কবিতার মাস এপ্রিলে ২১টি কবিতা
জেলার সংখ্যা ৬৩
সাইফুল্লাহ মাহমুদ দুলাল
কোরবানীর টুকরো টুকরো মাংসের মতো ভাগ করে বিলিয়ে দাও
ফরিদপুরে, পিরোজপুরে, বাগেরহাটে, মাদারীপুরে,
বরিশালে, নড়াইলে মিশিয়ে দাও।
নিষিদ্ধ। বিলুপ্ত।
.
আসিফ নজরুলের আইনে মধুমতিকে নিয়ে যাও বগুড়ায়
অথবা ছুঁড়ে ফেলে দাও বঙ্গোপসাগরে
বাকী নদীগুলো ভরাট করো বা বিক্রি করে দাও।
কবর দিয়ে সমাহিত করো টুঙ্গিপাড়া।
.
মানচিত্র থেকে মুছে গেছে হিন্দু—হিন্দু গন্ধ গোপালগঞ্জ,
পাঠ্যপুস্তকে এখন জেলার সংখ্যা ৬৩।
—টরন্টো
রবির আলো
(রবীন্দ্রনাথকে স্মরণ করে)
শামস আল মমীন
তাঁর হাঁটার ভঙ্গিতে, মুখের রেখায়,
চোখের দৃষ্টিতে ছিল সহস্র যুগের আলোকরশ্মি।
তিনি হাঁটলেই আলখেল্লার ভেতর থেকে
ঝরে পড়তো অমর পঙক্তিমালা, আর বৃষ্টি বৃষ্টি খেলা
শেষে সুর হয়ে উঠতো
তন্দ্রাচ্ছন্ন চোখে চোখে
জোড়াসাঁকোর বাগানে রুয়েছেন তিনি
হরেক ফুলের গাছ। জ্যোৎস্নায়
পুড়তে পুড়তে বজরা ভাসিয়ে
শুনেছেন
লালনের সুর
অন্ধকারে আমরা যখন অন্ধ, তাকাই উন্মুখ
নক্ষত্রের দিকে...
চাঁদও জ্যোৎস্না দেবে বলে পক্ষী ও মনুষ্যকূলে
কী সুন্দর কিচির মিচির...
গাছেরাও গরবীণী আপন সবুজে
এক মুঠো আলোর জন্য, ছিটে ফাটা ঠান্ডা হাওয়ার জন্য
আর জো্যাৎস্নায় উৎসব হবে বলে
কেন যে তোমরা অপেক্ষায় থাকো
নক্ষত্র ও চাঁদ আর গাছের সবুজ হাসতে হাসতে বলে,
আমরাই তো বেঁচে থাকি রবির আলোয়...
—নিউইয়র্ক
‘যাওয়াতো নয় যাওয়া’
আনিস আহমেদ
আজকাল আমি বার বার বটবৃক্ষের কাছে যাই
মাঝে মাঝে হিংসের আগুনে পুড়ে হই ছাই।
শৈশবে দেখা এই বুড়ো বট গাছটার এমন আয়ু
ফুরোয় না আজও ঝড়ে, যত তীব্রই হোক বায়ু।
আমার রয়েছে কেবল প্রতিদিনই কবিতার কিছু ছন্দ
মৃত্যুর কথা কীইবা বলি আর, জীবনেইতো দ্বন্দ্ব।
গত শতকে জনম আমার, হবে এ শতকে মরণ
তবে শতবর্ষের আয়ু নয় জেনো, জীবন করবে সে হরণ।
অতঃপর দেখবে সবাই, সবার অশ্রুসজল নয়ন
মুচকি হেসে বিধাতা তখন করবে আমায় বরণ।
হিংসে তবে কেন শুধু শুধু বটের আয়ুর প্রতি
মৃত্যুতো আনে ভিন্ন জীবনের অভিন্ন এক গতি।
