নন্দনের বরপুত্র মুস্তাফা মনোয়ার শিরীন বকুল নিউইয়র্ক

বাংলাদেশ টেলিভিশনের পর্দায় তাঁর নাম দেখে আমি বড় হয়েছি। বিশেষ করেমুখরা রমণী বশীকরণএবংরক্তকরবী’—এই দুটি কালজয়ী নাটকের স্রষ্টা হিসেবে তিনি বাংলাদেশে টেলিভিশনের ইতিহাসে অমর হয়ে থাকবেন! তিনি আমাদের জাদুর মানুষ মুস্তফা মনোয়ার!

আমাদের কৈশোরের সেই সৃষ্টিশীল মানুষটির সঙ্গে দেখা হয়ে গেল একদিন বাংলামটরের বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের একটি অনুষ্ঠানে। শিল্প সংস্কৃতির অঙ্গনে আমার যখন কাজ শুরু হলো তখন বিভিন্ন অনুষ্ঠানে তাঁর সঙ্গে দেখা হতো, কথা হতো।কণ্ঠশীলনথেকে উচ্চারণ এবং আবৃত্তির ওপর তিনমাসের কোর্স করার পর থেকেই নানা অনুষ্ঠান উপস্থাপনায় ডাক পড়ত আমার। সেসব অনুষ্ঠানে দেখা হলেও তিনি আমার উপস্থাপনার প্রশংসা করেছেন। স্বল্পভাষী মানুষ মৃদুস্বরে কিন্তু স্পষ্ট উচ্চারণে কথা বলতেন। তিনি চিত্রশিল্পী হলেও শিল্পের সব ক্ষেত্রেই তাঁর জাদুর তুলির আঁচড়ে অপরূপ সৌন্দর্য ফুটে উঠত! তিনি চমৎকার গান গাইতে পারতেন। তাঁর গান শোনার ভাগ্য সবার হয়নি এটা সত্যি। পাপেট নিয়ে তিনি আমাদের দেশে যুগান্তকারী কাজ করেছিলেন। আমাদের মুক্তিযুদ্ধের সময় তিনি পাপেট শো করে মুক্তিযোদ্ধাদের অনুপ্রেরণা যোগাতেন। তাঁর কাছে শুনেছি পশ্চিম পাকিস্তানিদের বিধিনিষেধের তোয়াক্কা না করেই তিনি টেলিভিশনে নারী শিল্পীদের কপালের টিপ বাদ না দিয়ে বরং সেই টিপকে আরও বড় করে তুলেছিলেন। বাংলাদেশের স্বাধীনতার জন্য লড়াই করেছিলেন শিল্পীর সত্তা দিয়ে। চাকরি সূত্রে যখন যেখানেই গেছেন সেখানেই দেশের শুদ্ধ শিল্পসাহিত্য সংস্কৃতির জন্য কাজ করেছেন, সংগ্রাম করেছেন।

মানুষ হিসেবে তিনি ছিলেন অত্যন্ত বিনয়ী অমায়িক। তবে সত্য কথা বলেছেন সততার সঙ্গে, বিনয়ের সঙ্গে! মিথ্যার সঙ্গে কোনদিন আপোস করেননি তিনি।

আমি তাঁকে স্যার বলেই ডাকতাম। কারণ তিনি আমাদের থিয়েটার স্কুলে নন্দনতত্ত্ব পড়াতেন। তিনি যখন পড়াতেন আমরা মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে শুনতাম তাঁর কথা। তাঁর জীবনের সবটুকু জুড়ে ছিলেন রবীন্দ্রনাথ। রবীন্দ্রনাথের গান কবিতা নাটক প্রবন্ধ চিঠিÑমোটকথা রবীন্দ্রনাথকে আত্মস্থ করেছিলেন এমনভাবে যে তাঁর জীবন হয়ে উঠেছিল রবীন্দ্রময়!

মনে পড়ে কবিতার চিত্রকল্প পড়ানোর সময় তিনি রবীন্দ্রনাথেরবৃষ্টি পড়ে টাপুর টুপুরকবিতাটি পড়ে পড়ে একটি জলছবি এঁকে ফেলেছিলেন।

আমি আবদুল্লাহ আল মামুন থিয়েটার স্কুলের প্রথম ব্যাচে প্রথম স্থান অধিকার করেছিলাম। বছর শেষে আমাদের প্রযোজনা ছিল রবীন্দ্রনাথের নাটকরক্তকরবী এর নির্দেশনায় ছিলেন ভাস্বর বন্দ্যোপাধ্যায়। আমাদের এক বছরের ডিপ্লোমা ডিগ্রির সার্টিফিকেট দেয়া হলো এবং শেষে আমরা নাটকটি মঞ্চস্থ করলাম। দর্শকের সারিতে দেশের গণ্যমান্য মানুষের মধ্যে ছিলেন মুস্তাফা মনোয়ারও। কথা শুনেই আমার ভীষণ নার্ভাস লাগছিল। তাঁর সামনে নন্দিনী চরিত্রে অভিনয় করার দুঃসাহস দেখাতে হবে! নাটক শেষে তিনি আমার মাথায় হাত রেখে বলেছিলেন তুমি আমাদের মাটির নন্দিনী!! এরপর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলাবিভাগের এক পুনর্মিলনী অনুষ্ঠানে আমিরক্তকরবীনাটকের একটি অংশ অভিনয় করেছিলাম। আমার সঙ্গে রাজার চরিত্রে ছিল আমাদের বিভাগের ছাত্র স্বপন। সেদিনও মুস্তাফা মনোয়ার স্যার এসেছিলেন তাঁর স্ত্রী মেরিনা জাহানকে নিয়ে। মেরিনা জাহান ছিলেন বাংলা বিভাগের ছাত্রী। আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ স্যারের সহপাঠী। আমাকে দেখেই মনোয়ার স্যার বললেন আরে এইতো আমাদেরনন্দিনীএসে পড়েছে। স্যারের এই আশীর্বাদ আমার জীবনে এক অনন্য প্রাপ্তি! আজও নিউইর্য়কের মঞ্চে যখনরক্তকরবীনাটকে নন্দিনী চরিত্রে অভিনয় করি তখনও আমার মুস্তাফা মনোয়ার স্যারের সেই কথা মনে পড়ে!

দেশ ছেড়ে নিউইয়র্কে এসে পড়ায় স্যারের সাথে অনেক দিন যোগাযোগ ছিলো না। তবে জানতাম তিনি খুব অসুস্থ! অবশেষে সেই চিরবিদায়ের খবর পেলাম! দেশে থাকলে শহীদ মিনারে গিয়ে শ্রদ্ধা জানাতে পারতাম। কিন্তু দূরদেশে বসে শুধু স্মৃতি নিয়ে বসে আছি! সেই ক্লাসরুম মুস্তফা মনোয়ার স্যার আমাদের পড়াচ্ছেন..

দিনের আলো নিবে এলো সূর্যি্য ডোবে ডোবে।

আকাশ ঘিরে মেঘ জুটেছে চাঁদের লোভে লোভে।

মেঘের উপর মেঘ করেছেÑ রঙের উপর রঙ।

মন্দিরেতে কাঁসর ঘণ্টা বাজল ঠঙ্ ঠঙ্।

পারেতে বিষ্টি এল, ঝাপসা গাছপালা।

পারেতে মেঘের মাথায় একশো মানিক জ্বালা!!’

Related Posts