রেকর্ডে উজ্জ্বল বিশ্বকাপ

স্পোর্টস প্রতিবেদনঃ বুধবার দিবাগত রাতে সিয়াটলে দুর্দান্ত কামব্যাকে সেনেগালকে গোলে হারিয়েছে ইউরোপের আরেক দেশ বেলজিয়াম। গতকাল সকালে সানফ্রান্সিসকোয় বসনিয়া হার্জেগোভিনাকে গোলে হারিয়ে শেষ ষোলোর টিকিট কেটেছে স্বাগতিক যুক্তরাষ্ট্রও। তিন জয়ে হ্যারি কেইন, ইউরি টিলেম্যান্সদের হাত ধরে অসংখ্য রেকর্ড হয়েছে।

চলতি আসরে কেইনের গোলসংখ্যা এখন পাঁচ। ইংলিশ ফুটবলারদের মধ্যে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ। তিনি ছুঁয়ে ফেলেছেন জিওফ হার্স্টকে। ১৯৯০ সালে ছয় গোল করা গ্যারি লিনেকার রয়েছেন নম্বরে। বিশ্বকাপে সব মিলিয়ে কেইনের গোল ১৩টি। তিনি ব্রাজিল গ্রেট পেলেকে টপকে ছুঁয়েছেন ফরাসি গ্রেট জঁ ফতেঁকে। এখানেই শেষ নয়। ষষ্ঠ ফুটবলার হিসেবে দুটি বিশ্বকাপে পাঁচ কিংবা ততোধিক গোল করেছেন কেইন। তিনি ছাড়া কীর্তি আছে তিওফিলো কুবিলাস, মিরোস্লাভ ক্লোসা, টমাস মুলার, লিওনেল মেসি কিলিয়ান এমবাপ্পের।

কেইন দুটি গোলই করেছেন বদলি খেলোয়াড় অ্যান্থনি গর্ডনের পাস থেকে। ১৯৬৬ সালের বিশ্বকাপের পর প্রথম কোনো খেলোয়াড় বদলি হিসেবে নেমে দুটি কিংবা ততোধিক গোলে অ্যাসিস্ট করলেন।

প্রথমার্ধে গোল খেয়েও শেষ পর্যন্ত কেইনের ডাবলে জয় পায় ইংল্যান্ড। বিশ্বকাপে প্রথমার্ধে পিছিয়ে থাকার পরও শেষ পর্যন্ত জয় পাওয়ার নজির এর আগে নেই ইংল্যান্ডের। এছাড়া বিশ্বকাপের ম্যাচে প্রথমে গোল খেয়েও ইংল্যান্ডের জয়ের মাত্র দ্বিতীয় নজির এটা।

বিশ্বকাপে হেডে মোট চারটি গোল করেছেন কেইন। জায়গায়ও তিনি সেরাদের ক্লাবে জায়গা করে নিয়েছেন। মিরোস্লাভ ক্লোসা সাতটি, গার্ড মুলার পাঁচটি গোল করে কেইনের চেয়ে এগিয়ে রয়েছেন।

সিয়াটলে ১২৫ মিনিটের পেনাল্টি গোলে সেনেগালকে হারিয়েছে বেলজিয়াম। পেনাল্টি স্পট থেকে গোল করে যেন সেনেগালিজ ফুটবলারদের বুকে ছুরিই বিঁধিয়ে দিলেন ইউরি টিলেম্যান্স। বিশ্বকাপ ইতিহাসে এত পরে গোল করার কিংবা জয়সূচক গোল হওয়ার নজির নেই।

ইংল্যান্ড বেলজিয়াম উভয়ই পিছিয়ে পড়ার পর শেষে জয় নিয়ে মাঠ ছাড়ে। সব মিলিয়ে চলতি বিশ্বকাপে ১১টি ম্যাচে কামব্যাক জয় এসেছে, যা একক বিশ্বকাপের রেকর্ড। এছাড়া চলতি আসরে মোট ৩১ বার এক ম্যাচে এক গোলের বেশি করার নজির স্থাপন করেছেন খেলোয়াড়রা, যা বিশ্বকাপের নতুন ইতিহাস।

সেনেগালের বিপক্ষে জোড়া গোল করেছেন বেলজিয়ামের টিলেম্যান্স। মাত্র দ্বিতীয় বেলজিয়ান খেলোয়াড় হিসেবে বিশ্বকাপের কোনো নির্দিষ্ট ম্যাচে একাধিক গোল করার কৃতি দেখালেন তিনি। তার আগে কীর্তি আছে বার্নার্ড ভুরহুফের (১৯৩৪)

বিশ্বকাপে দুই গোলে পিছিয়ে থাকার পরও জয়ের দশম নজির স্থাপন করে বেলজিয়াম। বিশ্বকাপে দুই গোলে পিছিয়ে থাকার পরও জয়ের রেকর্ড দুবার করে আছে বেলজিয়াম পশ্চিম জার্মানির।

সহস্বাগতিক দেশ যুক্তরাষ্ট্র গোলে হারিয়েছে ইউরোপের বসনিয়া হার্জেগোভিনাকে। বিশ্বকাপের নকআউটে এটা যুক্তরাষ্ট্রের মাত্র দ্বিতীয় জয়। ২০০২ আসরের শেষ ষোলোয় তারা গোলে হারিয়েছিল মেক্সিকোকে। চলতি বিশ্বকাপে সেটপিস থেকে সর্বাধিক চার গোল করল যুক্তরাষ্ট্র।