জীবনতো নয় রুদ্ধ কেবল, আকাশ— মাটির মাঝে
জীবনতো নয় সচল কেবল সকাল থেকে সাঁঝে।
স্থান—কালের সীমানা পেরিয়ে জীবন চলে উড়ে
সীমার সাথে অসীম তখন আপনি পড়ে জুড়ে।
এই মিলনের প্রতীক্ষায়তো কাটছে বরষ মাস
মৃত্যুতো নয় কেবল যখন রুদ্ধ হবে শ্বাস।
ঈশ্বর—খোদা—গড তোমরা যে যা বলো ভাই
প্রেমের বাঁধন তাঁরই সাথে আরতো কিছু নাই।
এই বাঁধনে মুক্তি আমার তাতেই খুশি আমি
তিনি দেখেন বাইরে যেমন, তেমনি অন্তরযামী।
মরণকে আর করবো নাতো সারাজীবন ভয়
মরণ মাঝেই দেখি আমি জীবনেরই জয়।
—মেরিল্যান্ড
স্বতন্ত্র সনেট ২২৯
হাসানআল আবদুল্লাহ
হারানো হাড়ের ব্যথা ভালবাসা যায় না তো ছোঁয়া
সমন্বিত অশ্রম্ন ঝরে স্মৃতিগুলো জমা হয় ঘামে
ক্ষত্রিয় হয়েও আমি যুদ্ধবাজ হইনি কখনো
আমার শরীরে আছে মানুষের জড়ানো পোশাক
যে জমিন চাষ করি তার আল পাহাড় লাগোয়া
ঝর্ণার শীতল এসে ঢাল বেয়ে মাঝে মাঝে নামে
নিয়মিত কেটে ফেলি পাদদেশে বিস্তীর্ণ বন—ও;
সারি সারি ঘরবাড়ি উঁচু উঁচু সাজানো পাহাড়ে
সাপের মতন ক’রে ঘোরানো পেঁচানো রাজপথ,
সেই সব পার হয়ে মানুষ এসেছে বহুদূর
কানে কানে শুনে তারা দিয়েছেও দিগন্তের ডাক।
আজ তারা প্রতিদিন জ্যামিতিক হারে শুধু বাড়ে;
কেউ কেউ অবিবেকী, কেউ কেউ হয়েছে মহত;
তাদের সুরের সাথে মিশে গেছে ভাটিয়ালি সুর।
—নিউইয়র্ক
তোমারই কারণে
শামীম আজাদ
তোমারই কারণে রে মজ্জুব,
আকাশ আলনা রেখে
চিলেরা উড়া উড়ি করে
চিক চিক তার ডানা
আমার চোখের ভেতরে।
ডিসেম্বর নেমে এলে,
গরম স্যুপের বাটি
ঊষার উষ্ণতা ধরে
আমারে জড়াইয়া ধরে।
বৃ্ষ্টিবালা রাত্রিমাখা দিনে
কত গল্প, মিষ্টি কথা—
ঝালমুড়ি, রবীন্দ্রনাথ
কত ট্রেন চলে
এই অন্তরের থানে।
এ তথ্য নতুন নয়
কারো না কারো জন্য
এমনই সকলের হয়
যার যার নিজস্ব কেবিনে
ও মনে।
এপ্রিল শাওয়ারে ভিজে
বিলেতের ব্যাপক গরমে
যেন আম কুড়াবার ধুম লাগে
আমার মনো—বৈশাখ বাগে।
—লন্ডন
পুণ্যাহ কথা
বদরুজ্জামান আলমগীর
একটি গ্রাম কাকরগাছি টোনাটুনির বাস
একটি নদী ঘোড়াউত্রা লম্বা গলার হাঁস।
মুখ বাড়িয়ে থাকে নিতুই সঞ্চিবেরি গ্রাম
নাওয়ের গলুই নিয়ে আসে জলসরলার নাম।
