আমেরিকার ২৫০ বছর নতুন প্রজন্মের ভাবনা

1.পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ দেশগুলোর একটি || দেবনীল ডি. নাথ

নিউইয়র্কের কুইন্সে জন্ম বেড়ে ওঠা একজন ১৬ বছর বয়সী হিসেবে, আমেরিকার ২৫০তম জন্মদিন আমার কাছে অত্যন্ত অর্থবহ। এটি আমাকে ভাবতে শেখায়, আমাদের দেশ কত দূর এগিয়ে এসেছে। আমার বাবামা বাংলাদেশ থেকে যুক্তরাষ্ট্রে অভিবাসী হয়েছিলেন, কারণ তাঁরা নিজেদের এবং তাঁদের ভবিষ্যৎ সন্তানদের জন্য একটি উন্নত জীবন চেয়েছিলেন। তাঁরা বিশ্বাস করতেন, আমেরিকা তাঁদের এমন সুযোগ দেবে যা তাঁরা নিজ দেশে কখনও পেতেন না। তাঁদের কষ্ট ত্যাগের কারণে আমি বিশ্বের সবচেয়ে বৈচিত্র্য্যময় শহরে বেড়ে ওঠার সুযোগ পেয়েছি। আমেরিকায় সবার জন্য যে অসীম সুযোগ স্বাধীনতা রয়েছে, তা আমি অনুভব করতে পেরেছি।

আমেরিকার ২৫০তম বার্ষিকী উদযাপন আমাকে মনে করিয়ে দেয় যে আমি এমন একটি দেশের অংশ, যার দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে। একটি দেশ যা অসাধারণ সাফল্য অর্জন করেছে, আবার নিজের ভুল থেকেও শিক্ষা নিয়েছে। এই ২৫০ বছরের ইতিহাস শুরু হয়েছিল যখন উপনিবেশগুলো গ্রেট ব্রিটেন থেকে স্বাধীনতা ঘোষণা করে। উপনিবেশবাসীদের ওপর কর আরোপ করা হচ্ছিল এবং তাঁদের সঙ্গে অন্যায় আচরণ করা হচ্ছিল। তাঁদের মূল স্লোগান ছিল, ‘প্রতিনিধিত্ব ছাড়া কর নয় তাঁরা ব্রিটেনের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেন এবং যুদ্ধে অংশ নেন। স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র ব্রিটিশ শাসনের অবসান ঘটায় এবং আমেরিকার জন্ম স্বাধীনতাকে সুপ্রতিষ্ঠিত করে। এটি ১৭৭৬ সালে স্বাক্ষরিত হয়েছিল এবং ইতিহাসকে চিরতরে বদলে দিয়েছিল।

তবে আমেরিকার শুরুটা ছিল অনিশ্চিত কঠিন। দেশের প্রথম সরকার ছিল খুবই দুর্বল। কনফেডারেশনের শর্তগুলো কার্যকর ছিল না, এবং আমেরিকার একটি শক্তিশালী জাতীয় সরকারের প্রয়োজন ছিল। সংবিধানের জন্ম আমেরিকাকে চিরতরে বদলে দেয়। আজও যে সরকারব্যবস্থা ব্যবহৃত হচ্ছে, তার ভিত্তি হলো এই সংবিধান। সংবিধান সরকারের তিনটি শাখা এবং ক্ষমতার ভারসাম্য নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করে, যাতে কোনো এক ব্যক্তি বা শাখা অতিরিক্ত ক্ষমতাশালী হয়ে উঠতে না পারে। যুক্তরাষ্ট্রের জনগণের অধিকার রক্ষার জন্য সংবিধানে বিল অব রাইটস যোগ করা হয়। এটি বাক্স্বাধীনতা, ধর্মীয় স্বাধীনতা এবং ন্যায্য বিচারের অধিকারের মতো গুরুত্বপূর্ণ স্বাধীনতাগুলো সুরক্ষিত করে।

যদিও ২৫০ বছরের ইতিহাস সামগ্রিকভাবে ইতিবাচক মনে হতে পারে, এর অনেক সময়ই তা ছিল না। আমেরিকা সব সময় সবার জন্য ন্যায্য সমান ছিল না। দাসপ্রথা আমেরিকার ইতিহাসের একটি বড় অংশ। বৈষম্য ছিল একটি বড় সমস্যা, এবং আজও এর বিরুদ্ধে সংগ্রাম চলছে। সমান অধিকারের জন্য বহু আমেরিকান নাগরিক অধিকার আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়েছেন। তাঁদের প্রচেষ্টা আফ্রিকানআমেরিকানদের জন্য পথ তৈরি করেছে এবং সব আমেরিকানের জন্য সমতার অগ্রগতি ঘটিয়েছে। ১৩তম সংশোধনী দাসপ্রথা বিলুপ্ত করে। ১৪তম সংশোধনী আফ্রিকানআমেরিকানদের নাগরিকত্ব দেয়। ১৫তম সংশোধনী তাঁদের ভোটাধিকার দেয়।

আমেরিকার ইতিহাসের দীর্ঘ সময়জুড়ে নারীরাও সমান আচরণ পাননি। তাঁদের সব সময় পুরুষদের মতো একই অধিকার সুযোগ দেওয়া হয়নি। ইতিহাসজুড়ে নারীরা পরিবর্তন আনার জন্য বহু প্রচেষ্টা চালিয়েছেন। সুসান বি. অ্যান্থনি এবং অ্যালিস পলের মতো নারীরা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের নারীদের জন্য পথ তৈরি করেছেন। ১৯তম সংশোধনী নারীদের ভোটাধিকার। এই অধিকারটি যা শুরু থেকেই তাঁদের পাওয়া উচিত ছিল।

গত ২৫০ বছরে অনেক কষ্ট সংগ্রাম থাকলেও আমি এখনও বিশ্বাস করি, আমেরিকা বিশ্বের শ্রেষ্ঠ দেশগুলোর একটি, এবং তার ইতিহাসজুড়ে এটি অসাধারণভাবে এগিয়ে গেছে। আমি এর ইতিহাসের অংশ হতে পেরে এবং এর চলমান অগ্রগতির অংশ হতে পেরে গর্বিত।


2.আড়াইশ বছরের সংগ্রাম ইমিগ্রান্টদের || ফাসীর কবির কাব্য

১৭৭৬ সালের জুলাই ফিলাডেলফিয়ায় একদল মানুষ এমন এক ঘোষণাপত্রে স্বাক্ষর করেছিলেন, যার প্রতিধ্বনি তাঁদের জীবনকাল অতিক্রম করে আড়াই শতাব্দী ধরে অনুরণিত হয়েছে এবং ভবিষ্যতেও হবে। সেই ঘোষণার মূল বাণী ছিলসকল মানুষ সমানভাবে সৃষ্ট এবং এমন কিছু অবিচ্ছেদ্য অধিকারের অধিকারী, যা কোনো সরকার প্রদান বা কেড়ে নিতে পারে না।

২০২৬ সালে যুক্তরাষ্ট্র ২৫০তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উদযাপন করতে যাচ্ছে। কিন্তু এই ঘোষণাকে যদি একটি সম্পূর্ণ অর্জন হিসেবে দেখা হয়, তবে তা ইতিহাসের প্রতি এক ধরনের অন্ধত্ব হবে। যাঁরা এই শব্দগুলো লিখেছিলেন, তাঁরাও জানতেনএটি কোনো সমাপ্তি নয়; বরং এক দীর্ঘ যাত্রার সূচনা। এটি ছিল একটি প্রতিশ্রুতি, যা প্রতিটি প্রজন্মকে নতুন করে বাস্তবায়ন করতে হয়েছে।

১৮৫২ সালে স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষে বক্তৃতা দিতে গিয়ে সাবেক দাস মহান বক্তা ফ্রেডেরিক ডগলাস উৎসবের আনুষ্ঠানিক উচ্ছ্বাসে শরিক হতে অস্বীকার করেছিলেন। তিনি স্মরণ করিয়ে দিয়েছিলেন যে স্বাধীনতার অর্থ সবার কাছে এক নয়, এবং কোনো আদর্শকে সত্যিকার অর্থে সম্মান জানাতে হলে তার অপূর্ণতাকেও স্বীকার করতে হয়। প্রকৃতপক্ষে, আমেরিকার ইতিহাস হলো সেই অপূর্ণ প্রতিশ্রুতিগুলোকে বাস্তবতায় রূপ দেওয়ার নিরন্তর সংগ্রামের ইতিহাস। ইমিগ্রান্টদের অভিজ্ঞতাও সেই ইতিহাসেরই অবিচ্ছেদ্য অংশ।

আজ আমি লিখছি তাঁদের একজন হিসেবে, যাঁদের অন্তর্ভুক্ত করতে আমেরিকার সেই প্রতিশ্রুতিগুলোকে সময়ের সঙ্গে বিস্তৃত হতে হয়েছে। আমি এমন এক আমেরিকায় বেড়ে উঠেছি, যাকে দেশটির প্রতিষ্ঠাতারা কল্পনাও করতে পারেননি। আর সেই বৈচিত্র্যই আমেরিকার সবচেয়ে বড় শক্তি। আড়াইশ বছরের এই যাত্রা মূলত লক্ষ লক্ষ ইমিগ্রান্টের স্বপ্ন, শ্রম, ত্যাগ আত্মউপলব্ধির ইতিহাসযাঁরা পৃথিবীর নানা প্রান্ত থেকে এসে আমেরিকাকে প্রতিনিয়ত নতুনভাবে নির্মাণ করেছেন।

আমেরিকার শক্তি কেবল তার সামরিক ক্ষমতা বা অর্থনৈতিক প্রভাবের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। তার প্রকৃত শক্তি নিহিত রয়েছে বহু ভাষা, বহু সংস্কৃতি বহু ধর্মকে একই সামাজিক কাঠামোর মধ্যে ধারণ করার অসাধারণ সক্ষমতায়।

আমেরিকা ইমিগ্রান্টদের দেশ’Ñএই বাক্যাংশটি এতবার উচ্চারিত হয়েছে যে, এটি প্রায় স্লোগানে পরিণত হয়েছে। কিন্তু একজন ইমিগ্রান্টের সন্তান হিসেবে আমি মনে করি, এর প্রকৃত অর্থ বোঝার জন্য আমাদের থামতে হবে। আমেরিকাকে নির্মাণ করেছে মূলত ইমিগ্রান্টদের শ্রম। 

আমাদের খাদ্যতালিকার খাবারগুলো মানে চলমান সময়ের খাদ্যাভ্যাস, স্কুলের মাঠে শেখা কথ্য ভাষা (স্ল্যাং), এবং আমি যে ইংরেজিতে কথা বলি তার ব্যাকরণযে ইংরেজি শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে স্প্যানিশ, ইদ্দিশ উলফ (ডড়ষড়ভ) ভাষার শব্দ অভিব্যক্তিকে আত্মস্থ করে এসেছেএসবই সেইসব মানুষের রেখে যাওয়া চিহ্ন, যারা এখানে এসে নীরব হয়ে মিশে যেতে অস্বীকার করেছিলেন; বরং নিজেদের স্বতন্ত্র পরিচয়কে পুনরায় প্রতিষ্ঠিত দৃঢ় করার চেষ্টাই করেছিলন। যা বর্তমানেও আমাদের প্রাত্যহিক জীবনাচারের সাথে মিশে আছে, আমরা সেই ধারাবাহিকতারই উত্তরসূরী।

এই যে আমেরিকায় বাঙালিদের উপস্থিতির ইতিহাস, তা আমাদের অধিকাংশের ধারণার চেয়েও অনেক পুরনো। গবেষক বিবেক বাল্ড তাঁর গবেষণায় দেখিয়েছেন, ১৮৮০ সালের কাছাকাছি সময়ে বাঙালি ফেরিওয়ালারা এলিস আইল্যান্ড হয়ে আমেরিকায় এসেছিলেন। কথিত আছে, আজকের বাংলাদেশের নোয়াখালী, সন্দ্বীপ সিলেট অঞ্চলের অনেক লোকজন ব্রিটিশ জাহাজে খালাসি নাবিকের চাকুরি নিয়ে নতুন জীবন ভাগ্য বদলের আশায় নিউইয়র্ক বাল্টিমোর বন্দরে সুযোগ পেলে নেমে পড়তেন এবং নতুন জীবন শুরু করতেন। যে জীবনের প্রত্যাশায় তাঁরা পা বাড়াতেন, তা অতো সহজ ছিলো না। পদে পদে ছিল অনিশ্চয়তার শংকা। বর্ণবাদী আইন তাঁদের নাগরিকত্বের পথে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করলেও তাঁরা  সেদিন থেমে যাননি। তারা কৃষ্ণাঙ্গ, বোরিকুয়া ক্রেওল নারীদের সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হয়ে পরিবার গড়েছিলেন এবং হারলেম, নিউ অরলিন্স ডেট্রয়েটের শ্রমজীবী এলাকায় তাঁরা বসতিও গড়েছিলেন।

ইমিগ্রান্টদের ইতিহাস কোনো সরল রূপকথা নয়। যে বৈচিত্র্যময় এক অধ্যায়, তা সৃষ্টি হয়েছে সংঘর্ষ, বিনিময়, সহাবস্থান এবং আন্তঃসম্পর্কের মাধ্যমে। এই মিথস্ক্রিয়াই আমেরিকার সৃজনশীলতা প্রাণশক্তির উৎস।

