গত উইকএন্ডে কুইন্সের জেক্যালে তিনটি নাটক || নাট্যমেলার প্রথম সন্ধ্যায় রক্তকরবী

বাঙালী প্রতিবেদনঃ নিউইয়র্ক সিটির বাংলাদেশী কম্যুনিটিতে এই সামারে প্রায় প্রতি উইকএন্ডেই চলছে নাটক নাটক বিষয়ক আয়োজন এবং নাট্যোৎসব। এর মধ্যে রয়েছে ঢাকা ড্রামা, কৃষ্টি, বাংলা থিয়েটার শিল্পাংগন। নাট্যোৎসবে একাধিক নাটক গ্রুপের নাটক মঞ্চায়ন হয়েছে। হয়েছে নাটক নিয়ে আলোচনা, মতবিনিময় ওয়ার্কশপ। সবচেয়ে আশার কথা এবছরের এইসব নাট্যায়োজনে বেশ কয়েকটি নতুন উঁচুমানের নাটক মঞ্চায়ন হয়েছে। গত সপ্তাহে শনিবার জেক্যাল (জ্যামাইকা সেন্টার ফর আর্ট এন্ড কালচার) মঞ্চে আয়োজিত হয় বাংলা থিয়েটার নিউইয়র্ক নাটক মানুষ। সম্মানীয় নাট্যজন মামুনুর রশীদের লেখা এই নাটকটির কাহিনী মানসিক হাসপাতাল থেকে পালিয়ে আসা এক তরুণের জীবনের ভাঙচুরের ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে। মানসিক রোগী না হলেও তাকে হাসপাতালে ভর্তি করা হলে সে পালিয়ে আসে। মধ্যরাতে নদী পার হতে গিয়ে দেখা হয় মাঝির সাথে। কথোপকথনে উঠে আসে, সে জীবনের অর্থ সন্ধান করে চলেছে। মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে বিভ্রান্তি তাকে পীড়িত করে। নদী পার হয়ে ঘটনাচক্রে এক বেশ্যাপাড়ায় এসে পড়ে। বেশ্যা সন্ধ্যারাণী, দালাল এবং বেশ্যার কিশোর পুত্রের সাথে কথা বিনিময়ে সন্ধ্যারাণীকে নতুন জীবনের লোভ দেখিয়ে তাকে নিয়ে পালিয়ে যায়। ঢাকায় গিয়ে তারা ওঠে তরুণের ভাইয়ের বাসায়। তার ভাই ঢাকার ভাড়ায় খাটা সন্ত্রাসী। এক সময় সন্ধ্যারাণীর খদ্দের সাবেক দারোগা মমিন খবর পেয়ে সেখানে হাজির হলে ক্রসফায়ারে সন্ধ্যারাণী নিহত হয়।

মামুনুর রশীদ এই নাটকে সমাজের বিভিন্ন স্তরের নিম্নবর্ণের মানুষদের ভেতরের মানুষকে আবিষ্কার করার চেষ্টা করেছেন। তরুণ চরিত্রে মোহাম্মদ কামাল, সন্ধ্যা চরিত্রে শিরীন বকুল, মাঝি চরিত্রে শফিউল আলম, ছোটভাই রীপন শওকত রহমান, বেশ্যার দালাল আফাজ আনোয়ার সেলিম, কিশোরপুত্র লিটন ফিলিপস মমিন চরিত্রে অভিনয় করেন জেফ হোসেন।

সম্পূর্ণ অন্য এক জগতের বিচিত্র চরিত্রের কাছ থেকে অভিনয় আদায় করে নিয়েছেন নির্দেশক শিরীন বকুল। তিনি নিজেও এই রকম একটি টানাপোড়েনের চরিত্রে অভিনয় করেছেন নির্দেশনার পাশাপাশি। তবে মৃত্যু দিয়ে সমস্যার সমাধানকল্পে নাটক শেষ করা দুর্বল মনে হয়েছে। 

