বয়স যখন ২৫০ বছর
২৫০ বছর আগে আমেরিকার যে ফাউন্ডিং ফাদাররা প্রথমে ডিক্লারেশন অব ইন্ডিপেনডেন্স, পরে সংবিধান প্রণয়ন ও তারপরই প্রথম সংশোধনীর মধ্য দিয়ে যে দেশটির যাত্রাপথ নির্মাণ করেছিলেন, এতদিন পরে পড়লে মনে হয় তারা একটি মানবিক দেশ গড়ে তোলার লক্ষ্যে ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছিলেন। যদিও এই বিশাল ভূমিটি ছিল এদেশের নানা নামের আদিবাসীদের। যারা নৃতাত্ত্বিকভাবে এখানে বসবাস করতেন হাজার হাজার বছর। অবশ্য জর্জ ওয়াশিংটনের যুদ্ধ তাদের বিরুদ্ধে ছিল না। তাদেরকে এই মাটি থেকে উচ্ছেদ অথবা কুক্ষিগত করে রাখার কাজটি সম্পন্ন করেছিল বৃটিশ, স্প্যানিশ, ইতালীয়রা। জর্জ ওয়াশিংটন আমেরিকাকে স্বাধীন করেছিলেন সেই বৃটিশদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে।
আমেরিকা বা ইউনাইটেড স্টেটসকে একটি মহত্তম দেশে পরিণত করার উপাদান রয়ে গেছে এ দেশের সংবিধানে এবং সংশোধনীতে। সংবিধানে যেমন গণতন্ত্রের তিনটি স্তম্ভকে শক্তিশালী করা হয়েছে, তেমনই চতুর্থ স্তম্ভ সংবাদপত্র অর্থাৎ বাক ও ব্যক্তি স্বাধীনতা, ধর্ম চর্চার অধিকারকে স্থায়িত্ব দেয়া হয়েছে প্রথম সংশোধনী ও বিল অব রাইটসে। পঞ্চম সংশোধনীতে বলা হয়েছে, একজন ব্যক্তি যিনি যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থান করবেন তার ইমিগ্রেশন স্ট্যাটাস যাই হোক না কেন তাকে নিরাপত্তা দেয়া হে্ব। যেমন কোনো কাগজপত্রহীন ইমিগ্রান্টকে যদি ডিপোর্ট করার উদ্যোগ নেয়া হয়, সংবিধান অনুযায়ী তার অধিকার আছে আদালতের শরণাপন্ন হয়ে শুনানিতে আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ পাওয়ার। সেই সাথে যদি তিনি চান, কোনো প্রশ্নের উত্তর না দেওয়ারও অধিকার আছে। সংবিধানের এই সংশোধনীতে তাই ইমিগ্রান্টকে ‘পারসন’ বলে উল্লেখ করা হয়েছে। চতুদ্দর্শ সংশোধনীতে নিশ্চয়তা দেয়া হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিতে অবস্থানকালে পিতা—মাতার ইমিগ্রেশন স্ট্যাটাস যাই হোক না কেন সন্তানরা এদেশের নাগরিক হিসাবে গণ্য হবে।
আমেরিকার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো, নিজ দেশে রাজনৈতিক মতপার্থক্য এবং অন্য যে কোনো জাতিগত, লিংগ ভেদে, বা পারিারিক নির্যাতনের শিকার হয়ে বা আশংকায় আমেরিকার কোনো প্রবেশ পথে রাজনৈতিক আশ্রয় প্রার্থনা করলে তাদের প্রবেশাধিকর দেয়া হয়। পরবতীর্ পর্যায়ে সেই অভিযোগ প্রমাণ করে এ দেশে অস্থায়ী বা স্থায়ীভাবে বসবাস করার অনুমতি পাওয়া যায়। এই আইনটি অবশ্য সংবিধানে বা সংশোধনীতে নেই, এর জন্য প্রণীত হয় ইমিগ্রেশন এন্ড ন্যাশনালিটি এ্যাক্ট (আইএনএ)।
আমেরিকা বিশাল দেশ। অজ¯্র প্রান্তর মানুষহীন। অথচ পৃথিবীর কোটি কোটি মানুষ এশিয়া, আফ্রিকার বিভিন্ন দেশে অত্যন্ত ঘনবসতির মধ্যে বাস করে। কোটি কোটি মানুষ কর্মহীন। কোটি কোটি মানুষ তিনবেলা পেটপুরে খেতে পায় না। আমেরিকা গড়ে তুলতে অনেক মানুষের প্রয়োজন ছিল। আফ্রিকা থেকে একদা মানুষদের স্বল্পমূল্যে কিনে এনে আমেরিকায় বিক্রি করে দেয়া হতো। তারা ছিল দাস। তারা রাস্তা বানিয়েছে, রেললাইন বসিয়েছে, জাহাজ নির্মাণ করেছে, সর্বোপরি অবকাঠামো নির্মাণ করেছে। যাদের শ্রমে আমেরিকার অবকাঠামো গড়ে উঠেছে, তাদের স্বীকৃতি দেয়া হয়নি, প্রয়োজনীয় মজুরি দেয়া হয়নি। এমনকি মানবাধিকার থেকেও বঞ্চিত করা হয়। তাদেরকে বৈষম্যমূলকভাবে পৃথক করা হয়। কারণ তারা দাস। যেন তারা অর্ধেক মানুষ। তাছাড়া তাদের গায়ের রং ছিল ভিন্ন।