নিউইয়র্ক এই বৈচিত্র্যের এক উজ্জ্বল উদাহরণ। বাংলাদেশী ইমিগ্রান্ট পরিবারের সন্তান হিসেবে এই শহরেই আমার বেড়ে ওঠাশৈশবের প্রথম ভাষা শেখা থেকে যে সংস্কৃতির সাথে পরিচয়, সবই এই বহুমাত্রিক সাংস্কৃতিক পরিবেশে। মায়ের হাত ধরে যে সংস্কৃতি চর্চা, তা আমাকে শিখিয়েছে নিজের শেকড়ের গুরুত্ব। একই সঙ্গে উপলব্ধি করেছিএই সমাজে বৈচিত্র্যকে দুর্বলতা নয়, বরং শক্তি হিসেবে দেখা হয়। বিভিন্ন সংস্কৃতির বিনিময় সমাজকে সমৃদ্ধ করে, নতুন চিন্তা, উদ্ভাবন সৃজনশীলতার জন্ম দেয়। তাই ইমিগ্রান্টরা কেবল অর্থনীতির চালিকাশক্তি নয়; শিক্ষা, চিকিৎসা, বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, সাহিত্য শিল্পকলাসহ নানা ক্ষেত্রে তাদের অবদান অনস্বীকার্য।

ছোটবেলায় আমি যখন নানুর সাথে ডাক্তারের চেম্বারে যেতাম, আমি নানুর কথা ডাক্তারদের ইংরেজিতে অনুবাদ করে শোনাতাম, আবার ডাক্তারের পরামর্শ নানুর বোধগম্য বাংলায় বুঝিয়ে দিতাম। আর সুযোগ পেলে  প্রবীণদের অনেক দরকারি কাগজপত্র ইংরেজি থেকে বাংলায় অনুবাদ করেও শোনাতাম।
মার্কিন সংবিধানের প্রথম সংশোধনী (ঋরৎংঃ অসবহফসবহঃ) একসঙ্গে বাকস্বাধীনতা, সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা, সমাবেশের অধিকার এবং ধর্মীয় স্বাধীনতার নিশ্চয়তা দেয়। কিন্তু কাগজে লেখা এই অধিকারগুলো বাস্তবে অর্থবহ হয়েছে তাঁদের কারণে, যাঁরা ঝুঁকি নিয়ে এগুলোর চর্চা করেছেন।

দাসপ্রথাবিরোধী আন্দোলন, ১৮৪৮ সালের সেনেকা ফলস সম্মেলনে নারীদের ভোটাধিকারের দাবি, কিংবা ভিয়েতনাম যুদ্ধবিরোধী ছাত্র আন্দোলনসবই দেখিয়েছে যে, ভিন্নমত কখনো দেশপ্রেমের বিপরীত নয়; বরং তা দেশপ্রেমেরই এক গভীর প্রকাশ।

১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে জর্জ হ্যারিসন রবিশংকর নিউইয়র্কের ম্যাডিসন স্কয়ার গার্ডেনেকনসার্ট ফর বাংলাদেশআয়োজন করেছিলেন। এটি ইতিহাসের প্রথম বৃহৎ মানবিক সহায়তা কনসার্ট হিসেবে স্বীকৃত। আমেরিকার স্বাধীন মত প্রকাশ সমাবেশের অধিকারই এই দূরবর্তী মানবিক বিপর্যয়কে বিশ্বদৃষ্টিতে নিয়ে এসেছিল।

আজ আমি যখন বাংলা কবিতা আবৃত্তি করি, মঞ্চে নৃত্য পরিবেশন করি বা নিজের ভাষায় কথা বলি, তখন সেই একই স্বাধীনতার সুফলই ভোগ করি। যদিও সেন্সরশিপ, নজরদারি, বর্ণবাদ জাতীয়তাবাদী প্রতিক্রিয়া বারবার এই স্বাধীনতাকে চ্যালেঞ্জ করেছে, তবুও সাধারণ মানুষের অবিচল প্রতিরোধই এটিকে বাঁচিয়ে রেখেছে।

আজ একই রাস্তায় মসজিদ, মন্দির, গির্জা, সিনাগগ গুরুদ্বার পাশাপাশি দাঁড়িয়ে আছে। মুসলিম, হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান, ইহুদি কিংবা ধর্মনিরপেক্ষসকলেই সমান সাংবিধানিক অধিকার ভোগ করে। কিন্তু ধর্মীয় বৈষম্য এখনো কী পুরোপুরি বিলুপ্ত হয়েছে! ইতিহাস দেখায়, প্রতিটি নতুন ধর্মীয় সংখ্যালঘুকে একসময়অতি বিদেশিবলে চিহ্নিত করা হয়েছে। তবুও আমেরিকার ধর্মীয় স্বাধীনতার আদর্শ ক্রমাগত বিস্তৃত হয়েছে, এবং হবে।

অধিকাংশ ইমিগ্রান্ট একটি উন্নত জীবনের সন্ধানে আমেরিকায় আসে। কিন্তু তাদের সামনে থাকে ভাষাগত প্রতিবন্ধকতা, সাংস্কৃতিক দূরত্ব, অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা এবং পরিচয়ের জটিল প্রশ্ন। এসব বাধা অতিক্রম করেই তাঁদের এগিয়ে যেতে হয়। প্রথম প্রজন্মের ইমিগ্রান্টদের জীবন প্রায়ই কঠোর পরিশ্রম আত্মত্যাগে ভরা; তারা নিজেদের চেয়ে পরবর্তী প্রজন্মের ভবিষ্যৎ গড়ে তুলতেই বেশি মনোযোগী থাকেন।

ফলস্বরূপ তাদের সন্তানরা উন্নত শিক্ষা পেশাগত সাফল্যের সুযোগ পায়। তাই তো আজ ইমিগ্রান্ট পরিবারের সদস্যরা চিকিৎসক, প্রকৌশলী, অধ্যাপক, বিজ্ঞানী, উদ্যোক্তা, শিল্পী জনপ্রতিনিধি হিসেবে আমেরিকার মূলধারায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছেন। অবশ্য এই সংগ্রামগুলো খুব কমই ইতিহাসের বইয়ে স্থান পায়। যা বহু ভাষায়, বহু সংস্কৃতিতে এবং বহু মানুষের হাত ধরে প্রতিনিয়ত পুনর্নির্মিত হয়।

3.গড ব্লেস আমেরিকা ফাতিমা জেড কাইয়ুম

আমার বাবা, ইমাম কাজী কাইয়ুম একজন আন্তঃধর্মীয় ইমাম সমাজকর্মী। গত ৩৫ বছর ধরে তিনি বৃহত্তর নিউইয়র্কের কমিউনিটির সেবা গর্বের সঙ্গে করে আসছেন এবং এখনও করে যাচ্ছেন। তাঁর কারণেই আমি আমার দেশকে ফিরিয়ে দিতে পারছি সেই মূল্যবোধ, যা আমার বাবা একজন বাংলাদেশী ইমিগ্রান্ট হিসেবে দিয়েছেন। তিনি ১৯৯১ সালে শান্তি জীবনের নিরাপত্তার আশায় যুক্তরাষ্ট্রে এসেছিলেন।

বর্তমানে আমি যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনীর একজন সামরিক কর্পসম্যান হিসেবে কাজ করছি মেরিল্যান্ডে অবস্থিত ওয়াল্টার রিড ন্যাশনাল মিলিটারি হাসপাতালে। আমি আনন্দের সঙ্গে বলতে চাই যে, আমার বাবা প্রতিদিন আমাকে অনুপ্রাণিত করেন। তিনি আমাকে মনে করিয়ে দেন কেন আমি আমার দেশের জন্য এত কঠোর পরিশ্রম করতে চাইÑসেই যুক্তরাষ্ট্রের জন্য, যেখানে আমি জন্মেছি এবং বড় হয়েছি কুইন্সের জ্যাকসন হাইটস এলাকায়, যাকে মিনি বাংলাদেশও বলা হয়।

তিনি সারাজীবন আমাকে দেখিয়েছেন কেন তিনি আমাদের দেশ, যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি এত কৃতজ্ঞ। কেন এই দেশটি বিশ্বের সর্বশ্রেষ্ঠ দেশ। আর সেই কারণেই আমার দেশের জন্য কিছু দিতে পারছি বলে আমি খুব গর্বিত। তা যত সামান্যই হোক। আমার পরিবার আমাকে আশা এবং স্বপ্ন দেখার সুযোগ দেওয়ার জন্য ধন্যবাদ, আমেরিকা!

আমি নৌবাহিনীর সব প্রশিক্ষণ গ্র্যাজুয়েশন সম্পন্ন করেছি ইলিনয়ের শিকাগোর গ্রেট লেকে অবস্থিত ইউএস নেভি রিক্রুটিং ট্রেনিং কমান্ড সেন্টারে। এরপর টেক্সাসের ফোর্ট স্যামে নৌবাহিনী সামরিক চিকিৎসা বিষয়ে আমার প্রশিক্ষণ শেষ করি। ২০২৬ সালের মে মাসে মেরিল্যান্ডের ওয়াল্টার রিড ন্যাশনাল মিলিটারি হাসপাতালে যোগ দিয়ে আমার কর্মজীবন শুরু করি এবং একজন উচ্চমানের সামরিক চিকিৎসক হওয়ার লক্ষ্য নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছি।

আমি ২০ বছর বয়সী এবং আমার দুই ভাইবোনের মধ্যে সর্বকনিষ্ঠ। আমার বোন মরিয়ম কাইয়ুম, ২৪ বছর বয়সী। তিনি যুক্তরাষ্ট্রের সেনাবাহিনীতে ফোর্ট ব্র্যাগ, নর্থ ক্যারোলাইনায় সক্রিয় দায়িত্বে লজিস্টিকস বিভাগে গর্বের সঙ্গে পাঁচ বছরের সেবা শেষ করেছেন। তাঁর জন্য আমি এবং আমার পরিবার অত্যন্ত গর্বিত। আমার একমাত্র ভাই রমাদান কাইয়ুম, ২২ বছর বয়সী। তিনি অ্যাসোসিয়েট ডিগ্রি সম্পন্ন করেছেন। আমার বাবামায়ের সেবা করেন, খন্ডকালীন কাজ করেন এবং উচ্চশিক্ষার বাকি পথের জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছেন।

আমি এবং আমার বোন চেয়েছিলাম, সে যুক্তরাষ্ট্রের বিমানবাহিনীতে যোগ দিক। কিন্তু সে বাবামায়ের কাছাকাছি থেকে তাঁদের সেবা করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। আমরা তার জন্যও গর্বিত।

উপসংহারে, আমি আন্তরিকভাবে ধন্যবাদ জানাতে চাই আমাদের পারিবারিক অভিভাবক, আমার সম্মানিত চাচা মি. কাদির খান এবং তাঁর পরিবারকেআমার এই সাফল্যের পথে, আমার আমেরিকান স্বপ্ন অর্জনে সহায়তা করার জন্য।

আমি আমার স্নেহময়ী মা, দাদি, পরিবারের সদস্য, পারিবারিক বন্ধুদেরও সালাম কৃতজ্ঞতা জানাই আমাদের আগামীর সাফল্যের জন্য তাঁদের অব্যাহত দোয়া, সমর্থন উৎসাহের জন্য।

সবশেষে, সবকিছুর জন্য মহান আল্লাহর কাছে অশেষ কৃতজ্ঞতা!

গড ব্লেস আমেরিকা!



4.দুই পরিচয় নিয়েই আমি গর্বিত || আলভান চৌধুরী

নিউইয়র্ক সিটিতে জন্ম বেড়ে ওঠা একজন বাংলাদেশীআমেরিকান হিসেবে, আমেরিকার ২৫০তম জন্মদিন আমার জন্য এই দেশের ইতিহাস এবং এর ভেতরে আমার নিজের অবস্থান নিয়ে ভাবার এক অর্থবহ সুযোগ। আমার পরিবারের শিকড় বাংলাদেশে হলেও, যুক্তরাষ্ট্রই সেই দেশ যেখানে আমি জন্মেছি, বড় হয়েছি এবং আমার লক্ষ্য স্বপ্ন পূরণের সুযোগ পেয়েছি। নিউইয়র্ক সিটিতে বেড়ে ওঠার ফলে আমি বিশ্বের অন্যতম বৈচিত্র্যময় সমাজের অভিজ্ঞতা লাভ করেছি, যেখানে ভিন্ন সংস্কৃতি পটভূমির মানুষ প্রতিদিন একসঙ্গে বসবাস কাজ করে। বাংলাদেশী সম্প্রদায়ের সঙ্গে সক্রিয়ভাবে যুক্ত থাকা আমাকে আমার ঐতিহ্য, সংস্কৃতি মূল্যবোধের সঙ্গে সংযুক্ত থাকতে সাহায্য করেছে, একই সঙ্গে একজন আমেরিকান হিসেবে আমার পরিচয়কেও গ্রহণ করতে শিখিয়েছে। ১৭৭৬ সালের স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র থেকে শুরু করে পরবর্তী বহু সংগ্রাম অর্জন পর্যন্ত এই জাতির ইতিহাস সম্পর্কে জানা আমাকে সেই স্বাধীনতা সুযোগের প্রতি আরও গভীর কৃতজ্ঞতা দিয়েছে, যা প্রজন্মের পর প্রজন্ম আমেরিকানরা রক্ষা প্রসারিত করার জন্য কাজ করেছেন।