পানিখাউরি পক্ষী বসে লখাইপুরের বাঁকে
চন্দ্র বুড়ির সুতা লাগে মাকড় ভরা হাতে।
নাটাই ছাড়া ঘুড্ডি ওড়ে মনবেহুলার টানে
গরুর চোখে কত মধু কালো মাছিরা জানে।
পান খেয়েছে ডুমুর কইনা বাঞ্চে মাথার কেশ
চুন পড়িলো নদীর জলে তাই আগুনের বেশ।
হাম্বা রবে উড়ছে সমন ফাটা নসিবের রেশ
চোখের তারায় ঝালর কাটা তোমার নিরুদ্দেশ।
—পেনসিলভেনিয়া
এপ্রিলের কবিতা
রাকীব হাসান
এই এপ্রিলের নতুন পাতায় কবিতা লিখে যাচ্ছি
কেউ না পড়ুক বাতাস তো পড়বে,
ফুলের গায়ে বাতাসে বাজুক স্বপ্নখোর বালকের মন।
কেউ যদি না চায় পাখিদের শিস
কারো ঠোঁটে লাটিম ঘুরাবো,
অথবা নিজেই লাটিম হয়ে নাভীতে ঘুড়বো আনন্দ।
এই এপ্রিলে আমি পোকাদের স্কুলে ভর্তি হয়েছি
ক্লাসরুমে সঙ্গমের নসিহত শুনি
বৃষ্টি নামলে গলে যেতে হবে
আঙুলে বাদ্য ভরে ছুঁয়ে দেবো মাছের স্তন।
পোকার সঙ্গমে জন্ম লয় বসন্ত অনন্তকাল
দেহ মরে না, যার গায়ে মাকড়সার জাল
বেঁচে আছি, পচনে—পোকায় এবং পরম্পরায়।
প্রেমের নতুন পাঠশালায়
চোখে আমার ঝিঝি পোকার পাখা নাচে
এক ফোটা নজর যদি দিতে পারো
তোমার নাম শুনবে আম পাতার প্রথম শব্দে —
প্রাণের স্বরে আরও বেশি পোকা—মাকড়ের কথা হোক
এই এপ্রিলের কবিতায় তোমার হৃদয় খুলুক।
—মন্ট্রিয়েল
একই মুখোশে বিমূর্ত প্রতীক
হোসাইন কবির
সূর্যের আলোয় কিংবা আঁধারে
কোনো বিভাজনরেখা আজ স্পষ্ট নয়
তবু দিন গড়িয়ে যায় রাতের অচেনা স্বরে
সকাল বিকেল সব একাকার করে
চেনা রঙে বিস্মৃতির ধূসর আলপনায় ছড়িয়ে পড়ি—
যেখানে আনন্দ আর বিষাদ
একই মুখোশে বিমূর্ত প্রতীক— পাশাপাশি
ঘুরছি সময়চক্রে একই বৃত্তে— অবিরাম— অনিশ্চিত
দাঁড়িয়ে থাকি
পথে ঘাটে অন্ধকারে— গলির মুখে
তবুও হিসেব মেলে না
সোজা কিংবা বাঁকা
সব পথ এক ও অভিন্ন ঠেকে—
যেন প্রতিটি গন্তব্য আজ
একই অদৃশ্যে শূন্যতায় ধাবমান
আলোতে আঁধার
অতৃপ্ত বিরহে বেদনাচুম্বন
হিসেবে মেলে না সখী অলৌকিক বিশ্বাসে
এসো তবে অতলেই ডুবে যাই
—নিউইয়র্ক
ভগ্নাংশের যোগফল
আলী সিদ্দিকী
একলা এক কাক আমি মানুষের মগ্নভিড়ে
ল্যান্সডেল থেকে ওয়ালিংফোর্ড
