যা দেখেছি যা বুঝেছি—৩১ মনিরুল ইসলাম সাবেক রাষ্ট্রদূত

স্ত্রীচরিত

Once made equal to man, woman becomes his superior : Socrates.পৃথিবীর প্রত্যেক স্ত্রীর একটা না একটা অভিমান—অভিযোগ আছে তার স্বামীর ব্যাপারে, একটা না একটা প্রশংসা আছে অন্যের স্বামীর প্রতি। হয়ত বিপরীতটাও সত্য কিন্তু আমি যেহেতু একজন স্বামী, তাই একজন স্ত্রীর কথাই বলি। এই স্ত্রী আমার বা আপনাদের কারো নয়, সর্বজনীন বাঙালি স্ত্রী। বিদেশী সাহিত্য আমি তেমন পড়িনি, তবে বাংলা সাহিত্যের অমর উপন্যাসগুলিতে দেখা যায় আগের যুগে গ্রাম্য বধূরা স্বামীর বাড়িতে এসে কী অবর্ণনীয় দুঃখ কষ্ট লাঞ্ছনা ভোগান্তির মধ্য দিয়ে প্রায় পুরোটা জীবন পার করত। সশ্রদ্ধচিত্তে তাদের সেই অপরিসীম ত্যাগ ও দুর্দশার কাহিনী মনে রেখেই এ যুগের স্ত্রীদের কিছুকথা ও স্বভাবচরিত্র নিয়ে একটি রম্যরচনা লিখতে বসলাম। এ যুগের একজন স্বামীর কল্পচোখে যা কিছু ধরা পড়ল উৎকটভাবে, তা পড়ে বিভিন্ন জন বিভিন্ন মন্তব্য করবেন, তবে এখানে সবই মজা করার জন্য এবং সবই আপেক্ষিক।

দীনহীন বাঙালি পিতার বাসনা: একটা সুপাত্র খঁুজে কন্যা সম্প্রদান করা। বাস্তবে কন্যাদায়গ্রস্ত পিতা রেহাই পেলেও পাত্র হয়ে পড়েন স্ত্রীদায়গ্রস্ত। ‘ভাল জামাই’ মানে কি? বশীভূত স্ত্রৈণ, যার কোনো স্ত্রীলিঙ্গ নেই। মা—বাবা শাসন—শৃঙ্খলা—নীতির কথা বললে তার নাম আদরযত্ন, জামাই বললে নির্যাতন। ‘এতদিন মার কথায় তিতা করলা খেয়েছি, এখনও খাব? দেশি মুরগি/ডিম কে খায়, গরুর তাজা দুধ/মধু খাব? ছি, গন্ধ! মাছ—শাক—গুড় তুমি খাও...দাঁড়াও, টিভি দেখতে দাও, যখন ইচ্ছা ঘুমাতে যাব।’ মা—বোন কিছু বললে ‘উপদেশ’, শাশুড়ি—ননদ বললে সেটা হয় ‘খেঁাটা’। আর আমি স্বামী অসাবধানে কোনো ব্যাপারে মুখ খুলে ফেললে সহ্য করতে হয় ‘দোষধরা’র তীব্র ভর্ৎসনা। সে যখন কড়া কথা শোনায় সেটা ঠাট্টা, আমি ঠাট্টা করলেও সেটা হয় সিরিয়াস! একই জিনিস সে বললে বলে, ‘জোক করলাম, এটাও বুঝলা না! তুমি একটা টিউব—লাইট’। আমি কিছু বললে বলে, ‘কেন রাগারাগি করো’, সে বললে তখন হয়, ‘জাস্ট পরামর্শ দিলাম’।

‘এই সংসারে আমার কোনো স্বাধীনতা নাই। এই বাড়িতে আমার কোনো মূল্য নাই। কাজের মেয়েরও দাম আছে, সেটাও আমার নাই। আমি বলে তোমার সংসার করলাম, আর কেউ করত না। খরচের হিসাব, খাওয়ার কথা, ঘুমের সময় জিজ্ঞাসা করবা না। ফ্রীজ খুলবা না, স্টকে কী আছে দেখতে পারবা না। আমার সংসারে তুমি কিছু বলবা না, ধরবা না। অফিস তোমার, বাসা আমার। এটা তোমার অফিস না, এখানে আমাকে ডিক্টেট করবা না।’

