যা দেখেছি যা বুঝেছি—৮ || মনিরুল ইসলাম
প্রবাসে দ্বিতীয় প্রজন্ম
জলধির তরঙ্গের মতো উঠে আসে আর নেমে পড়ে একজন মানুষের জীবনপ্রবাহ। ছোট—বড় উঁচু—নীচুু টিলা—পর্বতের মতো দাঁড়িয়ে থাকে এই মানুষের বংশধারা। অধিকাংশ ব্যক্তির জীবনে যেমন উত্থান—পতন, বংশের ইতিহাসেও তেমনি আরোহণ, উচ্চাসন, অবনমন, অবসান। একটি মানুষ তার ৭০—৮০ বছরের জীবনে অনেক চড়াই—উৎরাইয়ের মধ্য দিয়ে লাভ—লোকসান ও দেনা—পাওনার হিসাব করতে করতে পৃথিবীতে তার সময়কাল শেষ করে। একজন ব্যক্তির আর্থিক, সামাজিক ও ধর্মীয় অবস্থান ক্রমান্বয়ে বিকশিত হয়, সর্বোচ্চ শিখরে অধিষ্ঠিত হয়Ñতারপর অবরোহণে চলতে থাকে। কখনো এই একক ব্যক্তিগত ধারা কিছুকাল অব্যাহত থাকে উত্তরাধিকারের মাধ্যমে, কখনো আবার সেই ব্যক্তির সাথে অকালে নিমিষে নিঃশেষ হয়ে যায়। যেমন, ইতিহাসে শের শাহের বংশ টিকেনি কিন্তু বাবরের বংশ টিকে ছিল অনেকদিন।
তেমনি একটি ক্ষুদ্র মানবগোষ্ঠী বা বংশকুলও এমনই উত্থান—পতনের মধ্য দিয়ে পৃথিবীতে এগিয়ে চলে। কখনো বা একটি নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়, আরেকটি নতুন বংশের সৃষ্টি হয়। মানবেতিহাসের বিভিন্ন যুগে সভ্যতা ও রাজ—রাজন্যবর্গের ইতিহাস এরকম সৃষ্টি—বিনাশের প্রকৃষ্ট উদাহরণ। বিভিন্ন দেশে বিভিন্নকালের স¤্রাট বাদশাহ রাজা জমিদার ও প্রতাপশালী সমৃদ্ধ ব্যক্তিবর্গের পুরনো প্রাসাদ, দূর্গ, দরবার ও বাড়িগুলো এই ধ্রুবসত্যের স্মারক। সত্য হল কিছুই স্থায়ী হয় না, আবার সবই স্থায়ী। রাজন্য স্থায়ী নয় কিন্তু রাজ্য স্থায়ী, মানুষ স্থায়ী নয় কিন্তু মানবকুল স্থায়ী। সেরকম ব্যক্তির হতাশা—দুর্দশা ও সুখ—শান্তি স্থায়ী নয় মনে হলেও জগতে বিদ্যমান মানুষের দুঃখ—বেদনা ও আনন্দ—উৎসব কিন্তু স্থায়ী। তাই মানব প্রজন্মও স্থায়ী, অন্তত রূপান্তরিতভাবে স্থায়ী। নশ্বর মানুষ নিজে স্থায়ী নয় বলে পরবতীর্ প্রজন্মের মাধ্যমে সে আরো কিছুকাল বেঁচে থাকতে চায় ধরণীর বুকে।
সেজন্যই নতুন প্রজন্মকে স্থায়ী করার লক্ষ্যে বুদ্ধিমান পরিণামদশীর্ মানুষের আকুল প্রয়াস। এই প্রয়াসের অংশ হিসাবেই মানুষ একতাবদ্ধ হয়ে শক্তি ও সম্ভাবনা বাড়ানোর জন্য গোষ্ঠীবদ্ধ জীবন বেছে নেয়। বংশানুক্রমে একদেশে একস্থানে বসবাস করতে চায়। কিন্তু টিকে থাকার পারস্পরিক সংগ্রাম তীব্রতর হলে কিছু মানুষ অনন্যোপায় হয়ে অথবা উন্নততর জীবনের আশায় অন্যত্র অজানায় অচেনায় পাড়ি জমায়। নতুন করে খোঁজে প্রজন্মের আশ্রয় বসতি ও প্রতিষ্ঠা। আপন হয়ে যায় পর, পরকে করে নেয় আপন। আমি যদি স্থায়ীভাবে পরদেশে রোপিত—অভিবাসী হই, আমার সন্তান সেদেশে দ্বিতীয় প্রজন্ম। সেই নতুন ঠিকানায় তার জীবন কেমন যাবে, সেটির ওপর নির্ভর করে আমার পরবতীর্ প্রজন্মের চিহ্ন কতদিন কিভাবে টিকে থাকবে পৃথিবীর বুকে।