নিউইয়র্ক থেকে বাংলাদেশের এক চিলতে ভূমি
নির্লিপ্তমগ্নতার ভেতর ঘুমায় হাঁটু মুড়ে
মেপল থেকে কৃষ্ণচূড়ার ডালে ডালে
অহর্নিশ কা কা করে তোমার জন্য কেঁদে চলেছি।
আমাদের প্লেটোনিক জার্নি দিয়েছিলো
ঈর্ষাজ্বালা মানুষের অন্তরাত্মা পোড়ানো অভিযাত্রা
ঘষে দিয়েছিলাম আমরা ঝামাপাথর একদিন
একশত একটি লালগোলাপের রুমাল উড়িয়ে
ভেঙেছিলাম বদ্ধচেতা মানুষদের ইগো
গড়েছিলাম মুক্ত বিহঙ্গের এক বনেদী আকাশ।
হলো কিছু জীবন পোড়ানো চড়ুইভাতি
আগাগোড়া জম্পেশ যুদ্ধই ছিলো বিপরীত স্রোতে
হৃদয়ের নোনাজলে ভেসে গেছে শত সহস্র দিনরাত
ক্লান্তিহীন লড়াইয়ে পেরিয়ে এসেছি কঠিন পুলসেরাত
হাতের মুঠোর ভেতর হাত ছিলো অবিচল
হোঁচট খেয়েছি কত কত কোথাও আমরা থামি নি।
মুঠো খুলে আজ তোমার হাত ছিটকে হয়েছে বেপথু
অবলম্বনহীন হাতজোড়া আমার নিরুপায় বিবশ
লণ্ডভণ্ড জীবন হারিয়ে ফেলেছে সময়ের গতি
সবাই কুড়িয়ে দেয় তোমার হাসি, কখনো উচ্ছলতা
কেউ কেউ দাড়ি কমা জুড়ে দিয়ে বানায় পাটাতন
আমি শুধু নিজের ভগ্নাংশ দিয়ে তোমার মূর্তি গড়ি।
—পেনসিলভেনিয়া
রাতের জ্যাজ
লায়লা ফারজানা
আমার মধ্যরাতের জ্যাজ
আরোহণ করছি অবগাহন—
দুরন্ত ব্লু—নোটে
বসন্ত এখন
জ্বলে ওঠা ট্রাম্পেটে
আলোর কোলাজ—
বেনামী বেদনা
নিজেই নিজের সুর
পাহাড়ের তিন রাস্তা
ঘোড়ার চোখের
ডুবন্ত নৌকায়
বিপন্ন বিকৃত মেঝে —
অরলিন্সের অন্ধ গলির
তালের ভাঙা শ্বাস
সোনালী কেশরে
উড়ন্ত গাছের আকৃতি
আকাশে পুতুল—সদৃশ—বেলুন
স্যাক্সোফোনে — অদ্ভুত দাম্পত্য
লাল পিয়ানোর কাল চাবি
দুই রমণী বিয়ের সাজে
অস্বাভাবিক সুন্দর।
কাঠের সিঁড়ির ভাসমান প্লাটফর্মে
স্থুল সাদা লোক —
এক্সনোমেট্রিক লিফ্টের বাটন:
“ওয়েলকাম টু তিম্বাকতু”—
আমি নীল গান গাই
—নিউইয়র্ক
বাংলা কবিতায় ব্যাঙ
লালন নূর
কোথা থেকে উড়ে এসে ডালে বসে আছে পাখি..
তার ডানার রাগী বাতাস গাছের পাতাকে দোল দিচ্ছে।
মেঘে মেঘে ঘর্ষণ লেগে বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে।
পাখি কি জানে না —
ঘটনার মাঝে ছড়িয়ে রয়েছে প্রভূ ও ফাঁদের রাঙতা মোড়ানো গান!