আমি নিজেকে প্রকাশ করি এবং অন্যদের সঙ্গে যুক্ত হই, তার একটি উপায় হলো গান গাওয়া। সংগীত সব সময়ই মানুষকে একত্র করার এক শক্তিশালী মাধ্যম। সংস্কৃতি, ভাষা বা পটভূমি যাই হোক না কেন। আর এটি আমেরিকাকে অনন্য করে তোলা বৈচিত্র্যকেও প্রতিফলিত করে। বাংলাদেশী কম্যুনিটি এবং বৃহত্তর নিউইয়র্ক সিটি কম্যুনিটি, উভয়ের সঙ্গে আমার সম্পৃক্ততার মাধ্যমে আমি দেখেছি, ভিন্ন জীবনপথের মানুষ কীভাবে নিজেদের ঐতিহ্য উদযাপন করতে করতে একটি যৌথ আমেরিকান পরিচয়ে অবদান রাখতে পারে। আমেরিকা যখন তার ২৫০তম জন্মদিন উদ্যাপন করছে, তখন আমি বাংলাদেশী আমেরিকান এই দুই পরিচয় নিয়েই গর্বিত এবং এই দেশ আমার পরিবারসহ অসংখ্য মানুষকে যে সুযোগ দিয়েছে, তার জন্য কৃতজ্ঞ। এই বার্ষিকী শুধু জাতির অতীতের উদযাপন নয়; এটি আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে আমেরিকার ভবিষ্যৎ আমার মতো বৈচিত্র্যময় সম্প্রদায়গুলোর মাধ্যমেই গড়ে উঠতে থাকবে। আমাদের ইতিহাসকে সম্মান জানিয়ে, পার্থক্যগুলোকে গ্রহণ করে এবং একটি সাধারণ ভবিষ্যতের লক্ষ্যে একসঙ্গে কাজ করে আমরা নিশ্চিত করতে সাহায্য করতে পারি যে আমেরিকার গল্পের পরবর্তী অধ্যায় হবে ঐক্য, সুযোগ এবং অগ্রগতিরÑআগামী প্রজন্মের জন্য।

5.বিতর্ক ও দ্বিমত আমেরিকার রাজনীতির বৈশিষ্ট্য || তৃষা আরেফিন

যুক্তরাষ্ট্রের জন্য ২৫০ বছর তার ইতিহাসের একটি অধ্যায় মাত্র। সমগ্র ইতিহাস জুড়ে যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধ এবং বৈষম্যের মতো নানা প্রতিকূলতার মুখোমুখি হয়েছে। তার পঞ্চম শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে এসে, জাতির এই ২৫০তম বার্ষিকীর (সেমিকুইনসেন্টেনিয়াল) মাইলফলক আমাকে এর অতীতের দিকে ফিরে তাকাতে, বর্তমানে মনোনিবেশ করতে এবং এর ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রশ্ন তুলতে বাধ্য করেছে। এই দেশের আগামী অধ্যায়গুলোতে কী অপেক্ষা করছে, এবং এটি কি তার প্রতিষ্ঠার মূল নীতিগুলোর জন্য লড়াই চালিয়ে যাবে? ‘জীবন, স্বাধীনতা এবং সুখের অন্বেষণ’—সব আমেরিকানদের এই তিনটি অবিচ্ছেদ্য অধিকার এবং একটি অঙ্গীকার যে আমাদেরসরকার শাসিতদের সম্মতি থেকে তার ক্ষমতা লাভ করে,’ যা ১৭৭৬ সালে স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রে আমাদের ফাউন্ডিং ফাদাররা খসড়া করেছিলেন। এই দলিলটি ছিল আমাদের ফাউন্ডিং ফাদাররা কীভাবে আমাদের রাষ্ট্র পরিচালিত হবে তা নিয়ে তৈরি করা একটি রূপরেখা, এবং এই নীতিগুলোর জন্যই তারা গ্রেট ব্রিটেনের বিরুদ্ধে স্বাধীনতার লড়াই করেছিলেন। যদিও এই দলিলটি এই জাতির জন্য একটি নতুন সূচনার জন্ম দিয়েছিল, একই সাথে এটি এই স্বপ্নগুলোকে বাস্তবায়িত করার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের এক দীর্ঘ সংগ্রামেরও সূচনা করেছিল। এটিই তার ইতিহাসের অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য। আধুনিক বিশ্বেও এর ধারাবাহিকতা বজায় রয়েছে। ১৮৬১ থেকে ১৮৬৫ সাল পর্যন্ত গৃহযুদ্ধ (সিভিল ওয়ার) এই জাতিকে দুটি সুনির্দিষ্ট যুক্তিতে বিভক্ত করেছিল: ইউনিয়ন, যা দাসপ্রথা বিলোপের পক্ষে ছিল এবং পশ্চিমমুখী সম্প্রসারণকে সমর্থন করত না; এবং দক্ষিণের ১১টি স্টেট, যারা দাসপ্রথা বিলোপের বিপক্ষে ছিল এবং পশ্চিমমুখী সম্প্রসারণকে সমর্থন করত। এই ঐতিহাসিক ঘটনাটি যুক্তরাষ্ট্রের জন্য অন্যতম বড় একটি সতর্কবার্তা (ওয়েকআপ কল) ছিল, কারণ এটি যে নীতিগুলোর ওপর ভিত্তি করে দেশ গড়ে উঠেছিল, তাকেই চ্যালেঞ্জ করেছিল। গৃহযুদ্ধের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ফলাফলগুলোর একটি ছিল দাসপ্রথার বিলোপ, এবং পরবর্তীতে আমাদের পাঠ্যপুস্তকে এটি এমন একটি জাতি হয়ে ওঠার উল্লেখযোগ্য পদক্ষেপ হিসেবে স্থান পায় যা নিজের ত্রুটিগুলো সংশোধন করতে এবং মূল নীতিগুলোর সাথে একাত্ম হতে সক্ষম। যদিও এটি আমেরিকান সমাজের বৈষম্যের বৃহত্তর সমস্যার সম্পূর্ণ সমাধান করতে পারেনি, তবুও এটি কাগজেকলমে লেখা আদর্শ এবং বাস্তবতার মধ্যকার ব্যবধানের মুখোমুখি হওয়ার ক্ষেত্রে জাতির ইতিহাসে একটি যুগান্তকারী মোড় (ওয়াটারশেড) হিসেবে চিহ্নিত হয়েছিল। প্রায় এক শতাব্দী পর, নাগরিক অধিকার আন্দোলন (সিভিল রাইটস মুভমেন্ট) দেখিয়েছিল যে যুক্তরাষ্ট্র তার প্রতিষ্ঠাকালীন প্রতিশ্রুতি পূরণের থেকে তখনও অনেক দূরে ছিল। নাগরিক অধিকার আন্দোলনের মূল বৈশিষ্ট্য ছিল শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ, নাগরিক সক্রিয়তা এবং বর্ণবৈষম্য অসমতার বিরুদ্ধে দেশের নাগরিকদের আইনি লড়াই। এই আন্দোলনটি যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মোড় ছিল, কারণ এটি যুগান্তকারী আইনি সংস্কারে সহায়তা করেছিল এবং যারা নিপীড়িত বা যে কোনো ধরনের অবিচারের মুখোমুখি হয়েছিল, তাদের জন্য লক্ষ লক্ষ সুযোগের দ্বার উন্মোচন করেছিল। এই আন্দোলনটি আমেরিকান ইতিহাসের একটি পুনরাবৃত্ত সত্যকেও ফুটিয়ে তুলেছে। আরেকটি অধ্যায় যেখানে পরিবর্তন তখনই আসে যখন সম্প্রদায়গুলো অবিচারের বিরুদ্ধে লড়াই করতে এবং এর প্রতিষ্ঠাকালীন নীতিগুলোকে সমুন্নত রাখতে একসঙ্গে এগিয়ে আসে। অতীতের এই ঐতিহাসিক ঘটনাগুলোর ধারা প্রমাণ করে যে, জন্মলগ্ন থেকেই তরুণ আমেরিকানরা যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিটি প্রজন্মকে নতুন রূপ দিয়েছে। ফাউন্ডিং ফাদারদের বেশিরভাগেরই বয়স ছিল বিশের কোঠায়, এবং তরুণ ছাত্র কর্মীরাই ছিলেন নাগরিক অধিকার আন্দোলনের মূল চালিকাশক্তি। এই ধারা আজ আমাদের বর্তমান প্রজন্মেও দৃশ্যমান, যেখানে আমি আমার বয়সী তরুণদের রাজপথে নেমে প্রতিবাদ করতে দেখছি ঠিক সেই একই কারণে যার জন্য আমাদের আগের কিছু প্রজন্ম লড়াই করেছিল, এবং তারা অনলাইনের মাধ্যমে মানুষকে সচেতন করছে বিরোধী পক্ষের সাথে যুক্তিতর্ক করছে। হাই স্কুলের শেষ বর্ষে (সিনিয়র ইয়ার), আমার গভর্নমেন্ট বিষয়ের শিক্ষক আমাকে এবং আমার সহপাঠীদের একটি বিতর্ক প্রতিযোগিতায় অংশ নিতে বলেছিলেন, যা আমাকে আমেরিকার রাজনৈতিক সামাজিক চর্চা এবং আইন সম্পর্কে আমার নিজের মতামতের সম্পূর্ণ বিপরীত কিছু মতামতের মুখোমুখি করেছিল। যখন আমি আমার থেকে ভিন্ন মত পোষণকারী সহপাঠীদের ঠিক বিপরীতে বসেছিলাম, তখন আমরা আলোচনা করেছিলাম যে কেন আমরা আমাদের ব্যক্তিগত মতামতকে সঠিক মনে করি এবং কেন অন্যজন ভুল। যদিও আমি অন্য পক্ষের সাথে একমত হতে পারিনি, তবুও আমি বুঝতে পেরেছিলাম যে আমাদের দ্বিমতগুলো নিয়ে খোলামেলা আলোচনা করা আমেরিকান রাজনীতির অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য। আমেরিকায় দলগুলোর মধ্যে বিতর্ক দ্বিমত থাকা কোনো নতুন বা চমকপ্রদ বিষয় নয়। আমাদের রাজনৈতিক দলগুলো দুটি পক্ষে বিভক্ত, যাদের প্রত্যেকেরই দেশের মঙ্গলের জন্য নিজস্ব চিন্তাধারা রয়েছে এবং তারা আমাদের সরকারে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেয়। তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এই আলোচনাগুলো পরবর্তী প্রজন্মের জন্য এমন একটি ক্ষেত্র তৈরি করে যেখানে তারা প্রশ্ন তুলতে পারে এবং যুক্তরাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ তাদের জন্য কেমন হওয়া উচিত তা নিয়ে নতুন ধারণা গড়ে তুলতে পারে। এই অভিজ্ঞতা একজন ছাত্র সাংবাদিক হিসেবে আমার লক্ষ্যকে নির্ধারণ করে দিয়েছেবিভিন্ন মানুষের কাছ থেকে ভিন্ন ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি শোনা এবং তাদের গল্পগুলো তুলে ধরা। সম্পূর্ণ ভিন্ন পটভূমির একেকজন আমেরিকান নাগরিকের জীবনের গল্পের মধ্য দিয়ে পরোক্ষভাবে বেঁচে থাকার মাধ্যমে আমি বুঝতে পেরেছি যে, যুক্তরাষ্ট্রের মূল নীতিগুলোর কোনো নির্দিষ্ট বা বাঁধাধরা সংজ্ঞা নেই, বরং প্রতিটি আমেরিকান নাগরিকের নিজস্ব পটভূমি এবং অভিজ্ঞতার আলোকে তা ভিন্ন ভিন্ন রূপ নেয়। ২০৭৬ সালে আমেরিকার ৩০০তম বার্ষিকীর (ট্রাইসেন্টেনিয়াল) দিকে তাকালে, ভবিষ্যৎ কী ধারণ করে আছে তা দেখানোর মতো কোনো সুনির্দিষ্ট উত্তর বা মডেল নেই। পরবর্তী প্রজন্ম যখন যুক্তরাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ গঠনে হাত দেবে, তখন তারা যেমন পূর্ববর্তী প্রজন্মের চ্যালেঞ্জগুলোর এক ভারী বোঝা বহন করবে, তেমনই তাদের সাফল্যগুলোকেও ধারণ করবে, যা তাদের স্বপ্নের মতো করে দেশকে গড়ে তোলার জন্য পরিবর্তনের এক নতুন তরঙ্গ তৈরি করতে পারে। আমি বিশ্বাস করি যে, যুক্তরাষ্ট্রের আগামী ৫০ বছর নির্ভর করছে আমেরিকানরা তাদের প্রতিষ্ঠার মূল নীতিগুলোকে ফুটিয়ে তুলে এমন একটি দেশ গঠনে কতটা একসাথে কাজ করতে পারছে তার ওপর। যুক্তরাষ্ট্রের গত ২৫০ বছর এবং এর পরবর্তী অধ্যায়ের দিকে তাকালে এই উপলব্ধিটি একটি অত্যন্ত প্রয়োজনীয় সত্য উন্মোচন করে: এর রূপান্তরযোগ্যতা (সধষষবধনরষরঃু) এবং এর অনিশ্চয়তা।

