চলে গেলেন নানা পাটেকর

বলিউড অভিনেতা নানা পাটেকর মারা গেছেন। বৃহস্পতিবার ভোরে তিনি মারা যান। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৭৬ বছর। বৃহস্পতিবার ভোরে গোয়ার নিজ বাসভবনে তিনি মারা যান।

প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে তার মৃত্যু হয়েছে। পানাজির কাছে ডোনা পাওলা এলাকায় নিজের অ্যাপার্টমেন্টে অভিনেতাকে অচেতন অবস্থায় পাওয়ার পর দ্রুত হাসপাতালে নেওয়া হয়।

হাসপাতালের সিনিয়র চিকিৎসক শেখর সালকার জানান, প্রায় ৪৫ মিনিট ধরে টানা সিপিআর দেওয়ার পরও তাকে বাঁচানো সম্ভব হয়নি। ভোর ৫টা ১০ মিনিটের দিকে তাকে মৃত ঘোষণা করা হয়। তিনি আরও জানান, এ ঘটনায় একটি মেডিকেল—লিগ্যাল কেস নথিভুক্ত করা হয়েছে এবং মৃত্যুর প্রকৃত কারণ জানতে ময়নাতদন্ত করা হবে। হাসপাতালের চিকিৎসকদের কাছে নানা পাটেকরের এক বন্ধু জানান, ভোর সাড়ে ৩টার দিকে অভিনেতা তাকে মেসেজ করে জানিয়েছিলেন যে তিনি অসুস্থ বোধ করছেন।

ডা. সালকার বলেন, বন্ধু মেসেজটি দেখেন ভোর ৪টার দিকে এবং দ্রুত নানা পাটেকরের অ্যাপার্টমেন্টে ছুটে যান। সেখানে তার সঙ্গে এক কেয়ারটেকার থাকতেন। এরপর কেয়ারটেকার দ্রুত বেসরকারি হাসপাতালে যোগাযোগ করলে সেখান থেকে একটি অ্যাম্বুলেন্স পাঠানো হয়। সালকার জানান, অ্যাম্বুলেন্সেই তাঁর চিকিৎসা শুরু হয়েছিল।

হাসপাতাল থেকে তার বাসভবনের দূরত্ব মাত্র পাঁচ মিনিটের পথ। হাসপাতালে আনার পর চিকিৎসকরা তাকে বাঁচানোর সর্বাত্মক চেষ্টা করেন, কিন্তু ভোর ৫টা ১০ মিনিটে তাকে মৃত ঘোষণা করা হয়।

চিকিৎসক সালকার জানান, মৃত্যুর সঠিক কারণ নিশ্চিত হওয়ার জন্য তার মরদেহ বাম্বোলিমের গোয়া মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে, সেখানে ময়নাতদন্ত সম্পন্ন হবে।

নানা পাটেকর হিন্দি ও মারাঠি চলচ্চিত্রে অসামান্য অভিনয়ের জন্য পরিচিত ছিলেন। তার উল্লেখযোগ্য হিন্দি চলচ্চিত্রের মধ্যে রয়েছে ‘পারিন্দা’, ‘প্রহার: দ্য ফাইনাল অ্যাক্ট’, ‘তিরঙ্গা’, ‘ক্রান্তিবীর’ এবং ‘খামোশি: দ্য মিউজিক্যাল’। তিনি তিনটি জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার, বেশ কয়েকটি ফিল্মফেয়ার অ্যাওয়ার্ড, মহারাষ্ট্র রাজ্য চলচ্চিত্র পুরস্কার এবং মারাঠি ফিল্মফেয়ার পুরস্কার পেয়েছেন। এ ছাড়া, শিল্পকলায় অবদানের জন্য তিনি ভারতের চতুর্থ সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মান ‘পদ্মশ্রী’ উপাধিতে ভূষিত হয়েছেন।

বহুমাত্রিক নানা পাটেকর

নানা পাটেকর কেবল তার চোখ, ডায়লগ বলা, ক্ষুব্ধ, বিরক্তি, আক্রোশ দিয়েই স্ক্রিনের সামনে ধরে রেখেছেন কোটি মানুষকে। এই একই নানা সিনেমাতে নিজের রাগ নিয়ন্ত্রণ করতে গিয়ে সংলাপ দেন ‘কন্ট্রোল উদয় কন্ট্রোল’ তখন সেটি হয় কমেডি, আমরা হাসি, শেয়ার হয় অসংখ্য মিম। তবে কতটাই বা নিয়ন্ত্রণ (‘কন্ট্রোল’) করতে পেরেছিলেন নিজেকে তিনি? কারগিল যুদ্ধ শুরু হলে ছুটে যান কাশ্মিরের বরফের পাহাড়ে, অংশ নেন যুদ্ধে, সামলে নেন পাকিস্তানি সেনাদের আক্রমণ। সেই ‘ক্ষুব্ধ’ নানা, মহারাষ্ট্রের খরা হওয়ায় আবার এগিয়ে যান কৃষকদের সহায়তার জন্য; তাদের আন্দোলনে একাত্মতা প্রকাশ করেন।

