রেফারির সিদ্ধান্ত নিয়ে বিশ^কাপে বাড়ছে বিতর্ক
বিশেষ প্রতিবেদনঃ বিশ্বকাপ ফুটবল পৃথিবীর সবচেয়ে বড় ক্রীড়া আয়োজন। সেজন্য বলা হয় ‘দ্য গ্রেটেস্ট শো অন আর্থ’। এত বড় আয়োজন আমেরিকা, ক্যানাডা ও মেক্সিকোয় এ পর্যন্ত সুষ্ঠুভাবেই হচ্ছে। উন্মাতাল পৃথিবীতে তেমন কোনো দুর্ঘটনা ঘটেনি বিশ্বকাপকে কেন্দ্র করে, কেবল আমেরিকার সম্প্রতিকালের রাজনীতির নানামুখী অসামঞ্জস্যর শিকার হতে হয়েছে অনেক গুণী ক্রীড়া ব্যক্তিত্বকে। তবে মূল ফোকাস যদি হয় খেলা, সেখানেই ঘটছে বিপত্তি। একটির পর একটি। প্রশ্ন উঠেছে রেফারির সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা নিয়ে। প্রশ্ন উঠেছে খেলার ফলাফলে রাজনীতির আচড় লাগছে কিনা। প্রাপ্ত খবরে এমনই তথ্য ফুটে উঠেছে।
বিশ্বকাপ শুরুর আগে থেকেই এক ধরনের বৈষম্য, বিতর্ক ঘিরে ধরেছে ফুটবলকে। বল মাঠে গড়ানোর পর থেকে রেফারিদের বিতর্কিত সিদ্ধান্ত, আর অনেক বেশি ভিআরের ব্যবহার ফুটবল বিশ্বকাপের সৌন্দর্যে ছেদ পড়েছে। সর্বশেষ বেলজিয়াম আর সেনেগালের ম্যাচে অতিরিক্ত সময়ের ঠিক শেষ মুহূর্তের পেনাল্টি সেনেগালকে ছিটকে দেয়।
অথচ আসলেই সেটি পেনাল্টি ছিল কি না, তা নিয়ে পুরো ফুটবল বিশ্বে বিতর্ক চলছে। এর আগে ইরানকে এক ধরনের ‘জোর করে’ হারিয়ে দেওয়া হয় বলে অভিযোগ তুলেছেন অনেকে। জার্মানির গোল বাতিলের সিদ্ধান্তটি নিয়ে নেতিবাচক আলোচনা চলছে। অনেকেই এটিকে ইতিহাসের ‘জঘন্য’ বিশ্বকাপ বলছেন।
ফিফা বরাবরই দাবি করে, ফুটবল একটি নিরপেক্ষ জায়গা। এটি রাজনৈতিক বিরোধের ঊর্ধ্বে উঠে সব জাতি ও মানুষকে ঐক্যবদ্ধ করে। তবে যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকোতে আয়োজিত এবারের বিশ্বকাপ এক ভিন্ন বাস্তবতা সামনে এনেছে। এবারের আসর দেখিয়ে দিল, বিশ্বের সবচেয়ে বড় ক্রীড়া আসরে কারা ভ্রমণ করবে, খেলবে কিংবা প্রতিনিধিত্ব করবে, তা এখনো নির্ধারণ করে ভূরাজনীতিই। বিশ্বকাপের শুরুর সপ্তাহগুলোতেই মার্কিন কর্তৃপক্ষের প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের কারণে খেলাধুলার পরিবেশ বিঘ্নিত হয়েছে। রেফারিদের যুক্তরাষ্ট্রে ঢুকতে দেওয়া হয়নি, অ্যাক্রিডিটেশন কার্ডধারী পেশাদারদের ডিপোর্ট করা হয়েছে এবং কর্মকর্তারা ভিসা—জটিলতায় পড়েছেন। এ ছাড়া বিভিন্ন দেশের খেলোয়াড়সহ প্রতিনিধিদল ইমিগ্রেশনে হয়রানির শিকার হয়েছে এবং সমর্থকদের ভ্রমণ পরিকল্পনা ভেস্তে গেছে। ফলে শুরুর আগে এবারের বিশ্বকাপ নিয়ে বিতর্কের সৃষ্টি হয়। আয়োজক দেশের চাপিয়ে দেওয়া নানা বিধিনিষেধ নিয়ে ফিফা রহস্যজনকভাবে নীরব ভূমিকা পালন করেছে।