6.এদেশে বাঙালি—আমেরিকানদের প্রারম্ভিক ইতিহাস || রেনোয়া মাহমুদ

যুক্তরাষ্ট্রে প্রায় ৭৫০,০০০ বাঙালি বসবাস করেন, যারা বিভিন্ন বড় সিটি স্টেটে ছড়িয়ে আছেন। এদেশে বাঙালিআমেরিকানদের ইতিহাস এক শতাব্দীরও বেশি পুরনো, যার শুরু উনিশ শতকের শেষ দিকে। প্রায় ১৮৮১ সাল থেকে পশ্চিমবঙ্গের হুগলি জেলার আশেপাশের গ্রাম থেকে ছোট ছোট বাঙালি ব্যবসায়ী দল স্টিমশিপে করে নিউইয়র্ক বাল্টিমোরের মতো শহরে আসতে শুরু করেন। তারা সঙ্গে করেচিকননামে পরিচিত রেশমি পণ্য আনতেন, যার মধ্যে ছিল শাল, টেবিলক্লথ এবং বালিশের কভার। এই ব্যবসায়ীরা চিকনদার নামে পরিচিত ছিলেন, এবং অর্থ উপার্জনের পর আরও পণ্য আনার জন্য পরিবারসমাজের সঙ্গে পুনরায় যোগাযোগ করতে তারা নিজ শহরে ফিরে যেতেন। পূর্বদেশীয় পণ্য আমেরিকান অভিজাতদের মুগ্ধ করত; তারা এগুলোকে অদ্ভুত আকর্ষণীয় বলে দেখতেন। বিশেষ করে নিউ অরলিন্সে তারা সাফল্য পেয়েছিলেন, যেখানে এশীয় মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর রেশমি পণ্য মার্ডি গ্রাস প্যারেডের ভাসমান মঞ্চ সাজাতে ব্যবহৃত হতো। তবে সমৃদ্ধ বাণিজ্যে অংশ নেওয়া সত্ত্বেও, এই বাঙালিরা জিম ক্রো আমেরিকার জটিল বর্ণবাদী পরিবেশের মুখোমুখি হন।

আমেরিকানদের মনে এশিয়া সম্পর্কে এক ধরনের কল্পনাপ্রবণ, ওরিয়েন্টালিস্ট ধারণা ছিল, আর চিকনদাররা সচেতনভাবেই সেই ধারণাকে কাজে লাগাতেনÑফেজ টুপি পাগড়ি পরে এক ধরনের স্টেরিওটাইপিক্যাল সাজে নিজেদের উপস্থাপন করতেন। তাদেরকালারডমানুষ হিসেবে গণ্য করা হতো এবং দক্ষিণে আফ্রিকানআমেরিকান মিশ্র বর্ণের মানুষেরা যে বৈষম্যমূলক আইন হয়রানির মুখোমুখি হতেন, তারাও একই ধরনের অভিজ্ঞতার শিকার হন। এর ফলে বাঙালিরা ট্রেমের মতো কৃষ্ণাঙ্গ পাড়ায় নিজেদের কম্যুনিটি গড়ে তোলেন। ট্রেমে ছিল যুক্তরাষ্ট্রের প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ পাড়া এবং নিউ অরলিন্সের মুক্ত কালার জনগোষ্ঠীর ঐতিহাসিক কেন্দ্র; ১৯১০ সালে সেখানে আটটি বাঙালি পরিবার বাস করত। এই বাঙালিরা কৃষ্ণাঙ্গ পরিবারের সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন এবং ধীরে ধীরে ট্রেমে সম্প্রদায়ের সঙ্গে একীভূত হয়ে যান। তাদের স্ত্রীরা ব্যবসায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতেন। স্বামীরা পণ্য ফেরি করার সময় তারা পরিবার দেখাশোনা করতেন এবং ব্যবসা পরিচালনায় সহায়তা করতেন। শেষ পর্যন্ত ১৯২০ ১৯৩০এর দশকে মহামন্দার পর কারখানাভিত্তিক বস্ত্র উৎপাদনের অগ্রগতির কারণে চিকনদার বাণিজ্যের অবনতি ঘটে। ১৯১০ সাল থেকে মহামন্দার সময় পর্যন্ত লস্কররাÑ যারা ব্রিটিশ জাহাজে কর্মরত দক্ষিণ এশীয় শ্রমিক ছিলেন, নিউইয়র্ক শহরে জাহাজ নোঙর করার সময় জাহাজ ত্যাগ করতেন। ভালো জীবনের আশায় তারা ইস্পাত কারখানা, জাহাজ নির্মাণ কারখানা, মোটরগাড়ি সংযোজন লাইন এবং অস্ত্র কারখানায় কাজ খুঁজে পান। প্রথম বিশ্বযুদ্ধে অধিকাংশ তরুণ আমেরিকান পুরুষ যুদ্ধে চলে যাওয়ায়, জনশক্তি প্রয়োজন এমন শিল্পখাতে তারা কাজ করার সুযোগ পান। চিকনদারদের মতোই, মহামন্দার সঙ্গে সঙ্গে লস্করদের আগমনও কমে যায় এবং তারা বৃহত্তর আমেরিকান সমাজে একীভূত হয়ে যান। এই প্রারম্ভিক বাঙালিআমেরিকানরা এমন এক সময়ে ইমিগ্রেশন করেছিলেন যখন এশীয়দের বিরুদ্ধে তীব্র বৈষম্য ছিলÑ১৮৮২ সালের চীনা বর্জন আইন এবং ১৯১৭ সালের ইমিগ্রেশন আইন এশীয়দের যুক্তরাষ্ট্রে ইমিগ্রেশন নিষিদ্ধ করেছিল। পশ্চিম উপকূলে স্থানীয়দের সঙ্গে শিখ ইমিগ্রান্টদের উত্তেজনা ১৯০৭ সালের প্যাসিফিক কোস্ট দাঙ্গায় রূপ নেয়, যা ক্যালিফোর্নিয়া, ওয়াশিংটন কানাডার বিভিন্ন শহরে ঘটে।

পূর্ব উপকূলের বাঙালিরা তুলনামূলকভাবে অদৃশ্য থাকতে পেরেছিলেন, কারণ তারা অন্য গোষ্ঠীর তুলনায় সংখ্যায় কম ছিলেন এবং আলাদা কোনো বড় বসতি গড়ে তোলেননি। তাদের পেশার প্রকৃতির কারণে, আমেরিকান শ্রমিকদের কাছে তারা হুমকি হিসেবে বিবেচিত হননি এবং জনসমক্ষে বেশি দৃশ্যমানতাও এড়াতে পেরেছিলেন। এই ইমিগ্রান্টরা আজকের বাঙালিআমেরিকানদের মধ্যে যে উদ্যোক্তা মনোভাব দেখা যায়, তারই প্রতিনিধিত্ব করেন। বাংলাদেশী ইমিগ্রান্টদের সন্তান হিসেবে আমি আমার পরিবার এবং আরও অনেকের সংগ্রামের সঙ্গে সরাসরি মিল খুঁজে পাই; তারা যুক্তরাষ্ট্রে নিজেদের পরিবারের জন্য ভালো জীবন নিশ্চিত করতে ত্যাগ স্বীকার করেছেন এবং কঠোর পরিশ্রম করেছেন। যেমন এই প্রারম্ভিক বাঙালিরা বৈষম্যের মুখোমুখি হয়েছিলেন, তেমনি /১১পরবর্তী পরিবেশ দক্ষিণ এশীয় মুসলিমদের বিরুদ্ধে বর্ণবিদ্বেষী পরিস্থিতি সৃষ্টি করেছিল; আর এখন ডোনাল্ড ট্রাম্প সম্পূর্ণ কিছু দেশকে যুক্তরাষ্ট্রে ইমিগ্রেশনের যোগ্যতা থেকে বাদ দিয়েছেন, যেমন ১৯২৪ সালের ইমিগ্রেশন কোটা আইন করেছিল। এই সংগ্রামের ইতিহাস কত পুরনো তা দেখে আমি যে সুযোগগুলো পেয়েছি তার প্রতি আরও গভীর কৃতজ্ঞতা অনুভব করি, যা আমাকে আমার যা আছে তার সর্বোচ্চ ব্যবহার করতে এবং সাফল্য অর্জনের জন্য আরও অনুপ্রাণিত করে। আমি বিশ্বাস করি, এমন গল্পগুলোই ইতিহাস অধ্যয়ন বোঝার গুরুত্ব দেখায়, যাতে আমরা অতীত থেকে শিক্ষা নিতে পারি এবং ভবিষ্যতের দিকে তাকাতে পারি।

7.আমেরিকার জাতীয় সংগীত || সিজান আহমেদ

আমেরিকার জাতীয় সংগীতদ্য স্টারস্প্যাংলড ব্যানারকেবল একটি গান নয়; এটি যুদ্ধ, দেশপ্রেম এবং এক আকর্ষণীয় বৈপরীত্যের ইতিহাস। অলিম্পিকের মঞ্চ থেকে শুরু করে প্রতি বছরের সুপার বোলের মাঠ পর্যন্ত যে সুর কোটি কোটি আমেরিকানের হৃদয় গর্বে ভরিয়ে তোলে, সেই সুরের জন্মকাহিনী অত্যন্ত রোমাঞ্চকর।

গানটির রচয়িতা ফ্রান্সিস স্কট পেশায় কবি ছিলেন না, বরং ছিলেন একজন আইনজীবী। ১৮১২ সালের যুদ্ধ চলাকালে, ১৮১৪ সালের সেপ্টেম্বরে ব্রিটিশ নৌবাহিনী মেরিল্যান্ডের ফোর্ট ম্যাকহেনরির ওপর টানা ২৫ ঘণ্টার নিরবচ্ছিন্ন গোলাবর্ষণ চালায়। পরদিন সকালে কুয়াশা বারুদের ধোঁয়ার ভেতর দিয়ে ফ্রান্সিস দেখলেন, সব ধ্বংসযজ্ঞের মাঝেও বিশাল তারাখচিত আমেরিকান পতাকাটি গর্বের সঙ্গে উড়ছে। এই দৃশ্যে গভীরভাবে আবেগাপ্লুত হয়ে তিনি জাহাজের ডেকে বসেই দ্রুত একটি কবিতা লিখে ফেলেন, যার মূল শিরোনাম ছিলডিফেন্স অব ফোর্ট এমহেনরি সেই কবিতাই পরে আজকের পরিচিত গানটিতে রূপ নেয়।

গানটি লেখা হওয়ার পরপরই জাতীয় সংগীত হয়ে ওঠেনি। কংগ্রেসের অনুমোদনের পর প্রেসিডেন্ট হার্বার্ট হুভার ১৯৩১ সালের মার্চ এটিকে যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় সংগীত হিসেবে আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করার আগে দীর্ঘ ১১৭ বছর অপেক্ষা করতে হয়েছিল।

মোট চারটি স্তবক নিয়ে গঠিত এই সংগীতটি পরিবেশনের জন্য কঠিন। এর স্বরপরিসর এত নাটকীয়ভাবে উঁচুনিচুতে ওঠানামা করে যে নিখুঁতভাবে গাওয়া অনেক পেশাদার শিল্পীর জন্যও চ্যালেঞ্জ হয়ে থাকে। তবু প্রতিবার এই সুর বেজে উঠলে এটি শক্তিশালীভাবে মনে করিয়ে দেয়বারুদের ধোঁয়া যুদ্ধের আগুনের মধ্য দিয়ে একটি পতাকা, এবং একটি জাতি, কীভাবে টিকে থাকার জন্য লড়েছিল তার কথা।

তবে জাতীয় সংগীতের সবচেয়ে বিস্ময়কর বিদ্রুপাত্মক তথ্যটি এর সুরের মধ্যেই লুকিয়ে আছে। যে সুর আজ আমেরিকার সার্বভৌমত্বের প্রতীক হিসেবে সম্মানিত, সেটি আসলে আনুমানিক ১৭৭৫১৭৭৬ সালে ব্রিটিশ সুরকার জন স্ট্যাফোর্ড স্মিথ লন্ডনের একটি অভিজাত ক্লাবঅ্যানাক্রিয়ন্টিক সোসাইটি জন্য রচনা করেছিলেন। এই ক্লাবটি মূলত অপেশাদার সংগীতশিল্পী মদপ্রেমীদের মিলনস্থল ছিল; তাই মূল সুরটি ছিল এক প্রাণবন্তব্রিটিশ পানীয়সংগীত

আরও আকর্ষণীয় বিষয় হলো, এই সুরটি বিশেষভাবে একজন অত্যন্ত দক্ষ, অপেরাপ্রশিক্ষিত একক কণ্ঠশিল্পীর পরিবেশনার জন্য তৈরি করা হয়েছিল, ফলে বড় কোনো জনসমষ্টির একসঙ্গে গাওয়ার জন্য এটি মোটেই উপযোগী ছিল না। ঠিক এই কারণেই আজও আমেরিকার জাতীয় সংগীত পরিবেশনের সময় স্বরপরিসরের নাটকীয় ওঠানামা সবচেয়ে অভিজ্ঞ শক্তিশালী কণ্ঠশিল্পীদেরও সত্যিকারের সংগীতপরীক্ষার মুখে ফেলে।

8.দুই দেশের গল্প, এক জীবনের পরিচয় || মনন হায়দার

আমার বয়স যখন আট, তখন বাবামা এবং চার বছর বয়সী স্পেশাল নিডস ছোট ভাইকে নিয়ে নিউইয়র্কে চলে আসি। তার আগে আমাদের জীবন ছিল ঢাকার ইস্কাটনে। আমি বিয়াম স্কুলের ইংলিশ ভার্সনে পড়তাম। পড়াশোনার পাশাপাশি ছায়ানটে গান শিখতাম, বাসার কাছেই একটি প্রতিষ্ঠানে ছবি আঁকা শিখতাম, আর ফুটবল, ক্রিকেট হ্যান্ডবলের ক্লাস করতাম। ছোটবেলাটা ছিল ব্যস্ত, আনন্দময় এবং পরিচিত মানুষে ভরা।

