ব্রিকস সামিটে বাংলাদেশের অনুপস্থিতির দীর্ঘ মাশুল || ড. জীবন বিশ্বাস
অষ্টাদশ ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলনের কূটনৈতিক মানচিত্রে বাংলাদেশের অনুপস্থিতি অনেককে স্তম্ভিত করেছে। এই স্তম্ভিত হওয়া এ কারণে নয় যে একটি মাত্র সম্মেলন কোনো জাতির অর্থনৈতিক ভাগ্য নির্ধারণ করতে পারে, বরং বহুপাক্ষিক কূটনীতির মুহূর্তগুলো ক্রমে ক্রমে সঞ্চিত হয়ে দীর্ঘমেয়াদি গুরুত্ব অর্জন করে, সে কারণে। গত ১২—১৩ সেপ্টেম্বর নয়াদিল্লিতে সম্প্রসারিত ব্রিকসের নেতারা ‘সহনশীলতা, উদ্ভাবন, সহযোগিতা ও স্থায়িত্বের জন্য নির্মাণ’ প্রতিপাদ্য নিয়ে সমবেত হন। গৃহীত নয়াদিল্লি ঘোষণাপত্রে বৈশ্বিক শাসনব্যবস্থার সংস্কার, বাণিজ্য, অবকাঠামো, প্রযুক্তি, আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স (এআই), উন্নয়ন—অর্থায়ন এবং অধিকতর সহনশীল বৈশ্বিক ভ্যালু—চেইন বা মূল্যশৃঙ্খলার প্রশ্ন স্থান পায়। অথচ বাংলাদেশ সেখানে কোনো প্রতিনিধিই পাঠায়নি। বাংলাদেশকে ব্রিকসে যোগদানের জন্য দুটি আমন্ত্রণ জানানো হয়। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে প্রথমে দ্বিপক্ষীয় সফরের জন্য এবং পরে পৃথকভাবে, বর্তমান বিমসটেক চেয়ার হিসেবে তাঁকে ব্রিকস আউটরিচ বা ব্রিকস—প্লাস অধিবেশনে অংশগ্রহণের আমন্ত্রণ জানানো হয়। আগস্টে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীও এই দুটি স্বতন্ত্র আমন্ত্রণের কথা স্বীকার করেন। নয়াদিল্লির ভাষ্য ছিল, আঞ্চলিক সংস্থাগুলোর প্রধানদের আউটরিচ অধিবেশনে আমন্ত্রণ জানানো ব্রিকসের প্রচলিত রীতি। এসব প্রসঙ্গ নিয়েই আজকের উপসম্পাদকীয়।
কিন্তু ঢাকা আমন্ত্রণের প্রাতিষ্ঠানিক পরিচয়টিকে গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচনা করে। পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির বলেন, তারেক রহমানকে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নয়, বিমসটেকের চেয়ার হিসেবে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। তাঁর বক্তব্য ছিল, ভারতের উদ্দেশে প্রধানমন্ত্রীর প্রথম সফরটি বহুপাক্ষিক সম্মেলনকেন্দ্রিক না হয়ে পূর্ণাঙ্গ দ্বিপক্ষীয় সফর হওয়াই সমীচীন। শেষ পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রী তো যানইনি, বাংলাদেশের অন্য কোনো প্রতিনিধিও যোগ দেননি। পরে ভারত জানায়, তাদের পাঠানো দুটি আমন্ত্রণের কোনোটিরই জবাব তারা পায়নি। ফলে বিরোধের কেন্দ্রটিও স্পষ্টÑ নয়াদিল্লির কাছে এটি ছিল স্বাভাবিক বহুপাক্ষিক প্রটোকল; আর ঢাকার কাছে গুরুত্বপূর্ণ ছিল—কোন পরিচয়ে বাংলাদেশের সরকারপ্রধানকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। অর্থাৎ ঢাকার কাছে বাংলাদেশের চেয়েও প্রধানমন্ত্রীর পরিচয়টিই বেশি গুরুত্ব পেয়েছে বললে অত্যুক্তি হবে না।
