীর্ঘদিন। 

ক্স তোমার রাগের প্রতিকার নেই? অন্যের অন্যায় অপরাধের জন্য নিজে ফেঁসে মরে যাও কেন?

ক্স সুস্থদেহ সুস্থমন নিয়ে দীর্ঘজীবন লাভের প্রত্যাশা করো।

আমরাবিশ্ব মানবজন্ম দিবসপালন করি না, অথচ ১০ সেপ্টেম্বর বিশ^ আত্মহত্যা প্রতিরোধ দিবসের কথাটা শুনেই মনটা ভারি হয়ে গেল। উন্নতদেশে পুরুষ মধ্যবয়সী এবং অনুন্নতদেশে নারী অল্পবয়সীরা বেশি সংখ্যায় আত্মহত্যা করে। পৃথিবীতে মানবমৃত্যুর শীর্ষ দশম কারণ হল আত্মহনন। প্রতিবছর সাধারণভাবে একলক্ষ লোকের মধ্যে দশজন আত্মহত্যায় মারা যায়। প্রতি ১০৪০টা প্রয়াসের মধ্যে একটা সফল হয়। সুইসাইড নোট রেখে যায় অর্ধেক। এই প্রবণতা বেশি আছে দক্ষিণ কোরিয়া, ভারত, চায়না, যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা।

হোমিসাইড বা সুইসাইড, কোথাও কোনো কৃতিত্ব নেই, দুষ্কৃতি ছাড়া। পৃথিবীতে এমন কিছু নেই যার জন্য আমি মরতে পারি। সংসারে এমন কোনো অন্যায় নেই, এমন কোনো দুঃখ নেই, এমন কোনো লজ্জাঅপমানব্যর্থতা নেইÑযার জন্য আমাকে মরতে হবে। পৃথিবীর কোনো অপরাধই মৃত্যুঘটানোর সমান নয়, অন্তত যদিনা তা আরেকটি মৃত্যু ঘটায়। কোনো পাপই মৃত্যুর সমান নয়, কোনো ভুলই মৃত্যুর সমান নয়। সবচেয়ে বড় ভুল হল জীবন সংগ্রামের কাছে আত্মসমর্পণ করা, হার মেনে বসে যাওয়া, জীবনপথ থেকে সরে দাঁড়ানো, জীবনকেবাইবলা।

পৃথিবী অসুন্দর নয়, নিষ্ঠুরও নয়Ñবরং মানুষই নিষ্ঠুর। মানুষ আত্মহত্যা করে প্রকৃতির অত্যাচার নির্যাতনে নয়, নির্মম মানুষের অপমান অবহেলা অবজ্ঞার কারণে। উপরে ওঠার জন্য মানুষ প্রকাশ্যেগোপনে সার্বক্ষণিক যুদ্ধ করে, অন্যকে কষ্ট দেয় নানাভাবে। তবু মনে রেখোÑবাঁচার পথ একটা নয়, অসংখ্য। ব্যর্থপ্রেম অর্থনাশ সম্মানহানি অভিমান অপমান যা হোক, কোনো কারণের জন্যই মরে যেয়ো না, অনাগত জীবনকে নিয়ে বেঁচে থাকার অনেক কারণ আছে তোমার। যে ঘৃণা অবহেলা করল তাকে বড় করে দেখে তুমি মরে যাচ্ছ কিন্তু যে তোমাকে তারচেয়ে বেশি ভালবাসে বা বাসবে তাকে ভুলে গেলে। 

x

বেঁচে থাকারকারণবেঁচে থাকা নয়, বেঁচে থাকার কারণজীবনকী জিনিস, তা পর্যবেক্ষণ করাÑনিজের, অন্যের, সকল প্রাণীর। একটিজীবনশুধু একবার, একমাত্র, প্রথম, শেষ, অফেরতযোগ্য, ওয়ানওয়ে জার্নি। উত্থানপতনে ধৈর্য ধরে পথের শেষ প্রান্ত পর্যন্ত দেখে যাও পথটা কত ভাল এবং কত মন্দ হতে পারে। জীবন এরকমই, যখন যেরূপ আছো। যখন সুখেআনন্দে থাকবে, ভাববে জীবন এরকমই। যখন দুঃখেশোকে ভাসবে, ভাববে জীবন এরকমই। সুতরাং কোনো অবস্থাতেই উদ্বেলিত বিচলিত হয়ে জীবনের পথ চলা বন্ধ করবে না। এটা নিশ্চিত যে এই জীবন দ্বিতীয়বার আর কখনো কিছুতেই ফিরে পাবে না, সকল প্রতিকূলতায় একে তাই ধরে রাখো। জীবনের চেয়ে বড় কোনোকিছু হতে পারে নাÑঅবিচার বঞ্চনা গঞ্জনা যন্ত্রণাÑসবই জীবনের চেয়ে ক্ষুদ্র। বিপদ শঙ্কা যত ভয়াবহ হোক, সব পথ রুদ্ধ হয়ে যাক, তবু কিছুতেই মরে যেয়ো না, যেভাবেই হোক অন্তত প্রাণ বাঁচিয়ে রাখো। বেঁচে থেকে এগিয়ে যাও। 