বর্তমান পৃথিবীর ছয়টি মহাদেশের ১৫৭টি দেশে প্রায় ১৫ মিলিয়ন বাংলাদেশী প্রবাসী হিসাবে বসবাস করে। পৃথিবীর ২৩৪টি দেশের মধ্যে ১৪৪টি দেশের নিজস্ব জনসংখ্যা আমাদের প্রবাসী জনসংখ্যার চেয়েও কম। সুতরাং সময় এসেছে এই বিপুল অভিবাসী বাংলাদেশীদের প্রবাস জীবনের সুখ—দুঃখ নিয়ে ব্যাপকতর চিন্তা ভাবনা করার। দীর্ঘ পরবাসে থাকার ফলে নিজ জন্মভূমির প্রত্যক্ষ সংস্পর্শের অভাবে আস্তে—ধীরে একজন অভিবাসী মানুষ মূলধারা হারিয়ে ফেলে, তার আহরিত সব ধ্যান ধারণা মূল্যবোধ প্রতিস্থাপিত হতে থাকে নতুন অর্জনের মাধ্যমে। জীবনের এই নবযোগ পথ্যে কেউ সহজে অভ্যস্ত হয়ে যায়, কারো সমস্যা হয় সাময়িক বা দীর্ঘকাল, অনেকের ঘটে বংশ কিংবা প্রজন্ম বিলুপ্তি।
প্রথম পুরুষের কথা আজ থাক, দ্বিতীয় প্রজন্মের জীবন নিয়ে কিছু কথা বলি। কারণ একজন মানুষ, বিশেষত প্রাচ্যের হলে, তার নিজের নয়, তার সন্তান তথা পরবর্তী প্রজন্ম নিয়ে অধিকতর চিন্তিত থাকে। উত্তরপুরুষের জন্য কয়েকটি জরুরি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে দরকারি দরবারি আলোচনা হতে পারে।
ভাষা
মানুষের ভাষা শুধু মনের আয়না নয়, তার মনের দরজাও। তাই সে কোন ভাষায় কতটুকু স্বাচ্ছন্দ্যে কথা বলে, সেটি খুব গুরুত্বপূর্ণ। অভিবাসী হলে প্রথম আঘাতটি আসে ভাষার ওপর এবং দ্বিতীয় প্রজন্ম তার মায়ের ভাষাটি হারিয়ে ফেলে। অথচ এই ভাষাই হল তার পূর্বপুরুষের ইতিহাস—ঐতিহ্যের সাথে সংযোগ স্থাপনের প্রধান মাধ্যম। মা—বাবা, মিডিয়া ও সঙ্গীÑএই তিনটি উৎস থেকে শিশু কথাবলা শিখতে শুরু করে এবং এই ত্রিধারার ভাষা যদি কমন হয়, শিশুটি দ্রুত সেই কমন ভাষাটি রপ্ত করে ফেলে। একসাথে কয়েকটি ভাষার সংস্পর্শে আসলে বাড়ন্ত শিশু কোনো একটি ভাষাই সহজে রপ্ত করতে পারে না। তাই শুরুতে শিশুসন্তানের সাথে শুধু একটি ভাষায় ভাব বিনিময় করতে হবেÑএকাধিক ভাষায় কথা বললে সে কনফিউজড হয়ে যাবে। আর সবদিক থেকে ভাল হয় যদি সাথে থাকা মায়ের নিজস্ব ভাষাটি সে ধরতে পারে দ্রুত। মাতৃস্তন্য যদি তার দৈহিক পুষ্টি যোগায়, মাতৃভাষা তার মানসিক স্ফূরণকে বিকশিত করবে পূর্ণকলায়। মা—বাবার কাছে সে তাদেরই ভাষায় পৃথিবীকে চিনতে শিখুক অবলীলায়, সহজাতগুণে। তারপর তিন থেকে পাঁচ বছর পর সে দ্বিতীয় ভাষা শিখতে শুরু করুক, দশ বছরে তৃতীয় ভাষা ধরুক এবং আরো কত কি।