ব্রিকসÑ একটি সংক্ষিপ্ত নাম থেকে গ্লোবাল সাউথের গুরুত্বপূর্ণ মঞ্চ
ব্রিকসের ইতিহাস ব্যতিক্রমী। ২০০১ সালে অর্থনীতিবিদ জিম ও’নিল ব্রাজিল, রাশিয়া, ভারত ও চীনের ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক সম্ভাবনা বোঝাতে ‘ইজওঈ’ শব্দটি ব্যবহার করেছিলেন। পরে চার দেশের সরকার সেই বিনিয়োগসংক্রান্ত সংক্ষিপ্ত নামকে রাজনৈতিক সহযোগিতার কাঠামোতে রূপ দেয়। ২০০৬ সালে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের পার্শ্ববৈঠকে প্রথম পররাষ্ট্রমন্ত্রী পর্যায়ের বৈঠক হয় এবং ২০০৯ সালে রাশিয়ার ইয়েকাতেরিনবুর্গে অনুষ্ঠিত হয় প্রথম রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধানদের শীর্ষ সম্মেলন। ২০১১ সালে দক্ষিণ আফ্রিকা যুক্ত হলে ইজওঈ হয়ে ওঠে ইজওঈঝ। ২০২৩ সালের জোহানেসবার্গ সম্মেলনের সিদ্ধান্তে বৃহত্তর সম্প্রসারণ ঘটে; মিশর, ইথিওপিয়া, ইরান, সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত বৃহত্তর কাঠামোয় যুক্ত হয় এবং ২০২৫ সালে ইন্দোনেশিয়া পূর্ণ সদস্য হয়।
বর্তমানে ব্রিকসের ১১টি পূর্ণ সদস্য হলো ব্রাজিল, রাশিয়া, ভারত, চীন, দক্ষিণ আফ্রিকা, মিশর, ইথিওপিয়া, ইরান, সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও ইন্দোনেশিয়া। এর দশটি পার্টনার বা অংশীদার দেশ হলো বেলারুশ, বলিভিয়া, কিউবা, কাজাখস্তান, মালয়েশিয়া, নাইজেরিয়া, থাইল্যান্ড, উগান্ডা, উজবেকিস্তান ও ভিয়েতনাম। উল্লেখ্য, সদস্য তো নয়ই, অংশীদার দেশ হিসেবেও এখানে বাংলাদেশ বা পাকিস্তান নেই। বিশ্বের প্রায় অর্ধেক জনগোষ্ঠী এবং মোট বৈশ্বিক জিডিপির প্রায় ৪০ শতাংশ এই দেশগুলোর অন্তর্ভুক্ত। ফলে ব্রিকস কোনো সামরিক জোট কিংবা ইউরোপীয় ইউনিয়নের মতো অতিরাষ্ট্রীয় অর্থনৈতিক সংগঠন না হয়েও আন্তর্জাতিক রাজনীতি ও অর্থনীতিতে উল্লেখযোগ্য কাঠামোগত প্রভাব ধারণ করে।
ব্রিকসের লক্ষ্য কেবল বাণিজ্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। জাতিসংঘ, আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল, বিশ্বব্যাংক ও বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার মতো প্রতিষ্ঠানে উদীয়মান ও উন্নয়নশীল দেশগুলোর অধিকতর প্রতিনিধিত্ব প্রতিষ্ঠা তার অন্যতম ঘোষিত উদ্দেশ্য। এর সহযোগিতা মূলত তিনটি স্তম্ভকে কেন্দ্র করেÑ রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা, অর্থনৈতিক ও আর্থিক সহযোগিতা এবং জনগণের সঙ্গে জনগণের যোগাযোগ। ২০২৬ সালের ঘোষণাপত্রেও উদীয়মান অর্থনীতি ও স্বল্পোন্নত দেশগুলোর বৈশ্বিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে বৃহত্তর প্রতিনিধিত্বের আহ্বান জানানো হয়েছে। ভারতের ২০২৬ সালের সভাপতিত্বে ত্রিশটি শহরে চার শতাধিক বৈঠক ও কার্যক্রম অনুষ্ঠিত হওয়া প্রমাণ করে যে ব্রিকস এখন আর বছরে একবার নেতাদের প্রতীকী সমাবেশমাত্র নয়।
