দ্বিপাক্ষিক নয় কেবল বহুপাক্ষিক আলোচনায় বিশ্ব—শান্তির সম্ভাবনা || আনিস আহমেদ

বর্তমান বিশ্বে যে অনাকাঙ্খিত অস্থিরতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে তা যে কেবল যুদ্ধরত রাষ্ট্রগুলির জন্য ক্রমশই বিপদ সংকুল পরিস্থিতি সৃষ্টি করছে তাই নয়, গোটা বিশ্ব এক বিপদসঙ্কুল অবস্থায় পৌঁছে গেছে। এই পরিস্থিতি থেকে মুক্ত হবার এক মাত্র পথ হচ্ছে কূটনৈতিক আলাপ আলোচনার মাধ্যমে বহুপাক্ষিকতাকে গুরুত্ব প্রদান। গত ২৪ এপ্রিল ছিল জাতিসংঘেরবহুপাক্ষিকতা শান্তির জন্য কূটনীতি দিবস এই দিনটির প্রতি জাতিসংঘের সদস্যরাষ্ট্রগুলোর তেমন গুরুত্বপূর্ণ নজর ছিল বলে তো মনে হয়নি। আর কেবল নির্দিষ্ট দিবস পালনের বিষয় নয়, সব সময়ের জন্য আমরা চাই একটি বহুপাক্ষিক বিশ্ব যেখানে সকল রাষ্ট্রের ভূরাজনৈতিক স্বার্থ সংরক্ষিত হবে এবং তারই মাধ্যমে বিশ্ব ব্যাপি শান্তি সংরক্ষিত থাকবে। বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্র ইসরাইল যে ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ করছে তাতে যে কেবল বিবদমান রাষ্ট্রগুলি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে তাই নয়; এর প্রত্যক্ষ প্রভাব পড়েছে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলির ওপর যেমন, তেমনি পরোক্ষ প্রভাব পড়ছে বিশ্বের অন্যান্য দেশগুলির ওপরও। সংবাদপত্রের ভাষ্য মতে২০২৬ সালের ইরান যুদ্ধের (যুক্তরাষ্ট্র ইসরাইল কর্তৃক পরিচালিত) মূল কারণ ছিল ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি ধ্বংস করা, সামরিক সক্ষমতা কমানো এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। মূলত, ইরানের পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি, ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচী, প্রক্সি যুদ্ধ এবং ইসরাইলের অস্তিত্বের প্রতি হুমকির অভিযোগেই সংঘাতের সূত্রপাত ঘটে, যার ফলে বিরোধ নিরসনে কূটনৈতিক আলোচনার পরিবর্তে গ্রহণ করা হয় সামরিক পথ এই সামরিক পথ গ্রহণ কতখানি যুক্তিসঙ্গত সেটি ভাববার বিষয়। ইরান কেন, কোনো দেশেই পরমাণু অস্ত্র নির্মাণকে সমর্থন করা যায় না। কিন্তু আমরা তো জানি যে নিজেদের প্রতিরক্ষার লক্ষ্যে বিশ্বের একাধিক রাষ্ট্র পরমাণু অস্ত্র মওজুদ করে রেখেছে। এমনকী এই উপমহাদেশের দুটি পরস্পর বৈরী রাষ্ট্র ভারত পাকিস্তান পারমাণবিক বোমায় নিজেদের সমৃদ্ধ করেছে। ইরানের পরমাণু অস্ত্র মূলত ইসরাইলের জন্য হুমকি হয়ে উঠতে পারে এই আশংকার বশবর্তী হয়ে ইসরাইল এবং দেশটির সবচেয়ে বড় সমর্থক যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বিরুদ্ধে এই পদক্ষেপ নিয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের আরও কয়েকটি রাষ্ট্রও ব্যাপারে ভীত হয়ে রয়েছে। তবে ইরান বার বার বলেছে যে তাদের পরমাণু কর্মসূচি বোমা বানানোর জন্য নয়। 