স্পেনের বার্সিলোনায় একটি বাঙালি পরিবারে একটি শিশু পাঁচ বছর পর্যন্ত কথা বলতে শেখেনিÑএটা না ওটা, এই দোটানায় পড়ে। বাংলাদেশে যাওয়ার মাত্র দুই বছর পর সে বাংলা গান ধরেছে! নিউইয়র্কে একটি চাইনিজ—জাপানী পরিবারে দেখেছি শিশুটির সাথে বাবা বলে চাইনিজ, মা বলে জাপানিজ এবং টিভিতে সে শোনে ইংরেজি। এই শিশু আড়াই বছরেও একটি বোধগম্য শব্দ বলতে পারে না বলে পিতামাতা উদ্বিগ্ন। আমি বললাম, তোমরা ওর সাথে তোমাদের কমন ভাষা ইংরেজি বলো শুধু, আরো বড় হলে পরে মা—বাবার ভাষা শেখাতে পারবে। আমার অনুরোধ, আপনার দ্বিতীয় প্রজন্মের শিশুকে প্রথমে শুধু বাংলায় সব কথা বলতে শেখান, মায়ের উচ্চারণে মায়ের মতো করে সে নিজেকে প্রকাশ করতে শিখুক। ইংরেজির সাগরে বসবাস করছে বলে এই শিশু অচিরেই আপনার অলক্ষ্যেই এমন শুদ্ধতম ইংরেজি শিখে ফেলবে যে আপনি নিজেই অবাক হয়ে যাবেন, এজন্য চিন্তা পরিকল্পনারও দরকার নেই।
সংস্কৃতি
দ্বিতীয় প্রজন্মের জন্য সংস্কৃতি হল একটি স্পর্শকাতর অথচ অতীব গুরুত্বপূর্ণ দিকনির্ধারণী বিষয়। ভয়ে বিতৃষ্ণায় অবজ্ঞায় আমরা বলি বিজাতীয় বা অপসংস্কৃতি। আসলে বিজাতীয় সংস্কৃতি বলে কিছু নেই, সব সংস্কৃতিই জাতীয়। এখন দ্বিতীয় প্রজন্মের জন্য বেছে নিতে হবে সেই সংস্কৃতি যা তার মনন, পরিবেশ ও ভবিষ্যৎকে সুন্দর সুস্থভাবে প্রস্ফুটিত হতে সাহায্য করবে। প্রথমে তাকে তার নিজস্ব জনগোষ্ঠীর একজন সুযোগ্য সদস্য হিসাবে গড়ে তোলা জরুরিÑতারপর হবে সে বিশ্বনাগরিক। আমার যে জাতি, শত সহ¯্র বছর ধরে কিংবা কয়েক প্রজন্ম ধরে আমার যে বংশ—রক্ত—ঐতিহ্যের ধারা, সেই ধারা থেকে প্রাপ্ত সংস্কৃতিই আমার নিজস্ব বা জাতীয় সংস্কৃতি। আমার এই জাতীয় সংস্কৃতিতে আমাকে, আমার সন্তানকে খাপ খাইয়ে নেয়ার দায়িত্ব আমারÑঅন্যের নয়, শিশুরও নয়। সে হিসাবেই দ্বিতীয় প্রজন্মের একজন চাইনিজ গ্রহণ করবে চাইনিজ সংস্কৃতি, আরব করবে আরবীয়, বাংলাদেশী হবে বাঙালি। এটা হীনম্মন্যতার নয়, নির্বাচনের নয়, বিচার্যের বিষয়ও নয়Ñএটা গৌরবের, অস্তিত্বের, অবশ্যম্ভাবিতার।