অর্থনৈতিক ক্ষেত্রেও এর প্রাতিষ্ঠানিক কার্যক্রম বিস্তৃত হচ্ছে। টঘঈঞঅউ—এর হিসাবে, ব্রিকসভুক্ত দেশগুলোর অভ্যন্তরীণ পণ্য রপ্তানি ২০২৪ সালে ১.১৭ ট্রিলিয়ন ডলারে পৌঁছায়, যা ২০০৩ সালের তুলনায় তেরো গুণেরও বেশি। নয়াদিল্লি ঘোষণাপত্রে আন্তঃসীমান্ত অর্থ প্রদান ব্যবস্থার সমন্বয়, জাতীয় মুদ্রায় বাণিজ্য নিষ্পত্তি, অবকাঠামো অর্থায়ন, বাণিজ্য সহজীকরণ, বৈশ্বিক ভ্যালু—চেইনের ডিজিটাল রূপান্তর, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের অর্থায়ন এবং প্রযুক্তি সহযোগিতা নিয়ে অগ্রগতির কথা বলা হয়েছে। একই সঙ্গে অবকাঠামো ও টেকসই উন্নয়নের অর্থায়নে নিউ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের ভূমিকা পুনর্ব্যক্ত করা হয়েছে।
বাংলাদেশের অনুপস্থিতির অর্থনৈতিক তাৎপর্য
বাংলাদেশ ব্রিকসের সদস্য না হলেও এর অর্থনৈতিক কাঠামোর সঙ্গে ইতিমধ্যেই গুরুত্বপূর্ণভাবে যুক্ত। ২০২১ সালে বাংলাদেশ নিউ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের সদস্য হয়। ২০২৫ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত বাংলাদেশে তিনটি প্রকল্পের জন্য ব্যাংকটির অনুমোদিত অর্থায়ন ছিল ৪৫০ মিলিয়ন ডলার। ব্রিকস আউটরিচে বাংলাদেশ উপস্থিত থাকলেই নতুন ঋণ, বাজারসুবিধা কিংবা সদস্যপদ নিশ্চিত হতোÑএমন নয়, তবে উপস্থিতির কূটনীতি যে দীর্ঘমেয়াদে সুযোগ সৃষ্টি করে, তাতে সন্দেহের অবকাশ নেই। সুযোগ হারানোর অর্থনৈতিক মূল্য সময়ের সঙ্গে ধীরে ধীরে বর্ধিত হতে পারে। চীন, ভারত ও ইন্দোনেশিয়াÑব্রিকসের এই তিন সদস্যই ২০২৪—২৫ অর্থবছরে বাংলাদেশের সর্ববৃহৎ বাণিজ্যঘাটতির তিনটি উৎস। বাংলাদেশ চীন থেকে প্রায় ১৮.৫৬ বিলিয়ন ডলার মূল্যের পণ্য আমদানি করলেও রপ্তানি করেছে মাত্র ৬৯৪ মিলিয়ন ডলারের। ভারত থেকে আমদানি ৯.৬২ বিলিয়ন ডলারের বিপরীতে রপ্তানি ছিল ১.৭৬ বিলিয়ন; আর ইন্দোনেশিয়া থেকে ৩.৬৪ বিলিয়ন ডলারের আমদানির বিপরীতে বাংলাদেশের রপ্তানি ছিল মাত্র প্রায় ৫৭ মিলিয়ন ডলার। বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রাথমিক হিসাবে ২০২৫—২৬ অর্থবছরে পণ্য রপ্তানি ছিল প্রায় ৪৩.৯ বিলিয়ন ডলার, আমদানি ৭১.১ বিলিয়ন এবং বাণিজ্যঘাটতি প্রায় ২৭.৩ বিলিয়ন ডলার।
