‘আমার সোনার হরিণ চাই’ || আনিস আহমেদ
‘তোরা যে যা বলিস ভাই, আমার সোনার হরিণ চাই’Ñ এই সোনার হরিণ পাওয়া যে সহজ নয়, সেটি রবীন্দ্রনাথ যতটুকু জানতেন, তার চাইতে অনেক বেশি জানি আমরা বর্তমানের এই সংকটময় সময়ে। রবীন্দ্রনাথ কবি ছিলেন বলে এই সোনার হরিণের উপমা দিয়ে তিনি তাঁর অন্তরের আকাঙ্খার কথা বলেছেন। আমাদের এই সোনার হরিণের এক ভিন্ন সত্ত্বা আছে। সে চমকে বেড়ায় না, দৃষ্টি এড়ায় না— তবু থেকে যায় সেই সোনার হরিণ আমাদের সকলের ধরা—ছোঁয়ার বাইরে। কোন সে সোনার হরিণ? এই সোনার হরিণের নাম শান্তি, আরও বড় করে বলতে হলে বলবো বিশ্ব শান্তি। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর শান্তি স্থাপনের লক্ষ্যে ১৯১৯ সালে যে লীগ অব নেশনস গঠন করা হয়েছিল, সে সংগঠন শান্তি স্থাপনে ব্যর্থ হলো যখন আবার দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সূত্রপাত হলো। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ভয়াবহতা এবং ব্যাপকতা আবার বিশ্ব—শান্তির জন্য বিভিন্ন রাষ্ট্রে আকুলতা বৃদ্ধি করে। আর তারই ফলে ১৯৪৫ সালের ২৪ অক্টোবর সনদ স্বাক্ষরের মাধ্যমে জাতিসংঘ প্রতিষ্ঠিত হয়। প্রকৃতপক্ষে এটি জাতিসংঘ নয়, রাষ্ট্রসংঘ, ইংরেজি নেশনস শব্দের আক্ষরিক অনুবাদ করতে গিয়ে এটিকে জাতিসংঘ বলা হয় কিন্তু আমরা জানি যুক্তরাষ্ট্রে নেশন শব্দটি রাষ্ট্র অর্থেই ব্যবহৃত হয়। সে জন্যই ইউনাইটেড নেশানস—এর সঠিক বাংলা হওয়ার কথা, রাষ্ট্রসংঘ। তবে নামে কী বা আসে—যায়? জাতিসংঘের প্রধান উদ্দেশ্য হলো বিশ্বে শান্তি ও নিরাপত্তা বজায় রাখা, দেশগুলোর মধ্যে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তোলা, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বাড়ানো এবং এসব লক্ষ্য পূরণে দেশগুলোর কাজের সমন্বয় করা। সেই যে ১৯৪৬ সালের জানুয়ারি মাসে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের তৎকালীন ৫১টি রাষ্ট্র নিয়ে লন্ডনে প্রথম সম্মেলন শুরু হয় সেই থেকে সদস্য রাষ্ট্রগুলি শান্তির অন্বেষায় মিলিত হয়েছে, প্রথমে লন্ডনে এবং ১৯৫২ সাল থেকে যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্ক শহরে। বর্তমানে এই জাতিসংঘের সদস্য—রাষ্ট্রের সংখ্যা ১৯৩।
১৯৪৬ সাল থেকে এই ২০২৬ সাল পর্যন্ত, গত ৮০ বছরে সদস্য সংখ্যা বেড়েছে। কিন্তু আমাদের সকলের কাঙ্খিত সোনার হরিণ মেলেনি। প্রথমে ১৯৯১ সাল পর্যন্ত শীতল যুদ্ধ চলতে থাকে। যুদ্ধ তো আর বাস্তবে শীতল হয় না, একে অপরকে ঘায়েল করার জন্য তর্ক—বিতর্ক, বিবৃতি—পাল্টা বিবৃতিতে দেশ ও সমাজ ঝলসে যেতেই পারে। আর শীতল যুদ্ধের অবসানেই যে শান্তির পায়রা ডানা মেলে তেমনটিও নয়। এই একুশ শতকের ছাব্বিশটি বছর পেরিয়ে এখনও যুদ্ধবিগ্রহ, কখনও আন্তর্জাতিকভাবে, কখনও বা অভ্যন্তরীণভাবে আমাদের শান্তি বিঘ্নিত করছে। আর এ বছর জাতিসংঘের অধিবেশনের শুরুতেই জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুয়েতেরেস তাঁর ভাষণে বলেন, ‘সবচেয়ে বড় শক্তি কিন্তু আধিপত্য বিস্তারের শক্তি নয়। সবচেয়ে বড় শক্তি হচ্ছে এমন একটি ভবিষ্যৎ নির্মাণের শক্তি যা সকলের জন্য কার্যকর হয়’। জাতিসংঘের মহাসচিব হিসেবে গুয়েতেরেসের মেয়াদ আর মাত্র প্রায় ১০০ দিন। তাঁর ভাষণে তিনি আক্ষেপ করে বলেন, আন্তর্জাতিক রীতিনীতি এবং মানদন্ড এখন ম্রিয়মান প্রায়, যুদ্ধে এখন অসামরিক লোকজনকে লক্ষ্যবস্তু করা হচ্ছে এবং মানবিক সেবার কাজে নিয়োজিত লোকদের হত্যা করা হচ্ছে। আন্তর্জাতিক আইন কানুনের কোনো তোয়াক্কা না করেই দেশগুলোর মধ্যকার আস্থাকে বিনষ্ট করা