নতুন প্রজন্মের অংশগ্রহণে নিউইয়র্কে হয়ে গেল বাংলা চলচ্চিত্র উৎসব
লিটু আনামঃ নিউইয়র্কে প্রথমবারের মতো জাঁকজমকপূর্ণ আয়োজনের মধ্য দিয়ে সম্পন্ন হলো চার দিনব্যাপি আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসব ‘নিউইয়র্ক বাংলা ফিল্ম ফেস্টিভ্যাল’। জ্যামাইকা পারফর্মিং আর্টস সেন্টারে আয়োজিত এই উৎসবের সমাপনী অনুষ্ঠান প্রবাসী বাংলাদেশী দর্শকসহ স্থানীয় চলচ্চিত্রপ্রেমীদের মাঝে ব্যাপক সাড়া ফেলেছে।
প্রিয়জন ফিল্মস ও লেমন স্টুডিওর যৌথ উদ্যোগে এবং আমেরিকান বাংলাদেশী প্রডিউসার অ্যাসোসিয়েশনের সহযোগিতায় এই উৎসবের আয়োজন করা হয়। এছাড়া পুরো আয়োজনের অন্যতম প্রধান স্পন্সর ছিল ‘অল কাউন্টি হোম কেয়ার’। অলিভ আহমেদ, লিটু আনাম, পিকলু চৌধুরী ও তানভীর সানির অক্লান্ত প্রচেষ্টায় আয়োজিত এই প্রথম আসরটি আমেরিকায় প্রবাসী দর্শকদের মন জয় করতে সক্ষম হয়েছে। উৎসবের প্রথম তিন দিনে বাংলাদেশ ও উত্তর আমেরিকার নির্মাতাদের স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র, তথ্যচিত্র এবং পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র প্রদর্শিত হয়। প্রবাসী দর্শকদের স্বতঃস্ফূর্ত উপস্থিতি প্রমাণ করেছে যে অন্যদেশে থেকেও দেশের সিনেমার প্রতি তাদের ভালোবাসা আজও অটুট। সমাপনী অনুষ্ঠানে ছিল বর্ণাঢ্য রেড কার্পেট, মনোজ্ঞ সাংস্কৃতিক পরিবেশনা এবং পুরস্কার বিতরণী পর্ব। এই আয়োজনে অংশ নেন জনপ্রিয় চিত্রনায়ক জায়েদ খান, কাজী মারুফ, ইমন, সজল, চিত্রনায়িকা বিন্দু এবং জনপ্রিয় সংগীতশিল্পী প্রতীক হাসান। প্রিয় তারকাদের সামনাসামনি দেখতে পেরে উচ্ছ্বসিত ছিলেন দর্শকরা।
এবারের উৎসবে ২০২৩ থেকে ২০২৫ সালের সেরা চলচ্চিত্র, নির্মাতা, অভিনয়শিল্পী ও কলাকুশলীদের বিভিন্ন বিভাগে সম্মাননা প্রদান করা হয়।
‘প্রিয়তমা’ সিনেমায় অভিনয়ের জন্য সেরা অভিনেতা হিসেবে নির্বাচিত হয়েছেন শাকিব খান। ‘দেয়ালের দেশ’ চলচ্চিত্রে অভিনয়ের জন্য সেরা অভিনেত্রী নির্বাচিত হয়েছেন শবনম বুবলী এবং ‘১৯৭১ সেই সব দিন’ নির্মাণের জন্য সেরা পরিচালক হিসেবে নির্বাচিত হয়েছেন হৃদি হক।
এছাড়া আরো যাঁরা পুরস্কৃত হয়েছেন তাঁরা হলেন সেরা পার্শ্ব অভিনেতা চঞ্চল চৌধুরী (তুফান), সেরা পার্শ্ব অভিনেত্রী সানজিদা প্রীতি (১৯৭১ সেইসব দিন), শ্রেষ্ঠ ওয়েব ফিল্ম কাছের মানুষ দূরে থুইয়া ও পরিচালক শিহাব শাহীন, সেরা অভিনেতা (ওয়েব ফিল্ম) মামুনুন ইমন (মায়া), সেরা অভিনেত্রী (ওয়েব ফিল্ম) আফসান আরা বিন্দু (উনিশ ২০), শ্রেষ্ঠ শিশুশিল্পী কাজী আরিশা (গ্রীন কার্ড) ও নৈঋতা হাসিন রৌদ্রময়ী (জংলী), শ্রেষ্ঠ গায়ক বালাম (প্রিয়তমা— ও প্রিয়তমা) ও প্রীতম হাসান (লাগে উড়া ধুরা— তুফান), শ্রেষ্ঠ গায়িকা অবন্তি সিঁথি (সুড়ঙ্গ— গা ছুঁয়ে বলো), শ্রেষ্ঠ কাহিনীকার ড. ইনামুল হক (১৯৭১ সেই সব দিন), শ্রেষ্ঠ চিত্রনাট্যকার, নাজিম উদ দৌলা ও রাহয়ান রাফী (সুড়ঙ্গ), শ্রেষ্ঠ চিত্রগ্রাহক সুমন সরকার (সুড়ঙ্গ) ও সাহেল রনি (দেয়ালের দেশ), শ্রেষ্ঠ সম্পাদক সিমিত রায় অন্তর (সুড়ঙ্গ), কামরুজ্জামান রনি (১৯৭১— সেই সব দিন), শ্রেষ্ঠ শব্দগ্রাহক রিপন নাথ (তুফান), শ্রেষ্ঠ গীতিকার আসিফ ইকবাল (মেঘের নৌকা— প্রহেলিকা) ও সোমেশ্বর অলি (ঈশ্বর— প্রিয়তমা), শ্রেষ্ঠ সুরকার প্রিন্স মাহমুদ (ঈশ্বর— প্রিয়তমা), শ্রেষ্ঠ সংগীত পরিচালক ইমন সাহা (প্রহেলিকা), শ্রেষ্ঠ স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র লস্ট (খড়ংঃ) ও শ্রেষ্ঠ প্রামাণ্য চলচ্চিত্র ঝড়হমং ভড়ৎ ধ ঈড়ঁহঃৎু (একটি দেশের জন্য গান)।
বাংলা চলচ্চিত্রে অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ স্বনামধন্য অভিনেতা আহমেদ শরীফকে আজীবন সম্মাননা প্রদান করা হয়। এছাড়া বাংলা চলচ্চিত্রের বিকাশে বিশেষ অবদান রাখার জন্য সম্মাননা স্মারক গ্রহণ করে বায়োস্কোপ ফিল্মস, স্টার সিনেপ্লেক্স এবং জনপ্রিয় ওটিটি প্ল্যাটফর্ম ‘চরকি’।
আয়োজকদের মতে, এই উৎসবের মূল লক্ষ্য কেবল চলচ্চিত্র প্রদর্শন নয়; বরং প্রবাসী নতুন প্রজন্মের সঙ্গে বাংলা চলচ্চিত্রের একটি শক্ত সেতুবন্ধন তৈরি করা এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলা সিনেমার অবস্থানকে আরও সুদৃঢ় করা। প্রথম আসরের অভাবনীয় সাফল্যের পর দর্শক, নির্মাতা ও শিল্পীদের প্রত্যাশা—আগামী বছর আরও বড় পরিসরে এবং আন্তর্জাতিক অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে এই উৎসব বাংলা চলচ্চিত্রকে বিশ্বদরবারে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাবে।