আড়ালে থাকা কিংবদন্তি

লিওনেল মেসি, ক্রিস্টিয়ানো রোনালডো, কিলিয়ান এমবাপ্পে, আর্লিং হালান্ড কিংবা ভিনিসিয়ুস জুনিয়রের মতো মহাতারকাদের আলোয় অন্য অনেক অসাধারণ ফুটবলারের কীর্তি আড়াল হয়ে গেছে। সেই তালিকার সবচেয়ে বড় নাম সম্ভবত হ্যারি কেইন। গোলের পর গোল করেও যিনি কখনো আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে ওঠেননি। অথচ ইংল্যান্ড যখন বিশ্বকাপ থেকে বিদায়ের দ্বারপ্রান্তে, তখন আবারো তিনিই হয়ে উঠলেন ত্রাতা। কঙ্গো গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্রের বিপক্ষে ১১ মিনিটের ব্যবধানে দুটি গোল করে শেষ ষোলোয় তুলেছেন টমাস টুখেলের দলকে। একই সঙ্গে নিজের নামও আরো উঁচুতে তুলে নিয়েছেন বিশ্বকাপের ইতিহাসে।

কেইনের ক্যারিয়ারের পরিসংখ্যানই বলে দেয় তিনি আধুনিক ফুটবলের অন্যতম সেরা স্ট্রাইকার। টটেনহামের জার্সিতে ৪৩৫ ম্যাচে করেছেন ২৮০ গোল। এরপর বায়ার্ন মিউনিখে যোগ দিয়ে যেন আরো ভয়ংকর হয়ে ওঠেন। মাত্র ১৪৭ ম্যাচেই করেছেন ১৪৬ গোল। ক্লাব ফুটবলের মতো জাতীয় দলেও তার ধারাবাহিকতা অবিশ্বাস্য। ইংল্যান্ডের হয়ে ১১৮ ম্যাচে ৮৪ গোল করে এরই মধ্যে দেশের ইতিহাসের সর্বকালের সর্বোচ্চ গোলদাতা হয়েছেন তিনি। বিশ্বকাপেও কেইনের নাম এখন কিংবদন্তিদের কাতারে। কঙ্গোর বিপক্ষে জোড়া গোলের পর বিশ্বকাপে তার গোলসংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১৩। বিশ্বকাপের সর্বকালের গোলদাতাদের তালিকায় উঠে এসেছেন ষষ্ঠ স্থানে। তালিকায় জায়গা পাওয়াই প্রমাণ করে, কেইন শুধু ইংল্যান্ডের নন, বিশ্ব ফুটবলেরও অন্যতম সেরা গোলশিকারি।

তবে সংখ্যাই তাকে ব্যাখ্যা করার জন্য যথেষ্ট নয়। কেইনের সবচেয়ে বড় শক্তি তার বহুমাত্রিকতা। তিনি কেবল বক্সের ভেতরের শিকারি নন। মাঝমাঠে নেমে খেলা গড়ে দিতে পারেন, দীর্ঘ কিংবা ছোট পাসে আক্রমণের ছন্দ তৈরি করতে পারেন। পিঠে ডিফেন্ডার নিয়ে বল ধরে রাখা, সতীর্থদের জন্য জায়গা তৈরি করা কিংবা এক টাচে আক্রমণের গতি বদলে দেয়ার দক্ষতাও তাকে অন্যদের থেকে আলাদা করেছে। গতি হয়তো তার সবচেয়ে বড় অস্ত্র নয়, কিন্তু খেলার বুদ্ধি, অবস্থান নির্বাচন এবং নিখুঁত ফিনিশিং দিয়ে সেই ঘাটতি বহু আগেই পূরণ করেছেন।

কঙ্গোর বিপক্ষেও তার দুই গোল যেন ছিল দুই ভিন্ন পরিচয়ের প্রতিচ্ছবি। প্রথমটি হেডে, দ্বিতীয়টি দুর্দান্ত পায়ের শটে। দুই ক্ষেত্রেই বোঝা গেছে, সুযোগ পেলেই কতটা নির্মম হয়ে উঠতে পারেন ইংলিশ অধিনায়ক। ম্যাচ শেষে নিজের সাফল্যের চেয়ে আবারো কথা বলেছেন উন্নতির দর্শন নিয়ে। বিনয়ী কণ্ঠে বলেছেন, ‘ছোট ছোট বিষয়ই একজন খেলোয়াড়কে সর্বোচ্চ পর্যায়ে ধরে রাখে। মেসি আর ক্রিস্টিয়ানো সেই জায়গার সর্বোচ্চ উদাহরণ।

মন্তব্যেই যেন ধরা পড়ে কেইনের ব্যক্তিত্ব। বিতর্ক নয়, অহংকার নয়, প্রচারের আলো নয় তিনি বিশ্বাস করেন কাজেই। এমন এক সময়ে খেলছেন, যখন ফুটবলের মঞ্চে একের পর এক সুপারস্টারের ভিড়। তবু সেই দানবদের যুগেই নিজের জায়গা তৈরি করেছেন নীরবে।

Related Posts