বড় আশা নিয়ে মা—বাবা আসে ছেলের বাসায়, থাকবে কিছুদিন। ওমা, সেদিন শুনলাম তার আত্মীয়াকে ফোনে বলছে, দুয়েকদিন দেরি করো, বাসায় ‘মেহমান’ এসেছে। গভীর দুঃখে বুঝলাম আমার শ^শুর—শাশুড়ি যদি মেহমান হয়, মা—বাবাও তো এ বাসায় মেহমান! বোকা আমি! সেজন্যই হয়ত সেদিন অনুযোগ করে বলল, কথায় কথায় ‘মা গো মা’ করবা না, এক—দুইবার ‘বউ গো বউ’—ও করবা।

মামাবাড়ি আছে, চাচাবাড়ি নেই। মামার বাড়ির কিচ্ছা—কাহিনী—স্মৃতি যেন অমৃত। আহা, মামার বাড়ি দুধের হাঁড়ি! চাচার বাড়ি গাল পাড়ি। খালামণি মামণি খালুজান আছে, ফুফুমণি চাচিমণি ফুফাজান কি আছে? সন্তানকে কে শেখায় এসব? নানি—নানা আদরের ভান্ডার, দাদি—দাদা কিপ্টার সম্ভার।

তার কথাই সই। কথায় যুক্তিতে সর্বদা উপরে থাকা চাই। আমি তার একটি ‘দোষ’ বললে সে বলবে দশটা। আমার এক মিনিটের কথার জবাবে দশ মিনিট কথা শুনাবে। ‘আগে আমার কথা শুনো, আমার কথা শেষ করতে দাও’। মন্দটা যদি নিজের উপর বর্তায় বলবে, ‘তুলনা করবা না’ কিন্তু নিজের পক্ষে ভাল কিছু হলে নিজেই তুলনা করে খেঁাটা দেবে, ‘বুঝলা, দাসীর কথা বাসি হলে ফলে’। ‘বাসার কাজের বুয়াটাও আমার চেয়ে বেশি কদর পায়’, একথারও জবাব দেবেন না, দিলে খবর আছে। একদিন রাগে একটা গ্লাস ভেঙে ফেললাম, সেও তৎক্ষণাৎ আরেকটা ভেঙে বলে, ‘আমিও পারি!’ জেতা যাবে, হারা যাবে না।

তার মার ব্যাপারে কিছু বলতেই সাথে সাথে ফেটে পড়ল, ‘তোমার মা—ও খারাপ...তোমার কথার জবাব দিতে হবে সাথে সাথে।’ অর্থাৎ প্রতিশোধে বিলম্ব করা যাবে না। সময়ে কথা বলতেও ভয় হয়Ñপ্রতিটি কথা, পদক্ষেপ, সিদ্ধান্ত বা প্রস্তাবে পিঠাপিঠি বিরোধিতা করবে। কতবার প্রতিজ্ঞা করেছি কথা বলব না, রি—অ্যাক্ট করব না কিন্তু পারি না পানি হয়ে যেতে। এতবুদ্ধি তার মাথায়, কোনোকিছু বলার সাথে সাথে তার দোষভার আমার উপর বর্তিয়ে দেয়।

‘তুমি কেমন একটা পুরুষ, কিচ্ছু পারো না। মোনার জামাই দেখলাম কী সুন্দর ওটা করে ফেলল।’ যতই মনোযোগ দিয়ে সময় নিয়ে বাজার করি, স্ত্রী বলেন, ‘ভাল/ঠিক হয়নি। এটা—ওটা ওরকম কিনো নাই কেন!’ দুঃখে কাঁচাবাজারে আর যাব না প্রতিজ্ঞা করি কিন্তু সেই প্রতিজ্ঞার মেয়াদকাল শেষ হয়ে যায় পরের সপ্তাহে। সংসারে আমার বেশির ভাগ ঝগড়া হয়েছে বাজার করা, বাসার দাওয়াতে রান্নার আইটেম/সংখ্যা নিয়ে। ‘বাপের পয়সার যত্ন নিবা, জামাইর পয়সা খরচা করবা দুইহাতে।’