এই পরিসংখ্যান অবশ্য প্রমাণ করে না যে ব্রিকসের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা বাংলাদেশের বাণিজ্যঘাটতি স্বয়ংক্রিয়ভাবে কমিয়ে দেবে। বাণিজ্যের ভারসাম্য নির্ধারিত হয় উৎপাদন কাঠামো, প্রতিযোগিতাশক্তি, অবকাঠামো, মুদ্রাবিনিময় হার এবং আমদানিনির্ভরতার মতো গভীর অর্থনৈতিক উপাদানে। তবে উপরোক্ত সংখ্যাগুলো নির্দেশ করে কেন বাজার বহুমুখীকরণ, বৈশ্বিক ভ্যালু—চেইন, বিনিয়োগ, উন্নয়ন—অর্থায়ন এবং নতুন আন্তঃসীমান্ত অর্থপ্রদানব্যবস্থা নিয়ে আলোচনার টেবিলে বাংলাদেশের উপস্থিতি অর্থনৈতিকভাবে প্রাসঙ্গিক।
সময়টিও বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। বাংলাদেশ এখনো ২৪ নভেম্বর ২০২৬ জাতিসংঘের স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে উত্তরণের জন্য নির্ধারিত, যদিও সরকার প্রস্তুতিকাল বাড়ানোর আবেদন করেছে এবং জাতিসংঘে সেই প্রক্রিয়া এখনো নিষ্পত্তির অপেক্ষায় রয়েছে। উত্তরণের পর ক্রমে কিছু খউঈ—নির্দিষ্ট বাণিজ্যসুবিধা কমে এলে বাংলাদেশের সামনে রপ্তানি বৈচিত্র্য, উৎপাদনশীলতা, বৈদেশিক বিনিয়োগ, প্রযুক্তিগত অংশাদারিত্ব এবং নতুন বাজারব্যবস্থা আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। জাতিসংঘও বাংলাদেশের মসৃণ উত্তরণ—কৌশলে বাণিজ্যসুবিধা, রপ্তানি বহুমুখীকরণ, উৎপাদনক্ষমতা এবং আন্তর্জাতিক অংশীদারিত্বকে কেন্দ্রীয় অগ্রাধিকার হিসেবে চিহ্নিত করেছে।
অতএব বিষয়টি একটি সম্মেলনে অনুপস্থিত থাকার চেয়ে বৃহত্তর, এটি কূটনৈতিক উপস্থিতির অর্থনীতি। বিমসটেক চেয়ার হিসেবে ব্রিকস সামিটে অংশগ্রহণ করলে কোনো সদস্যপদ গ্রহণ বা পশ্চিমা অংশীদারদের সঙ্গে সম্পর্কের পরিবর্তন ছাড়াই বাংলাদেশ এমন বহু রাষ্ট্রনেতার সঙ্গে একই মঞ্চে থাকতে পারত, যাদের দেশ বাংলাদেশের পুঁজি, আমদানি, জ্বালানি, প্রযুক্তি ও উন্নয়ন—অর্থায়নের গুরুত্বপূর্ণ উৎস।
একটি খালি আসন বাংলাদেশকে দরিদ্র করে দেবে না, কিংবা তার জন্য ব্রিকসের দরজাও বন্ধ করে দেবে না। কিন্তু এমন এক বিশ্বে, যেখানে অর্থনৈতিক কূটনীতি ক্রমেই কঠোর জোটের বদলে পরস্পর—সংযুক্ত বহুপাক্ষিক নেটওয়ার্কের মধ্য দিয়ে পরিচালিত হচ্ছে, ধারাবাহিক অনুপস্থিতির ঝুঁকির মূল্য হতে পারে অনেক বড়। একটি রাষ্ট্র তার সিদ্ধান্তের স্বাধীনতা অক্ষুণ্ণ রেখেও ধীরে ধীরে সেইসব কক্ষে নিজের প্রভাব হারাতে পারে, যেখানে তার ভবিষ্যৎ—সংশ্লিষ্ট সিদ্ধান্তের পরিমণ্ডল গড়ে ওঠার সম্ভাবনা প্রবল।
বাংলাদেশের দীর্ঘমেয়াদি সমৃদ্ধি শেষ পর্যন্ত নির্ভর করবে দেশের অভ্যন্তরীণ উৎপাদনশীলতা, প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা ও আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতাশক্তির ওপর। কূটনীতি এগুলোর বিকল্প নয়। কিন্তু বিচক্ষণ অর্থনৈতিক রাষ্ট্রনীতি একটি সত্য স্বীকার করেÑবাজার নির্মিত হয় দেশের ভেতরে, কিন্তু সুযোগের অনেক দরকষাকষি সম্পন্ন হয় দেশের বাইরে। বাংলাদেশ বাইরের সেই রকম একটি সুযোগকে হেলায় হারালো। এর মূল্য হতে পারে অনেক বড়।
