এ বছরের রসায়নের নোবেল প্রাইজে আমি কেন আনন্দিত

আশরাফ আহমেদঃ রসায়নে এ বছরের নোবেল পুরস্কারের জন্য ঘোষিত হয়েছেন হেনরি কাগান এবং কেনসো সোয়াই নামের যথাক্রমে ফরাসি ও জাপানি দুই বিজ্ঞানী। তাঁরা অংুসসবঃৎরপ ঝুহঃযবংরং আবিষ্কার এবং অঁঃড়পধঃধষুংরং পদ্ধতিতে সেই আবিষ্কারের দক্ষতা প্রায় শতভাগ নিশ্চিতকরণের জন্য এই পুরস্কার পান। সংবাদটি আমার জন্য অত্যন্ত রোমাঞ্চপূর্ণ ও সুখকর। কারণ আজ থেকে তেতাল্লিশ বছর আগে ছাত্রাবস্থায় এবং সম্প্রতি অবসরে যাওয়ার আগ পর্যন্ত আমি অনুরূপ দুটি কাজেই সফলতার সাথে নিয়োজিত ছিলাম।

প্রতিদিন আমাদের বাড়িতে রান্নার মাধ্যমে যে খাবার প্রস্তুত করা হয় তা অসংখ্য রাসায়নিক বিক্রিয়ারই ফল। এভাবে আমরা যে অসংখ্য নাইলন ও প্লাস্টিকের দ্রব্য ব্যবহার করি সেগুলোও ভিন্ন ভিন্ন রাসায়নিক বিক্রিয়ার ফল। এক বা একাধিক বস্তু থেকে রাসায়নিক সংশ্লেষণ বিক্রিয়া বা ঈযবসরপধষ ঝুহঃযবংরং—এর মাধ্যমে উৎপাদিত ‘অভিন্ন’ নতুন রাসায়নিক পদার্থের উৎপাদনকে ইংরেজিতে অংুসসবঃৎরপ ঝুহঃযবংরং বলা হয়, বাংলায় যাকে ‘অসমতা—নিশ্চিতকরণ সংশ্লেষণ’ বলা যেতে পারে। এখানে অসমতা—নিশ্চিতকরণ বলতে উৎপাদিত দ্রব্যের প্রতিটি অণুর একই বা অভিন্ন জ্যামিতিক গঠন বোঝানো হয়। এই গোলমেলে বাক্যের ব্যাখ্যা নিচে দিচ্ছি।

প্রাণিজগতে পদার্থের এই ‘সমতা’ ও ‘অভিন্নতা’র গুরুত্ব অপরিসীম। আমাদের দেহে এ ধরনের যত সংশ্লেষণ বিক্রিয়া হয় তার সব উৎপাদনই অসমতা—নিশ্চিত করে। কিন্তু গবেষণাগারে সংশ্লেষণ বিক্রিয়ার মাধ্যমে আমরা যে দ্রব্য উৎপাদন করি তাতে ‘ডান’ এবং ‘বাম’ দুই ধরনের অসম ‘স্থানিক’ অণুর সমমিশ্রণ (ঝুসসবঃৎু বা সমতা) থাকেÑ আয়নার সামনে দাঁড়ালে নিজ এবং নিজের ছায়ার মাঝে যে বিপরীত স্থানিক পার্থক্য দেখা যায়, অনেকটা সেরকম। গাছ যা উৎপাদন করে, আমরা যা খাই এবং আমাদের দেহের কোষের অংশ হিসেবে মিষ্টি যে চিনি আছে তার সবগুলো অণুই ‘ডান’ প্রজাতির। অন্যদিকে প্রকৃতিতে প্রাপ্ত, উৎপাদিত ও আমাদের দেহ—কাঠামোর মূল উপকরণ, অ্যামিনো অ্যাসিডের প্রায় শতভাগই হচ্ছে ‘বাম’ প্রজাতির। ‘ডান’ ও ‘বাম’ অণুর গুরুত্ব একটি উদাহরণ দিয়ে বোঝানো যেতে পারে।

ষাটের দশকে জার্মানির এক কোম্পানি গর্ভবতী মহিলাদের গড়ৎহরহম ঝরপশহবংং বা ‘বমি প্রবণতা’ রোধের একটি মহৌষধ বাজারজাত করার সাথে সাথে বিশ্বব্যাপী জনপ্রিয়তা পায়। কিন্তু মাস কয়েক পর এই ওষুধ সেবনকারীদের অনেকে যে সন্তান প্রসব করলেন তাঁদের কারও ছিল না হাত, কারও ছিল না পা বা চোখ, অথবা হয়েছিল বিকলাঙ্গ। দেখা গেল থ্যালিডোমাইড নামের ওষুধের প্রতিটি অণু ‘ডান’ প্রজাতির ‘অভিন্ন’ হলেও সেবনের পর গ্রহীতার দেহে সামান্য পরিবর্তিত হয়ে একটি ‘বাম’, ফলে ‘ভিন্ন’ প্রজাতির থ্যালিডোমাইডও তৈরি হয়। আর সেই ভিন্নতাই ভ্রম্নণকে বিকলাঙ্গ করে দেয়। মনে রাখতে হবে মানবদেহে সব ওষুধই ‘ডান’ থেকে ‘বাম’ বা বিপরীত হয়ে যায় না।