নিজের মন—মর্জিতে কাজ ও মেজাজের জন্য পরিচিত এই অভিনেতা মঞ্চনাটকে পেতেন ‘আসল’ অভিনয়ের তৃপ্তি।সমসাময়িক আরও অভিনেতা যেমন নাসির উদ্দিন শাহ ও ওম পুরির মতো বারবার ফিরে যেতেন মঞ্চে। আজ যখন নানা পাটেকর গোয়াতে ভারতের স্থানীয় সময় ভোর ৫টা ২০ মিনিটে মারা যান তখন পেছনে রেখে যান ৭৫টি বছর, পাঁচ দশক বিস্তৃত কাজ, তিনটি জাতীয় পুরস্কার, অসংখ্য স্মৃতি এবং সর্বোপরি একটি বিরল ব্যক্তিত্ব।

’৭৮ সালে গমন সিনেমা দিয়ে নানা পাটেকর তার অভিনয়ের যাত্রা শুরু করেন, এই কথাটি বেশ গতানুগতিক। আদতে শুরু হয় মারাঠি অভিনয় দলের তামাশা দেখার মাধ্যমে। বাবার সঙ্গে তিনি তামাশা দেখতে যেতেন। তামাশা হলো গান, নাচ ও ‘অতিরঞ্জিত’ অভিনয়ের মাধ্যমে এক ধরনের নাট্য পরিবেশন যা মহারাষ্ট্রের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য। নানা পাটেকর সেসব তামাশা দেখতে যেতেন, অভিনয় উপভোগ এবং নিজেও অভিনয়ের চেষ্টা করতেন।

নানা যখন অভিনয় শুরু করেন তখন ভারতীয় সিনেমা জগত বিশেষ করে হিন্দি সিনেমা দুই ভাগে বিভক্ত। এক দিক ৭০ এর রাজনৈতিক পরিস্থিতি, ৮০ এর দশকে হিন্দি সিনেমায় আন্ডার ওয়ার্ল্ডের সম্পৃক্ততা; অনিল কাপুর, ঋষি কাপুর ও মিঠুন চক্রবর্তীদের মতো রোমান্টিক ও অ্যাকশন অভিনেতাদের বাজার দখল, আরেক দিকে শ্যাম বেনেগালের মতো পরিচালকদের সমান্তরাল সিনেমা। নানা পাটেকর দেশের পরিস্থিতি আর নিজের জীবনের বাস্তবতার বাইরে গেলেন না। বেছে নিলেন গমন (১৯৭৮) সিনেমার বসু চরিত্র।

নানা তার সিনেমা ক্যারিয়ারে এমন সব চরিত্রের সঙ্গেই নিজেকে মিশিয়ে ফেললেন যেগুলো সিনেমার ভাষায় ‘খল’ বা মন্দ চরিত্র। তবে সব চরিত্রগুলোকে ভালো—মন্দের বিচারে চোখ বন্ধ করে বাধাও যায় না। ‘মন্দ’ বললেও ঠিক ‘মন্দ’ও নয়, খল হলেও দর্শকদের ভাবিয়েছে, কারণ চরিত্রটিকে রূপ দিয়েছেন নানা পাটেকর।

একে একে করলেন পারিন্দা (১৯৮৯), অঙ্গার (১৯৯২), অগ্নি সাক্ষী (১৯৯৬), শক্তি (২০০২), অপহরণ (২০০৫) এর মতো সিনেমা, যেখানে তার চরিত্র ‘খল’। আবার যেসব সিনেমাতে তিনি খল চরিত্র করেননি, সেখানেও তার মাঝে লুকিয়ে থাকা রাগ বের হয়েছে। প্রহার (১৯৯১), তিরাঙ্গা (১৯৯৩), ক্রান্তিবীর (১৯৯৪), জশবন্ত (১৯৯৭), আব তাক ছাপ্পান (২০০৪) এসব সিনেমা অন্যতম।