জীবন যেহেতু এরকম বৈচিত্র্যপূর্ণ, যতই দুঃখবঞ্চনা আসুক আমি মুচড়ে যাব কিন্তু ভাঙব না, প্রাণটা বাঁচিয়ে রেখে দেখব আগামীতে কী ঘটে আমার জীবনে। তাহলে বেঁচে থেকে আমি কী করব? কিচ্ছু করারও দরকার নেই, শুধু দেখো অন্যেরা কী করে। এইনাকরে’ ‘দেখা জীবনের একটা বড়কাজ।বেঁচে থাকলে সব হবে’Ñএকথার মানে হল ধৈর্য ধরো, টিকে থাকো, কোনোদিন হয়ত তোমার মরে যাবার কারণ দূরীভূত হতে পারে। না হলেও অন্তত দেখতে পাবে জীবন কত কষ্টের বা সুখের বা বৈচিত্র্যের হতে পারে। জীবনে যে কিছু পাওনি সেটা দেখে বুঝে যাওয়াও একধরনের পাওয়া। বেঁচে থাকার বাসনায় দোষ নেই, কাপুরুষতা নেই বরং মরে যাবার ইচ্ছায় বোকামী আছে, অধৈর্যতা আছে। 

পৃথিবীকে সংসারকে বোঝার আগেই মৃত্যুকে বুঝতে যেয়ো নাÑআর সবকিছু এতবেশি বোঝারও দরকার নেই। মরণে কিচ্ছু নেই, জীবনেই সবকিছু। স্বর্গনরক ঈশ^রের কল্পনাও জীবনেই, মরণে নয়। মরণে সর্বস্ব খোয়ানো ছাড়া তোমার কোনো লাভ নেই। তুমি মরে গেলেও অন্য সকলের জীবন তাদের আপন গতিতে সব সুখদুঃখ নিয়ে চলতে থাকবে। স্বজনরা মনে করবে কয়েক বৎসর আগে কিছু একটা দুর্ঘটনা ঘটেছিল, সময়ের সাথে সব ঠিক হয়ে গেছে, সব দুঃখকষ্ট ভুলেবিজনেস অ্যাজ ইউজুয়েল’, সংসার যথারীতি। পৃথিবীতে কারো কিছু আসে যায় না একজনের চলে যাওয়ায়, কেউ কারো কথা মনে রেখে তার জন্য বসে থাকবে না। তুমি মরে গেলেও জীবন তার আপন বেগে সব সুখদুঃখ নিয়ে চলতে থাকবে। সে শুধু বঞ্চিত হল এমন সুন্দর পৃথিবীর সুন্দর জীবন থেকে। যে কারণে সে প্রাণ দিল, সে কারণও এগিয়ে যাবে সানন্দে।

এই যুদ্ধ একদিন থেমে যাবে, উড়ন্ত ধূলিবালি মাটিতে পড়ে যাবে, অন্তরের সব আগুন নিভে আসবে। দণ্ডভোগ শেষ হবে, অঁাধার শেষে আলো আসবে। সময় যেতে দাও। জীবনের নূতন একটা পথ খুলে যাবে, নূতন একটা অধ্যায় চলে আসবে। শুধু আজ বা আগামীকালের জন্য দুশ্চিন্তা করো না, আগামী বছর আগামী দশকের কথা ভাবো। পৃথিবীর বহু মানুষ রাস্তায় কাগজ কুড়ায় বা বাদাম বেঁচেÑপরে সে একদিন দেশের প্রেসিডেন্ট হয়। তুমি প্রেসিডেন্ট হলে না, সুন্দর একটি জীবন তো পেতে পারো?

কেউ যখন থাকে না পাশে, তখন প্রকৃতির কাছে যাও, দেখো কত সংগ্রাম করে প্রত্যেকটি প্রাণী নিজেকে বাঁচিয়ে রাখে। হে ক্ষুব্ধ মানুষ, কতটুকু আর দেখেছ বিচিত্ররূপিনী জগতের লীলা। যতই দুর্বহ হোক, বর্তমান নিয়ে ভবিষ্যতের জন্য বেঁচে থাকো, বেঁচে থাকলে জীবনের পরবর্তী ধাপে কী আছে তা জানতে পারবে। অনন্তে তো যাবই, সেখানেই তো থাকব অনন্তকাল, তার আগে পৃথিবীটাকে যতটুকু পারি দেখে যাই বেশি। আমি চাইলেইও পৃথিবীতে দ্বিতীয়বারএই আমিহয়ে ফেরত আসতে পারব না, চাইলেও জীবনপরিধি বাড়াতে পারব না। আহা, মানুষ রে, এমনমানবজীবনআর পাবে না, কখনও না, কোথাও নাÑদুনিয়াতে না, পরকালে না। উপভোগ করতে না চাও বা নাপারো, অন্তত পুরো মানবজীবনের রূপ দেখে যাও। এই সীমাবদ্ধ ক্ষুদ্র জীবনটাকে কেটে ছোট করো না।



Related Posts