গানের ভেলায় স্মৃতির খেয়ায়— তেইশ সুরের ছন্দ—স্পন্দনে তবলার জাদুকর রাধাকান্ত নন্দী
ড. জীবন বিশ্বাসঃ একটি গানের অবয়ব তৈরি হয় সুর ও বাণীতে, কিন্তু তার ভেতরে জীবনবায়ু ফুঁকে দেয় যে অলৌকিক স্পন্দন, তা হলো ছন্দ। মঞ্চের তীব্র আলো যখন কেবল মূল গায়কের মুখমন্ডলে এসে পড়ে, তখন পেছনে অথবা পাশে বসে থাকা মানুষটি নিঃশব্দে সুরের তাপমাত্রা ও লয় মেপে নেন। চামড়ায় মোড়ানো কাঠের দুটি খোলসে আঙুলের আলতো ছোঁয়া দিয়ে যে সাধক বাংলা গানের হৃদস্পন্দন তৈরি করেছিলেন, তিনি কেবল তালরক্ষক ছিলেন না, তিনি ছিলেন শব্দের ভেতরের নীরবতার দীক্ষিত অনুবাদক রাধাকান্ত নন্দী। গান শুরু হওয়ার ঠিক আগের মুহূর্তটিতে, যখন গায়ক বুক ভরে নিঃশ্বাস নিয়ে সুরের জগতে প্রবেশ করতে যাচ্ছেন, তখন তালযন্ত্রের তবলা ও বায়ার গম্ভীর অনুরণনে যে মায়াবী আবহ তৈরি হয়, তা শ্রোতাকে অচেনা এক ভাবলোকে নিয়ে যায়। রাধাকান্ত নন্দীর নাম বাংলা গানের ইতিহাসে কোনো সাধারণ বাদ্যযন্ত্রীর তালিকায় আবদ্ধ নয়, তিনি ছিলেন কণ্ঠ ও তালের মাঝখানে বিরাজ করা এক বিস্ময়কর সাঙ্গীতিক সাঁকো, যিনি আঙুলের নিখুঁত জাদুতে স্বরকে করে তুলেছিলেন অধিকতর নাটকীয়, প্রাণবন্ত, অর্থবহ ও গতিময়।
জন্মবৃত্তান্ত, পরিবার ও প্রয়াণ
১৯২৮ সালের ২৩ মে ব্রিটিশ ভারতের বরিশালের বানারীপাড়ায় (বর্তমান বাংলাদেশ) জন্ম নেওয়া এই বিরল তাল—সাধকের পিতৃদত্ত ও পারিবারিক পরিবেশটিই ছিল সুর—লয়ের আদি পাঠশালা। পিতা রোহিণীকান্ত নন্দী ছিলেন সে সময়কার নামজাদা তবলিয়া ও লয়দার শিল্পী, আর পিতামহ কালীচরণ নন্দী ছিলেন প্রখ্যাত বৈষ্ণব কীর্তনীয়া। মাত্র ছয় বছর বয়সে জ্যেষ্ঠদের সঙ্গে নগরকীর্তনে খোল বাজিয়ে যাঁর শিশুজীবনের সুরযাত্রা শুরু হয়েছিল, পরবর্তীতে কলকাতায় এসে তিনি মহামহিম আনোখিলাল মিশ্র এবং পন্ডিত জ্ঞানপ্রকাশ ঘোষের মতো দিকপালদের কাছে তালিম নিয়ে তবলা ও পাখোয়াজের দুরূহ ও সূক্ষ¥তম সংগতে পারদর্শিতা অর্জন করেন। দীর্ঘকাল ধরে হাজারো কালজয়ী গানের অন্তরালে স্পন্দিত হওয়া এবং বাংলা সুরের জগতকে এক অনন্য উচ্চতায় পৌঁছে দেওয়ার পর ১৯৮৪ সালের ৩০ নভেম্বর মাত্র ৫৬ বছর বয়সে কলকাতায় এই গুণী শিল্পীর জীবনাবসান ঘটে। এই প্রয়াণ ও সূচনার মধ্যবর্তী সময়টুকু মূলত তাঁর চৌকষ দুটি হাত চামড়ায় মোড়ানো তালযন্ত্রের মাধ্যমে অগণিত সুরের কণ্ঠকে অমরত্বের দুয়ারে পৌঁছে দিয়েছে অকাতরে।
সংগতের নন্দনতত্ত্ব ও তবলার ভাষায় গান
সংগীতের পরিভাষায় ‘সংগত’ কথাটির একটি গভীর নন্দনতাত্ত্বিক অর্থ রয়েছে। সংগত মানে কেবল গায়কের পাশে বসে ছন্দের হিসাব মেলানো বা তাল মেপে যাওয়া নয়, সংগত হলো প্রধান শিল্পীর নিঃশ্বাস, আবেগের ওঠানামা এবং বাণীর সূক্ষ¥তম মায়াকে নিজের আঙুলে অনুভব করা। একজন খাঁটি সংগতিয়া জানেন কোথায় তবলার বোল সোচ্চার হবে, আর কোথায় নীরব থেকে সুরের বিস্তারকে পথ ছেড়ে দিতে হবে। রাধাকান্ত নন্দী ছিলেন এই সাঙ্গীতিক