গানের ভেলায় স্মৃতির খেয়ায়— চার আব্বাসউদ্দীন আহমদ উত্তর পথের উদাসী রাখালঃ মাটিই সুর, সুরই মাটি
জীবন বিশ^াসঃ বাংলার মিঠে রোদে ঘাসফড়িংয়ের ওড়াউড়ি দেখতে দেখতে যেমন মনটা হঠাৎ উদাস হয়ে যায়, ঠিক তেমনি উত্তরবঙ্গের তিস্তার তীরে কোনো এক পল্লীবন্ধু যখন গলায় সুর তোলেন, তখন নগরের সব কোলাহল ম্লান হয়ে আসে। সেই সুরের নাম ভাওয়াইয়া, আর সেই সুরকে আকাশছোঁয়া মহিমা দিয়েছিলেন যে মানুষটিÑতিনি আব্বাসউদ্দীন আহমদ। বাঙালির কান তখন কেবল উচ্চাঙ্গ সংগীতের তান কিংবা আধুনিক গানের মোলায়েম সুরে অভ্যস্ত। ঠিক সেই সময় গ্রামবাংলার ধুলোবালি মেখে, সোঁদা মাটির গন্ধ নিয়ে এক জোরালো কণ্ঠস্বর বেতারে আছড়ে পড়ল। বাঙালি শ্রোতার নাগরিক মনের সব জট ছাড়িয়ে আব্বাসউদ্দীন আহমদের কণ্ঠ একেবারে সেই মেঠো পথের দিকে তাড়িয়ে নিল। আব্বাসউদ্দীন ১৯০১ সালের ২৭ অক্টোবর কুচবিহারের তুফানগঞ্জে জন্মগ্রহণ করেন এবং মাত্র ৫৮ বছর বয়সে ১৯৫৯ সালের ৩০ ডিসেম্বর পরলোকগমন করেন।
রাজকীয় আভিজাত্য নয়, প্রাণের আর্তি
আব্বাসউদ্দীন আহমদের গানের জগতটা ঠিক রাজপ্রাসাদের ঝাড়বাতির নিচে গড়ে ওঠেনি। তাঁর কণ্ঠ ছিল রাখালের বাঁশির মতো, যা একাধারে কাঁদে আবার হাসায়। তাঁর কণ্ঠে কোনো শৌখিন কসরত ছিল না, ছিল না ওস্তাদি সংগীতে নিজেকে জাহির করার সেই পরিচিত দাপট। অথচ কী এক জাদুবলে তিনি যখন গাইতেনÑ’ওকি গাড়িয়াল ভাই’—তখন মনে হতো হাজার মাইল দূরের সেই চরের বাতাস ঘরে ঢুকে পড়ছে। তাঁর কণ্ঠের সেই বিশেষ ‘ভাঙা ভাঙা’ মরমী টান বা ‘টপ্পা’ অঙ্গের কাজ লোকসংগীতকে এক ধ্রুপদী উচ্চতা দিয়েছিল। তিনি প্রমাণ করেছিলেন যে, মাটির গান গাইতে গেলে কেবল গলা নয়, একটা বড় কলিজার দরকার হয়।
নজরুল ও আব্বাসউদ্দীন: এক কিংবদন্তি জুটি
আব্বাসউদ্দীনের জীবনের মোড় ঘুরে গিয়েছিল যেদিন তিনি কবি কাজী নজরুল ইসলামের সংস্পর্শে এসেছিলেন। কাজী নজরুল ইসলাম তখন বাংলা গানের একচ্ছত্র অধিপতি; তিনি প্রায় ১০০টি লোকগীতি রচনা করেছিলেন আব্বাসউদ্দীনের জন্য। কবির সেই তেজদীপ্ত লেখনী আর আব্বাসউদ্দীনের দরাজ কণ্ঠ মিলেমিশে যে রসায়ন তৈরি হয়েছিল, তা বাঙালি সংস্কৃতির এক অক্ষয় ইতিহাস। নজরুলের সেই অমর সৃষ্টি ‘ও মন রমজানের ওই রোজার শেষে’ গানটি ছাড়া আজও বাঙালির ঈদ যেন অনেকটাই অসম্পূর্ণ। কিন্তু কেবল ইসলামি গান নয়, নজরুলের লোকজ এবং আধুনিক গানেও তিনি ছিলেন সমান সাবলীল। বিদ্রোহী কবির নিজের ভাষায় আব্বাসউদ্দীন ছিলেন তাঁর ‘সুর—সারথি’। তাঁদের সেই যৌথ পদযাত্রা বাংলা গানের দিগন্তকে বিস্তৃত করেছিল এক নতুন মানচিত্রে।
শেকড় যখন দিগন্ত ছোঁয়