এই ফাঁকে বাংলা কবিতার আষাঢ়ে প্রেম ঢুকে গিয়ে
লাফাতে লাফাতে যে বের হয়ে আসে
সে আসলে একজোড়া রাজনৈতিক ব্যাঙ।
—ওহাইয়ো
মন রাখি
আহমদ সায়েম
নীরব রাতের স্বপ্ন তুমি — অদেখা এক ধারা
সময়ের দাগে জ্বলা তুমি — অন্তরেরই ইশারা
চলার পথের ভাঙা সুরে — ডাকে কারা কারা
শরীরজুড়ে সংখ্যা বাড়ে — মায়ারই জোয়ারা
সময়ের দাগগুলো এখন — দীর্ঘ ছায়াপারা
লাল নীলের উচ্চতায়ও — লুকায় দুঃখভরা
কথার আড়াল জমে ওঠে — নীরবতার কারা
মনকাটা সেই রেশে বাজে — অচেনা এক তারা
তোমার ফুলেল রাখিতে বাঁধা — এই মনেরই ধারা
মিলনের প্রদীপ জ্বালাই — আমি তুমি একসারা।
—পেনসিলভেনিয়া
ফুল সুন্দরী
মুজিব ইরম
সুন্দরী গাছের ফুল ফুটিছে দূর সুন্দরবনে যাইনি কখনো আমি তবু তারে ফুটিতে দেখেছি.. আগর ফুটেছে খুব বনে আর মনে কুঁচফুল ঝরে গেছে ধরেছে রক্তিম ফল কিছুটা আড়ালে.. আহা গুস্তাভিয়া পাতার আড়ালে থাকো রোদ হয়ে ডাকো নাম ধরে.. ভুই চাঁপা মাটিতে ফুটেছো তুমি যেভাবে পাতার আগে মাটি ফুঁড়ে ফুটে ফুটে থাকো লোকে ডাকে ভূমিচম্পা বনেলা বনেলা রূপ সুগন্ধি কুসুম.. বনের ভেতরে তুমি কেড়ে নাও ঘুম।
—লন্ডন
অন্য অন্ধকার
(হোজে সারামাগোকে শ্রদ্ধা জানিয়ে)
মনিজা রহমান
শহরের সব নারী—পুরুষ পলকে অন্ধ হয়ে গেল
হাঁটতে হাঁটতে অন্ধ, ঘুম ভেঙে অন্ধ,
কফিতে চুমুক দিতে দিতে অন্ধ
চোখের ভেতরে নিভে গেল সবগুলো ল্যাম্পপোস্ট
সূর্যালোক কিংবা চাঁদের আলো, মোম অথবা মশাল।
লাইটের সুইচের প্রয়োজন শেষ —
জ্বলা—না—জ্বলায় কোনো পার্থক্য নেই।
অন্ধের আবার আলো!
চোখ যেন ব্যাটারি ফুরিয়ে যাওয়া টর্চ লাইট।
বাতাসে ছড়িয়ে দিয়েছে বিষ কারা যেন সন্তর্পণে
কী অকৃত্রিম অন্ধত্ব! কেউ কাউকে দেখে না, কিছুই দেখেনা
ঝি ঝি পোকার মত একটানা কাঁদছে অন্ধকার।
অসংখ্য অন্ধ মানুষের ভিড়েও তোমাকে চিনতে পারলাম
তোমার নিজস্ব কোলন আর প্রশ্বাস জানালো তুমি এসে গেছ
কোন পথে এলে তুমি? কীভাবে? কে তোমার হাত ধরেছিল?
অন্ধকারে চোখের ভেতর ভেসে উঠল অন্য এক নিরাকার সন্দেহ
নারীরা অন্ধ হলেও একা একা ফিরে যায় পিতৃগৃহে।
আমি হয়ে উঠি ঈর্ষা—কাতর আফ্রোদিতি
একি ভালোবাসার অন্ধত্ব নাকি অন্ধের ভালোবাসা?