মানুষ নাটকের আলোক পরিকল্পনায় ছিলেন বাবর খাদেমী, মঞ্চ সংগীত পরিকল্পনায় রীপন শওকত রহমান, শব্দ নিয়ন্ত্রণে মো. নজরুল ইসলাম আর মঞ্চ ব্যবস্থাপনায় ছিলেন আনোয়ার সেলিম। নাটক শেষে ধন্যবাদ জানান বাংলা থিয়েটার নিউইয়র্কের প্রধান প্রবীণ নাট্যজন মুজিব বিন হক।

রবিবার একই মঞ্চে অর্থাৎ জেক্যালে উদ্বোধন হয় লং আইল্যান্ডভিত্তিক সাংস্কৃতিক সংগঠন শিল্পাংগনের নাট্যমেলা। তিন প্রয়াত নাট্যজন জামালউদ্দিন হোসেন, আতাউর রহমান মুস্তাফা মনোয়ারকে উৎসর্গ করা হয় এই নাট্যমেলা। বষীর্য়ান নাট্যজন রেখা আহমেদ প্রদীপ প্রজ্জ্বলনের মধ্য দিয়ে নাট্যমেলার উদ্বোধন করেন অত্যন্ত ভাবগম্ভীর পরিবেশে। সময় তাঁকে উত্তরীয় পরিয়ে দেন নতুন প্রজন্মের নুসায়বাহ কবীর, ক্রেস্ট প্রদান করেন শান্তা মনি।

তাঁকে দেয়া এই সম্মাননার উত্তরে রেখা আহমেদ বলেন, নিষ্ঠা ডেডিকেশন না থাকলে কেউ কোনো কাজে সফল হতে পারে না। তিনি বলেন, আমি আনন্দিত যে এই নাট্যমেলা উৎসর্গ করা হয়েছে যে তিনজনকে তাদের একজন আতাউর রহমান। যখন কোনো গ্রুপে যোগ দিইনি, সেই ষাটের দশকে, তখন আমরা একসাথে অভিনয় করেছি।

রেখা আহমেদ বলেন, আমি বছর বয়স থেকে নাটক করছি। এখন ৮১ চলছে। হয়ত আর নাটক করতে পারব না। কিন্তু আপনাদের সাথে থাকব।

নাট্যমেলার প্রথম নাটক ছিল বাংলাদেশের লোককাহিনীভিত্তিক কবি জসিমউদ্দীনেরবেদের মেয়ে বেদে সম্প্রদায়ের জীবন সংগ্রাম এবং নাগরিক জীবনের অর্থবিত্তের কুপ্রভাব লোলুপ দৃষ্টি কীভাবে এই খেটে খাওয়া নারীদের জীবনকে তছনছ করে দেয় সেই মর্মন্তুদ কাহিনী বেদের মেয়ে। এই নাটকে বেদের মেয়ে চরিত্রে শাহরুখ তাসনিম, বেদে চরিত্রে নজরুল ইসলাম গ্রামের মোড়ল চরিত্রে শফিউল আলম দর্শকদের আনন্দ দিয়েছে।

বেদের মেয়ের নির্দেশনায় ছিলেন . নজরুল ইসলাম, আলোক নিয়ন্ত্রণে বাবর খাদেমী, সংগীতে রাফিয়া খান, সৈয়দ ইসলাম টুটুল লিটন ফিলিপস, নৃত্য পরিচালনায় ছিলেন রাফিয়া খান। অন্যান্য চরিত্রে অভিনয় করেন সোনিয়া পান্না, সুলতানা খানম, জান্নাত সুলতানা, মৌসুমি রহমান, আফরিন খান, শিল্পী রফিক, শান্তা মনি, নুসায়বাহ কবির, লিটন ফিলিপস, আহছান উল্লাহ, মুস্তাফা মোরশেদ, সৈয়দ ইসলাম টুটুল, স্বপন কবির, আওকাত খান।