শুধু খল নয়, কমেডি সিনেমাতেও নিজের ছাপ রাখেন নানা। ট্যাক্সি নম্বর ৯২১১ ও ওয়েলকাম এই দুই সিনেমার কথা বলতেই হয়। কোনো কারণে পারিন্দা সিনেমার পর অনীল কাপুরের সঙ্গে দীর্ঘ দিন কাজ করেননি নানা পাটেকর। যার ইতি ঘটে ওয়েলকাম সিনেমায় উদয় শেট্টির চরিত্র দিয়ে,  যেখানে অনীল কাপুর করেন বিখ্যাত মজনু ভাইয়ের চরিত্র। ওয়েলকাম সিনেমার অসংখ্য দৃশ্য এখন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের মিম।

আবার ট্যাক্সি নম্বর ৯২১১ সিনেমাতেও তিনি কমেডি করেন। সেই কমিক দৃশ্যগুলোতেও তাকে দেখা যায় তার স্বভাবজাত মেজাজ দেখাতে।

অভিনেতা পরিচয়ের বাইরেও নানার আরেকটি পরিচয় আছে, সেটি যোদ্ধা। ৮০ দশকের শেষের দিকে মারাঠা লাইট ইনফেন্ট্রির সঙ্গে যুক্ত হন তিনি। সেখানে তিন বছর প্রশিক্ষণ নেন এবং ১৯৯০ সালে ইন্ডিয়ান টেরিটরি আর্মির ক্যাপ্টেন পদে যুক্ত হন। ১৯৯৯ সালে কারগিল যুদ্ধ শুরু হলে, নানা যুদ্ধে অংশগ্রহণ করার ইচ্ছা জানান। প্রথমে সেটি নাকচ করা হয়।

স্বভাবজাত মেজাজ দেখিয়ে তিনি ফোন করে বসেন ডিফেন্স মিনিস্টার জর্জ ফেরনান্দেজকে। মারাঠা লাইট ইনফেন্ট্রিতে তার তিন বছরের প্রশিক্ষণের অভিজ্ঞতার কথা মন্ত্রীকে জানান এবং সম্মতি পান। যুদ্ধের সময় তিনি লাইন অব কন্ট্রোলের লে, বারামুল্লা, সপোরের মতো বরফাচ্ছন্ন অতিউচ্চ স্থানে ভারতীয় সেনাদের সঙ্গে কাজ করেন। যুদ্ধের আগে তার ওজন ছিল ৭৬, ৬০ দিন পর হয় ৫৬।

খরা উপমহাদেশের বাস্তবতা। বিভিন্ন সময়ে বহু কৃষক করেছে আত্মহত্যা, সময়ে সময়ে নেমেছে রাস্তায়, করেছে আন্দোলন। নানা পাটেকর নিজেকে সব সময় তাদেরই একজন মনে করতেন। কৃষকদের আন্দোলন নিয়ে তিনি বরাবরই সরব ছিলেন, তাদের সমর্থন দেন, গড়ে তুলেন নাম ফাউন্ডেশন, যার মধ্যে তিনি কৃষকদের আর্থিকসহ বিভিন্ন ধরনের সহায়তা দেন। 

এত এত চরিত্রে অভিনয় করলেও পারিন্দা সিনেমাটি নানা পাটেকরের সিনেমা—জীবনে বিশেষ।

অন্না শেঠ চরিত্রটি দেখে বিশ্বের তথা ভারতের একজন বিখ্যাত সিনেমা পরিচালক মুগ্ধ হন। সেই পরিচালক নানাকে জড়িয়ে ধরে তার অভিনয়ের প্রশংসাও করেন, যা তিনি সবাইকে করেন না। অত্যন্ত নামকরা ও প্রভাবশালী এই পরিচালক ১৯৯২ সালে মারা যান। মৃত্যুর পর তার ব্যক্তিগত ডায়েরির সাধারণের জন্য প্রকাশ করা হয়, যেখানে লেখা তিনি দিলীপ কুমারের সঙ্গে কাজ করতে চেয়েছিলেন।

এক সাক্ষাৎকারে নানা পাটেকর জানিয়েছিলেন, ডায়েরিতে আরেকটি কথাও ছিল ‘আই ওয়ান্ট টু ওয়ার্ক উইথ নানা পাটেকর’ ডায়েরিটি সত্যজিৎ রায়ের! যা স্বয়ং নানা পাটেকারের মতে তার জীবনের অন্যতম সেরা অর্জন।

