লেখকের অংগনে শহীদ কাদরী স্মরণ
নিউইয়র্কঃ প্রবাসে বাংলা ভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতির চর্চাকে আরও সমৃদ্ধ করার লক্ষ্যে লেখকের অঙ্গন—এর ২৮তম গ্রন্থালোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে শনিবার, ১৫ আগস্ট, কুইন্স পাবলিক লাইব্রেরিতে। সাহিত্যপ্রেমী, কবি, লেখক ও পাঠকদের প্রাণবন্ত উপস্থিতিতে এ সাহিত্যসভা অনুষ্ঠিত হয়। এ বারের পর্বটি উৎসর্গ করা হয় বাংলা সাহিত্যের অন্যতম প্রধান কবি শহীদ কাদরীর স্মৃতির উদ্দেশে।
অনুষ্ঠানে শহীদ কাদরীর কবিতা, গদ্য, অনুবাদ, জীবন, নির্বাসন, ব্যক্তিত্ব, স্মৃতি ও সাহিত্য ভাবনাসহ তাঁর সৃষ্টিশীল জীবনের নানা দিক নিয়ে কবি, সাহিত্যিক ও গবেষকরা আলোচনা করেন। আলোচকদের বিশ্লেষণ ও স্মৃতিচারণে শহীদ কাদরীর সাহিত্যিক প্রতিভার পাশাপাশি তাঁর ব্যক্তি জীবনের নানা অজানা বিষয়ও উঠে আসে।
আরিফ মাহমুদ শৈবাল—তাঁর আলোচনায় শহীদ কাদরীর জীবনের কিছু কম আলোচিত ও অন্তরঙ্গ দিক তুলে ধরেন। তিনি কবির ব্যক্তিত্ব, জীবনবোধ ও সাহিত্যচিন্তার নানা অনুষঙ্গের প্রতি আলোকপাত করেন। তাঁর মতে, শহীদ কাদরীকে শুধু তাঁর বিখ্যাত কবিতার মধ্য দিয়ে দেখলে কবির পূর্ণাঙ্গ পরিচয় পাওয়া যায় না। তাঁর জীবন ও সৃষ্টির অন্তরালে থাকা অনুভূতি, নিঃসঙ্গতা ও আত্মজিজ্ঞাসাও কবিকে বোঝার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। তাঁর আলোচনা শহীদ কাদরীর পরিচিত সত্তার আড়ালে থাকা এক গভীর ও সংবেদনশীল কবিকে নতুনভাবে আবিষ্কারের সুযোগ করে দেয়।
কাউসারী মালেক রোজী—তাঁর আলোচনায় শহীদ কাদরীর মননশীলতা ও স্মৃতির নানা অধ্যায় তুলে ধরেন। তিনি ব্যক্তিগত স্মৃতি, কবির চিন্তাভাবনা ও সাহিত্যিক মানসের বিভিন্ন দিক অত্যন্ত আন্তরিকতার সঙ্গে উপস্থাপন করেন। তাঁর বক্তব্যে শহীদ কাদরীর মানবিকতা, রসবোধ ও গভীর জীবনদৃষ্টির নানা চিত্র ফুটে ওঠে। তিনি শহীদ কাদরীর দুটি গদ্যের উপর আলোকপাত করেন।
মোহাম্মদ মহিবুর রহমান—তাঁর আলোচনায় শহীদ কাদরী মূলত কবি হিসেবে বাংলা সাহিত্যে বিশেষভাবে পরিচিত হলেও তাঁর সাহিত্য চর্চার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল অনুবাদ। তিনি কবিতা, গদ্য, উপন্যাস ও নাটক বাংলা ভাষায় অনুবাদ করে পাঠকদের সঙ্গে বিশ্বসাহিত্যের সংযোগ স্থাপন করে গেছেন।
সুরীত বড়ুয়া— শহীদ কাদরীর কবিতায় শব্দচয়ন ও শব্দের নান্দনিক বিন্যাস নিয়ে বিশদ আলোচনা করেন। তিনি দেখান, কবি কীভাবে অত্যন্ত সচেতনভাবে শব্দ নির্বাচন করে কবিতার আবহ, অর্থ ও সৌন্দর্য নির্মাণ করেছেন। তাঁর আলোচনায় শহীদ কাদরীর ভাষার আধুনিকতা, সংযম ও ব্যতিক্রমী প্রকাশভঙ্গির বিভিন্ন দিক উঠে আসে।
আহমাদ মাযহার—তাঁর আলোচনায় শহীদ কাদরীর গদ্যরচনার বিভিন্ন দিক ও বৈশিষ্ট্য তুলে ধরেন। তিনি কবির গদ্যে চিন্তার গভীরতা, ভাষার স্বাতন্ত্র্য এবং জীবনকে দেখার বিশেষ দৃষ্টিভঙ্গির প্রতি আলোকপাত করেন। কবি হিসেবে শহীদ কাদরীর পরিচিতির আড়ালে তাঁর গদ্যসাহিত্যের যে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রয়েছে, তিনি তা বিশেষভাবে তুলে ধরেন। ফলে শ্রোতারা কবির সাহিত্যিক সত্তার একটি অপেক্ষাকৃত কম আলোচিত অধ্যায় সম্পর্কে জানার সুযোগ পান।