বস্তুত ২০১৫ সালে ইরানের সঙ্গে পৃথিবীর বৃহৎ শক্তিসমূহযুক্তরাষ্ট্র, ফ্রান্স, রাশিয়া জার্মানি পারমাণবিক চুক্তি স্বাক্ষর করেছিল। এই চুক্তিতে পরমাণু অস্ত্র তৈরি নিষিদ্ধ করা হয়েছিল এবং কেবল মাত্র ইরানের নিজস্ব অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য অভ্যন্তরীণভাবে পারমাণবিক শক্তি ব্যবহারের কথা ছিল। জেসিপিওএ বা জয়েন্ট কম্প্রিহেনসিভ প্ল্যান অব অ্যাকশান নামের এই চুক্তির আওতায় ইরানের ইউরেনিয়াম পরিশুদ্ধিকরণের পরিমাণও সীমিত করা হয়। তাছাড়া আন্তর্জাতিক আণবিক শক্তি সংস্থাকে ব্যাপারে নজরদারি করারও ক্ষমতা দেয়া হয়। তবে ২০১৮ সালে যুক্তরাষ্ট্র একতরফাভাবে এই চুক্তি থেকে বেরিয়ে আসার পর ইরান এই চুক্তির বাধ্যবাধকতা মানেনি এবং ইউরেনিয়াম বিশুদ্ধিকরণের পরিমাণ বৃদ্ধি করেছে। আর সে কারণেই ইসরাইল আরও একবার ইরানকে তাদের অস্তিত্বের প্রতি হুমকি হিসেবে দেখেছে যেমন ইরান সমর্থিত লেবাননের হেজবুল্লাহকেও ইসরাইল হুমকি বলেই মনে করে। হেজবুল্লাহও ইসরাইলের ওপর তাদের আক্রমণ অব্যাহত রেখেছে। এদিকে হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচলের ক্ষেত্রেও বড় রকমের টানাপোড়েন অব্যাহত রয়েছে। আমরা এও জানি যে মধ্যপ্রাচ্যের কয়েকটি দেশে যুক্তরাষ্ট্রের ঘাঁটি থাকায় সেই দেশগুলিও ইরানের আক্রমণের শিকার হয়েছে। আর অন্যদিকে ইসরাইল যুক্তরাষ্ট্রের আক্রমণে ইরানের প্রচুর ক্ষয়ক্ষতি প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে। যে কোনো যুদ্ধের ক্ষেত্রে মানবিক বিষয়ে যে কোনো ধরনের অবক্ষয় একটা বড় রকমের সমস্যা সৃষ্টি করতে পারে আর বিশেষত প্রাণহানির বিষয়টি এতখানি অমানবিক যে তা বলাই বাহুল্য। সাম্প্রতিক সময়ে যুক্তরাষ্ট্র, ইসরাইল ইরান যুদ্ধে, কেবল মাত্র ইরানেই প্রাণহানির সংখ্যা ,৩০০ জন থেকে ,৬০০ জন হতে পারে। এই যুদ্ধে অসামরিক লোকজনের প্রাণহানির সংখ্যা হচ্ছে ২৫০ জন শিশুসহ অন্তত ১৬০০ লোক। তাছাড়া লেবাননে প্রায় ২৩০০ লোক প্রাণ হারিয়েছেন আর ইসরাইলের এই সংখ্যা ২৬। যুক্তরাষ্ট্রের হিসাব অনুযায়ী সামরিক বাহিনীর প্রায় ১৩ জন সদস্য নিহত হয়েছেন। যদিও ইরান দাবি করছে সংখ্যা আরও বেশি। তবে সংখ্যার হিসাব দিয়ে যুদ্ধের ভয়াবহতা পরিমাপযোগ্য নয়। একজন লোকেরও প্রাণহানি মানবতাকে ভঙ্গুর করে তোলে। 