এরপর বল মাঠে গড়ানোর পর থেকেই রেফারিদের বিতর্কিত সিদ্ধান্ত অনেক দলকেই ছিটকে দিয়েছে। ভিআরের অতিরিক্ত ব্যবহার ফুটবলের সৌন্দর্যে ছেদ ফেলেছে। বিতর্কিত সিদ্ধান্তের ফলে জার্মানির মতো দেশ ছিটকে পড়েছে। ইরান তো নকআউট পর্বেই যেতে পারেনি। সর্বশেষ সেনেগালকে বিদায় নিতে হয়েছে শেষ ৩২ দল থেকেই।
১২৫ মিনিটে সেনেগালের বিপক্ষে যে পেনাল্টি দেওয়া হলো সেটি নিয়ে ইংল্যান্ডের সাবেক ডিফেন্ডার গ্যারি নেভিল বলেছেন, ‘পেনাল্টির সিদ্ধান্তটি সঠিক ছিল না।’ আয়ারল্যান্ড ও ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড কিংবদন্তি রয় কিন বলেন, ‘পেনাল্টির সিদ্ধান্তটা একটু বেশিই কঠোর হয়ে গেছে, আর রেফারিও মনিটর দেখতে বেশি সময় নিয়েছেন। রেফারির সিদ্ধান্তে একটা দৃঢ়তা থাকা উচিত, অথচ তিনি দীর্ঘ সময় ধরে দ্বিধাদ্বন্দ্বে ভুগছিলেন।’ এই সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে সরব হয়েছেন সুইডেনের সাবেক কিংবদন্তি ফুটবলার ইব্রাহিমোভিচও। ফক্স স্পোর্টসকে দেওয়া এক সাক্ষাত্কারে তিনি সরাসরি বলেন যে, সেনেগালকে ‘ডাকাতি’ করে হারানো হয়েছে। তার মতে, বেলজিয়াম খেলোয়াড় সংঘর্ষটিকে অতিরঞ্জিত করে দেখিয়েছেন এবং রেফারি তাতে বিভ্রান্ত হয়েছেন।
ইংল্যান্ডের সাবেক ডিফেন্ডার গ্যারি নেভিল সোজাসাপ্টা বলে দিয়েছেন, ‘আমি মনে—প্রাণে বিশ্বাস করি, ওটা কোনোভাবেই পেনাল্টি ছিল না।’ খেলার মাঠে কামারার সাথে তিলেমান্সের হালকা শরীরী সংঘর্ষ হয়েছিল ঠিকই, কিন্তু নকআউটের অতিরিক্ত সময়ের শেষ মুহূর্তে তা পেনাল্টি দেওয়ার মতো গুরুতর অপরাধ ছিল কি না, তা নিয়ে বিতর্ক অন্তহীন। সেনেগালিজদের জন্য এই ক্ষত আরো বেশি পুড়ছে। কারণ চলতি বছরের শুরুতেই আফ্রিকা কাপ অব নেশনসের (আফকন) ফাইনালে মরক্কোর বিপক্ষেও ঠিক একইভাবে যোগ করা সময়ে ভিএআরের বিতর্কিত পেনাল্টি সিদ্ধান্তের শিকার হতে হয়েছিল তাদের। সেবার ক্ষোভে দল নিয়ে মাঠ ছেড়েছিলেন কোচ পাপে থিয়াও। এবার মাঠ না ছাড়লেও কান্নাভেজা চোখে বিদায় নিয়েছেন।
শেষ বত্রিশের ম্যাচে কর্নার থেকে জার্মানি বল জালে জড়ালেও রেফারি ভিএআর যাচাই করে তা বাতিল করে দেন। মিশরের বিপক্ষে শেষ মুহূর্তের জয়সূচক গোল অফসাইডের কারণে বাতিল হওয়ায় গ্রুপ পর্ব থেকেই বিদায় নিতে হয় ইরানকে। ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ম্যাচে ঘানার খেলোয়াড় ডি—বক্সে ফাউলের শিকার হলেও রেফারি কোনো পেনাল্টি দেননি। খেলা চলাকালীন বাধ্যতামূলক ‘হাইড্রেশন ব্রেক’ বা জলপানের বিরতি নিয়ে সমালোচনা তৈরি হয়েছিল, কারণ টিভি সমপ্রচারকারী সংস্থাগুলো এই বিরতিকে বিজ্ঞাপন দেখানোর কাজে ব্যবহার করেছিল।