আমেরিকায় আসার আগেই আমি এশিয়ার কয়েকটি দেশ ভ্রমণ করেছিলাম। তাই বিদেশ আমার কাছে সম্পূর্ণ নতুন কোনো অভিজ্ঞতা ছিল না। তবু নতুন দেশে স্থায়ীভাবে বসবাসের অভিজ্ঞতা ছিল একেবারেই ভিন্ন। সৌভাগ্যবশত আমাদের ঠিকানা হয় জ্যাকসন হাইটসে, যেখানে বাঙালি কমিউনিটির উপস্থিতি এতটাই শক্তিশালী যে প্রথম দিকে খুব বেশি বিদেশে আছি বলে মনে হতো না। বাংলা ভাষা, পরিচিত খাবার, দোকানপাটÑ সব মিলে নতুন জীবনের শুরুটা কিছুটা সহজ হয়েছিল।

আমি ভর্তি হই পিএস ৬৯এ। স্কুলটির প্রায় অর্ধেক শিক্ষার্থীই ছিল বাঙালি পরিবারের সন্তান। তবু আমার জন্য প্রথম বছরটি ছিল খুব কঠিন। আমি ইংলিশ ভার্সনে পড়লেও ইংরেজিতে সাবলীলভাবে কথা বলতে পারতাম না। থার্ড গ্রেডে প্রতিদিন স্কুলে গিয়ে নিজেকে একা মনে হতো। ভাষার সীমাবদ্ধতার কারণে আমার কোনো বন্ধু ছিল না।

একদিন স্কুল থেকে একটি ডাচ ফার্মে শিক্ষা সফরে গিয়েছিলাম। দুপুরের খাবারের সময় আমি একা একটি টেবিলে বসে ছিলাম, আর আমার সহপাঠীরা সবাই অন্য টেবিলে একসঙ্গে খাচ্ছিল। সেই সফরে আমার মা প্যারেন্ট ভলান্টিয়ার হিসেবে গিয়েছিলেন। বাসায় ফিরে তিনি কেঁদে ফেলেছিলেন, কারণ নিজের চোখে দেখেছিলেন যে ক্লাসে আমার কোনো বন্ধু নেই। সেই দৃশ্যটি আজও আমার মনে গেঁথে আছে।

ভাষার সমস্যার পাশাপাশি আমাকে বুলিংও সহ্য করতে হয়েছে। বাংলাদেশ থেকে নিয়ে আসা একটি জ্যাকেট পরতাম বলে কেউ বলত সেটি নোংরা। আমার দাঁত একটু উঁচু ছিল বলে অনেকে দাঁত নিয়ে উপহাস করত। নতুন দেশে এসে, নতুন ভাষা শিখতে শিখতে, এমন আচরণ একটি শিশুর মনে কতটা কষ্ট দিতে পারে, তখন আমি প্রতিদিন তা অনুভব করেছি।

এর সঙ্গে যোগ হয়েছিল আরেকটি চ্যালেঞ্জÑ নিউইয়র্কের শীত। বাংলাদেশের আবহাওয়ার সঙ্গে এর কোনো মিল ছিল না। তীব্র ঠান্ডা আর কনকনে বাতাস আমাকে বারবার দেশের কথা মনে করিয়ে দিত। অনেক দিন স্কুল থেকে ফিরে শুধু মনে হতো, যদি আবার ঢাকার রোদেলা বিকেলে ফিরে যেতে পারতাম।
কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সবকিছু বদলাতে শুরু করে। থার্ড গ্রেড থেকে ফোর্থ গ্রেডে ওঠার পর আমার কিছু বন্ধু হয়। শুরুতে একজন বাঙালি সহপাঠী আমার জন্য দোভাষীর কাজ করত। পরে আর তার সাহায্যের প্রয়োজন পড়েনি। আমি ধীরে ধীরে ইংরেজিতে আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে কথা বলতে শিখি। তখন আমি নিজেই বাংলাদেশ থেকে সদ্য আসা বাঙালি ছেলের দোভাষী হই। স্কুলের লাইব্রেরি এবং কুইন্স লাইব্রেরি থেকে প্রচুর বই পড়তাম। বই ছিল আমার সবচেয়ে বড় শিক্ষক। পড়তে পড়তেই ভাষা শিখলাম, নতুন পৃথিবীকে চিনলাম, আর নিজের আত্মবিশ্বাস ফিরে পেলাম।

আরও একটি বিষয় আমাকে আশ্বস্ত করেছিল। আমি বুঝতে পারলাম, এখানে বুলিংকে স্বাভাবিক বলে মেনে নেওয়া হয় না। শিক্ষককে জানালে ব্যবস্থা নেওয়া হয়, এমনকি বুলিং করা শিক্ষার্থীর বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক পদক্ষেপও নেওয়া হয়। এতে আমি বুঝলাম, নিজের কণ্ঠস্বর ব্যবহার করা দুর্বলতার নয়, সাহসের পরিচয়।

আমার দাঁতের সমস্যার বিষয়েও স্কুল থেকে বাড়িতে চিঠি পাঠানো হয়। পরে ম্যানহ্যাটানে এনওয়াইইউ ডেন্টিস্ট্রিতে চিকিৎসা নিয়ে দাঁতে ব্রেস লাগাই। ধীরে ধীরে আমার সুন্দর দাঁতের সঙ্গে আত্মবিশ্বাসও ফিরে আসে।

মিডল স্কুলে আমি আইএস ২৩০ পড়েছি, যেখানে অনার্স ক্লাসে সুযোগ পাই। এরপর ভর্তি হই ব্রুকলীন ল্যাটিন স্কুলে, যা নিউইয়র্ক সিটির বিশেষায়িত পাবলিক হাই স্কুলগুলোর একটি। এই পথচলা আমাকে শিখিয়েছে যে শুরুটা যত কঠিনই হোক, অধ্যবসায়, শিক্ষা এবং সুযোগ একসঙ্গে থাকলে মানুষ অনেক দূর যেতে পারে।

আজ আমার বয়স একুশ। এখনো বাবামা এবং ছোট ভাইয়ের সঙ্গে থাকি। পরিবার আমার সবচেয়ে বড় শক্তি। আমার অটিস্টিক ভাইয়ের কাছ থেকে ধৈর্য, সহমর্মিতা এবং নিঃশর্ত ভালোবাসার অর্থ শিখেছি। আর বাবামায়ের ত্যাগ আমাকে প্রতিদিন মনে করিয়ে দেয়, তারা আমাদের ভবিষ্যতের জন্য কত বড় সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন।

অবসর পেলেই আমি ম্যানহ্যাটানে ঘুরতে ভালোবাসি। সেন্ট্রাল পার্কে হাঁটা, জাদুঘরে যাওয়া, চায়না টাউনের রেস্টুরেন্টে খাওয়া কিংবা শুধু শহরের রাস্তায় হেঁটে মানুষের বৈচিত্র্য দেখাÑ এসব আমাকে বারবার মনে করিয়ে দেয়, নিউইয়র্ক এমন একটি শহর যেখানে পৃথিবীর নানা প্রান্তের মানুষ নিজেদের স্বপ্ন নিয়ে আসে।

আমি নিজেকে শুধু একজন আমেরিকান বা শুধু একজন বাংলাদেশী হিসেবে দেখি না। আমি দুই সংস্কৃতির উত্তরাধিকার বহন করি। বাসায় বাংলা ভাষায় কথা বলি, বাংলা খাবার খাই, আমাদের উৎসব পালন করি। আবার একই সঙ্গে আমেরিকার শিক্ষা, বৈচিত্র্য, স্বাধীনতা এবং সুযোগের মূল্যও গভীরভাবে অনুভব করি। আমার পরিচয়ের এই দুই দিক একে অপরের প্রতিদ্বন্দ্বী নয়, বরং তারা একে অপরকে সমৃদ্ধ করেছে।

আমেরিকার ২৫০তম বার্ষিকীতে দাঁড়িয়ে আমি কৃতজ্ঞতা নিয়ে পেছনের পথের দিকে তাকাই। একসময়ের একাকী, ভীত ছোট্ট ছেলেটি আজ আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে নিজের গল্প বলতে পারে। সেই গল্পে আছে বাংলাদেশ, আছে আমেরিকা, আছে সংগ্রাম, আছে সাফল্য। আর আছে এই বিশ্বাসনিজের শিকড়কে আঁকড়ে ধরে নতুন স্বপ্ন গড়া সম্ভব। আমার কাছে এটাই আমেরিকার সবচেয়ে বড় শক্তি, আর কারণেই আমি এই দেশকে ভালোবাসি।

9.সবসময় একটি বৈপরীত্যের দেশ || সুচিস্মিতা লোহানী

২০২৬ সালের জুলাই মাসে যুক্তরাষ্ট্রের দুই শত পঞ্চাশতম বার্ষিকী পূর্ণ হবে। যুদ্ধের মধ্য দিয়ে জন্ম নেওয়া একটি জাতি; সমতা স্বাধীনতার অনুসন্ধানের আকাক্সক্ষায় চালিত। স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রে ফাউন্ডিং ফাদাররা স্বাক্ষর করার পর ২৫০ বছর পেরিয়ে গেছে, যখন তাঁরা গণতন্ত্রের ভিত্তিতে একটি জাতি গড়ার লক্ষ্যে তাঁদের যাত্রা শুরু করেছিলেন। সে সময় গণতন্ত্রের ওপর এই জোর ছিল এক নতুন ঘটনা, আর তাই এটিগ্রেট আমেরিকান এক্সপেরিমেন্টনামে পরিচিত হয়। একটি যথার্থ পরীক্ষার মতোই, এই জাতির ইতিহাসে সাফল্য, ব্যর্থতা এবং বহু শিক্ষা রয়েছে। আজ আমরা এই গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক অর্জন করেছি, কিন্তু তা করছি গভীর অর্থনৈতিক সামাজিক অস্থিরতার এক সময়ে। এমন সময়ে আমাদের বর্তমানকে বোঝার জন্য অতীতের দিকে ফিরে তাকানো ভালো হতে পারে, যাতে আমরা অনুসন্ধান করতে পারি যুক্তরাষ্ট্র কীভাবে বছরের পর বছর বিকশিত হয়েছে এবং ভবিষ্যতে কীভাবে আরও এগিয়ে যাবে।

আমেরিকা সবসময়ই বৈপরীত্যের একটি দেশ। স্বাধীনতা সমতার প্রয়োজন থেকে এর জন্ম, অথচ সেই একই ফাউন্ডিং ফাদাররা, যাঁরা ওই আদর্শগুলো ঘোষণা করেছিলেন, দাসের মালিক ছিলেন। মানুষকে মালিকানাধীন সম্পত্তি হিসেবে দেখা, তাদের স্বাধীনতা থেকে বঞ্চিত করা এবং তাদের কণ্ঠস্বর না দেওয়াএসবই আমেরিকান এক্সপেরিমেন্টের আদর্শের সরাসরি বিরোধী ছিল। তবু সেটিই এই দেশের ভিত্তির অংশ। আমরা কেন আজকের সন্ধিক্ষণে এসে দাঁড়িয়েছি তা সত্যিকারভাবে বুঝতে হলে এই জাতির উৎস বোঝা জরুরি। পরীক্ষাটি বহুবার ব্যর্থ হয়েছে; অনেক ক্ষেত্রেই একই ধরনের বৈপরীত্যের কারণে। তবুও, বৈপরীত্যের পাশাপাশি ভিন্ন মত বিশ্বাসও ছিল। সব ফাউন্ডিং ফাদার দাসের মালিক ছিলেন না, এবং অনেকেই দাসপ্রথার তীব্র বিরোধী ছিলেন। এই পরস্পরবিরোধী আদর্শ জাতিকে ছিন্নভিন্ন করে দেয়, যখন দেশ গৃহযুদ্ধের মধ্য দিয়ে যায়। সেই যুদ্ধ দাসপ্রথার অবসান ঘটায়। সেটিই ছিল এমন এক মুহূর্ত, যখন পরীক্ষাটি সফল হয়েছিল।

ইতিহাসজুড়ে আমেরিকা এমন বহু পরীক্ষায় ব্যর্থ হয়েছে এবং সফলও হয়েছে। এটি নিজেকে ইমিগ্রান্টদের দেশ বলে, কিন্তু বছরের পর বছর আমেরিকায় ইমিগ্রান্টদের সঙ্গে খারাপ আচরণ করা হয়েছে। ১৮০০এর শতকে আইরিশ ইমিগ্রান্ট এবং ২০২০এর দশকে মেক্সিকান ইমিগ্রান্টউভয়ই বৈষম্য, খারাপ কর্মপরিবেশ এবং কঠোর ইমিগ্রেশন নীতির শিকার হয়েছে। এটি আরেকটি বৈপরীত্য, যা সময়ের সঙ্গে বারবার ফিরে এসেছে। আজ, আমাদের জাতির ইতিহাসের এই গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে, আমি সবাইকে অনুরোধ করছি, এই বৈপরীত্য, আদর্শ পরীক্ষাগুলোর দিকে ফিরে তাকান এবং সেগুলো থেকে শিক্ষা নিন। কারণ তা আমাদের বুঝতে সাহায্য করবে আমরা কীভাবে বর্তমান অবস্থায় পৌঁছেছি এবং ব্যর্থ পরীক্ষাগুলো সংশোধন করতে ভুলের পুনরাবৃত্তি এড়াতে আমরা কী করতে পারি। আমেরিকার বয়স ২৫০ বছর, এবং এটি এখনও বেড়ে উঠছে। মহান পরীক্ষাটি চলমান, আর এখন এতে অবদান রাখার পালা আমাদের, যাতে আমরা একে সাফল্যের পথে এগিয়ে নিতে পারি, সবার জন্য স্বাধীনতা ন্যায়বিচারের লক্ষ্যে।