জিপিএস হারিয়ে ফেলি মনের সাত মাথায়।
চোখের আলো নিভে গেলে অন্য এক অন্ধকার ঝলসে দেয় চোখ।
—নিউইয়র্ক
লুসি আমার নাম
জেবুন্নেছা জোৎস্না
দেহের বাহিরে সমান্তরাল জগতে এ ভ্রমণ
এই প্রথম অথবা শেষ না — হয়েছে বহুবার।
তোমরা শুনছিলে, “হীরকখচিত আকাশে লুসি” গান
আমি তখন বত্রিশ লক্ষ বছরের শিম্পাঞ্জি’র দেহে
এই পথে, পাহাড়ে— জঙ্গলে বৃক্ষ চূড়ায় ছিলাম
হোমো হ্যাবিলিস জন্মে বানিয়েছি হাতিয়ার
পিকিং ম্যান হয়ে আগুন জ্বালিয়ে পুড়িয়েছি সব
মরেছে আয়ুর মায়াগাছ — সবুজাভ বীজ তার
না জাগ্রতে— না ঘুমিয়ে — শূন্যে অংকুরোদগমে
অক্ষয় থেকেছে শুধু আজবুয— যানাব
এখন সংসার চক্রবুহ্যে — জীবনে জীর্ণতা
শপথ ভাঙ্গায় বাকলের ক্ষতে কতো কথা
দোটনায় মন করে শুধু — এপার—ওপার —
আজ এই এপ্রিল হাওয়ায়— চৈতন্য মায়ায়
সূর্য রোদে ত্রসরেণু পদ্যের কাপলেট ভাঙ্গায়
কম্পোস্টের অণুজীব ড্যান্ডেলিয়ন সাজায়
হায় সময় ! হলুদ যৌবন ফুল
সাদা প্যাপাসে ক্রমশ বৃদ্ধ হয়
শুধু একবার ভালোবাসি বলে
ব্লো—বলে ফুঁৎকারে দাও ইচ্ছেকে উড়িয়ে —
নয়তো কে জানে কবে আবার জাইগোট ভেঙে
দেহে দেবে প্রাণ —আজবুয— যানাব
—নিউইয়র্ক
কংক্রিটের ক্যাসেট
কাজল রশীদ
শহরের ধমনীতে এখন জ্যামিতিক কোলাহল,
সিগন্যালের লাল আলোয় আটকে থাকে,
কয়েকটি দীর্ঘশ্বাস আর গত হওয়া বিকেলের রোদ।
ফুটপাতে পড়ে থাকা খবরের কাগজগুলো এখন আর খবর দেয় না,
শুধু ধুলো জমায়।
তোমার সাথে দেখা হওয়ার কথা ছিল কোনো এক পরাবাস্তব স্টেশনে,
যেখানে ট্রেনের হুইসেলগুলো ধুলোর মতো ভেসে যায়।
কিন্তু আমাদের পকেটে এখন শুধু ডিজিটাল স্তব্ধতা,
স্মার্টফোনের স্ক্রিনে আঙুল ঘষলেই শুকিয়ে যায় একটা আস্ত নদী।
আমরা কেউ কাউকে চিনি না, অথচ,
একই বাসের হ্যান্ডেল ধরে ঝুলে আছি সমান্তরাল।
রাতের বারান্দায় যখন নিয়ন আলো জ্বলে ওঠে,
তখন বোঝা যায়,
আমরা আসলে একজোড়া বিচ্ছিন্ন দ্বীপের মতো ঘরে ফিরছি।
—লন্ডন
এপ্রিলের কবিতা
ফারুক ফয়সল
তোমার কাছে গচ্ছিত রেখেছি— বসন্ত দিনের পঙক্তিমালা,
দীর্ঘ শীতদিনের বিলাপসমূহকে পাঠিয়েছি বরফ করে পাহাড় চূড়ায়;
পশ্চিমের মনোরম বসন্ত—বাতাস মুঠোবন্দি করে,
নিদাঘের খরতাপে পাঠিয়ে দিলাম, বৈশাখী মেলায় বাংলাদেশে!