এরপর মঞ্চসারথী প্রয়াত নাট্যজন আতাউর রহমানের স্মৃতিচারণ করেন অপর নাট্যজন রোকেয়া রফিক বেবি। তিনি বলেন, আতাউর রহমান মনে করতেন বাঁচতে হবে আনন্দের সাথে। আতা ভাইকে মনে রাখতে হবে তার প্রতিটি নাটকের জন্য। তবে বিশেষভাবে মনে রাখতে হবে গ্যালিলিও দেওয়ান গাজীর কিসসায় অনবদ্য অভিনয়ের জন্য।

রোকেয়া রফিক বলেন, আতাউর ভাই অনর্গল রবীন্দ্রনাথ শেকসপিয়ার আবৃত্তি করতে পারতেন মুখস্ত। তাছাড়া তিনি দেশের সাংস্কৃতিক সংকটে সবসময় সম্মুখসারির যোদ্ধা ছিলেন। একাত্তরকে তিনি মনেপ্রাণে ধারণ করেছিলেন।

এদিনের শেষ আয়োজন ছিল রবীন্দ্রনাথে রক্তকরবী। রক্তকরবী নাটকের শতবর্ষ উপলক্ষে এই বিশেষ আয়োজনটি অত্যন্ত যত্ন নিষ্ঠায় মঞ্চস্থ করে শিল্পাংগন। এই কালোত্তীর্ণ বহু অভিনীত নাটকটিকে দর্শকদের হৃদয়ে পৌঁছে দেয়া খুব সহজসাধ্য নয়। কিন্তু নির্দেশক শিরীন বকুল সেই কাজটি অত্যন্ত সাফল্যের সাথে সম্পন্ন করেন। দর্শকরা এই জটিল নাটক অত্যন্ত নিরবতায়, গভীর মনোযোগ নিয়ে দেখেন। এই নাটকে রাজা চরিত্রে নজরুল ইসলাম, নন্দিনী চরিত্রে শিরীন বকুল, অধ্যাপক চরিত্রে রীপন শওকত আনোয়ারসহ শওকত রিমন, আনোয়ার সেলিম, লিটন ফিলিপস প্রাণ উজাড় করে অভিনয় করে, পারস্পরিক বোঝাপড়ার মধ্য দিয়ে এগিয়ে নিয়েছেন। এই নাটকে মঞ্চকে জ্যামিতিক গ্রাফিক্সে ব্যবহার করেছেন শিরীন বকুল। অধিকাংশ সময় নেপথ্যে থেকেও নজরুল ইসলামের উপস্থিতিকে ভিজিবল করে তুলেছেন নির্দেশক। তাদের স্পষ্ট দাঢ্য সংলাপ প্রক্ষেপন বারবার স্মরণ করিয়ে দিচ্ছিল রবীন্দ্রনাথকে। বাংলা ভাষার এই শ্রেষ্ঠ নাটকটি বাংলা হলেও তা সম্পূর্ণভাবেই উপস্থাপনাসহ এর বিষয়বস্তু আন্তর্জাতিক। অন্যভাবে বললে ইয়োরোপীয়।

রক্তকরবীর সাফল্যের অন্যতম কারণ বাবর খাদেমীর সুষম, ইমপ্রেশনিস্টিক আলোক প্রক্ষেপণ। আলোআঁধারির খেলা নাটকটিতে সংবেদনশীল করে তুলেছিল। ধন্যবাদ বাবর খাদেমী, ধন্যবাদ শিরীন বকুল, ধন্যবাদ . নজরুল ইসলাম, ধন্যবাদ শিল্পাংগন।

শিল্পাংগনের নাট্যমেলার আরো দুদিনের নাট্যায়োজন হবে আজ শনিবার কাল রবিবার লং আইল্যান্ডের লেভিটটাউন হলে।

Related Posts