10.আমেরিকান চেতনা সর্বত্র বিরাজমান || লিয়ানা মানহা

আজকের আমেরিকার দিকে তাকালে সহজেই বোঝা যায় যে দেশটি কতটা সমৃদ্ধভাবে বিকশিত হচ্ছে। আসলে, এটি ২৫০ বছর ধরে সমৃদ্ধি অর্জন করে চলেছে, যা সত্যিই অবিশ্বাস্য। দেশের মানুষ, সংস্কৃতি, সুযোগসুবিধা, বৈচিত্র্য এবং আরও অনেক দিক একত্রিত হয়ে একটি বিকাশমান পরিবেশ সৃষ্টি করেছে। তবে, আমেরিকা সবসময় এমন ছিল না, এবং সময়ের সঙ্গে এটি অবশ্যই পরিবর্তিত হয়েছে। প্রকৃতপক্ষে, এটি প্রতিটি মুহূর্তে পরিবর্তিত সমৃদ্ধ হতে থাকে। এই সব পরিবর্তনের মধ্যেও আমেরিকা সম্পর্কে একটি বিষয় কখনও বদলায়নি। এটি কখনও জনগণের মধ্যে বা দেশের ভেতর থেকে হারিয়ে যায়নি। সেই বিশেষ বৈশিষ্ট্য হলো আমেরিকান চেতনা। এটি অধ্যবসায়, দৃঢ়সংকল্প, আশা এবং প্রতিকূলতা মোকাবিলার শক্তির প্রতীক। আমেরিকার গভীর ২৫০ বছরের ইতিহাসে এটি একবারও বিলীন হয়নি, এবং শিগগিরই বিলীনও হবে না। গৌরব, কষ্ট, সমৃদ্ধি দুর্দশার সময়েও এটি অটল ছিল, এবং আমাদের আমেরিকানদের হৃদয়ে চিরকাল বিকশিত হতে থাকবে।

এই সর্বজনীন চেতনা আমেরিকার ইতিহাস অস্তিত্বজুড়ে দেশটিকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া এবং বিকশিত করার জন্য অত্যন্ত মৌলিক প্রভাবশালী একটি ধারণা। পর্যন্ত এই অগ্রগতি আমেরিকাকে তার অন্যতম বৃহৎ অর্জনের কাছে নিয়ে এসেছে, যা হলো এর ২৫০তম বার্ষিকী। ব্যক্তিগতভাবে আমি এই অসাধারণ অর্জন উদযাপন করতে অত্যন্ত গর্বিত উচ্ছ্বসিত, এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য আমার দেশ যেন আরও বেশি সাফল্য অর্জন করে সেই প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখতে চাই। শুধু এটি নিয়ে ভাবলেই আমার মুখে হাসি ফুটে ওঠে, কারণ আমেরিকাকে আরও উঁচুতে পৌঁছাতে এবং আরও উজ্জ্বলভাবে জ্বলতে অনুপ্রাণিত করেছে এর স্থিতিস্থাপকতা অধ্যবসায়। 

আমেরিকান চেতনা সর্বত্র বিদ্যমান জাতির ইতিহাস থেকে শুরু করে আধুনিক যুগের সাধারণ মানুষের মধ্যেও, আমিসহ। আমি বছর আমেরিকার ২৫০তম বার্ষিকী এবং এর এই অবস্থানে পৌঁছানোর ইতিহাস নিয়ে অত্যন্ত রোমাঞ্চিত। এই দীর্ঘ সময়ে আমেরিকা অনেক কিছু অতিক্রম করেছে। জাতির প্রতিষ্ঠা থেকে শুরু করে মহামারি যুদ্ধের মতো চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হওয়া, গুরুত্বপূর্ণ উদ্ভাবন আবিষ্কার, বৈচিত্র্যের বৃদ্ধি, এবং অর্থনৈতিক সংগ্রাম উন্নয়নের অভিজ্ঞতাসময়ের সঙ্গে আমেরিকা বহু প্রভাবশালী পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে গেছে। এই সব পার্থক্য পরিবর্তনের মধ্যেও আমাদের পুরো জাতি তার স্থিতিস্থাপক চেতনাকে অটুট রেখেছে। 

বছর যখন সমগ্র আমেরিকা তার ২৫০তম বার্ষিকী উদযাপন করছে, তখন আমিও এমন একটি অর্জন উদযাপন করতে পারছি বলে গর্বিত। এটি আমার দেশের জন্য একটি বিশাল মাইলফলক, এবং আমেরিকা যে সব বাধা সাফল্যের মুহূর্ত অতিক্রম করেছে তা জানার পর, আমার জাতির সূচনার পর থেকে এত দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেছে দেখে সত্যিই বিস্ময়কর লাগে। এই ২৫০তম বার্ষিকী আমেরিকার দীর্ঘ অর্থবহ ইতিহাসের একটি শক্তিশালী তাৎপর্যপূর্ণ স্মারক। বছরের পর বছর ধরে আমেরিকা যেভাবে বেড়েছে এবং পরিবর্তিত হয়েছে, তা আমাকে সত্যিই অনুপ্রাণিত করে। আমার কাছে এই অর্থবহ মাইলফলক আমেরিকান জনগণ, সংস্কৃতি এবং চেতনার শক্তিকে তুলে ধরে। আগামী বছরগুলোতে আমেরিকা যেন ধরনের আরও অনেক মাইলফলক স্পর্শ করে, সেই প্রত্যাশায় আমি উচ্ছ্বসিত, এবং সেগুলো বাস্তবে ঘটতে দেখার জন্যও আগ্রহী। আমি সবসময় আমেরিকার ভবিষ্যৎ এবং তখন এর অগ্রগতি কীভাবে আরও বৃদ্ধি পাবে তা নিয়ে ভাবতে ভালোবাসি।

আমেরিকার গভীর তাৎপর্যপূর্ণ ২৫০তম বার্ষিকীর মাধ্যমে বর্তমানকে উদযাপন করার পাশাপাশি, আমি বিশ্বাস করি ভবিষ্যতের দিকেও তাকানো অত্যাবশ্যক। ২৫০ বছর আগে কেউ কখনও ভাবেনি যে আমাদের মহান আমেরিকা এমন হবে। তাই, আরও ২৫০ বছর পরে আমেরিকা কেমন দেখাবে? পর্যন্ত আমেরিকার অগ্রগতি আমাকে আশাবাদে পূর্ণ করে, কিন্তু আমার জাতির জন্য সামনে অপেক্ষা করা অসীম সম্ভাবনাগুলোর ব্যাপারে আমি আরও বেশি আশাবাদী।

11.আমি দুই ভুবনের বাসিন্দা || রুহি রহমান

ছোটবেলা থেকেই আমার প্রায়ই মনে হতো আমি একসাথে দুটো ভিন্ন জগতে বাস করছি। স্কুলে আমি ছিলাম আর পাঁচটা সাধারণ আমেরিকান শিক্ষার্থীর মতোইÑযে পড়াশোনা, বন্ধুত্ব আর সবার প্রত্যাশা পূরণের দৌড়ে শামিল। কিন্তু ঘরে ফিরলেই আমি জড়িয়ে যেতাম আমার বাংলাদেশী শিকড়ের সাথেÑভাষায়, খাবারে, ঐতিহ্যে আর মূল্যবোধে। যুক্তরাষ্ট্রে জন্ম বেড়ে ওঠা একজন আমেরিকানবাংলাদেশী হিসেবে আমার এই দ্বৈত সত্তা আমার পরিচয়কে একই সাথে জটিল শক্তিশালী করে তুলেছে। একেবারে অল্প বয়স থেকেই আমি আমার পারিবারিক জীবনের সাথে সহপাঠীদের জীবনের পার্থক্যগুলো খেয়াল করতে শুরু করি। আমার বন্ধুরা যখন উপহার আর ঘর সাজিয়ে ক্রিসমাস উদযাপন করত, আমার পরিবার তখন উদযাপন করত ঈদ, যেখানে থাকত নামাজ, নতুন পোশাক আর হরেক পদের ঐতিহ্যবাহী বাঙালি খাবারে ঠাসা বিশাল সব পারিবারিক আয়োজন। মাঝেমধ্যে মনে হতো, আমি কোথায় আছি তার ওপর ভিত্তি করে আমাকে আমার পরিচয়টা বদলে ফেলতে হচ্ছে। স্কুলে আমাকে উৎসাহিত করা হতো নিজের মতামত প্রকাশ করতে, স্পষ্ট কথা বলতে আর আলোচনায় অংশ নিয়ে নিজেকে মেলে ধরতে। অন্যদিকে, ঘরে আমাকে শেখানো হতো একটু সংযত হতে, মন দিয়ে কথা শুনতে এবং বড়দের মুখের ওপর কোনো কথা না বলে শ্রদ্ধা প্রকাশ করতে। এই দ্বৈত পরিচয় সামলানো সবসময় সহজ ছিল না। এমন কিছু মুহূর্ত গেছে যখন মনে হতো, আমি কোনো জগতেই পুরোপুরি খাপ খাওয়াতে পারছি না। আমেরিকান বন্ধুদের মাঝে মাঝেমধ্যে নিজের সাংস্কৃতিক ব্যাকগ্রাউন্ডের কারণে নিজেকে আলাদা লাগত। আবার ঠিক একই সময়ে, বাংলাদেশী কমিউনিটির ভেতরে আমার বেড়ে ওঠা আর মানসিকতার কারণে আমাকে শুনতে হতো আমিঅতিরিক্ত আমেরিকানহয়ে গেছি। তবে, এই যে দুই নৌকায় পা দিয়ে চলাএই দোলাচলটাই একসময় আমার অন্যতম বড় শক্তিতে পরিণত হয়েছে। দুই সংস্কৃতির আবহে বেড়ে ওঠা আমাকে পৃথিবীটাকে আরও বড় ক্যানভাসে দেখতে শিখিয়েছে। আমি বৈচিত্র্যকে সম্মান করতে, যেকোনো ভিন্ন পরিস্থিতির সাথে খাপ খাওয়াতে এবং বিভিন্ন ব্যাকগ্রাউন্ডের মানুষের সাথে যোগাযোগ স্থাপন করতে শিখেছি। এই অভিজ্ঞতাগুলো সমতা, ন্যায়বিচার এবং সমাজের মতো বিষয়গুলো নিয়ে আমার দৃষ্টিভঙ্গি তৈরিতে সাহায্য করেছেযা আইন বিষয়ের একজন শিক্ষার্থী হিসেবে আমার কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সংস্কৃতি এবং মানুষের পরিচয় কীভাবে তাদের সুযোগ প্রতিবন্ধকতাগুলোকে প্রভাবিত করে, তা আমি খুব কাছ থেকে দেখেছি। আর এটাই আমাকে অন্যের অধিকারের জন্য লড়ার অনুপ্রেরণা জুগিয়েছে। আমার পরিচয় গড়ে তোলার পেছনে ভাষারও একটা মস্ত বড় ভূমিকা রয়েছে। যদিও ইংরেজি আমার প্রথম ভাষা, তবুও বাংলা বুঝতে পারাটাই আমাকে আমার ঐতিহ্যের সাথে বেঁধে রেখেছে, সাহায্য করেছে পরিবারের বয়োজ্যেষ্ঠদের সাথে যোগাযোগ বজায় রাখতে। এটি আমাকে সংস্কৃতির এমন কিছু অলিখিত নিয়ম সূক্ষ¥ অনুভূতি বুঝতে শিখিয়েছে, যা হয়তো অন্যথায় হারিয়েই যেত। একই সাথে, অনেক সময় আমাকে অন্য সংস্কৃতির মানুষের কাছে আমাদের সাংস্কৃতিক রীতিনীতিগুলো ব্যাখ্যা বা অনুবাদ করতে হয়েছে, যার ফলে আমি নিজেকে দুটি ভিন্ন পৃথিবীর মাঝে একটা সেতু বা বন্ধন বলে মনে করি। আমার সত্তা গঠনে নিউইয়র্ক শহরেরও একটা বিরাট অবদান আছে। এমন একটা বৈচিত্র্যময় শহরে বড় হওয়ার কারণে আমি প্রতিনিয়ত বিভিন্ন সংস্কৃতি, প্রেক্ষাপট আর ভিন্ন ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গির মানুষের সান্নিধ্য পেয়েছি। কুইন্স বা ব্রুকলীনের মতো এলাকাগুলো দিয়ে হেঁটে যাওয়ার সময় যখন বিভিন্ন রকমের ভাষা শুনতাম, নানা সংস্কৃতির মেলবন্ধন দেখতাম, তখন এই দ্বৈত পরিচয় নিয়ে নিজেকে আর একা মনে হতো না। নিউইয়র্ক এমন একটা পরিবেশ তৈরি করে দিয়েছিল যেখানে একই সাথে আমেরিকান এবং বাংলাদেশী হওয়াটা কোনো দ্বন্দ্বের বিষয় ছিল না, বরং এটাই ছিল ভীষণ স্বাভাবিক। এই শহরই আমাকে আত্মবিশ্বাসের সাথে বৈচিত্র্যের মাঝে টিকে থাকতে এবং একটি বহুসাংস্কৃতিক পরিবেশের সৌন্দর্যকে উপভোগ করতে শিখিয়েছে। বয়স বাড়ার সাথে সাথে আমি আমার এই দ্বৈত পরিচয়কে মনেপ্রাণে গ্রহণ করার আত্মবিশ্বাস পেয়েছি। আমার আমেরিকান আর বাংলাদেশী সত্তা দুটিকে আলাদা করে দেখার চেয়ে, এখন আমি এগুলোকে আমার ভেতরের একে অপরের সাথে জড়িয়ে থাকা অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে দেখি। এই দৃষ্টিভঙ্গি আমার প্রাতিষ্ঠানিক পেশাগত লক্ষ্যকেও গভীরভাবে প্রভাবিত করেছে। আইনের ছাত্র হিসেবে, ইমিগ্রান্ট সমাজ এবং সুবিধাবঞ্চিত উপেক্ষিত গোষ্ঠীগুলোর নানাবিধ সমস্যা নিয়ে কাজ করতে আমি বিশেষভাবে আগ্রহী। আমার জীবনবোধ আমাকে এই চ্যালেঞ্জগুলোকে একদম ব্যক্তিগত পর্যায় থেকে বুঝতে সাহায্য করে। পরিশেষে বলতে পারি, আমেরিকানবাংলাদেশী হওয়া মানে যেকোনো একটা পরিচয়কে বেছে নেওয়া নয়। এর আসল অর্থ হলো কীভাবে এই দুটি সত্তার মাঝে একটা সুন্দর ভারসাম্য বজায় রাখা যায় এবং সেই অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে নিজের ভেতরের মানুষকে সমৃদ্ধ করা যায়। আমার এই জীবনযাত্রা আমাকে প্রতিকূলতা জয় করতে, পরিস্থিতির সাথে খাপ খাওয়াতে এবং অন্যের প্রতি সহানুভূতিশীল হতে শিখিয়েছেযে গুণগুলো আমার শিক্ষা এবং আগামী দিনের ক্যারিয়ারে আমাকে পথ দেখাবে। দুই ভুবনের মাঝে নিজেকে বিভক্ত ভাবার চেয়ে, আমি এখন নিজেকে এমন একজন মানুষ হিসেবে দেখি যে এই দুটি ভিন্ন ভুবনকে এক সুতোয় বেঁধে দিতে পারে।