ইস্ট রিভারের তীরে গ্যান্ট্রি প্লাজায়ও চেরি ব্লসম দর্শনার্থীর ভিড়,
দক্ষিণের রাস্তায় ফুডকার্ট আর আইসক্রিমের গাড়ি।
সাঁঝ নেমে এসে উপুড় হয়ে বসে নদীবক্ষে..
শান্ত হয়ে আসে চারিধার, জলের স্রোত তীরে এসে ঘাই মারে,
পদ্মা যমুনার সাথে মিসিসিপি, কলোরাডো একাকার জলস্বরে!
কবি—ল্যাঙস্টোন হিউজের ‘এপ্রিল রেইন সঙ’ আওড়াই, পড়ে যাই—
টি এস এলিয়টের ‘দ্য ওয়েস্ট ল্যান্ড’ এডনা সেন্ট ভিনসেন্টের ‘স্প্রিং’!
দুলিয়ে মাথা ড্যাফোডিল ও লাইলাক, টিউলিপ ও হায়াসিন্থ নাচে—নাচায়,
রংধনু রঙয়ের ঢেউ খেলে যায় বসন্তের হাওয়ায়!
শিমুল, পলাশ, কৃষ্ণচূড়া অশোক ও গাঁদার সারি বাড়ির আঙিনায়..
চকিতে মনে হয়, কানের পাশ দিয়ে বসন্তের কোকিল গান গেয়ে যায়!
—নিউইয়র্ক
আঁখিযোগ
বেনজির শিকদার
দিনটি সেদিন আদুরে খোলসে ঢাকা
তুমি ছিলে ঠিক জানালার ধারে বসে!
ভাষাহীন সেই চোখের চাহনিটুকু
এতদিন পরও স্মৃতির পাথর ঘষে!
চোখ ছিল ওই চোখের আকাশ জুড়ে
সারাটা পথতো কথাই হয়নি মোটে;
কম্পনে ছিল পুলক পাহাড়—নদী——
নীরবতা ছুঁয়ে স্বপন বাবুই ছোটে।
কামরায় ভিড় মানুষের আগাগোনা
আমাদের মন চোখের তারায় মিশে;
হুইসেল বাজে, সম্বিত ফিরে হাসি
অচেনা রাগের ঠুমরীর বন্দিশে!
আড়চোখে দেখি, ফের সরে চোখ দূরে
চোখের সঙ্গে চোখের এমনি মিল!
লুকোচুরি খেলি নিজের সাথেই নিজে
দস্যি ডাকাত তোমার ঠোঁটের তিল।
আমার তখন ভেতর ভেতর ঘাম
তুমিও দেখছো লাস্য—লাজুক চেয়ে;
গলা শুকিয়েছে তেষ্টা পেয়েছে খুব
জানালার ধারে পদ্মচোখের মেয়ে।
অতনু ওড়না বাতাসে দোলায় ঘ্রাণ
আমি ভেসে যাই মনের দুয়ারে তৃষা;
এই যে হঠাৎ তোমার আমার দেখা
চোখের মিলনে উদাসীন অমানিশা।
দেখেছি তোমার থুতনির কারুকাজ
দেখেছি তোমার অরূপ রূপের দোলা;
এই জীবনের হারানো ভ্রমণপথে
ক্ষণিক সে ধন, যায়নি তোমায় ভোলা।
দেখেছি তোমার পদ্মচোখের পাতা
দেখেছি তোমার ভুরুর অমল রেখা;
একজীবনের যৌথ যাত্রাকালে
তোমার সঙ্গে আর—তো হবে না দেখা!
—নিউইয়র্ক
আমাদের বলার কিছু নেই
রাজিয়া নাজমী
অনেকদিন পর পুরনো প্রেমের কাছে
ফিরে এলাম— কিছু না বলা কথা নিয়ে
আরেকবার — রিকশার টুংটাং শব্দে
একতলা বাড়ির সীমানায় — কদম গাছের নিচে
দাঁড়িয়ে বৃষ্টিতে ভিজে ভিজে
দেখতে— ফুল কি আজও ফোটে!