নানা পাটেকরের আসল পরিচয় আসলে কোনটি? তিনি নাট্য মঞ্চের অভিনেতা, সিনেমার অভিনেতা নাকি যোদ্ধা নাকি একজন বিপ্লবী। সবগুলোই তার পরিচয় তার ব্যক্তিত্বেরই অংশ যেমন ওয়েলকামের ‘কন্ট্রোল উদয়’ বলে বুঝিয়ে দেন যে, তিনি রাগ নিয়ন্ত্রণ করছেন একইসঙ্গে ক্ষুব্ধ হয়ে ক্রান্তিবীর সিনেমায় দেখিয়ে দেন যে, এই সমাজ কত অন্যায় ও অবিচারে জর্জরিত। নানা পাটেকরের চোখের তেজ, রাগ ও তীব্রতা উপমহাদেশের লাহোর কিংবা বোম্বে অথবা ঢাকা প্রতিটি ক্ষুব্ধ নাগরিকের প্রতিফলন। এমন ‘মেজাজি’ নানা পাটেকারের আজ বিদায়!


বারবার নিজেকে ভেঙে ‘নটসম্রাট’ হয়ে উঠেছিলেন নানা পাটেকর

মাহমুদুর রহমানঃ মহেশ মাঞ্জরেকরের ‘নটসম্রাট’—এর শেষ দিকের দৃশ্যগুলো মনে পড়ছে। জীবনভর অন্যের লেখা সংলাপ আউড়ে গেছেন মঞ্চের কিংবদন্তি অভিনেতা গণপত বেলওয়ালকর। অন্যের লেখা চরিত্রে নিজেকে বিলিয়ে দিয়েছেন। একসময় নিজের জীবনেই যেন এক চরিত্র হয়ে দাঁড়ান। আনন্দ, অহংকার, প্রেম, অভিমান, পরাজয়, নিঃসঙ্গতা সবকিছু মিলিয়ে মানুষটির ভেতরে তখন যে শূন্যতা, সেটিও যেন অভিনয়ের অংশ হয়ে ওঠে। সেই চরিত্রে নানা পাটেকরকে দেখলে মনে হয়, তিনি অভিনয় করছেন না; তিনি যেন গণপত বেলওয়ালকর হয়ে বেঁচে আছেন।

‘নটসম্রাট’ ছিল নানা পাটেকরের অভিনয়জীবনের এক চূড়ান্ত প্রকাশ। অথচ তার প্রায় পাঁচ দশকের ক্যারিয়ারের দিকে তাকালে বোঝা যায়, এ একটি চরিত্র দিয়েই তাকে ব্যাখ্যা করা অসম্ভব। নানা পাটেকর এমন এক অভিনেতা ছিলেন, যাকে নির্দিষ্ট একটি ঘরানায়, একই ধরনের চরিত্র, এমনকি নির্দিষ্ট একটি ভাষার সিনেমায়ও আটকে রাখা যায়নি। তিনি ছিলেন সত্যিকারের ‘ভার্সেটাইল অভিনেতা’। ৭৫ বছর বয়সে আজ তার মৃত্যু ভারতীয় সিনেমার এমন এক অধ্যায়ের সমাপ্তি, যার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল অভিনয়; তারকা হওয়া নয়।

নানা পাটেকর শুরু করেছিলেন থিয়েটার দিয়ে। বড় পর্দায় অভিষেক ‘গমন’ সিনেমায়, ১৯৭৮ সালে। কিন্তু পর্দায় আসার আগেই মঞ্চ তাকে শিখিয়েছিল অভিনেতার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পাঠ—অভিনেতা চরিত্রকে শুধু উপস্থাপন করেন না, তিনিই হয়ে ওঠেন ওই চরিত্র। এ শিক্ষা পরবর্তী পাঁচ দশক ধরে তার অভিনয়ের ভিত হয়ে থেকেছে।