পরিমিতিবোধের এক প্রাজ্ঞ শিক্ষক। তবলার রেলা, চাট্টি কিংবা গাবায় তাঁর আঙুলের আঘাত ছিল অত্যন্ত স্পষ্ট, অথচ তা কখনোই গায়কের কণ্ঠকে ছাপিয়ে আত্মজাহির করত না। কিংবদন্তি কণ্ঠশিল্পী সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায় তাঁর সম্পর্কে এক চিরস্মরণীয় মন্তব্য করেছিলেন—‘রাধাকান্ত নন্দী তবলা বাজাতেন না, তবলায় গান গাইতেন’। অর্থাৎ সুর, বাণী, রাগের মেজাজ এবং গায়কের কণ্ঠের অন্তর্নিহিত বেদনাকে তিনি তবলার চামড়ায় নিখুঁতভাবে অনুবাদ করতে পারতেন।
মান্না দে—র অনন্য সহায় ও ‘ন্যাচারাল জিনিয়াস’
বাংলা আধুনিক ও রাগাশ্রয়ী গানের রাজকুমার মান্না দে—র সুরযাত্রায় রাধাকান্ত নন্দীর ভূমিকা ছিল এক অবিচ্ছেদ্য অধ্যায়। মান্না দে স্পষ্ট ভাষায় স্বীকার করেছিলেন যে, তাঁর গায়কির দুই প্রধান স্তম্ভ হলেন গীতিকার পুলক বন্দ্যোপাধ্যায় এবং তবলাবাদক রাধাকান্ত নন্দী। লয় ও রাগের ব্যাপারে চরম সুশৃঙ্খল মান্না দে তাঁকে ডাকতেন ‘ন্যাচারাল জিনিয়াস’ বা প্রকৃতিনির্দিষ্ট প্রতিভা বলে। ‘কে তুমি তন্দ্রাহরণী’ কিংবা ‘আমি যামিনী তুমি শশী হে’—র মতো গানের সুরবিন্যাস বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, সেখানে তবলা কেবল তাল রক্ষা করেনি; বরং গায়কের বাণীর মেজাজ, দ্রুত নাটকীয় মোড় এবং সুরের রূপরেখাকে এক সমান্তরাল কণ্ঠ হিসেবে অনুসরণ করেছে। গায়ক যখন সুরের শীর্ষে গিয়ে মীড় টানতেন, রাধাকান্তের বায়া তখন ঠিক ততখানিই গভীরতা নিয়ে ঘরের আবহ বদলে দিত।
শিল্পীর আত্মমর্যাদা ও অনমনীয় অবস্থান
যন্ত্রশিল্পীদের পেশাগত মর্যাদা ও আত্মসম্মান রক্ষায় রাধাকান্ত নন্দীর নাম এক প্রদীপ্ত উদাহরণ। আড়ালে বসে বাজানো শিল্পীকে সে যুগে প্রায়শই যথাযথ গুরুত্ব দেওয়া হতো না। কিন্তু নিজের শিল্পের মর্যাদা রক্ষায় তিনি ছিলেন আপসহীন। ‘সন্ন্যাসী রাজা’ চলচ্চিত্রের একটি হাস্যরসাত্মক গানের দৃশ্যে গীতিকার গৌরীপ্রসন্ন মজুমদার প্রথমে লিখেছিলেন—‘রাধাকান্ত তুমি দেখছি আসরটাকে করবে মাটি’। কিন্তু তিনি স্পষ্ট জানিয়ে দেন যে, তিনি আসর মাটি করার মতো অনভিজ্ঞ বাজিয়ে নন, নিজের নাম নিয়ে এমন ঠাট্টা তিনি কোনো অবস্থাতেই মেনে নেবেন না। শিল্পীর তীব্র আপত্তির মুখে পরবর্তীতে গানটিতে ‘রাধাকান্ত’ শব্দটি বদলে ‘শশীকান্ত’ করা হয়। এই ঘটনাটি প্রমাণ করে যে, একজন সংগতিয়া কেবল মূল গায়কের সহায়ক নন, তিনি নিজের জায়গায় একজন সার্বভৌম শিল্পী এবং আত্মমর্যাদার পরম প্রতীক।
বহুস্বরের সংগত ও সুরের নিভৃত সাধনা
