মোহাম্মদ হাসান রোকনের চিত্র প্রদর্শনী || ক্যানভাসের আড়ালে অন্তর্লোকের ভাষা
ড. জীবন বিশ্বাসঃ বাংলাদেশী—আমেরিকান চিত্রকর ও মৃৎশিল্পী মোহাম্মদ হাসান রোকনের একক শিল্পপ্রদর্শনী হয়ে গেল ১১ জুলাই থেকে ১৯ জুলাই পর্যন্ত গভর্নর্স আইল্যান্ডের ১৬ নোলান পার্কে। ট্রাস্ট ফর গভর্নর্স আইল্যান্ড রেসিডেন্স কর্মসূচির আওতায় বাংলাদেশী আমেরিকান আর্টিস্ট ফোরাম আয়োজিত এই প্রদর্শনী শনি ও রবিবার দর্শকদের জন্য উন্মুক্ত ছিল। অর্থাৎ সপ্তাহে চারদিন।
কঠোর পরিশ্রমী শিল্পী মোহাম্মদ হাসান রোকন কেবল তুলি আর ক্যানভাসেই নিজেকে সীমাবদ্ধ রাখেননি। সংগঠনটির অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা সদস্য হিসেবে তাঁর দূরদর্শী প্রজ্ঞা, দক্ষ নেতৃত্ব এবং জনমানুষকে শিল্পধারার সাথে যুক্ত করার অবিচল প্রয়াস তাঁকে ভিত্তি দিয়েছে। বাংলাদেশে জন্ম ও বেড়ে ওঠা এবং বর্তমানে কুইন্সে বসবাসকারী শিল্পী রোকন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়ন করেন, পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সিরামিক বিভাগ থেকে স্নাতক সম্পন্ন করেন এবং নিউইয়র্কের আর্ট স্টুডেন্ট লীগে পরীক্ষামূলক মিক্সড—মিডিয়া শিল্পচর্চা করেন। অ্যাক্রিলিক, জলরং ও মিশ্রমাধ্যম তাঁর প্রধান ক্ষেত্র। তাঁর শিল্পপদ্ধতির একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলোÑতিনি আগে থেকে নির্দিষ্ট কোনো চিত্র বা শেষবিন্দু স্থির করে কাজ শুরু করেন না; একটি আঁচড় পরবর্তী আঁচড়ের জন্ম দেয়। তাঁর কাজে আধা—অস্বচ্ছ, ভাঙা রঙের স্তরায়ণ বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ, যেখানে নিচের রঙ আংশিকভাবে দৃশ্যমান থেকে যায়।
শিল্পীর এই পদ্ধতির কারণেই তাঁর চিত্রগুলো যেন কোনো দৃশ্যের সরাসরি প্রতিরূপ নয়, বরং রঙের স্তরের নিচে প্রত্নতাত্ত্বিক অনুসন্ধান। কোনো অবয়ব ফুটে ওঠে, আবার মিলিয়ে যায়; নীল জলকে মনে করায়, অথচ নিছক জলদৃশ্য হয় না; বৃত্ত কখনো দরজা, কখনো চাকা, কখনো সময়ের চিহ্ন বলে মনে হয়। আঁচড়গুলো কখনো মানচিত্র, ক্ষত, শিকড় কিংবা স্মৃতির রেখা হয়ে ওঠে। দর্শককে তিনি বলে দেন না কী দেখতে হবে বরং দেখার সম্ভাবনাকে বারবার খুলে দিয়ে আবার তিনি তা বাধাগ্রস্ত করেন তাদের দৃষ্টি ও চিন্তাশক্তিকে পুনঃ—ব্যবহারের অনুশীলনের মহৎ উদ্দেশে।
প্রদর্শনীর ব্রোশিওরে শিল্পীর ১৬টি স্বতন্ত্র ‘শিরোনামহীন’ শিল্পকর্ম রয়েছে। পাঠক ও দর্শক যাতে সহজে তার কাজগুলো শনাক্ত করতে পারেন, সেভাবে দেয়া হল। এগুলো শিল্পীর দেওয়া শিরোনাম নয়।
৪৮ী৭২ ইঞ্চির ‘ইমের্যাল্ড প্যাসেজ’ বা ‘পান্না পথ’—এ ফিরোজা, কালো, সাদা ও সবুজের ওপর তীক্ষè তির্যক রেখা ছুটে গেছে। কখনো ভাঙা স্থাপত্য, কখনো বৃষ্টিভেজা উদ্ভিদের মতো মনে হয়, যা নির্মাণ ও ক্ষয়ের মধ্যে এক টানাপোড়েন তৈরি করে। ৪৮ী৬০ ইঞ্চির ‘ভায়োলেট স্পাইরাল’ বা ‘বেগুনি আবর্ত’ ধূসর, বেগুনি ও নীলকে এক অস্পষ্ট ঘূর্ণনের দিকে টেনে নিয়ে যায়। তার কেন্দ্র যেন একই সঙ্গে দূরবর্তী এবং আকর্ষণশীলÑঅন্তর্মুখী স্মৃতির মতো।
