জনগণও ভুল করে
যে কোনো দেশে ক্ষমতায় যাওয়ার জন্য বিভিন্ন রাজনৈতিক দল উন্মুখ হয়ে থাকে। অকথিত হলেও রাজনীতির মূল কথা, বিশেষত, রাজনীতিকদের কাছে তাই। জনগণই সকল শক্তির উৎসÑ এটা পুরনো কথা। কিন্তু জনগণ যে সবসময় সঠিক সিদ্ধান্ত নেয়, তা নয়। একথা এখন বারবার প্রমাণ হচ্ছে। এর প্রমাণ যেমন দেখা যাচ্ছে আমেরিকায় তেমনই বাংলাদেশেও। আমেরিকায় দ্বিতীয় মেয়াদে যাকে হোয়াইট হাউজে ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়া হলো, তিনি ২০২৪ সালে জয়লাভ করেন বিপুল ইলেক্টোরাল কলেজ ভোটে। তিনি কিন্তু প্রতারণা করেননি জনগণের সাথে। প্রথম মেয়াদে যা যা করতে পারেননি তা যে পুরোমাত্রায় সম্পূর্ণ করবেন তেমন নির্বাচনী প্রতিশ্রম্নতি তার ছিল। যেমন সীমান্ত সম্পূর্ণ বন্ধ করা, আনডকুমেন্টেড ইমিগ্রান্টদের বিতাড়ন, বিভিন্ন জনসেবামূলক কাজে ফেডারেল সরকারের অর্থ বরাদ্দ বন্ধ বা সংকোচন, জন্মগত নাগরিকত্ব প্রদান বন্ধ ইত্যাদি। এবং তিনি তার প্রতিশ্রম্নতি রক্ষা করছেন। অথচ জনগণ এখন বুঝতে পারছে, তারা তাকে ভোট দিয়ে ঠিক করেনি। অতএব এখন মাত্র ১৫ মাস পরে তার প্রতি জনসমর্থন কিংবা তার কাজের প্রতি জনসমর্থন তলানিতে ঠেকেছে। অতএব জনগণ ভুল করে। অথচ গণতন্ত্রের মূল ভিত্তিই জনগণ। অন্তত আব্রাহাম লিংকনের ভাষায়। মাত্র তিনটি সংক্ষিপ্ত বাক্যে তিনি জনগণের মাহাত্ম গেয়ে গণতন্ত্রের সবচেয়ে টেকসই সংজ্ঞা নিরূপণ করেছেন যা সর্বজনীন হয়ে উঠেছে।
বাংলাদেশের মত তৃতীয় বিশ্বের দেশে যেখানে শিক্ষার কোনো মানদন্ড তৈরি হয়নি সেখানে আব্রাহাম লিংকনের এই সংজ্ঞাকে হয়ত সর্বজনীনভাবে দাঁড় করাতে না পারলে কোনো সমস্যা নেই। যে জনগণকে আব্রাহাম লিংকন গণতন্ত্রের মহান আসনে বসিয়েছেন, সেই জনগণ আম জনতা হলেও তাদের ন্যূনতম যোগ্যতা থাকতে হবে ভোটের প্রার্থীদের বোঝার জন্য। যদিও কাজটি সহজ নয়। যেহেতু বাংলাদেশে ভোটের কেনাবেচায় কোনো রাখঢাক নেই তাই ভোটকে কখনোই সার্বিক অর্থে সুষ্ঠু বলা সম্ভব নয়, তা যে কোনো সময়ের জন্যই হোক না কেন। আমেরিকায় গত ১৫ মাসে এই রাষ্ট্রপ্রধানের প্রতি জনসমর্থন যদি তলানির কাছাকাছি যায়, বাংলাদেশে তা আরো ভয়াবহ। গত মাত্র আড়াই মাস আগে জনগণ যাদের বিপুল ভোটে জয়ী করেছে, তাদের প্রতি আস্থা কতটা কম হলে এই স্বল্প সময়েই সরকারের কথা বা প্রতিশ্রম্নতি বিশ্বাস করছে না জনগণ।
যেমন সরকার বলছে, দেশে পর্যাপ্ত পেট্রোল মজুদ আছে। কিন্তু জনগণ সরকারের কথায় আস্থা পাচ্ছে না। তারা ঘন্টার পর ঘন্টা অপেক্ষা করছে পেট্রোলের জন্য। তাদের বিশাল কর্মঘন্টা নষ্ট হচ্ছে, কিন্তু লাইন ছাড়ছে না। তাছাড়া পর্যাপ্ত পেট্রোল যে বন্দরে পৌঁছাচ্ছে এমন কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। বরং হরমুজ প্রণালিতে তেলবাহি বাংলাদেশের জাহাজ আটকে থাকার খবর আসছে। সরকার যদি মনে করে অসত্য প্রতিশ্রম্নতি দিলে তাদের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল হবে, এটা ভুল। বরং সত্য স্বীকার করে বাস্তব পরিস্থিতি তুলে ধরলে জনগণ বুঝতে পারত। সরকারের প্রতি তাদের আস্থা বাড়ত। যেমন মধ্যপ্রাচ্যে ব্যারেল প্রতি পেট্রোলের দাম বৃদ্ধি হলে আমেরিকায় খুচরা বাজারে তার প্রভাব পড়বে। পড়ছেও তাই। জনগণ বিরক্ত হলেও, পকেটে চাপ পড়লেও তারা মেনে নিচ্ছে।