চিকিৎসক ও রসায়নবিদরা গবেষণাগারে যুগের পর যুগ ধরে ‘অসমতা—নিশ্চিতকরণ সংশ্লেষণ’ বা অংুসসবঃৎরপ ঝুহঃযবংরং আয়ত্তের চেষ্টা করছিলেন। ১৯৮৬ সালে ফরাসি বিজ্ঞানী হেনরি কাগান প্রথমবারের মতো তাতে সফল হন। কিন্তু তাঁর পদ্ধতিতে ‘ডান’ অথবা ‘বাম’ অণুর প্রাধান্য থাকলেও কোনোমতেই তা শতভাগ হচ্ছিল না। ১৯৯৫ সালে জাপানি বিজ্ঞানী কেনসো সোয়াই এর সমাধান দিলেন। তিনি দেখালেন বিক্রিয়াপাত্রে প্রথম থেকেই যদি সামান্য কিছু ‘ডান’ অণু দিয়ে দেওয়া যায়, তবে পর্যায়ক্রমে সেখানে প্রায় শতভাগ ‘ডান’ অণুই তৈরি হবে; সামান্য ‘বাম’ অণু দিলে প্রায় শতভাগ ‘বাম’ অণু তৈরি হবে। পদ্ধতিটিকে তিনি অঁঃড়পধঃধষুংরং (স্বানুঘটন বা স্ব—অনুঘটন) বলেন। জীবজগতের বাইরে এর আগে কেউ এমন সফলতা অর্জন করতে পারেননি।

নোবেল কমিটি তাঁদের বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ করেন, ‘হেনরি কাগান ও কেনসো সোয়াইয়ের গবেষণার কল্যাণে আমরা এখন জানতে পেরেছি, কীভাবে সমহস্তিতা (অর্থাৎ, ‘ডান’ অথবা ‘বাম’ — লেখক) সৃষ্টি হতে পারে। তাঁদের আবিষ্কার ওষুধ উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় রাসায়নিক বিক্রিয়া উদ্ভাবন ও পরিকল্পনায় নিয়োজিত রসায়নবিদদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও যুগান্তকারী ভূমিকা পালন করেছে’। প্রকৃতি কেন ‘বাম’ প্রজাতির চিনি এবং ‘ডান’ প্রজাতির অ্যামিনো অ্যাসিড উৎপাদনে পক্ষপাতিত্ব করে থাকে, এই পুরস্কার সেই প্রশ্নকেও সামনে এনে দিয়েছে।

এবার বলি এই পুরস্কার আমার জন্য কেন সুখকর? সাড়ে চার দশক আগে জাপানে পিএইচডি গবেষণার অংশ হিসেবে আমি যা বেছে নিয়েছিলাম, তার প্রায় পুরোটাই ছিল একটি রাসায়নিক পদার্থের ‘ডান’ থেকে ‘বাম’—এ এবং ‘বাম’ থেকে ‘ডান’—এ পরিবর্তনের বিক্রিয়ার রহস্য উদ্ঘাটন করা। অ্যামিনোক্যাপ্রোল্যাক্টাম নামে রেয়ন শিল্পের একটি বর্জ্য আছে। তা থেকে বাণিজ্যিকভাবে মানুষ ও জীবদেহের অত্যাবশ্যকীয়, ‘বাম’ প্রজাতির লাইসিন নামে একটি অ্যামিনো অ্যাসিড উৎপন্ন করা যায়।

কিন্তু অ্যামিনোক্যাপ্রোল্যাক্টাম উপাদানটি সর্বদা ‘বাম’ ও ‘ডানের’ সমমিশ্রণ হিসেবে থাকে। ফলে উপাদানের মাত্র অর্ধেক পরিমাণ ‘বাম’ লাইসিনে রূপান্তর করা সম্ভব। আমার কাজ ছিল উপাদানের শতভাগকে বাম লাইসিনে রূপান্তর করা সংক্রান্ত। কাজটি করতে গিয়ে আমি অন্তত কুড়িটি পদার্থের ‘ডান—বাম’ প্রকৃতি নিয়ে কাজ করেছি এবং রাসায়নিক পদ্ধতিতে প্রথমবারের মতো দুটি সম্পূর্ণ নতুন পদার্থ সৃষ্টি করেছিলাম। এত বছর পার হয়ে গেলেও বিভিন্ন দেশের বিজ্ঞানীরা এখনও আমার প্রকাশিত সেসব কাজ অনুসন্ধান করেছেন বলে বিভিন্ন সংস্থা মাঝেমাঝেই স্বয়ংক্রিয়ভাবে আমাকে জানায়। তখন সত্যিই বিজাতীয় এক পুলক অনুভব করি।

