জুলাইয়ের জয় ও যন্ত্রণার কথা || আনিস আহমেদ
আজ ৪ জুলাই যুক্তরাষ্ট্রের স্বাধীনতা দিবস উদযাপিত হচ্ছে। আজ থেকে আড়াই শ’ বছর আগে ১৭৭৬ সালের এই দিনে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র অনুমোদন করে কন্টিনেন্টাল কংগ্রেস। এই কন্টিনেন্টাল কংগ্রেস হচ্ছে একগুচ্ছ আইনি সংগঠন যা কার্যত যুক্তরাষ্ট্রের ১৩টি উপনিবেশে তৎকালীন অস্থায়ী সরকারের ভূমিকা পালন করে। ১৭৭৪ সালে এই কংগ্রেস ফিলাডেলফিয়ায় প্রথম অধিবেশনে বসে এবং ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলে, আমেরিকান বিপ্লবের দিকে এগিয়ে যায় এবং স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র অনুমোদন করে। এই ঐতিহাসিক ঘোষণায় ব্রিটিশ রাজতন্ত্রকে আনুষ্ঠানিকভাবে এটা জানিয়ে দেওয়া হয় যে ১৩টি আমেরিকান উপনিবেশ একটি স্বাধীন রাষ্ট্র হবার অভিপ্রায়ে ব্রিটিশ রাজতন্ত্রের সঙ্গে সকল বাঁধন ছিন্ন করছে। বস্তুত এরও দিন দুয়েক আগে ১৭৭৬ সালের ২ জুলাই এই উপানিবেশগুলি ব্রিটেন থেকে পৃথক হওয়ার পক্ষে ভোট দিয়েছিল। তবে ওই ঘোষণার শব্দ ও বাক্যগুলি ঠিক করতে দু’দিন সময় নিয়ে ৪ জুলাই স্বাধীনতা ঘোষণা করে। যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম ফাউন্ডিং ফাদার জন অ্যাডামস সেই যে বিখ্যাত পূর্বাভাসটি দিয়েছিলেন তার মূল কথা ছিল যে এই দিনটিকে আগামী প্রজন্ম এই মহাদেশের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্ত অবধি আনন্দের সঙ্গে উদযাপন করবে। সেই সময়ে আমেরিকানরা একই সঙ্গে সুসংবাদ ও দুঃসংবাদ পাচ্ছিলেন। ফিলাডেলফিয়ায় যখন ‘লিবার্টি বেল’ বা মুক্তির ঘন্টা বাজছিলো তখন নিউইয়র্কে ব্রিটিশ সৈন্যরা এসে নামে। আর সেই সময় থেকে ১৫ মাস ধরে আমেরিকান ও ব্রিটিশ সৈন্যদের মধ্যে সশস্ত্র সংঘাত চলতে থাকে। ১৭৭৬ সালের ৯ জুলাই তদানীন্তন জেনারেল জর্জ ওয়াশিংটন নিউইয়র্ক সিটিতে সৈন্য মোতায়েন করে তাঁর লোকদের জন্য স্বাধীনতার ঘোষণা উচ্চ কন্ঠে পাঠ করার নির্দেশ দেন। তিনি আশা করেন তারা এই স্বাধীনতা যুদ্ধের নতুন অর্থ খুঁজে পাবে।
প্রকৃতপক্ষে স্বাধীনতা দিবসে ইতিহাস জানার যতখানি প্রয়োজন ততখানি কিংবা সম্ভবত তার চেয়েও বেশি প্রয়োজন স্বাধীনতাকে অন্তর থেকে অনুভব করা। আড়াই শ’ বছর পেরিয়ে এলো যুক্তরাষ্ট্র। হয়ত এখনকার প্রজন্ম সে ইতিহাসও সম্পূর্ণভাবে জানেনা। কিন্তু তারা তাদের আবেগ দিয়ে অনুভব করে এই স্বাধীনতা দিবসকে। অনুভব করে আজও যদি তারা ব্রিটিশ উপনিবেশ হয়ে থাকতো তাহলে বিশ্বব্যাপী তাদের যে অর্জন এবং খ্যাতি তার কোনোটাই তারা পেতো না। কোনো কোনো ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র ও বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে কিছু কিছু মিল খুঁজে পাই। যেমন, স্বাধীনতা ঘোষণার দিনটিই স্বাধীনতা দিবস হিসেবে পালিত হয়ে আসছে এবং এই আনুষ্ঠানিক স্বাধীনতা ঘোষণার পর প্রত্যক্ষ লড়াই এক ভয়াবহ রূপ ধারণ করে। বাংলাদেশে ২৬ মার্চ জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান স্বাধীনতার ঘোষণা দেন এবং সেদিন থেকেই শুরু হয় আমাদের মুক্তিযুদ্ধ, যেমনটি হয়েছিল যুক্তরাষ্ট্রেও। তবে এই ঐতিহাসিক সমীকরণের চাইতেও বেশি গুরুত্বপূর্ণ কথা হলো স্বাধীনতাকে আন্তরিকভাবে উপলব্ধি করা। যুক্তরাষ্ট্রের জেন—জি হয়ত সম্পূর্ণ ইতিহাস জানে না। কিন্তু তারা উৎসবে আয়োজনেই কেবল নয়, মনে প্রাণে স্বাধীনতা দিবসটিকে লালন করে। তারা জর্জ ওয়াশিংটন, আব্রাহাম লিংকন কিংবা জর্জ অ্যাডামসকে কখনোই ছোট করে দেখেনি। যুক্তরাষ্ট্রেও এই আড়াই শ’ বছরে প্রতিবাদ আন্দোলন হয়েছে একাধিকবার। কিন্তু কখনোই তারা স্বাধীনতা দিবসকে কিংবা স্বাধীনতার জন্য লড়াইকে খাটো করে দেখেনি। অন্যদিকে আমরা লক্ষ্য করছি ২০২৪ সালের জুলাই মাসের আন্দোলনের পর এই জেন—জি বাংলাদেশের প্রতি মানুষের অনুভূতিকে বিনষ্ট করতে উদ্যত। তারা জুলাইয়ের সাজানো আন্দোলনকে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সঙ্গে তুলনা করে, মুক্তিযোদ্ধা ও জুলাই যোদ্ধাকে এক করে দেখে এবং মুক্তিযুদ্ধের অবমূল্যায়ন করে।
এক জুলাই যুক্তরাষ্ট্রের স্বাধীনতাকে স্বতঃস্ফূর্তভাবে সানন্দে উদযাপন করে, অপর জুলাই বাংলাদেশের স্বাধীনতাকে খর্ব করে, বিলুপ্ত করার চেষ্টা করে। এই পরিহাসমূলক পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের স্বাধীনতাপ্রিয় অধিকাংশ মানুষ হতবাক হয়ে গেছে। আপন দেশের স্বাধীনতার এই অবমূল্যায়ন, জুলাইয়ের তথাকথিত আন্দোলনে অত্যন্ত পরিকল্পিতভাবে ধুলিস্মাৎ করা হলো কেবল তাই—ই নয়, হাস্যকরভাবে ক্যালেন্ডারের সকল নিয়ম ভঙ্গ করে ৫ আগস্টকে করা হলো ৩৬শে জুলাই। অথচ এই সব কথিত আন্দোলনকারীরা ভুলে গেলেন এই জুলাইরে সূচনায় ২০১৬ সালে হোলি আর্টিজানে উগ্রবাদীদের হামলায় হতাহতদের কথা। প্রশ্ন উঠতেই পারেÑ কেন? সহজ উত্তর হলো হোলি আর্টিজানে যারা আক্রমণ চালিয়েছিল তাদেরই অনুগামীরা জুলাইয়ের এই কথিত আন্দোলনের পেছনে ছিল। সেই অপ্রিয় সত্য কথাটা প্রথমে স্পষ্ট না হলেও পরে আমরা সকলেই বুঝতে পারছি, জুলাইয়ের ঘটনার পরিণতি দেখে। বাংলাদেশে জুলাই হলো উগ্রবাদের উত্থানের মাস, যে উগ্রবাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিয়েছিলো শেখ হাসিনার সরকার। যে উগ্রবাদ সম্পর্কে বার বার সতর্ক করেছে যুক্তরাষ্ট্রও। যুক্তরাষ্ট্রে আজ যে স্বাধীনতা দিবস সানন্দে উদযাপন করা হচ্ছে সেই যুক্তরাষ্ট্র তো গণতন্ত্রের মশাল জ্বেলে এগিয়ে গেছে এই আড়াইশ’ বছর। কারণ মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকার সংরক্ষণই ছিল যুক্তরাষ্ট্রের স্বাধীনতা লড়াইয়ের মূলমন্ত্র। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের কারণও ছিল বাংলাদেশের মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকার অর্জন ও সংরক্ষণ। বাংলাদেশের মানুষ দেখেছে পাকিস্তান সৃষ্টির পর অসংখ্যবার তাদের গণতান্ত্রিক অধিকার লংঘিত হয়েছে। কেবলমাত্র ভোটের অধিকার নয়, ভাষার অধিকার, সংস্কৃতির অধিকার, বাঙালি জাতিসত্ত্বার অধিকার লংঘন করেছে পাকিস্তানিরা। কাজেই বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধও ছিল যুক্তরাষ্ট্রের স্বাধীনতার লড়াইয়ের মতো মানবিক অধিকার অর্জনের লড়াই। এ লড়াইয়ের সূচনা সেই ১৯৪৮ সাল থেকে। তবে প্রত্যক্ষ যুদ্ধ হলো একাত্তরের ২৬ মার্চ থেকে ১৬ ডিসেম্বর পর্যন্ত। বাংলাদেশের এই মুক্তি সংগ্রামের মতোই যুক্তরাষ্ট্রের স্বাধীনতা সংগ্রামও ছিল দীর্ঘ এবং বিভিন্ন অধ্যায়ে বিভক্ত। তবে লক্ষ্য অভিন্ন, মানুষের অধিকার অর্জন।
দুর্ভাগ্যবশত সেই জুলাই মাসেই বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের মূল আদর্শ কেবল যে লংঘিত হলো তাই—ই নয়, মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসকে বিলীন করে দেয়ার সুপরিকল্পিত প্রয়াস লক্ষ্য করলাম আমরা। তবে আশার দিকটি হলো বাংলাদেশের স্বাধীনতাকে বিলীন এমনকি মলিনও করা যাবে না কোনোদিন, যেমন জাগ্রত থেকেছে গত ২৫০ বছর ধরে যুক্তরাষ্ট্রের স্বাধীনতা। আর বাংলাদেশেও গণতন্ত্রের সকল শত্রু বিলুপ্ত হবে। মানুষের চোখে ধূলি দেয়ার জন্য যে বৈষম্য বিরোধিতার কথা বলা হলো, আজকের বাংলাদেশ সেই বৈষম্য থেকে মুক্ত নয়। বৈষম্যের বিরুদ্ধে আওয়াজ তুলতে হলে গণতন্ত্রের মাধ্যমে অর্জিত বাংলাদেশের স্বাধীনতার যথার্থ মূল্যায়ন করতে হবে। আজ যুক্তরাষ্ট্রের এই স্বাধীনতা দিবসে যেমন অভিনন্দন জানাই প্রতিটি আমেরিকানকে, তেমনি চেয়ে আছি সেদিনের জন্য যেদিন বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের অবমূল্যায়ন, জাতির জনকের অবমাননা সম্পূর্ণভাবে বন্ধ হবে এবং বাংলাদেশের মানুষ ফিরে যাবেন সেই কষ্টার্জিত মুক্তিযুদ্ধের আদর্শের প্রতি। এই প্রত্যাশার প্রদীপ যেমন মনে জ্বলছে বরাবর, তেমনি জুলাইয়ের বিস্ময়কর বেদনাও আমার মতো প্রবাসী বাঙালির মনে জুলাইয়ের আনন্দকে ম্লান করে দেয়।