১২ী১২ ইঞ্চির ‘রেড স্কয়ার মেমোরি’—তে লাল সীমারেখার মধ্যে নীল—সবুজ ক্ষেত্র কোনো ঘর, জানালা বা স্মৃতির কক্ষের ধারণা তৈরি করে। একই মাপের ‘ওখারের প্রতীকস্তম্ভ’—এ হলদে—সোনালি রং, উল্লম্ব আঁচড় ও বৃত্তাকার চিহ্ন যেন মাটি খুঁড়ে পাওয়া কোনো প্রাচীন প্রতীক কিংবা আচার—অনুষঙ্গের স্মৃতি জাগায়।
প্রদর্শনীর অন্যতম শক্তিশালী দৃশ্যচিত্র ৩৬ী৩৬ ইঞ্চির ‘এনশিয়েন্ট পোর্টাল’ বা ‘প্রাচীন দ্বার’। গাঢ় নীল—কালো পটভূমিতে দীপ্ত সোনালি বৃত্তাকার কাঠামোÑএকই সঙ্গে চাকা, দরজা এবং প্রত্নতাত্ত্বিক নকশার মতো। মনে হয় এমন এক ইতিহাসের প্রবেশদ্বার, যার অর্থ দর্শক অনুভব করতে পারে, কিন্তু পুরোপুরি পাঠোদ্ধার করতে পারে না। ‘ক্রোমেটিক গেট’ বা ‘রঙের দ্বার’ গাঢ় কেন্দ্রীয় ক্ষেত্রকে লাল, কমলা ও নীল উল্লম্ব অংশ দিয়ে ঘিরে রেখেছে। আর ‘অরবিট অব ফ্রাগমেন্টস’ বা ‘খণ্ডের কক্ষপথ’—এ দীর্ঘায়িত নীল—কালো অবয়বকে ঘিরে রঙিন গোলাকার অংশগুলো কমলা—লাল পটভূমির ভেতর ঘূর্ণির অনুভূতি তৈরি করে।
দেয়ালে বৃক্ষ—বাকলের চিত্রটি মোহাম্মদ হাসান রোকনের একটি অনন্য কাজ বলে অনেক দর্শক মত প্রকাশ করেছেন। ‘বার্ক ক্যাসকেড’ বা ‘বাকলের ধারা’ নামের কাজটিতে বিস্তৃত এক গাঢ় সারফেসের চারদিকে অনিয়মিত বাদামি, গাছের বাকলের মতো খণ্ড উপরে দেয়াল বেয়ে উঠেছে, নিচে নেমে বেসবোর্ড অতিক্রম করেছে এবং মেঝেতেও ছড়িয়ে পড়েছে। ফলে চিত্রটি আর আয়তাকার ক্যানভাসের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না; দেয়াল ও মেঝেকেও নিজের অংশ করে নেয়। ভরা জোয়ারের স্রোত যেমন নদীর সমস্ত জঞ্জাল গোলাকার ঘূর্ণিস্রোতে নিজের বুকে টেনে নেয়, পার্থিব জীবনও তেমনই ঘূর্ণিপাকে স্বাতন্ত্র্য কিছুটা বিসর্জন দিয়ে চারপাশের সামাজিকতায় মিশে যেতে বাধ্য হয়। ছিন্ন, পরিত্যক্ত কিংবা ঝরে পড়া বস্তু এখানে রচনার উপাদানে পরিণত হয়েছে।
সব কাজ একত্রে দেখলে এই শিল্পীর শিল্পপদ্ধতির শক্তি স্পষ্ট হয়। চিত্রে তাঁর বিমূর্ততার প্রবর্তন বাস্তব অভিজ্ঞতা থেকে মোটেই পালিয়ে যাওয়া নয় বরং সেই অভিজ্ঞতা সম্পর্কে চটজলদি কোনো সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়া থেকে বিরত থাকারই একটি উপায়। তাঁর চিত্র বারবার অবস্থান করে ভূদৃশ্য ও স্মৃতি, বস্তু ও প্রতীক, নিয়ন্ত্রণ ও আকস্মিকতার মাঝামাঝি অঞ্চলে। ক্যানভােসের স্তরায়ণে একটি রঙের ইতিহাসের নিচে আরেকটি ইতিহাস দৃশ্যমান থাকেÑআগের স্তর কখনোই সম্পূর্ণ মুছে যায় না।
তাই চিত্রকর ও মৃৎশিল্পী রোকনের একক প্রদর্শনী কেবল রঙিন বিমূর্ত চিত্রের সমাহার ছিল না। এটি যেন একটি ধারণা সামনে আনেÑসারফেস বা পৃষ্ঠও স্মৃতি ধারণ করতে পারে। একটি রঙের নিচে থাকে আরেক রং; একটি অবয়বের নিচে অন্য সম্ভাবনা; আর অভিবাসী জীবনের বর্তমানের গভীরে পুরনো ভূগোল এখনো নিঃশ্বাস নেয়। রোকন সেই স্মৃতির নির্দিষ্ট অর্থ দর্শককে বলে দেন না বরং আরও কঠিন এবং আরও স্থায়ী একটি সুযোগ দেনÑ আর সে সুযোগটি হচ্ছে ‘নিজের স্মৃতি আবিষ্কার করার সুযোগ’।