জীবনের প্রথমপাঠ থেকেই দ্বিতীয় প্রজন্মের সন্তানকে আপনার অর্থাৎ মা—বাবার নিজস্ব সংস্কৃতিতে অবগাহন করিয়ে দিন। তাকে বলুন, চারপাশের সব সংস্কৃতিরই ভাল—মন্দ দিক আছে, তবে আমার—তোমার ঐতিহ্যগতভাবে প্রাপ্ত সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট্যগুলো এরকম। এগুলো মেনে চলা, অনুসরণ করা, আমাদের সুস্থ—সুন্দর—স্বাভাবিক জীবন বিকাশের জন্য আবশ্যক। আমার নিজস্ব সামাজিক পরিমন্ডলে আমার সংস্কৃতি আমাকে পরিপুষ্ট করবে, সমৃদ্ধ করবে, পূর্ণমানবে পরিণত করবে। অন্যের সংস্কৃতি অন্যকেও তাই করবে, অন্যেরটা আমার স্থায়ীভাবে ধার করার প্রয়োজন নেই। অন্য সংস্কৃতি যত উন্নত বা আকর্ষণীয় হোক, তাকে শ্রদ্ধা করুন, নিজেরটাকে ভালবাসুন। যেমন অন্যের মাকে শ্রদ্ধা করে সম্মানিত হই, নিজের মাকে ভালবেসে তৃপ্ত হই।
ধর্ম
ভাষা ও সংস্কৃতির মতো আপনার প্রবাস—জীবনকে সুরক্ষিত করবে পূর্বপুরুষ থেকে পাওয়া আপনার সহজাত ধর্ম। এখানে বিধর্মী বলেও কিছু নেই। সবার ধর্মই নিজের কাছে পূতপবিত্র, আত্মার প্রশান্তিদায়ক, দুঃখবঞ্চনায় অভয়ারণ্য। সংখ্যালঘু বলে প্রবাসে দ্বিতীয় প্রজন্মের জন্য পিতামাতার ধর্মশিক্ষা গ্রহণ ও ধর্মানুসরণ একটি মারাত্মক সমস্যা হিসাবে আবির্ভূত হতে পারে। আর পিতামাতার ধর্মবোধ যদি আন্তরিক না হয়, ধর্মাচরণ যদি ভক্তিপূর্ণ না হয়, তাহলে দ্বিতীয় প্রজন্মের জন্য সেই সমস্যা প্রকটতর হয়।
প্রবাসে জন্ম নেয়া, বর্ধিত হওয়া শিশুকে শুরু থেকেই ধর্মবিশ্বাসের গুরুত্ব শেখান। নিজের জীবনাচরণ দিয়ে তাকে ধর্মানুষ্ঠান এবং প্রার্থনার পদ্ধতি শেখান। সন্তানকে আপনার নিজধর্মে আত্মনিষ্ঠ করার দায়িত্ব আপনারই। বিচ্যুত হলে উভয়েরই সমূলে সর্বনাশ। সন্তানকে বলুন: তুমি ধর্মকে রক্ষা করো, ধর্ম তোমাকে রক্ষা করবে। ধর্মপ্রাণতায় অন্তত হানিকর কিছু নেই কিন্তু ধর্মহীনতায় শূন্যতাবোধ আছে। ধর্মহীন মানুষ জলের মতোÑকখনো শান্ত, কখনো জলোচ্ছ্বাস।
এখন আপনার দ্বিতীয় প্রজন্মের শিশু কোন ভাষায় কথা বলতে শুরু করবে, কোন সংস্কৃতিতে লালিত হবে, কোন ধর্মে দীক্ষিত হবেÑসেটা চটজলদি একবাক্যে বলা গেলেও অনেকে হয়ত মানবেন না। বলবেন, এসব হচ্ছে মধ্যবিত্তীয় মানসিকতার বস্তাপচা সেকেলে পশ্চাদপদ চিন্তাভাবনা। তবু এটা দৃঢ়ভাবে বলা যায় যে, শিশুকে জীবনের শুরুতে শুধু একটি ভাষায়, একটি সংস্কৃতিতে এবং একটি ধর্মের পরিমন্ডলে বড় হতে দিনÑসবকিছু গুলিয়ে ফেলে প্যাচ—আপ করতে যাবেন না। লক্ষ্য যদি এক হয়, নিশানা স্থির হয়, উদ্দেশ্য মহৎ হয়Ñআপনার সন্তানের সহজাত মানসিক বিকাশ সুস্থ দ্রুত ও শক্তিশালী হয়ে উঠবে। পরবাসে দ্বিতীয় প্রজন্মের জন্য এই সত্য আরো অপরিহার্যভাবে প্রণিধানযোগ্য।
