কাগজের ক্যানভাসে পৃথিবীর গল্প—৬ মুদ্রার আড়ালে লুকিয়ে থাকা বিচিত্র সব গল্প || আখতার আহমেদ রাশা

আমাদের দৈনন্দিন জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হলো কাগজের মুদ্রা বা ব্যাংকনোট। সভ্যতার বিবর্তনে বিনিময়ের মাধ্যম হিসেবে কাগজের মুদ্রার প্রচলন এক যুগান্তকারী অধ্যায়। কেনাকাটা কিংবা জমানোর প্রয়োজনে প্রতিদিন কত নোটই না আমাদের হাতবদল হয়। কিন্তু আমরা কি কখনো খেয়াল করেছি, হাতের এই ছোট্ট কাগজটি আসলে একটি দেশের সংস্কৃতি, ইতিহাস এমনকি ধর্মীয় বিশ্বাসের এক শৈল্পিক দলিল? কখনো নোটের গায়ে থাকে নৈতিকতার পাঠ, কখনো বা লুকিয়ে থাকে অনিচ্ছাকৃত কোনো রহস্য কিংবা মুদ্রণ ত্রুটি। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের ব্যাংকনোটের পরতে পরতে লুকিয়ে থাকা এমনই কিছু বিস্ময়কর এবং বিচিত্র তথ্য নিয়ে আজ লিখছি  

ব্যাংকনোটের গায়ে আধ্যাত্মিক বাণী ব্যবহারের ক্ষেত্রে পাকিস্তান যুক্তরাষ্ট্র অনন্য। পাকিস্তানের নোটের পেছনে উর্দুতে লেখা থাকে: ‘হসুলরিজকহালাল ইবাদত হ্যায়’, যার অর্থ— ‘বৈধ পথে আয় করাও একটি ইবাদত অন্যদিকে, মার্কিন মুদ্রায় ১৯৫৬ সাল থেকে দাপ্তরিকভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে  ‘ওহ এড়ফ ডব ঞৎঁংঃ এটি মূলত বস্তুগত সম্পদের চেয়ে আধ্যাত্মিক সুরক্ষা, ঐক্য এবং নৈতিক পথনির্দেশনার প্রতি জাতির অবিচল আস্থার প্রতীক। ভারতের ব্যাংকনোটের দিকে তাকালে দেশটির বিশাল ভাষাগত বৈচিত্র্য স্পষ্ট হয়ে ওঠে। ভারতের প্রতিটি নোটের পেছনে একটিল্যাঙ্গুয়েজ প্যানেলথাকে, যেখানে ১৫টি ভিন্ন আঞ্চলিক ভাষায় নোটের মান লেখা আছে। এছাড়া নোটের প্রধান অংশে ব্যবহৃত হয় ইংরেজি এবং দাপ্তরিক ভাষা হিন্দি। সব মিলিয়ে মোট ১৭টি ভাষায় নোটের মান লেখা থাকে। এই অন্তর্ভুক্তি মূলত ভারতের বিভিন্ন ভাষার প্রতি শ্রদ্ধা, ‘বৈচিত্র্যের মধ্যে ঐক্যবা খরহমঁরংঃরপ উরাবৎংরঃুএর এক অনন্য উদাহরণ, যা দেশটির প্রতিটি নাগরিকের মাতৃভাষার প্রতি সম্মান প্রদর্শন করে।

মায়া সভ্যতার দেশ গুয়াতেমালার মুদ্রার নামকুয়েতজাল’ (ছঁবঃুধষ) এই নামটি এসেছে তাদের জাতীয় পাখির নাম থেকে। প্রাচীন মায়া সভ্যতায় এই পাখির উজ্জ্বল সবুজ পালক অত্যন্ত মূল্যবান ছিল এবং তা বিনিময়ের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহৃত হতো। এই ঐতিহ্য ধরে রাখতেই দেশটির প্রতিটি নোটে উড়ন্ত কুয়েতজাল পাখির ছবি দেখা যায়।

বাংলাদেশের ১০০০ টাকার নোটটি (২০০৮ সংস্করণ) দেশটির জাতীয় ইতিহাসের এক অনন্য প্রতিফলন। এই নোটের সামনের অংশেকেন্দ্রীয় শহীদ মিনার’—এর ছবি রয়েছে, যা ১৯৫২ সালের মহান ভাষা আন্দোলনে শহীদদের স্মৃতির প্রতি উৎসর্গকৃত। এটি বিশ্বের অন্যতম সুন্দর একটি নোট হিসেবে পরিচিত, যা একটি জাতির আত্মপরিচয় বহন করে। 