12.এখনো অনেক কাজ বাকি || মাহাদিন রহমান

যুক্তরাষ্ট্র তার ২৫০তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উদযাপন করছে, এটি একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক যার সূচনা হয়েছিল ১৭৭৬ সালের জুলাই, যখন দেশটি ব্রিটেনের কাছ থেকে নিজেদের স্বাধীনতা ঘোষণা করেছিল। এর আগে, ব্রিটিশ সরকারের কাছে কর প্রদান নিয়ে আমেরিকান উপনিবেশবাসীদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ছিল, কারণ সেই সরকারে তাদের কোনো মতামত বা প্রতিনিধিত্ব ছিল না। এই ক্ষোভ থেকেইবোস্টন টি পার্টি মতো বিখ্যাত সব প্রতিবাদের জন্ম হয় এবং শেষ পর্যন্ত যুদ্ধের সূত্রপাত ঘটে। দেশের ফাউন্ডিং ফাদাররা যখন ঘোষণা করেছিলেন যে প্রত্যেকেরইজীবন, স্বাধীনতা এবং সুখের অন্বেষণ’—এর অধিকার রয়েছে, তখন তাঁরা জনগণের দ্বারা পরিচালিত সম্পূর্ণ নতুন এক ধরনের শাসনব্যবস্থার সূচনা করেছিলেন।

নিউইয়র্ক শহরের দৃষ্টিকোণ থেকে এই বিশাল উদযাপনটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ এই শহরটিই ছিল স্বাধীনতা যুদ্ধের অন্যতম কেন্দ্রবিন্দু। ১৭৭৬ সালে শহরটি রক্ষার জন্য জর্জ ওয়াশিংটন তাঁর সৈন্যবাহিনী নিয়ে এখানে এসেছিলেন, যার ফলে সংঘটিত হয়েছিল বিশালব্যাটল অব ব্রুকলীনবা ব্রুকলীনের যুদ্ধ। সেই যুদ্ধে আমেরিকানরা পরাজিত হওয়ার পর ব্রিটিশরা দীর্ঘ সাত বছর নিউইয়র্ক শহর দখল করে রাখে এবং এটিকে তাদের প্রধান সামরিক ঘাঁটিতে পরিণত করে। যুদ্ধ শেষ হওয়ার পর নিউইয়র্ক আমেরিকার প্রথম রাজধানীতে পরিণত হয় এবং খোদ ওয়াল স্ট্রিটেই ওয়াশিংটন দেশের প্রথম রাষ্ট্রপতি হিসেবে শপথ গ্রহণ করেন।

এই মাইলফলক উদযাপনের লক্ষ্যে শহরজুড়ে নানা বড় বড় অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে। নিউইয়র্ক হারবারে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা ঐতিহাসিক বড় পালতোলা জাহাজের এক বিশাল আন্তর্জাতিক প্যারেডের আয়োজন করা হয়েছে, যেখানে সাধারণ মানুষ জাহাজে উঠে সেগুলো ঘুরে দেখার সুযোগ পাচ্ছেন। নিউইয়র্ক পাবলিক লাইব্রেরি বিশেষ প্রদর্শনীতে থমাস জেফারসনের হাতে লেখাস্বাধীনতার ঘোষণাপত্র’—এর একটি দুর্লভ কপি সবার জন্য উন্মুক্ত করেছে। লোয়ার ম্যানহ্যাটান থেকে ওয়াশিংটন হাইটস পর্যন্ত ঐতিহাসিক স্থানগুলো পরিদর্শনের পাশাপাশি শহরে বিভিন্নপাবলিক আর্টবা সর্বজনীন শিল্পকর্মের আয়োজন করা হয়েছে, যার মাধ্যমে স্থানীয় জাদুঘরগুলোর গায়ে ইমিগ্রান্টদের নানা গল্প তুলে ধরা হচ্ছে; এছাড়া পানির ওপর বিখ্যাতমেসি ফোর্থ অব জুলাইআতশবাজি প্রদর্শনীটি হতে যাচ্ছে শহরের ইতিহাসে সর্ববৃহৎ আয়োজন।

নিউইয়র্কের বিভিন্ন মানুষের কাছে এই বার্ষিকীর তাৎপর্য ভিন্ন ভিন্ন। যুক্তরাষ্ট্রে জন্মগ্রহণকারীদের জন্য এটি দেশের ইতিহাসের দিকে ফিরে তাকানোর একটি সময়। এটি গণতন্ত্রের টিকে থাকার জন্য গর্ববোধ করার মুহূর্ত, তবে একই সাথে এটি স্বীকার করারও সময় যে স্বাধীনতার প্রাথমিক প্রতিশ্রুতিগুলো শুরুতে সবার জন্য সমানভাবে প্রযোজ্য ছিল না। যার অর্থ হলো, ক্ষেত্রে এখনো অনেক কাজ বাকি। আর ইমিগ্রান্টদের জন্য যারা নিউইয়র্কের জনগোষ্ঠীর একটি বিশাল অংশ। এই ২৫০তম বার্ষিকী প্রমাণ করে যে আমেরিকার স্বাধীনতা সুযোগের আদর্শ আজও জীবন্ত। যারা যুক্তরাষ্ট্রে পাড়ি জমানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন, তাদের কাছে এই মাইলফলকটি এমন একটি স্থিতিশীল দেশের প্রমাণ, যেখানে তারা আরও ভাল জীবন গড়ে তুলতে পারেন এবং সেই শহরে আমেরিকার চলমান আখ্যানের অংশ হয়ে উঠতে পারেন, যা সবসময়ইআমেরিকান ড্রিমবা আমেরিকান স্বপ্নের প্রবেশদ্বার হিসেবে বিবেচিত হয়ে এসেছে।

13.ভাবছি আগামীর যুক্তরাষ্ট্রের কথা || দানিয়াল সামি

যখন আমি আমেরিকা তথা যুক্তরাষ্ট্রের পরবর্তী ২৫০ বছর নিয়ে ভাবি, তখন আমি একটি নিখুঁত দেশের কথা ভাবি না। প্রতিটি প্রজন্মেরই নিজস্ব সমস্যা ছিল, আর আমাদেরও আছে। আমরা দ্রুত প্রযুক্তিগত পরিবর্তন, রাজনৈতিক বিভাজন, অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, এবং ক্রমবর্ধমান একাকীত্বের সময়ে বাস করছি। তথ্য সর্বত্র রয়েছে, কিন্তু বোঝাপড়া প্রায়ই কঠিন মনে হয়। আমরা আমাদের ফোন এবং কম্পিউটারের মাধ্যমে সবসময় সংযুক্ত থাকি, তবুও অনেক মানুষ এখনও নিজেদের বিচ্ছিন্ন মনে করে। কারণেই আমি আশা করি, যুক্তরাষ্ট্র এমন একটি দেশ হবে, যা স্বাধীনতা এবং দায়িত্বÑউভয়কেই মূল্য দেয়। দায়িত্বহীন স্বাধীনতা স্বার্থপরতায় পরিণত হতে পারে, আর স্বাধীনতাহীন দায়িত্ব নিয়ন্ত্রণে পরিণত হয়। একটি সুস্থ সমাজের জন্য দুটিই প্রয়োজন। আমি এমন একটিআমেরিকাদেখতে চাই যেখানে মানুষকে সমালোচনামূলকভাবে চিন্তা করতে, নিজেদের সম্প্রদায়ে অংশগ্রহণ করতে, এবং তাদের সামনে যা রাখা হয়, তা শুধু গ্রহণ করার পরিবর্তে অর্থবহ কিছুতে অবদান রাখতে উৎসাহিত করা হয়।

আমি আশা করি আমরা শিক্ষায় বিনিয়োগ চালিয়ে যাব, শুধু চাকরি পাওয়ার উপায় হিসেবে নয়, বরং চিন্তাশীল সক্ষম মানুষ গড়ে তোলার উপায় হিসেবে। শিক্ষা ব্যবস্থায় মানুষকে শেখানো উচিত কীভাবে প্রশ্ন করতে হয়, তথ্য মূল্যায়ন করতে হয়, পরিবর্তনের সাথে খাপ খাইয়ে নিতে হয় এবং নিজের থেকে ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি বুঝতে হয়। সম্পূর্ণভাবে কারও জন্মগত পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করা উচিত নয়। যে শিক্ষার্থী শিখতে ইচ্ছুক, যে কর্মী নিজেকে উন্নত করতে ইচ্ছুক এবং যে ব্যক্তি ব্যর্থতার পর আবার এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছেÑসকলেরই এগিয়ে যাওয়ার একটি বাস্তব সুযোগ থাকা উচিত।

আমি এটাও চাই যে যুক্তরাষ্ট্র উদ্ভাবনের একটি স্থান হিসেবেই থাকুক। আগামী ২৫০ বছরে সম্ভবত এমন অগ্রগতি আসবে, যা আমরা আজ কল্পনাও করতে পারি না। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, চিকিৎসা ক্ষেত্রে নতুন আবিষ্কার এবং নতুন উদ্ভাবন মানুষের জীবনকে উল্লেখযোগ্যভাবে উন্নত করার সম্ভাবনা রাখে। তবে অগ্রগতির একটি উদ্দেশ্য থাকা উচিত। মানুষের সমস্যা সমাধানে, কষ্ট কমাতে, সুযোগ বাড়াতে এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য আমাদের উত্তরাধিকার হিসেবে পাওয়া পৃথিবীর চেয়ে আরও ভালো একটি পৃথিবী রেখে যেতে যেন সাহায্য করে নতুন নতুন উদ্ভাবনা।

একই সঙ্গে, আমি আশা করি আমরা ঘৃণা ছাড়া কীভাবে মতভেদ করতে হয়, তা শিখব। একটি স্বাধীন সমাজে মতের পার্থক্য এড়ানো যায় না এবং এটি আমাদের চিন্তার দুর্বলতাগুলো প্রকাশ করে বিকল্পগুলো বিবেচনা করতে বাধ্য করে এবং আমাদের আরও ভালোও করতে পারে। সমস্যা তখনই শুরু হয়, যখন মতভেদ ঘৃণায় পরিণত হয় এবং মানুষ একে অপরকে বোঝার চেষ্টা করার পরিবর্তে বিভিন্ন নাম পরিচয়ে সীমাবদ্ধ করে ফেলে।

একজন অনিশ্চিত সময়ে প্রাপ্তবয়স্ক জীবনে প্রবেশ করা মানুষ হিসেবে, আমার কাছে সব উত্তর নেই। আমার প্রজন্ম একই সঙ্গে বড় সুযোগ এবং গুরুতর চ্যালেঞ্জের উত্তরাধিকার পেয়েছে। আমাদের কাছে আগের যেকোনো প্রজন্মের চেয়ে বেশি জ্ঞানের সুযোগ রয়েছে, কিন্তু একই সঙ্গে ক্রমশ জটিল হয়ে ওঠা একটি পৃথিবীতে নিজের পথ খুঁজে নেওয়ার কঠিন কাজও রয়েছে। আমাদের মধ্যে অনেকেই নিজেদের ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রশ্ন করে এবং ভাবে, আজ আমরা যে পরিশ্রম করছি, তা সত্যিই আগামীকাল কোনো অর্থ বহন করবে কিনা।

তবুও, আমি মনে করি আশা করা এক ধরনের সিদ্ধান্ত। যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাস কখনোই নিখুঁত ছিল না। এটি এমন মানুষের ইতিহাস, যারা সমস্যাগুলোকে স্বীকার করেছে এবং ধীর অসম্পূর্ণ হলেও নিজেদের উন্নত করার চেষ্টা চালিয়ে গেছে। স্বাধীনতা, সুযোগ, সমতা এবং স্বশাসনের ধারণাগুলো সব সময় পুরোপুরি বাস্তবায়িত হয়নি, কিন্তু সেগুলো এখনও অনুসরণ করার মতো সুযোগ আছে।