বাংলাদেশে যদি পেট্রোলের অভাব না থাকে বা যদি অভাবের আশংকা না থাকে, তাহলে কেন সন্ধ্যায় মার্কেট বন্ধ করার সিদ্ধান্ত নেয়া হলো? বিদ্যুৎসহ পরিবহন এমন কি মোবাইল নেটওয়ার্ক চালানোও হুমকির মুখে পড়েছে বলে জানিয়েছে বিবিসি বাংলা নিউজ। কারণ প্রথমত লোড শেডিং বেড়ে গেছে, লোডশেডিং বেড়ে যাওয়ায় মোবাইল চার্জ দেয়া যাচ্ছে না পরিমাণ মত। আর চার্জ দেয়া না হলে মোবাইল বা এ্যাপ নির্ভর প্রায় সব ব্যবসাই পড়ছে ঝুঁকির মধ্যে। এমন কি কম্পু্যটার নেটওয়ার্কও। ফলে সেক্ষেত্রে ব্যাপক হারে বেড়ে গেছে জেনারেটরের ব্যবহার। জেনারেটর চলে ডিজেলে।
ক্ষমতায় যাওয়ার জন্য অনেক দেশে রাজনৈতিক দলগুলো নির্বাচন করে। নির্বাচন সুষ্ঠু হলে জয়ী হয়ে দেশ পরিচালনা করে। অনেক দেশে রাজনৈতিক দলসমূহ ক্ষমতায় যেতে চায় নিজেদের আদর্শ প্রতিষ্ঠা করার জন্য। অনেক দেশে ক্ষমতায় যাওয়ার মূল উদ্দেশ্য থাকে আখের গোছানো। বাংলাদেশে একাত্তরের পরাজিত শক্তি যখনই যারা ক্ষমতায় গেছে তাদের অকার্যকর করে কিংবা করার দাবি করে ক্ষমতায় যেতে চেয়েছে। তাদের উদ্দেশ্য যে আদর্শের ওপর ভিত্তি করে দেশ স্বাধীনতা অর্জন করে ১৯৭১ সালে তার পূর্বের পরাধীন ও সাম্প্রদায়িক দেশে পরিণত করা। সবসময় এই রকম সন্দেহ করা হয়েছে। কিন্তু তারা যে ভেতরে ভেতরে নানা প্রতারণার জাল বিস্তার করেছিল তা বোঝা যায়নি। ২০২৪ সালে সেই মুখোশ খুলে পড়ল। এখন সব কিছু উন্মুক্ত হয়ে গেছে। স্বাধীনতার শত্রু মিত্র চেনা সহজ হয়ে গেছে। এখন আর মুখোশ নেই।
সবচেয়ে দুঃখজনক হলো ১৯৭১এ যারা দেশের জন্য প্রাণ হাতের মুঠোয় রেখে যুদ্ধ করেছিল, যারা হারিয়েছে স্বজন, যারা হয়েছে ক্ষতিগ্রস্ত এখন তারা দেশে থাকে সন্ত্রস্ত অবস্থায়। ভীতিতে। তাদের চলাফেরা অবাধ নয়। আগের মত না হলেও এখনও মবতন্ত্র চলছে। একজন অধ্যাপক আগের সরকারের সময়কালকে বর্ণনা করেছিলেন ‘ভয়ের সংস্কৃতি’ বলে। এখন তিনি চুপ। তিনি নিশ্চয় স্বীকার করবেন ২০২৪ এর পর থেকে বাংলাদেশে শুরু হয়েছে ‘আতংকের সংস্কৃতি’।
জনগণ সকল ক্ষমতার উৎস বলেই বিএনপি ক্ষমতায় এসেছে বিপুল ভোটে জয়ী হয়ে। এই সত্যকে মেনে নিতে দ্বিধা থাকার কথা নয়। কিন্তু নির্বাচনে জয়ী হওয়া আর গণতন্ত্রের প্রতি সম্মান প্রদর্শন তো এক কথা নয়। গণতন্ত্রের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করতে হলে ইনক্লুসিভ রাজনীতির পথে আসতে হবে। ইনক্লুসিভ রাজনীতি অর্থ কোনো দলের কার্যক্রমকে নিষিদ্ধ করে দিয়ে নির্বাচন করা নয়। সংবিধান অনুসারে বা দেশের সংশ্লিষ্ট আইন অনুযায়ী যদি কেউ অপরাধ করে থাকে তাহলে সেই অপরাধ অনুযায়ী বিচার করতে হবে, চার্জ ও বিচারবিহীন অবস্থায় ঢালাও হত্যা মামলা দিয়ে মাসের পর মাস বন্দি করে রাখা শুধু বিচার বিভাগের প্রতি কটাক্ষ করা নয় চরম অমানবিকও।
গত সপ্তাহের সম্পাদকীয়তে আমরা উল্লেখ করেছিলাম ‘প্রতিটি এ্যাকশনেরই সমান রিএ্যাকশন’ আছে। এটা নিউটনের বিখ্যাত প্রমাণিত থিয়োরি। অন্যভাবে ইন্টারপ্রেট করলে দাঁড়ায়, অন্যায় করে কেউ কখনো ছাড় পায় না। অতীতে এমন দৃষ্টান্ত আছে। আমরা অতীত থেকে শিক্ষা নিই না। এটাও আমাদের সবচেয়ে বড় দুর্ভাগ্য।