১৯৯৮ সালে ফিলিপাইন ১০০,০০০ পিসো মূল্যের একটি বিশেষ নোট ইস্যু করে। এটি প্রায় একটি লিগ্যাল সাইজ কাগজের সমান (৩৫৬ মিমি ২১৬ মিমি) এটি বিশ্বের সবচেয়ে বড় আইনি টেন্ডার নোট। ১৯৪৪ সালে মরক্কো জরুরি ভিত্তিতে ৫০ সেন্টাইমসের (৫০ ঈবহঃরসবং) একটি নোট ইস্যু করে। এর আকার ছিল মাত্র ৪১ মিমি ৩২ মিমি। এটিকে বলা হয় ক্ষুদ্রতম নোট। ১৯৪২ সালে ফিজিতে পেনি নোট ইস্যু করা হয়েছিল। ব্রিটিশ উপনিবেশ থাকাকালীন এটি ছিল পাউন্ডের ২৪০ ভাগের ভাগ, যা এখন পর্যন্ত কোনো দেশের ইস্যু করা সর্বনিম্ন মানের নোট। 

রাশিয়ার তাতারস্তান এমন এক সিরিজের নোট ইস্যু করেছিল যাতে কোনো নির্দিষ্ট সংখ্যা বা মান লেখা ছিল না। রাশিয়ার স্বায়ত্তশাসিত প্রজাতন্ত্র তাতারস্তান ভলগা নদীর তীরে অবস্থিত। দেশটির রাজধানী কাজান। নব্বইয়ের দশকের শুরুতে সেখানে এক অদ্ভুত মুদ্রাব্যবস্থা প্রবর্তন করা হয় সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে যাওয়ার পর যখন রুবেলের মান দ্রুত কমছিল, তখন তাতারস্তান সরকার সরাসরি কোনো সংখ্যা বা মান ছাড়াইসোশ্যাল চেকবা কুপন ইস্যু করে। এই নোটগুলোর মান বোঝা যেত মূলত সেগুলোর রঙ দেখে। প্রতিটি নির্দিষ্ট রঙের কুপন নির্দিষ্ট পরিমাণ রুটি, চিনি বা তেলের সমপরিমাণ মান বহন করত। পরবর্তীতে যখন এই চেকগুলোতে সংখ্যা যোগ করা হয়, তখন সেখানে ফুটিয়ে তোলা হয় তাদের গর্বের প্রতীকসয়ম্বিকা টাওয়ার এই নোটগুলো আজ কেবল মুদ্রা সংগ্রাহকদের কাছেই মূল্যবান নয়, বরং এটি একটি জাতির অর্থনৈতিক সার্বভৌমত্ব রক্ষার লড়াইয়ের এক নীরব সাক্ষী।

 মুদ্রার নকশায় অনিচ্ছাকৃত ভুলের এক রোমাঞ্চকর উদাহরণ হলো ১৯৫৪ সালের কানাডিয়ান ডলার। ব্রিটেনের নতুন রানি দ্বিতীয় এলিজাবেথের ছবি দিয়ে এই নোটগুলো ছাপা হয়েছিল। নোটগুলো বাজারে আসার পর হইচই পড়ে যায়, কারণ অনেকেরই মনে হয়েছিল রানির চুলের ভাঁজে একটিশয়তানের মুখ’ (উবারষ' ঋধপব) দেখা যাচ্ছে! বিতর্ক এড়াতে ব্যাংক অব কানাডা দ্রুত নোটের নকশা পরিবর্তন করে নতুন নোট ছাপে। ২০১৮ সালে অস্ট্রেলিয়া প্রায় ৪৬ মিলিয়ন নতুন ৫০ ডলারের নোট বাজারে ছাড়ে। এই নোটের এক কোণায় ক্ষুদ্রাক্ষরে (গরপৎড়ঃবীঃ) বিখ্যাত নারী সংসদ সদস্য এডিথ কাওয়ানের একটি ভাষণ ছাপা হয়েছিল। সেখানেজবংঢ়ড়হংরনরষরঃু’ (দায়িত্ব) শব্দটি ভুল করেজবংঢ়ড়হংরনরষঃু’ (শেষেবাদ পড়েছিল) হিসেবে ছাপা হয়। বিশাল সংখ্যক নোট বাজারে চলে যাওয়ার সাত মাস পর এই ভুলটি নজরে আসে। 

১৯৯৯ সালে প্রবর্তিত ইউরো বর্তমানে ইউরোপীয় ইউনিয়নের একুশটি রাষ্ট্রের (ইউরোজোন) সরকারি মুদ্রা। মার্কিন ডলারের পর এটি বিশ্বের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ লেনদেন হওয়া মুদ্রা। ইউরোর ব্যাংকনোটে বিভিন্ন স্থাপত্যশৈলী নকশা স্থান পেয়েছে, যা ইউরোপের সমৃদ্ধ সাংস্কৃতিক ইতিহাস এবং অর্থনৈতিক সংহতির প্রতীক হিসেবে কাজ করে। 