এখন থেকে ২৫০ বছর পরে, আমি আশা করি মানুষ আমাদের সময়ের দিকে ফিরে তাকিয়ে দেখবে যে আমরা স্থবিরতার পরিবর্তে উন্নতি, ক্ষোভের পরিবর্তে বোঝাপড়া এবং স্বল্পমেয়াদি সাচ্ছন্দ্যের পরিবর্তে দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য বেছে নিয়েছিলাম। আমি আশা করি, তারা এমন একটিআমেরিকা উত্তরাধিকার পাবে, যা আরও জ্ঞানী, আরও ঐক্যবদ্ধ, এবং ভালো ভবিষ্যতের জন্য কাজ করতে ইচ্ছুক মানুষের জন্য সুযোগ তৈরিতে আরও প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।

14.আমি এই দেশ নিয়ে গর্বিত || রিহান চৌধুরী

আমি সারা জীবন এখানে, আমেরিকায়, একই বাড়িতে থেকেছিÑকখনো কোথাও সরিনি। আমি এখানেই জন্মেছি, এবং এখন আমার বয়স ১৫ বছর। সহজভাবে বলতে গেলে, স্বাধীনতার ঘোষণার পর থেকে যুক্তরাষ্ট্রের ২৫০তম বার্ষিকী দেখার সুযোগ পাওয়া আমার জন্য অত্যন্ত গর্বের বিষয়। তবে এটি শুধু দেশপ্রেমের চেয়েও অনেক বেশি কিছু।

এখানে ইমিগ্রান্টদের সঙ্গে সবসময় নাগরিকের মতো আচরণ করা হয়নি; আসলে সব সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীকেই বহু দশক ধরে বর্ণবাদী নিপীড়ন অমানবিক আচরণের মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে। দাসত্বে নিপতিত আফ্রিকানরা, অতিরিক্ত পরিশ্রম করেও কম মজুরি পাওয়া হিস্পানিক নেটিভ আমেরিকানরা, এবং বর্ণভিত্তিক কোটা ব্যবস্থার কারণে ভালো বেতনের চাকরি শিক্ষার সুযোগ থেকে বঞ্চিত দক্ষিণ এশীয়রাÑসবাই কোনো না কোনোভাবে এই অবিচারের শিকার হয়েছে। গত ২৫০ বছরে বহু জাতিগত গোষ্ঠী গণহত্যার শিকার হয়েছে। তাই এমন কারও জন্য, যার পূর্বপুরুষেরা প্রজন্মের পর প্রজন্ম এসব আঘাত সহ্য করেছেন, নিজের দেশ নিয়ে এত গর্ব অনুভব করা অযৌক্তিক মনে হতে পারে। কিন্তু আমি শুধু এই ইতিহাসের জন্য গর্বিত নই; বরং যুক্তরাষ্ট্র যেভাবে বদলে গিয়ে সত্যিকার অর্থেসবার স্বাধীনতার ভূমিহওয়ার দিকে এগিয়েছে, সেই পরিবর্তনের জন্যই আমি গর্বিত।

 ধীরে ধীরে, কিন্তু দৃঢ়ভাবে, মানুষ আরও অধিকারের জন্য লড়াই করেছে। বিশেষ সুবিধাপ্রাপ্ত মানুষের মতো সমান আচরণ পাওয়ার অধিকার, সমান সুযোগ পাওয়ার অধিকার, শান্তিপূর্ণভাবে প্রতিবাদ করার অধিকার, এবং একজন মানুষ হিসেবে সম্মানের সঙ্গে আচরণ পাওয়ার অধিকার। এটি শুধু জাতিগত গোষ্ঠীর মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না; এটি লিঙ্গ বৈষম্যের বিরুদ্ধে লড়াইসহ আরও অনেক ক্ষেত্রেও বিস্তৃত হয়েছে। সময় যত এগিয়েছে, ততই মনে হয়েছে যে বিল অব রাইটস সত্যিই যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসকারী সবার জন্য প্রযোজ্য হয়ে উঠছে।

আজকের সময়ে, নিউইয়র্কের কুইন্সে আমার যে জীবন, সেখানে আমি প্রতিদিন নানা জাতিগত গোষ্ঠীর মানুষকে আমার চারপাশে দেখি। স্কুলে, রাস্তায়, গণপরিবহনে এবং আমার বন্ধুদের মধ্যেসব জায়গায় এই বৈচিত্র্য রয়েছে। আমি এমন পরিবারের সদস্য বন্ধুদের চিনি যারা ইমিগ্রান্ট হয়েও ভালো বেতনের চাকরি পেয়েছেন, অন্যদের সঙ্গে সুন্দর সম্পর্ক গড়ে তুলেছেন, এবং সামনে উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ দেখছেন। প্রতিদিন এসব দেখে আমি অনেক সময় ভুলে যাই যে আমাদের এই অবস্থায় পৌঁছাতে কী কী সংগ্রাম অর্জন কাজ করেছে, এবং এগুলো আমাদের দৈনন্দিন জীবনে স্বাভাবিক বলে বিবেচিত হওয়া কত গুরুত্বপূর্ণ। 

আমার মাবাবা দুজনেই ১৯৯৫ সালে একটি লটারি প্রোগ্রামের মাধ্যমে এই দেশে আসতে পেরেছিলেন, এবং বহু বছর ধরে তারা অসংখ্য ভিন্ন ধরনের কাজে অত্যন্ত কঠোর পরিশ্রম করেছেন। বর্তমানে আমার বাবা ট্যাক্সি চালকদের মেডালিয়নসংক্রান্ত ব্যবসায় কাজ করেন। আমার মাবাবার নিষ্ঠা কঠোর পরিশ্রমের কারণে আজ আমি ইমিগ্রান্ট পরিবারের এক অত্যন্ত সৌভাগ্যবান সন্তান হিসেবে জীবনযাপন করতে পারছি। আমি সবসময় জানি, শতাব্দী আগে ইমিগ্রান্টরা যে অবস্থার মুখোমুখি হয়েছিল, তার তুলনায় আমি অনেক ভালো সুযোগ পেয়েছি। তখনকার এখনকার ইমিগ্রান্ট জীবনের এই সম্পূর্ণ ভিন্নতা এবং উন্নয়ন আমাকে যুক্তরাষ্ট্র তার সক্ষমতা সম্পর্কে গভীরভাবে ভালো অনুভব করায়।

 তাই, হ্যাঁ, আমি আমার দেশ নিয়ে গর্বিততার ভয়াবহ অতীত বা অন্যায় আচরণের জন্য নয়, বরং গত ২৫০ বছরে আমরা এই দেশের ভুলগুলো থেকে শিখে, উন্নতি করে, এবং বেড়ে উঠে নিজেদের সত্যিকার অর্থে স্বাধীন অনুভব করার দিকে এগিয়েছি বলে। এখানে এখন যদি কারও জন্য সবকিছু সেরা না হয়, অন্তত এটি আগের দশকগুলোর চেয়ে খারাপ নয়। আমি অত্যন্ত সৌভাগ্যবান যে আমার পরিশ্রমী মাবাবা এমন সময়ে এখানে এসেছিলেন, যখন তারা সুযোগ পেতে এবং নিজেদের জন্য কাজ করার অধিকারপ্রাপ্ত সাধারণ নাগরিক হিসেবে সম্মান পেয়েছিলেন। আর যুক্তরাষ্ট্র যখন আরও শতাব্দী ধরে এগিয়ে যাবে, তখন পরিস্থিতি আরও ভালো হবে, পরিবর্তন আসবে, এবং আমরা যে দিকেই এগোচ্ছি, সেটিই সঠিক দিক।

যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি কৃতজ্ঞতা।

15.বৈচিত্র্যই এর অন্যতম বড় শক্তি ||এলমা রুদমিলা

আমেরিকা কী প্রতিনিধিত্ব করে সে সম্পর্কে আমার অনুভূতি মিশ্র। যুক্তরাষ্ট্রে জন্মগ্রহণকারী এবং প্রথম প্রজন্মের আমেরিকান হিসেবে, আমি এমন অনেক সুযোগসুবিধার মধ্যে বড় হয়েছি যা হয়তো আমার বাবামা পাননি। একই সঙ্গে আমি বুঝি যে আমেরিকায় ইমিগ্রান্ট জীবনের অভিজ্ঞতা সব সময় সহজ নয়। এই কারণেই আমেরিকা সম্পর্কে আমার দৃষ্টিভঙ্গি একই সঙ্গে ইতিবাচক এবং সমালোচনামূলক।

আমি বিশ্বাস করি যে আমেরিকা ইমিগ্রান্ট তাদের পরিবারের জন্য অনেক সুযোগ সৃষ্টি করেছে। আমার পরিবার একটি ভালো ভবিষ্যতের আশায় এখানে এসেছিল, এবং তাদের ত্যাগের কারণেই আমি শিক্ষা গ্রহণ, বিভিন্ন সহশিক্ষামূলক কার্যক্রমে অংশগ্রহণ এবং এমন লক্ষ্য অর্জনের সুযোগ পেয়েছি যা হয়তো অন্য কোথাও অর্জন করা আরও কঠিন হতো। আমেরিকাকে প্রায়ইইমিগ্রান্টদের দেশবলা হয়, এবং এর ইতিহাস জুড়ে বিভিন্ন দেশের মানুষ স্বাধীনতা, নিরাপত্তা এবং একটি উন্নত জীবন গড়ার আশায় এখানে এসেছে। আমি আমার জন্য উন্মুক্ত হওয়া সুযোগগুলোর প্রতি কৃতজ্ঞ এবং স্বীকার করি যে অনেক ইমিগ্রান্ট কঠোর পরিশ্রম দৃঢ় সংকল্পের মাধ্যমে সফলতা অর্জন করতে পেরেছেন।

যদিও আমার জন্ম আমেরিকায়, আমি আমার মাতৃপিতৃভূমি বাংলাদেশের সংস্কৃতির সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত থেকেছি। প্রথম প্রজন্মের একটি পরিবারে বেড়ে ওঠার ফলে আমি দুই জগতের সেরা অভিজ্ঞতা লাভ করেছি। আমার পরিবার ভাষা, ঐতিহ্য, মূল্যবোধ এবং সাংস্কৃতিক উৎসবের মাধ্যমে আমাকে আমার শিকড়ের সঙ্গে সংযুক্ত রেখেছে। আমেরিকান এবং বাংলাদেশী পরিচয়ের মধ্যে একটি বেছে নেওয়ার পরিবর্তে, আমি শিখেছি যে এই দুই পরিচয় একসঙ্গে সহাবস্থান করতে পারে। আমার সাংস্কৃতিক পটভূমি আমাকে গড়ে তুলেছে এবং আমেরিকাকে অনন্য করে তোলা বৈচিত্র্যের মূল্য উপলব্ধি করতে শিখিয়েছে। তবে আমি এটাও বিশ্বাস করি যে আমেরিকা সবসময় তার আদর্শের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণভাবে চলতে পারেনি। 

আমেরিকার কথা উঠলে প্রথম যে দুটি শব্দ মনে আসে তা হলো স্বাধীনতা এবং সমতা। কিন্তু অনেক ইমিগ্রান্ট সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠী এখনও বৈষম্য, কুসংস্কার এবং নানা বাধার সম্মুখীন হয়, যা তাদের জন্যআমেরিকান ড্রিমপুরোপুরি অর্জন করা কঠিন করে তোলে। ইমিগ্রেশন প্রায়ই রাজনৈতিক বিতর্কের বিষয় হয়ে ওঠে, এবং অনেক মানুষ এই দেশে অবদান রাখার পরও অন্যায় আচরণ বা নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গির শিকার হন। এমনকি প্রথম প্রজন্মের আমেরিকানরাও কখনও কখনও দুই সংস্কৃতির মাঝে আটকে পড়ার অনুভূতি পায়Ñএকদিকে পরিবারের ঐতিহ্য ধরে রাখা এবং অন্যদিকে আমেরিকান সমাজে নিজেকে মানিয়ে নেওয়ার চেষ্টা।

আমেরিকা যখন তার ২৫০তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর দিকে এগিয়ে যাচ্ছে, তখন আমি মনে করি দেশের অর্জিত অগ্রগতি উদযাপন করা যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি যেসব ক্ষেত্রে এখনও উন্নতির প্রয়োজন রয়েছে সেগুলোও স্বীকার করা জরুরি। আমার কাছে দেশপ্রেমের অর্থ এই নয় যে আমেরিকাকে নিখুঁত মনে করতে হবে। বরং এর অর্থ হলো দেশের দেওয়া সুযোগগুলোর মূল্যায়ন করা এবং একই সঙ্গে আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক ভবিষ্যতের জন্য আশা করা কাজ করা। আমি বিশ্বাস করি, আমেরিকা এখনও এমন একটি স্থান যেখানে ভিন্ন ভিন্ন পটভূমির মানুষ নিজেদের স্বপ্ন অনুসরণ করতে পারে এবং একই সঙ্গে নিজেদের ঐতিহ্যও সংরক্ষণ করতে পারে। আমার অভিজ্ঞতা আমাকে শিখিয়েছে যে আমেরিকান হওয়ার জন্য নিজের শিকড় ত্যাগ করতে হয় না, এবং দেশের বৈচিত্র্যই এর অন্যতম বড় শক্তি।


Related Posts