নজরুলগীতি, রাগপ্রধান কিংবা বৈষ্ণব কীর্তনের প্রসারেও তাঁর ভূমিকা ছিল চিরস্মরণীয়। মানবেন্দ্র মুখোপাধ্যায়, ধনঞ্জয় ভট্টাচার্য, শ্যামল মিত্র কিংবা রামকুমার চট্টোপাধ্যায়ের মতো স্বতন্ত্র গায়কির শিল্পীদের আসরে তাঁর উপস্থিতি ছিল আভিজাত্যের প্রতীক। নজরুলের গানের চঞ্চল দাদরা, কাহারবার মেদুর ঘূর্ণি, কিংবা একতালের স্থির গাম্ভীর্যকে তিনি নিজের তবলার বোলে এমন এক অলৌকিক দোল দিতেন, যা সাধারণ শ্রোতাকেও মুগ্ধ করত। তিনি কেবল বড়মাপের তারকাদের সঙ্গেই বাজাননি, উদীয়মান ও অচেনা নবীন শিল্পীদের পাশে বসেও তাঁদের উৎসাহ জোগাতেন। হারমোনিয়াম বাজাতে এবং গাইতে সক্ষম এই গুণী মানুষটি একবার নিজের রচনায় লিখেছিলেন—‘তবলা আমায় বাজায়, তাই তো আমি বাজি’। এই একটিমাত্র বাক্যের ভেতরেই প্রকাশ পায় কোনো সাধক যখন নিজের যন্ত্রের সাথে একাত্ম হয়ে যান, তখন যন্ত্র আর মানুষ আলাদা থাকে না।
রাধাকান্ত নন্দীর সংগত করা কয়েকটি বিখ্যাত গান
১। কে তুমি তন্দ্রাহরণী (মান্না দে), ২। আমি যামিনী তুমি শশী হে (মান্না দে), ৩। কাহারবা নয় দাদরা বাজাও (মান্না দে), ৪। আমি যে জলসাঘরে (মান্না দে), ৫। ওগো বর্ষা তুমি ঝরো না গো (মান্না দে), ৬। যদি কাগজে লেখো নাম (মান্না দে), ৭। সুন্দরী গো দোহাই তোমার (মান্না দে), ৮। এ কী অপূর্ব প্রেম দিলে (মান্না দে), ৯। খুব জানতে ইচ্ছে করে (মান্না দে), ১০। দীপ ছিল শিখা ছিল (মান্না দে), ১১। আমার ভালোবাসার রাজপ্রাসাদে (মান্না দে), ১২। সবাই তো সুখী হতে চায় (মান্না দে), ১৩। এই তো সেদিন তুমি (মান্না দে), ১৪। জড়োয়ার ঝুমকো থেকে (মান্না দে), ১৫। তীর ভাঙা ঢেউ আর নীড় ভাঙা ঝড় (মান্না দে), ১৬। চম্পা চামেলি (মান্না দে ও সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়), ১৭। আমায় চিরদিনের সেই গান বলে দাও (মান্না দে ও সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়), ১৮। মায়াবতী মেঘে এলো তন্দ্রা (সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়), ১৯। এই পথ যদি না শেষ হয় (সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায় ও হেমন্ত মুখোপাধ্যায়), ২০। তুমি না হয় রহিতে কাছে (সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়), ২১। ওগো মোর গীতিময় (সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়), ২২। ভরিয়া পরাণ শুনিতেছি গান (মানবেন্দ্র মুখোপাধ্যায়), ২৩। বাগিচায় বুলবুলি তুই (মানবেন্দ্র মুখোপাধ্যায়), ২৪। অরুণকান্তি কে গো যোগী (মানবেন্দ্র মুখোপাধ্যায়), ২৫। যারে হাত দিয়ে মালা দিতে পারো নাই (মানবেন্দ্র মুখোপাধ্যায়)।
পরিশেষ
একজন তবলা বাদক অনালোকিত বেদীতে বসে নেপথ্যে সুরকে গতি দেন, তাঁর অবদান কেবল মেপে দেওয়া চাটির ধ্বনিতে সীমাবদ্ধ থাকে না। রাধাকান্ত নন্দী বাংলা সংগীতের সেরকমই একজন নেপথ্য কারিগর, যাঁর আঙুলের ছোঁয়া না পেলে অনেক চেনা কালজয়ী গানই হয়তো একই মাধুর্য নিয়ে বেঁচে থাকত না। তিনি কণ্ঠের পেছনে প্রদীপের শিখা হয়ে জ্বলতেন, অথচ সেই শিখার আলোয় আলোকিত হতো পুরো সাঙ্গীতিক আসর। সময় গড়িয়ে যাবে, নতুন প্রযুক্তিতে আরও নানা কৃত্রিম বাদ্যযন্ত্র চলে আসবে, কিন্তু খাঁটি চামড়ার তবলার ওপর তাঁর সেই সংগত আর বোলের অনুরণন বাংলা গানের আত্মায় এক অবিনাশী ঐতিহ্য হয়ে অনন্তকাল অমলিন হয়ে থাকবে।