উনবিংশ শতকে নানা অজুহাতে দক্ষিণ এশীয় ইমিগ্রান্টদের নিষিদ্ধ করা হয়। এইসব ইমিগ্রান্ট অমানুষিক যন্ত্রণা ভোগ করেন। অথচ আফ্রিকা, এশিয়া ও দক্ষিণ আমেরিকার ইমিগ্রান্টরা বিকশিত করতে থাকেন এই দেশের খেলাধূলা ও সংগীত জগতকে। আজো সেই ধারা অব্যাহত রয়েছে। লেখালেখির জগতেও এই শোষণ, অধিকারহীনতা ও অবদমনের মধ্যেই মাথা চাড়া দিয়ে উঠেছেন জেমস বল্ডুইন, ল্যাংস্টন হিউজ, মায়া এনজেলো, টনি মরিসন, র্যালফ এলিসন, আমিরি বারাকা, এলেক্স হ্যালি, জোরা নিল হাস্টর্ন, রিচার্ড রাইট, বেল হুকস, এলিস ওয়াকার প্রমুখ।
আমেরিকার ফাউন্ডিং ফাদাররা ছিলেন মিলিটারি জেনারেল, অর্থনীতিবিদ, দার্শনিক, ইতিহাসবিদ, বিজ্ঞানী। তাদের জনগণকেন্দ্রিক স্বাতন্ত্রের কারণে আমেরিকান উচ্চবগীর্য়রা ইয়োরোপ থেকে এলেও তারা এদেশের গণতন্ত্র, শাসন ব্যবস্থা, বিচার ব্যবস্থা এবং রাজনৈতিক কাঠামোকে ইয়োরোপীয় কাঠামোর প্রায় সম্পূর্ণ বিপরীত হিসাবে গড়ে তোলেন। স্থানীয় সরকার থেকে শুরু করে হোয়াইট হাউজকে জবাবদিহিতার আওতায় আনা হয়। বিচার ব্যবস্থায় কারো জন্য ছাড় দেয়া হয়নি। রাজতন্ত্রকে প্রত্যাখ্যান করা হয়েছে।
কিন্তু এই পদ্ধতিগুলোর বাস্তবায়ন খুব সহজ ছিল না। আমেরিকার ক্ষমতাসীনরা দাস ব্যবসার সাথে জড়িত থাকা বা দাস পুষতেন বলে এই প্রথার বিলোপ করতে প্রায় ১০০ বছর কেটে যায়। সংবিধানে ‘সব মানুষ সমান’ বলা হলেও নারীরা ভোটাধিকার পায় প্রায় ১৪০ বছর পরে। কৃষ্ণাঙ্গরা শ্বেতাঙ্গদের সমানাধিকার পেতে প্রায় ১৯০ বছর চলে যায়। গত ২৫০ বছরে আমেরিকা নিজেদের যেমন সবচেয়ে শক্তিশালী দেশ হিসাবে প্রমাণ করেছে, এর পাশাপাশি অস্ত্র ম্যানুফ্যাকচারিং ব্যবসার জন্য পৃথিবীজুড়ে বিভিন্ন দেশকে চোখ রাঙিয়ে চলেছে। আলবার্ট আইনস্টাইন, নিকোলা টেসলা, সেরগেই ব্রিজ (গুগল), ইলন মাস্ক (স্পেসএক্স ও টেসলা), এ্যান্ড্রু গ্রোভ (ইনটেল), অমর বোস (বোস সাউন্ড), আলেকজান্ডার গ্রাহাম বেল (টেলিফোন), এর পাশপশি এ্যাপল এর ভিশনারী স্টিভ জবস (সিরিয়ান) পৃথিবীর মানুষের জীবনযাপন পদ্ধতি পাল্টে দিয়েছেন ইমিগ্রান্ট হিসাবে।
আমেরিকাকে বলা হয় ‘ল্যান্ড অব ইমিগ্রান্টস’। কিন্তু ২৫০ বছর পর আজ ইমিগ্রান্টদের কপালে নানা অপবাদের কালি। গণতন্ত্রের পরিবর্তে যেন একনায়কতান্ত্রিক ব্যবস্থা, বিচারিক সমতা এবং জবাবদিহিতার যে প্রাসাদ তার ভিত্তিকে কাঁপিয়ে দেয়া হচ্ছে।
আমেরিকা অন্য কোটি ইমিগ্রান্টের মতো বাংলাদেশীদেরও। তারা স্টার স্প্যাংগল্ড ব্যানারের সামনে ন্যাশনাল এ্যানথেম বাজানোর সময় বুকে হাত দিয়ে দাঁড়িয়ে সম্মান জানায়। ২৫০ বছর আগে যারা মানুষকে এবং মানুষদের অধিকারকে, গণতন্ত্র চর্চাকে সবকিছুর আগে স্থান দেয়ার যে রূপরেখা দিয়ে গিয়েছিলেন, সব আমেরিকান যেন সেই ঐশ্বর্যকে ওপরে তুলে ধরতে পারেন। ২৫০তম প্রতিষ্ঠা বার্ষিকীর দিনে এটাই আমাদের প্রত্যাশা।