অস্ট্রেলিয়ার কারেন্সি ইতিহাসের এক অদ্ভুত অধ্যায় হলো ১৯৬৬ থেকে ১৯৯৩ সাল পর্যন্ত প্রচলিত ১০ ডলারের নোটটি। এই নোটের এক পিঠে ছিলেন বিখ্যাত কবি হেনরি লসন, আর অন্য পিঠে এক দন্ডপ্রাপ্ত আসামীস্থপতি ফ্রান্সিস গ্রিনওয়ে। পেশায় স্থপতি গ্রিনওয়ে ১৮০৯ সালে ব্যবসায়িক মন্দায় পড়ে দেউলিয়া হয়ে যান। ভাগ্য ফেরাতে তিনি আর্থিক দলিল জালিয়াতি করেন, যার শাস্তিস্বরূপ ১৮১২ সালে তাঁকে ইংল্যান্ড থেকে অস্ট্রেলিয়ায় নির্বাসিত করা হয়। কিন্তু তাঁর প্রতিভা তাঁকে দমে থাকতে দেয়নি। অস্ট্রেলিয়ার নিউ সাউথ ওয়েলসের তৎকালীন গভর্নর ল্যাকলান ম্যাককুয়ারি তাঁর মেধা দেখে তাঁকে কলোনির প্রধান স্থপতি হিসেবে নিয়োগ দেন। সিডনির বিখ্যাতম্যাককুয়ারি লাইটহাউসএবং ইউনেস্কো হেরিটেজ সাইটহাইড পার্ক ব্যারাকসতাঁরই সৃষ্টি। অতিরিক্ত খরচের অভিযোগে ১৮২২ সালে তাঁকে চাকরি থেকে বরখাস্ত করা হয়। চাকরি যাওয়ার সাথে সাথে তাঁর সরকারি বাসভবনও ছেড়ে দেওয়ার কথা ছিল। মজার ব্যাপার হলো, জালিয়াতির দায়ে শাস্তি পাওয়া এই মানুষটি জীবনের শেষবেলায় উচ্ছেদ ঠেকাতে আবারও জাল দলিল তৈরি করেছিলেন। ১৮৩৭ সালে চরম দারিদে্র্যর মধ্যে এই গুণী স্থপতির মৃত্যু হয়। আজ সিডনির বুকে ৪৯টি আইকনিক ভবন এবং ১০ ডলারের নোটের সেই প্রতিকৃতি গ্রিনওয়েকে ইতিহাসের পাতায় এক বিচিত্র স্মরণীয় চরিত্র হিসেবে বাঁচিয়ে রেখেছে। একজন জালিয়াতের জন্য ১০ ডলারের নোটে স্থান পাওয়ার চেয়ে বড় সম্মান আর কী হতে পারে! ফ্রান্সিস গ্রিনওয়ের মতো মানুষের গল্পগুলো আমাদের দেখায় যে, মুদ্রার জগত কতটা রহস্যময় হতে পারে।

আমরা সাধারণত ব্যাংকনোটকে কাগজের মুদ্রা বললেও এটি মূলত ৭৫% তুলা (ঈড়ঃঃড়হ) এবং ২৫% লিনেন (খরহবহ) দিয়ে তৈরি। এই বিশেষ সংমিশ্রণের কারণেই একটি নোট অত্যন্ত টেকসই হয় এবং ছিঁড়ে যাওয়ার আগে প্রায় ,০০০ বার ভাঁজ করা সম্ভব হয়। প্রতিটি ব্যাংকনোট আসলে সময়ের একটি জানালা, যার মধ্য দিয়ে আমরা অতীতের শিল্পকলা সংস্কৃতিকে দেখতে পাই। মুদ্রার এই স্বল্প পরিচিত ইতিহাস আমাদের বিশ্ববাজারের বৈচিত্র্যময় জগতের এক অনন্য ঝলক। এটি মনে করিয়ে দেয় যে, অর্থ কেবল কাগজের টুকরো নয়, বরং সময় ভূগোলের সীমানা ছাড়িয়ে বোনা এক সমৃদ্ধ গল্পের জাল। এরপর যখন কোনো ব্যাংকনোট আপনার হাতের স্পর্শ পাবে, তখন একবার এর দীর্ঘ পথচলার কথা ভাববেন। এর প্রতিটি ভাঁজে লুকিয়ে আছে অগণিত মানুষের সংগ্রাম, সৃজনশীলতা আর ইতিহাসের পদচিহ্ন। দিনশেষে প্রতিটি মুদ্রা কেবল বিনিময়ের মাধ্যম নয়, বরং মানব সভ্যতার বিবর্তনের এক জীবন্ত দলিলযা আমাদের অর্থনৈতিক সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের নীরব সাক্ষী হয়ে রয়। আপনার কাছে থাকা প্রতিটি মুদ্রাই আসলে একেকটি দেশ সংস্কৃতির না বলা মহাকাব্য।



Related Posts