আব্বাসউদ্দীন আহমদ কেবল ভাওয়াইয়া বা চটকা গাইতেন না; তিনি গাইতেন মানুষের বেঁচে থাকার গল্প। চটকা মূলত উত্তরবঙ্গের কুচবিহার, আসাম, জলপাইগুড়ি রাজবংশী সম্প্রদায়ের একটি জনপ্রিয় ও চটুল লোকসংগীত ধারা, যা ভাওয়াইয়া গানের একটি দ্রুত তালযুক্ত প্রকারভেদ। তাঁর গানে যে দীর্ঘশ্বাস ছিল, তা কোনো কৃত্রিম রোমান্টিকতা নয়Ñতা ছিল নদীভাঙা মানুষের হাহাকার। আবার যখন তিনি চটকা গাইতেন, তখন সেই গানে ফুটে উঠত গ্রাম্য জীবনের সহজ রসিকতা আর প্রাণচাঞ্চল্য। তিনি লোকসংগীতকে মেঠো সুরের তকমা থেকে মুক্ত করে শিক্ষিত সমাজের ড্রয়িংরুমেও বসিয়েছিলেন সসম্মানে। তাঁর গলার সেই অদ্ভুত বিস্তার শুনে বিস্ময়ে থমকে যেতেন সমকালীন পন্ডিতেরা। তিনি বিদেশের মাটিতে যখন বাংলার গান নিয়ে যেতেন, তখন ভাষাতীত এক আবেদনে বিমুগ্ধ হতো বিশ্ব। সুরের কোনো কাঁটাতার থাকে নাÑএই চিরন্তন সত্যটি তিনি তাঁর সারা জীবনের সাধনা দিয়ে প্রমাণ করে গেছেন। বাঙালির স্মৃতির জানালায় হঠাৎ আব্বাসউদ্দীনের কন্ঠে এখনো উঁকি দেয় সেই চিরচেনা ধানক্ষেত আর বাঁশঝাড়ের ছায়া।
এক বিষণ্ণ বসন্তের কারিগর
আব্বাসউদ্দীন আহমদকে নিয়ে পড়তে বসলে মনে হয়, তিনি যেন এক বিষণ্ণ বসন্তের কারিগর। তাঁর কণ্ঠে এক ধরনের মরমী বিষাদ ছিল, যা শুনলে মনে হয় জীবনটা খুব ক্ষণস্থায়ী, কিন্তু সুরটা চিরকালীন। তিনি ছিলেন অসম্ভব বিনয়ী একজন মানুষ, কিন্তু তাঁর সৃষ্টির ওজন ছিল হিমালয়সম। আজকের এই যান্ত্রিক যুগে, যেখানে সুরের চেয়ে বাদ্যযন্ত্রের কোলাহল বেশি, সেখানে আব্বাসউদ্দীনের গান আমাদের মনে করিয়ে দেয় যেÑমানুষের কণ্ঠই হলো পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ বাদ্যযন্ত্র।
আব্বাসউদ্দীনের কয়েকটি বিখ্যাত গান
১। ওকি গাড়িয়াল ভাই, ২। প্রাণ কান্দে রে, ৩। তোরষা নদীর ধারে, ৪। ফান্দে পড়িয়া বগা কান্দে রে, ৫। যে জন প্রেমের ভাব জানে না, ৬। আমায় ভাসাইলি রে, ৭। তোরষা নদীর ধারে ধারে, ৮। ও মোর কালারে বন্ধু রে, ৯। পাবনা গিয়াছিলা বন্ধু রে, ১০। মন মাঝি তোর বৈঠা নে রে, ১১। আল্লাহ মেঘ দে পানি দে, ১২। নাও ছাড়িয়া দে, ১৩। নদীর কূল নাই, ১৪। প্রাণ সখী রে ওই শোন কদম্বতলে, ১৫। ও ঢেউ খেলে রে, ১৬। একবার আসিয়া সোনার, ১৭। ও আমার দরদী, ১৮। সোনা বন্ধু রে, ১৯। কুচবরণ কন্যা রে, ২০। অনেক ছিল বলার, ২১। ওরে ও দরিয়ার মাঝি, ২২। আগা নাওয়ে ডুবো ডুবো, ২৩। ওকি একবার আসিয়া, ২৪। লোকে বলে বলে রে, ২৫। যে জন প্রেমের ভাব জানে না
পরিশেষ
আব্বাসউদ্দীন আহমদ আমাদের মাঝে নেই বহু দশক হলো। কিন্তু তাঁর সেই মেঠো সুরের অনুরণন আজও কাটেনি। তিনি সেই পথপ্রদর্শক, যিনি আমাদের শিখিয়েছেন নিজের শিকড়কে লজ্জা পেতে নেই, বরং তাকে গর্বের সাথে বিশ্বের দরবারে তুলে ধরতে হয়। তাঁর গান বাঙালির আত্মপরিচয়েরই এক অনন্য উপাদান। তিস্তা নদীর জল শুকিয়ে যেতে পারে, তোর্ষার গতিপথ বদলে যেতে পারেÑকিন্তু আব্বাসউদ্দীন আহমদের কণ্ঠের সেই মরমী টান কোনোদিনও ফিকে হবে না। যতদিন বাঙালি সত্তা থাকবে, যতদিন উত্তরবঙ্গের রাখাল বালক বাঁশিতে ফুঁ দেবে, ততদিন আব্বাসউদ্দীন আহমদ বেঁচে থাকবেন এক অবিনাশী সুরের ধ্রুবতারা হয়ে। তাঁর কণ্ঠের সেই হাহাকার আসলে আমাদের সবার হৃদয়ের গহীন কোণের এক না—বলা কথা।