ফিরে এসে দেখি মিলিয়ে নেবার কিছু নেই
সেই বাড়ি নেই, আছে অন্য বাড়ি
সেই গাছ নেই, আছে অন্য গাছ
তুমি আজও আছো
পুরনো প্রেমের স্মৃতি আছে — প্রেম নেই।
আমাদের বলার কিছু নেই!
—নিউইয়র্ক
মানুষশিকারী
রওশন হাসান
যেদিকে তাকাই রঙ ভরপুর দিন
কেবলি উপমাময়, মুগ্ধ হতে হতে বিষন্ন হতে থাকি—
হয়তোবা এমনি একটি পুষ্পদিনে আদম ও ঈভের
আবির্ভাব ঘটেছিলো পৃথিবীতে।
বৃক্ষরাজি দীর্ঘ, মুকুলিত হয়েছিলো মানুষের জন্যই।
আগ্নেয়াস্ত্রের আগুনে ঝলসে যায় যে নগর
স্তুপে স্তুপে নিষ্পাপ শিশুদের মৃতদেহ,
তবে কি এ মহাকালে এখনও স্থিতি হয়নি সভ্যতা?
একদল বুভুক্ষু শিকারীদল হত্যার স্বপক্ষে কথা বলে—
মানুষ মরে অহেতুক অপরাধহীন?
গোলাপগুলো সহসাই সান্ধ্যআঁধারে মূর্ছা যায়—
বহুস্বর নেমে আসে ঐক্যবদ্ধ অস্ত্রে
পাখায় পাখায় বিপন্ন ঘর্ষণশব্দে স্তম্ভিত পথিক—
শোকাকুল বিচ্ছেদী দূরত্বে
নিমিষে অনুসরণ করে প্রবল বাতাসের মত কারও
মূমুর্ষ নিঃশ্বাস।
—নিউইয়র্ক
বাউন্ডুলে ঘুড়ি
ফারহানা হক
আচমকা ভোকাট্টা হয়ে দিশেহারা হয়ে গেলো ঘুড়িটা। মাত্রই তো সপ্তম স্বর্গে ছিলো সে... ঘুরপাক খেতে খেতে, দমকা বাতাস তাকে নীচে নামিয়ে আনছে দ্রুত। হঠাৎ একটা বাড়ির ছাদে মুখ থুবড়ে পড়লো সে.. ফিনফিনে শরীর ছিঁড়ে গেছে, খুবলে নিয়েছে ঝোড়ো বাতাস, ডানারা নড়বড়ে... আরেকটা দমকে অ্যাসবেসটসের ছাদ থেকে বারান্দায় ছিটকে পড়লো সে। একগাদা ভাঙাচোরা শিশি বোতল, পুরানো খবরের কাগজের স্তুপের উপরে। তার শরীর অবসন্ন, ঘটনার ঘনঘটায় টালমাটাল... তবু্ও কেন যেন পরিচিত একটা ছবি বুকে ভেসে উঠলো... এ বাড়িটা থেকে কি সে উড়েছে কখনো? তা কি করে হয়! সে তো পাহাড়ে ছিলো... এখানে কি করে? তীব্র রোদ এসে পড়ছে তার মুখে, চোখ খুলতে পারছেনা। তার শরীরটা দোমাড়ানো মোচড়ানো হয়ে আছে অন্যান্য কাগজের সাথে। ভাঙা বোতলের টুকরো বিঁধে আছে সর্বাঙ্গে শেষবারের মতো চোখ খুললো সে, সরাসরি ঝকঝকে আকাশ... দেখতে পেল আকাশের ওপারে অন্য আকাশ। সেখান থেকে ভেসে আসা উল্লাস.... চোখ বন্ধ করে ফেলল সে। বন্ধ চোখ দেখেছে চশমার কাঁচের আড়ালে সুতো কেটে দেয়া মানুষটার আভাস...
—নিউজার্সি