সে জন্যেই প্রয়োজন কোনো কোনো ক্ষেত্রে দ্বিপাক্ষিক আবার কোনো কোনো ক্ষেত্রে বহুপাক্ষিক কূটনৈতিক আলোচনার মধ্যে সকল রকমের সংঘাত সংঘর্ষের অবসান ঘটানো। জাতিসংঘের বহুপাক্ষিকতা শান্তির জন্য কূটনীতি দিবস সেই কথাটিকেই প্রাধান্য দিয়ে থাকে। বহুপাক্ষিকতা যে মৌলিক নীতির ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠে তাহলো, শলাপরামর্শ, অন্তর্ভূক্তি এবং একাত্মবোধ। সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর ঐকমত্যের ভিত্তিতে তৈরি যে নিয়ম টেকসই কার্যকর সেটিই এই নীতির তৎপরতাকে অর্থবহ করতে পারে। সুতরাং বহুপাক্ষিকতা যেমন একদিকে সহযোগিতারই একটি পদ্ধতি, অন্যদিকে আন্তর্জাতিক ব্যবস্থাপনার একটি সংগঠিত রূপ হতে পারে। ২০২৪ সালে জাতিসংঘে অনুষ্ঠিতভবিষ্যৎ বিষয়ক শীর্ষ বৈঠকেবিশ্বের নেতারাভবিষ্যতের জন্য একটি চুক্তিঅনুমোদন করেন যেখানে তাঁরা শান্তি, টেকসই উন্নয়ন এবং মানবাধিকার রক্ষার ব্যাপারে তাঁদের প্রতিশ্রুতিকে পুনর্ব্যক্ত করেন। আজকের এই সংযুক্ত বিশ্বে, যে কোনো সময়ের তুলনায় এখন বহুপাক্ষিকতাও কূটনীতির অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠেছে। সংঘাত সংঘর্ষ নিরসনে জাতিসংঘ যে ধরনের কূটনীতি বহুপাক্ষিকতার ওপর জোর দিয়ে আসছে, বর্তমান পরিস্থিতিতে তাকে পাশ কাটানো হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র ইরানের মধ্যে পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় যে দ্বিপাক্ষিক আলোচনা হলো এবং সম্ভবত আগামী দিনেও হবে তা কিন্তু বহুপাক্ষিক আলোচনা নয়, সেটি কেবলই দ্বিপাক্ষিক আলোচনা। আমরা আবার এটিও লক্ষ্য করলাম যে ইসরাইল লেবাননের মধ্যে আরেকটি দ্বিপাক্ষিক আলোচনা অনুষ্ঠিত হলো। সব আলোচনায় আংশিক সাফল্য আসলেও শান্তি কতখানি টেকসই সুদূর প্রসারি হবে সে নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহের অবকাশ রয়েছে। 

এখন প্রয়োজন দ্বিপাক্ষিক নয়, বহুপাক্ষিক আলোচনা। কারণ বাহ্যত যা কেবল মাত্র ইরান, যুক্তরাষ্ট্র ইসরাইলের যুদ্ধ বলে মনে হচ্ছে প্রকৃত পক্ষে এই যুদ্ধের সম্প্রসারিত দিকটিও আমাদের উপলব্ধি করতে হবে। কাজেই কোনো রকম দ্বিপাক্ষিক আলোচনা বাহ্যত সফল হলেও এর প্রভাব প্রতিক্রিয়া থেকেই যাবে। গোটা মধ্যপ্রাচ্য এই যুদ্ধের ভয়াবহতা অনুভব করছে প্রত্যক্ষ না হলেও, পরোক্ষভাবে। তাই জাতিসংঘ যে বহুপাক্ষিক কূটনৈতিক আলোচনার ওপর জোর দিচ্ছে, সংশ্লিষ্ট সকলের উচিত হবে সেদিকেই এগিয়ে যাওয়া। তাতে হয়ত সময় লাগবে বেশি, তর্ক বিতর্ক হবে অনেকক্ষণ কিন্তু শেষ পর্যন্ত টেকসই সমাধানের দিকে যাওয়া সম্ভব হবে। ভিন্ন মতের মধ্য দিয়েই উঠে আসবে ঐকমত্য। 

Related Posts