এ বি এম সালেহউদ্দিন শহীদ কাদরীর দুর্লভ সাক্ষাৎকার ও কথোপকথনের বিভিন্ন দিক নিয়ে আলোচনা করেন। তিনি সাক্ষাৎকারের মাধ্যমে কবির ব্যক্তিজীবন, সাহিত্যভাবনা ও সমকাল সম্পর্কে তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরেন। এসব সাক্ষাৎকারে কবির যে চিন্তা, অভিজ্ঞতা ও ব্যক্তিত্বের পরিচয় পাওয়া যায়, তিনি তা গুরুত্বের সঙ্গে ব্যাখ্যা করেন। তাঁর আলোচনায় শহীদ কাদরীর এমন কিছু বক্তব্য ও ভাবনা সামনে আসে, যা সাধারণ পাঠকের কাছে তুলনামূলকভাবে অজানা। ফলে দুর্লভ সাক্ষাৎকারগুলো কবির জীবন ও সাহিত্যকে বোঝার মূল্যবান দলিল হিসেবে নতুন গুরুত্ব লাভ করে।
মনিজা রহমান—তাঁর আলোচনায় শহীদ কাদরীর জীবনে নির্বাসনের প্রভাব ও এর বহুমাত্রিক তাৎপর্য তুলে ধরেন। তিনি দেখান, দেশ ও স্বদেশ থেকে দূরে থাকার অভিজ্ঞতা কবির মনোজগৎ ও সৃষ্টিশীলতাকে কীভাবে প্রভাবিত করেছে। নির্বাসনের নিঃসঙ্গতা, স্মৃতি, বিচ্ছিন্নতা ও স্বদেশের প্রতি আকর্ষণ তাঁর আলোচনায় বিশেষভাবে উঠে আসে। কবির সাহিত্যকর্মে এই অভিজ্ঞতার প্রতিফলন কীভাবে ঘটেছে, তিনি তারও ব্যাখ্যা দেন। তাঁর আলোচনা শহীদ কাদরীর কবিসত্তাকে নির্বাসনের অভিজ্ঞতার আলোকে নতুনভাবে অনুধাবনের সুযোগ সৃষ্টি করে।
হাসান ফেরদৌস—তাঁর আলোচনায় শহীদ কাদরীর পরিচিত ও অজানা—উভয় সত্তাকে তুলে ধরার চেষ্টা করেন। তিনি কবির সাহিত্যিক পরিচয়ের পাশাপাশি তাঁর ব্যক্তিত্ব, জীবনযাপন ও চিন্তার বিভিন্ন অনালোচিত দিকের প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। তাঁর বক্তব্যে কখনো পরিচিত কবিকে নতুন আলোয় দেখা যায়, আবার কখনো অচেনা এক শহীদ কাদরীর সন্ধান মেলে। স্মৃতি, সাহিত্য ও ব্যক্তিজীবনের বিভিন্ন প্রসঙ্গ মিলিয়ে তিনি কবির একটি বহুমাত্রিক প্রতিকৃতি তুলে ধরেন। তাঁর আলোচনা শ্রোতাদের মনে শহীদ কাদরী সম্পর্কে নতুন কৌতূহল ও অনুসন্ধিৎসা তৈরি করে।
বদরুন নাহার—তাঁর আলোচনায় শহীদ কাদরীর নিঃসঙ্গতা, নির্জনতা ও অন্তর্জগতের বিভিন্ন দিক তুলে ধরেন। তিনি দেখান, কবির সৃষ্টিশীলতার সঙ্গে নিভৃত জীবন ও একাকিত্বের অনুভূতির একটি গভীর সম্পর্ক ছিল। তাঁর আলোচনায় শহীদ কাদরীর সংবেদনশীল মন, আত্মমগ্নতা ও জীবনবোধের নানা দিক ফুটে ওঠে। নির্জনতার মধ্যেও কীভাবে কবি তাঁর সৃষ্টিশীলতাকে সমৃদ্ধ করেছেন, তিনি সে বিষয়টি বিশেষভাবে ব্যাখ্যা করেন।
অনুষ্ঠানে কবি, সাহিত্যিক, পাঠক ও সাহিত্যপ্রেমীদের পাশাপাশি রানু ফেরদৌস, অভিক সোবহান, রাজিয়া নাজমী, মমতাজ বেগম সুমি, মোশাররফ হোসেন, বেনজির শিকদার, নাসির শিকদারসহ অনেকে উপস্থিত ছিলেন। সবশেষে অনুষ্ঠানের সঞ্চালক নীরা কাদরী উপস্থিত সবাইকে এবং কুইন্স পাবলিক লাইব্রেরির ম্যানেজার শান্তে গেন্সসহ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের আন্তরিক ধন্যবাদ জানান। সংবাদ বিজ্ঞপ্তির।