মীরা নায়ারের ‘সালাম বম্বে!’ (১৯৮৮)। নানা পাটেকরের উপস্থিতি ছিল সংক্ষিপ্ত কিন্তু স্মরণীয়। ১৯৮৯ সালে বিদু বিনোদ চোপড়ার ‘পরিন্দা’ তাকে জাতীয় পর্যায়ে প্রতিষ্ঠিত করে। আন্না ছিল অন্ধকার জগতের এক নিষ্ঠুর অপরাধী। এ চরিত্রকে নানা এমন ভীতিকর করে তুলেছিলেন, যা কেবল সংলাপে তৈরি হয় না। তার চোখ, শরীরী ভাষা, থেমে থেমে কথা বলা, সব মিলিয়ে আন্না হয়ে উঠেছিল ভারতীয় সিনেমার অন্যতম স্মরণীয় খলচরিত্র। এ অভিনয়ের জন্যই তিনি পেয়েছিলেন জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার। কিন্তু নানা পাটেকরের বিশেষত্ব ছিল, তিনি কখনই ‘ভিলেন’ হয়ে আটকে থাকেননি। ‘প্রহার: দ্য ফাইনাল অ্যাটাক’ একটি উদাহরণ। নানা একই সঙ্গে চিত্রনাট্যকার, পরিচালক ও অভিনেতা। একজন সেনা কর্মকর্তার চরিত্রে তার কঠোরতা ছিল বিশ্বাসযোগ্য। আবার সে কঠোরতার আড়ালে মানবিকতাও ছিল স্পষ্ট। তার অভিনীত চরিত্রগুলোয় প্রায়ই এ দ্বন্দ্ব দেখা যেত—বাইরে শক্ত, ভেতরে ক্ষতবিক্ষত।

‘ক্রান্তিবীর’ তার ক্যারিয়ারের আরেক মাইলফলক। ১৯৯৪ সালের সিনেমাটিতে প্রতাপ নারায়ণ তিলক চরিত্রে নানা পাটেকর শুধু অভিনয় করেননি; যেন পুরো সময়টাকেই নিজের মধ্যে ধারণ করেছিলেন। তার কণ্ঠস্বর, সংলাপ বলার ভঙ্গি, ক্রোধ মিলিয়ে চরিত্রটি সে সময়ের ভারতীয় দর্শকের কাছে এক ধরনের সামাজিক ক্ষোভের প্রতীক হয়ে উঠেছিল। এখনো দর্শক এ সিনেমার নানাকে প্রশংসা করে। এ সিনেমার জন্য আবারো পেয়েছিলেন জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার।

তারপর ‘অগ্নিসাক্ষী’ (১৯৯৬)। আবার জাতীয় পুরস্কার। এরপর ‘খামোশি: দ্য মিউজিক্যাল’, ‘যশবন্ত’, ‘আভ তক ছাপ্পান’, ‘অপরাধ’, ‘রাজনীতি’—প্রতিটি সিনেমায় নিজেকে ভেঙেছেন, তৈরি করেছেন। প্রমাণ করেছেন, একজন অভিনেতার সবচেয়ে বড় শক্তি তার মুখ নয়, তার উপস্থিতি। একটি দৃশ্যে তিনি থাকলে দৃশ্যটির ভার বদলে যেত।

বলিউডে দীর্ঘ সময় প্রথাগত সুন্দর চেহারার নায়করা সিনেমার কেন্দ্র ধরে রাখতেন। নানা প্রমাণ করেন একজন চরিত্রাভিনেতাও একটি সিনেমার কেন্দ্র হতে পারেন। এমনকি অনেক সময় চরিত্রাভিনেতাই হয়ে উঠতে পারেন সিনেমার সবচেয়ে বড় আকর্ষণ। সে কারণেই কমেডি চরিত্রে ওয়েলকামের উদয় শেঠি দর্শকের কাছে কমেডিয়ান নন, অভিনেতা।

নানা পাটেকরের অভিনয়ের আরেকটি বিস্ময়কর দিক ছিল তার কণ্ঠ। তার সংলাপ উচ্চারণে একটা খসখসে স্বর, একটা অস্থিরতা, কখনো বিস্ফোরণের আগে জমে থাকা নীরবতা কাজ করত। তিনি চিৎকার করলেও তা শুধু চিৎকার হয়ে থাকত না; মনে হতো সে কণ্ঠের ভেতরে বহু বছরের ক্ষোভ, অপমান, বেদনা জমে আছে। আবার সে একই মানুষ ‘ওয়েলকাম’—এর উদয় শেঠি হয়ে দর্শককে হাসিয়েছেন।