ওপরের উদাহরণটি ছিল নোবেল পুরস্কারের ‘অসমতা—নিশ্চিতকরণ সংশ্লেষণ’ বা অংুসসবঃৎরপ ঝুহঃযবংরং আবিষ্কার সংক্রান্ত। পুরস্কারের আরেকটি, ‘স্বানুঘটক’ বা অঁঃড়পধঃধষুংরং দিকটিও আমার গবেষণার সরাসরি সম্পর্কিত। মার্কিন কেন্দ্রীয় সরকারের এক গবেষণাগারে আমার শেষ চাকরির মূল দায়িত্ব ছিল বটুলিনাম নিউরোটক্সিন নামে বিশ্বের সবচেয়ে বিষাক্ত পদার্থের কার্যকরণ উদ্ঘাটন করা। আমার পূর্বের প্রায় সব গবেষকরা বছরের পর বছর ধরে লক্ষ্য করছিলেন যে এই বিষের ক্রিয়াশীল মূল অংশটি খুব সহজেই দুটি খণ্ডে বিভক্ত হয়ে পড়ে। কিন্তু কিছুতেই তাঁরা এর কারণ খুঁজে পাচ্ছিলেন না। চাকরিতে যোগ দেওয়ার অল্পকালের মাঝেই কারণটিকে আমি ‘স্বানুঘটিত’ বা অঁঃড়পধঃধষুঃরপ বলে শনাক্ত করে এর পক্ষে কয়েকটি জোরালো প্রমাণ দিলাম।

নোবেল পুরস্কৃত জাপানি বিজ্ঞানী কেনসো সোয়াইয়ের ‘স্বানুঘটক’ বা অঁঃড়পধঃধষুংরং—এর উপাদানগুলো প্রাকৃতিক ছিল না, ছিল মানবসৃষ্ট। এর বিপরীতে আমার উপাদানটি ছিল প্রাকৃতিক বিষ, এক ধরনের ব্যাকটেরিয়া—নিঃসৃত। ২০০১ ও ২০০৪ সালে প্রকাশিত দুটি গবেষণাপত্রের শিরোনামেও আমি অঁঃড়পধঃধষুংরং শব্দটি ব্যবহার করেছিলাম।

এই সূত্রে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ গবেষকদের উদ্দেশে আমার প্রিয় দুটি বিষয় উল্লেখ করতে চাই। তা হচ্ছে এই ‘ডান’ এবং ‘বাম’—এর প্রশ্ন। ল্যাটিন উবীঃৎড় শব্দের অর্থ হচ্ছে ডান বা ঘড়ির কাঁটার চক্রাকার পথ, এবং খবাড় শব্দের অর্থ হচ্ছে বাম বা ঘড়ির কাঁটার বিপরীত চক্রাকার পথ। ওপরে আলোচিত ‘ডান’ অণুর ভেতর দিয়ে একমুখী আলো প্রবেশ করালে তা ঘড়ির কাঁটার চক্রাকার পথে ঘুরে যায়। ‘বাম’ অণুতে ঠিক তার বিপরীত ব্যাপার ঘটে। নতুন গবেষকদের জন্য প্রথম প্রশ্ন হতে পারে প্রকৃতিতে চিনিজাতীয় পদার্থের প্রাধান্য কেন ‘বাম’ এবং অ্যামিনো অ্যাসিডের প্রাধান্য কেন ‘ডান’?

তাঁদের উদ্দেশে আমার দ্বিতীয় বিষয়টি হচ্ছে লতানো উদ্ভিদ নিয়ে। প্রকৃতির প্রায় নব্বই ভাগ লতানো উদ্ভিদ শক্ত গাছের কাণ্ডে ঘড়ির কাঁটার বিপরীত চক্রাকার পথ ধরে পেঁচিয়ে থাকে। অবশিষ্ট দশ শতাংশ লতা ওঠে বিপরীত পথ ধরে। লতার কোন প্রাণরাসায়নিক বা ভৌতিক বৈশিষ্ট্যের কারণে তা হয়ে থাকে?

এই দুটি প্রশ্নের সঠিক ও গ্রহণযোগ্য উত্তর যে বের করতে পারবে, আগামীর নোবেল পুরস্কার তার নাগালে থাকবে বলে আশা করা যায়। সবশেষে উপরোক্ত দুটি প্রশ্নের উত্তর কি অনেকের কাল্পনিক ‘সমান্তরাল পৃথিবী’ বা ‘সমান্তরাল মহাবিশ্ব’—এর সাথে সম্পর্কিত হতে পারে?

৮ই অক্টোবর, ২০২৬ পটোম্যাক, মেরিল্যান্ড

Related Posts