যতই মন খারাপ হোক, কান্না পাক কোনো দুঃসময়ে, সারাক্ষণ হাসিখুশি থাকতে হবে বউয়ের সামনে। বলে, ‘দরকারে আমি কাঁদব, তুমি কাঁদবে নাÑছি, ছেলেমানুষ কাঁদে!’ যত অন্যায় অন্যায্য করুক, পরক্ষণেই তা ভুলে সহজ স্বাভাবিক হয়ে যেতে হবে। ধরেই নেয় তার যত হইচই কটুভাষ রূঢ়ব্যবহার, সব হজম করে ফেলব মুহূর্তে। ভুল করলাম: রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ানোর জন্য শিশুকালে টিকা নেয়ার মতো যৌবনকালে হজমশক্তি বাড়ানোর হজমি খেয়ে বরযাত্রায় রওনা হওয়ার দরকার ছিল।

সন্তানকে বলে, ‘আমার বাপ ভাল, তোর বাপ ভাল না।’ স্বামীকে বলে, আমার বাড়ির সবাই ভাল। তোমাদের বাড়ির অমুক এরকম, তমুক ওরকম। জীবনেও এরকম কথা শুনি নাই, শুধু বিয়ের পর তুমি ও তোমার ভাইবোনেদের কাছে শুনলাম...। আমাদের বাসায় এরকম হয় না, তোমাদের ওখানে হতে পারে। আর শুনো, ‘তোমার মা, তোমার বাপ’ করবা নাÑতোমার কী হয়?

সবকিছুতেই ‘তোমার’ এবং ‘আমার’। বোঝাতে পারি না যে ভালবাসায় প্রতিযোগিতা নেই, আছে সহযোগিতা সহমর্মিতা। সম্পর্কটা দ্বান্দ্বিক ও সাংঘর্ষিক নয়, ঐক্য ও পরিপূরকের। সবকিছুতেই আমি যেন তার প্রতিপক্ষ, সপক্ষ নয় কোনোকিছুতেই। ছোটবড় যে কোনো যুক্তি মন্তব্য ধারণার বিপরীতে একটা প্রতিপক্ষ দাঁড় করাবে, বিরোধিতা করবে। ছেলেদেরকেও রাখে আমার বিপক্ষে। সন্তান লায়েক/বুঝের হলে দলে টেনে দল ভারী করে, আমার প্রতিপক্ষ বানায়। সংসারসমুদ্রে স্বামী/পিতা হয়ে যায় অসহায় একা নিঃসঙ্গ। ভাল কিছু বললেও সাথে সাথে দ্বিমত করে, পাছে আমি তার খারাপ কিছু বললাম কি—না। আমার সদুপদেশের বিপরীতে দ্বিধান্বিত সদুত্তর দিতে হলেও যোগ করবে, ‘তবে কিন্তু অবশ্য’।


যত চোটপাট, সব যায় আমার উপর দিয়ে: এটা কেন হল না, এমন কেন, কেন করল ...। আমার সাথে হৈচৈ করলেও অন্যের সাথে ভদ্রলোক। তারা বলে, ‘আহা, এমন ভদ্র বিনয়ী মেয়ে ক’জন আছে?’ আমি বলি, ‘জি, জি, কপাল আমার।’ যখনই দেখে বা বুঝে আমার সুবন্ধু শুভাকাঙ্খী কেউ, নির্বিচারে ভাবে তার পক্ষের লোক সে নয়। যে তার পক্ষে, অন্ধভাবে তার শতদোষ মাফ। একরত্তি যে যাবে তার বিপক্ষে বা আমার পক্ষে, সে হবে খেঁাটার টার্গেট। 

‘আমার ছেলে অসীম, আমার মেয়ে সীমা। তোমার তো মাত্র একবিন্দু অবদান, বাকি সবটাই তো আমার। আমার ছেলেমেয়েই সব, আমার সম্বল। এদের বন্ধুবান্ধবও কত ভাল। তুমি তো ধ্যাৎ—ধুৎ কর, তোমার আত্মীয়—স্বজন তো আরো বেশি।’


Related Posts