‘নটসম্রাট’—এর উদাহরণ আবারো ফিরে আসে। মারাঠি সাহিত্যের কিংবদন্তি চরিত্র গণপত বেলওয়ালকর। কুসুমাগ্রজ ছদ্মনামে ‘নটসম্রাট’ নামে একটি নাটক লিখেছিলেন বিষ্ণুবর্মণ সিরওয়াড়কর। বেলওয়ালকরের চরিত্রটি যাপন করেছিলেন নানা। এ সিনেমায় এ চরিত্র অভিনয় নানার দীর্ঘ অভিনয়জীবনের এক পরিণত মুহূর্ত। এখানে আর সেই ক্রুদ্ধ নানা নেই, নেই ‘পরিন্দা’র আন্না, নেই ‘ক্রান্তিবীর’—এর প্রতাপ। আছেন এক বৃদ্ধ অভিনেতা। যিনি সারা জীবন অন্যের জীবন অভিনয় করেছেন, কিন্তু শেষ বয়সে নিজের জীবনের সামনে দাঁড়িয়ে অসহায়। চরিত্রটির নিঃসঙ্গতা, আত্মমর্যাদা ও ভাঙনের মধ্যে নানা নিজের অভিনয়জীবনেরও যেন একটি প্রতিচ্ছবি তৈরি করেছিলেন।

তার অভিনয়ের এ বিস্তৃতিই ভারতীয় সিনেমায় নানা পাটেকরের প্রভাবকে গুরুত্বপূর্ণ করে তোলে। তিনি দেখিয়েছেন, অভিনয় মানে নায়ক হওয়া নয়। একজন অভিনেতা তার নিজস্ব ব্যক্তিত্ব, কণ্ঠ, শরীর ও অভিজ্ঞতা দিয়ে একটি চরিত্রকে এমনভাবে নির্মাণ করতে পারেন যে চরিত্রটি শেষ পর্যন্ত অভিনেতাকেও ছাড়িয়ে যায়। হিন্দি মূলধারার সিনেমা ও প্যারালাল সিনেমায় তিনি সমান স্বচ্ছন্দ ছিলেন।

নানা ঝুঁকি নেয়ার সাহস দেখিয়েছেন। পরিচালকের ভূমিকায়ও তিনি কাজ করেছেন। ‘প্রহার’—এর মতো ছবিতে তিনি যুদ্ধ, শৃঙ্খলা ও রাষ্ট্রের প্রতি দায়িত্বের প্রশ্নকে নিজের মতো করে দেখেছেন। আবার পরবর্তী সময়ে বাণিজ্যিক সিনেমায় এসে এমন চরিত্র করেছেন, যেগুলো দর্শককে নিছক বিনোদন দিয়েছে। একই অভিনেতার মধ্যে এতগুলো বিপরীত সত্তার সহাবস্থান খুব বেশি দেখা যায় না।

পর্দার বাইরে নানা পাটেকরের জীবনও তার অভিনয়ের মতোই সরল কোনো রেখায় এগোয়নি। ২০১৫ সালে মকরন্দ অনাসপুরের সঙ্গে তিনি নাম ফাউন্ডেশন প্রতিষ্ঠা করেন। মহারাষ্ট্রের খরাপ্রবণ অঞ্চলের কৃষক ও তাদের পরিবারকে সহায়তা, জলসংরক্ষণ এবং গ্রামীণ মানুষের পাশে দাঁড়ানো হয়ে ওঠে এ উদ্যোগের অন্যতম লক্ষ্য। নিজের জনপ্রিয়তাকে তিনি ব্যবহার করেছিলেন এমন মানুষের জন্য, যাদের কাছে সিনেমাও পৌঁছায় না। কার্গিল যুদ্ধের সময়ও তিনি সেনাদের সঙ্গে সময় কাটিয়েছিলেন। সমাজ, কৃষক, সৈনিক; বিভিন্ন বাস্তবতার সঙ্গে তার এক ধরনের প্রত্যক্ষ যোগাযোগ ছিল।

কিন্তু শেষ পর্যন্ত নানা পাটেকরকে সবচেয়ে বেশি মনে রাখা হবে অভিনেতা হিসেবেই। এমন একজন অভিনেতা হিসেবে, যিনি ক্যামেরার সামনে দাঁড়ালে অভিনয়কে আর অভিনয় বলে মনে হতে দিতেন না। সব সত্য বলে মনে হতো।

একবার নানা বলেছিলেন, শিল্পীর জীবন অনেকটা মঞ্চের সামনে থাকা অন্ধকারের মতো। সে অন্ধকারের মধ্যেই শিল্পীকে নিজের আনন্দ খুঁজে নিতে হয়। আর দর্শকের হাততালির শব্দ একসময় নেশায় পরিণত হয়। যতদিন সে শব্দ থাকে, শিল্পী বেঁচে থাকেন।

আজ নানা পাটেকর নেই। কিন্তু সে হাততালির শব্দ থামেনি। তিনি সত্যিকারের নটসম্রাট।


Related Posts