হচ্ছে। গুয়েতেরেস বলেন, ‘ক্ষমতাকে এখন তিন ভাগে ঢেলে সাজানো হচ্ছে: প্রথমতঃ নতুন নতুন রাষ্ট্রীয় শক্তির উদ্ভব, দ্বিতীয়তঃ সরকারগুলির কর্তৃত্ব এখন বেসরকারি কর্পোরেশন এবং ব্যক্তি বিশেষদের হাতে চলে যাচ্ছে এবং তৃতীয়তঃ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ক্রমবর্ধমান ভূমিকা এবং স্বশাসিত অস্ত্র নির্মাণ এখন মানুষের হাতের বাইরে চলে যাচ্ছে। আমাদের পৃথিবীতে ফাটলগুলি এখন বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং সেগুলি এখন বড় বড় খাদে পরিণত হচ্ছে।’ এই বিভাজনকে নীরবে মেনে নেওয়ার পরিবর্তে এখন প্রয়োজন সহযোগিতাকে আরও শক্তিশালী করা এবং পারস্পরিক নির্ভরতার ভিত্তিতে সত্যিকার অর্থে বৈশ্বিক নেটওয়ার্ক গড়ে তোলা।
তবে দুঃখের বিষয় হচ্ছে প্রকৃতপক্ষে অস্ত্র বিরতি এখন আর দৃশ্যমান নেই। উদাহরণ স্বরূপ তিনি মধ্যপ্রাচ্য, ইউক্রেন, সুদান ও মিয়ানমারের ক্রমবর্ধমান সংকটের কথা উল্লেখ করে বলেন যে তথাকথিত যুদ্ধ বিরতি মানে এখন ‘কম গুলি চালনা’ আর এর মূল্য দিতে হচ্ছে অসামরিক নাগরিকদের। তিনি গাজা সম্পর্কে আন্তর্জাতিক বিচারিক আদালত বা ইন্টারন্যশনাল কোর্ট অব জাস্টিসের নির্দেশ মেনে চলার কথা উল্লেখ করে সতর্ক করে দেন যে ইসরাইলের দখলকৃত পশ্চিম তীরে বসতির সম্প্রসারণ দুই—রাষ্ট্র সমাধানকে বিনষ্ট করার হুমকি স্বরূপ হবে। তিনি পুরোদমে ইউক্রেনকে দখলে নেওয়ার রাশিয়ার প্রচেষ্টাকে জাতিসংঘ সনদের স্পষ্ট লংঘন বলে মনে করেন। গুয়েতেরেস তাঁর ভাষণে একাধিক প্রসঙ্গের অবতারণা করেন এবং দৃঢ়ভাবে বলেন শান্তি, উন্নয়ন এবং মানবাধিকার হচ্ছে জাতিসংঘ সনদের অভিন্ন স্তম্ভ। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রয়োগ যে মানবিক সত্ত্বাকে অবমূল্যায়ন করতে পারে সেটি এবং বর্ণবৈষম্যের অবসান ঘটানোর আবেদনও তাঁর ভাষণের উল্লেখযোগ্য দিক ছিল। প্রকৃতপক্ষে জাতিসংঘের মহাসচিবের এই সাম্প্রতিক ভাষণ ছিল, আমাদের সকলের সেই সোনার হরিণ পাওয়ার প্রচেষ্টারই প্রতিধ্বনি। শান্তি নামের এই সোনার হরিণকে পাওয়ার আন্তর্জাতিক প্রচেষ্টার সবচেয়ে বলিষ্ঠ পদক্ষেপ জাতিসংঘ বা রাষ্ট্রসংঘ গঠন। কিন্তু এই এতো বছর পরও সেই শান্তি আমাদের ধরা—ছোঁয়ার বাইরেই রয়ে গেল। মাঝে মাঝে মনে হয় এই বুঝি শান্তি আসি আসি করছে, কিন্তু কোনো এক প্রাঙ্গনে যদি বা শান্তি আসে, অন্য প্রান্ত থেকে শান্তি নামের এই সোনার হরিণটি ফসকে যায়। বাহ্যত আফগানিস্তানে শান্তি বিরাজ করছে বটে কিন্তু ইরানে সেই শান্তির অস্তিত্ব এখন বিলুপ্ত।
তবে এই শান্তি কেবল যে আন্তঃরাষ্ট্রীয় ক্ষেত্রে বিলুপ্ত হচ্ছে তাই—ই নয় অভ্যন্তরীণভাবেও বিভিন্ন দেশে শান্তি কোথাও বিলুপ্ত, কোথাও বিঘ্নিত। খোদ বাংলাদেশ থেকে এখন শান্তি এতটাই বিঘ্নিত যে সাধারণ মানুষ রাতে নির্বিঘ্নে ঘুমাতে পারছে না, সাধারণ কোনো সন্ত্রাস কেবল নয়, রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণীত মব সন্ত্রাসের ভয়ে জনগণ তটস্থ। অনেকেই আশা করেছিলেন যে ড. ইউনুসের সরকারের পরিসমাপ্তির পর এ ধরনের সন্ত্রাসের বিলুপ্তি ঘটবে। কিন্তু কখনও কখনও কর্তা বদলালেও কর্ম বদলায় না। এখন তো রাজনৈতিক পরিচয় দিয়েই ঘটছে নানান রকম নিপীড়ন ও সন্ত্রাস। শান্তির পায়রা বাংলাদেশ থেকেও উড়ে গেছে। এ ঘটনা রাষ্ট্রে রাষ্ট্রে যুদ্ধর চেয়েও ভয়াবহ। এ ধরনের পরিস্থিতিকে নিয়ন্ত্রণ করতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় বোধহয় তেমন সোচ্চার হবে না, জাতিসংঘও বলবে এগুলো নিয়ন্ত্রণ করা তো তাদের সনদে নেই, অতএব শান্তি হয়ে থাকবে আমাদের সোনার বাংলায় বড়জোর সোনার পাথরবাটি।
