২০২৫ সালে অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে || ১২ হাজার ৬৬৩ কোটি টাকা ঘুস লেনদেন
ঢাকা থেকেঃ ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) পরিচালিত ‘সেবা খাতে দুর্নীতি: জাতীয় খানা জরিপ ২০২৫’—এর ফলাফলে দেখা গেছে, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় এক বছরে ঘুষ লেনদেন হয়েছে ১২ হাজার ৬৩৩ কোটি টাকা। এই অর্থ ২০২৪—২৫ অর্থবছরের সংশোধিত জাতীয় বাজেটের ১.৫৮ শতাংশ এবং দেশের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ০.২৩ শতাংশের সমান।
ওই সময় দেশের ৮১.৬ শতাংশ খানা অন্তত একটি সেবা খাতে দুর্নীতির শিকার হয়েছে এবং ৬৩.৬ শতাংশ খানা ঘুষ দিতে বাধ্য হয়েছে। ২০২৩ সালের তুলনায় ২০২৫ সালে দুর্নীতির শিকার খানার হার বাড়ে ১৫.১ শতাংশ এবং ঘুষের শিকার খানার হার বাড়ে ২৫.২ শতাংশ।
বৃহস্পতিবার রাজধানীর ধানমন্ডিতে টিআইবির কার্যালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে জরিপের ফলাফল থেকে এ তথ্য জানানো হয়।
জরিপে দেখা গেছে, দুর্নীতির ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি ভুক্তভোগী হয়েছেন পাসপোর্ট সেবা গ্রহণকারীরা।
এরপর রয়েছে বিআরটিএ এবং বিচার সংশ্লিষ্ট সেবা। এসব খাতে ঘুষ, দালালনির্ভরতা, হয়রানি এবং নিয়মবহির্ভূত অর্থ আদায়ের প্রবণতা সবচেয়ে বেশি।
জরিপের তথ্যানুযায়ী, কিছু সেবা খাতে আংশিক ডিজিটাইজেশন চালু হলেও তা দুর্নীতি কমাতে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারেনি। বরং সেবাপ্রাপ্তির ক্ষেত্রে মিশ্র পদ্ধতির জটিলতা ও দালালের ওপর নির্ভরতার কারণে ৯৮.১ শতাংশ খানা ঘুষ দিতে বাধ্য হয়েছে।
এর মধ্যে ৯১.২ শতাংশ ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা—কর্মচারীরা সরাসরি ঘুষ গ্রহণের সঙ্গে জড়িত বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।
ঘুষ দেওয়ার কারণ সম্পর্কে ৮১.৫ শতাংশ উত্তরদাতা জানিয়েছেন, ‘ঘুষ না দিলে সেবা পাওয়া যায় না।’ টিআইবির মতে, এটি দুর্নীতির প্রাতিষ্ঠানিকীকরণের একটি স্পষ্ট ইঙ্গিত।
জরিপে আরো উঠে এসেছে, দুর্নীতির বিরুদ্ধে অভিযোগ করার বিষয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে সচেতনতা অত্যন্ত কম। ৫৩.৩ শতাংশ খানা জানেই না কিভাবে অভিযোগ করতে হয়।
সরকারের অভিযোগ প্রতিকার ব্যবস্থা (জিআরএস) সম্পর্কে অবগত মাত্র ১.৪ শতাংশ খানা। জরিপের সময়সীমায় দুর্নীতির শিকার হওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে অভিযোগ করেছে মাত্র ১০.৩ শতাংশ। অভিযোগ দায়েরকারীদের ২১.৬ শতাংশের অভিযোগ গ্রহণই করা হয়নি, আর ৫১ শতাংশ ক্ষেত্রে কোনো ব্যবস্থাই নেওয়া হয়নি।
অভিযোগ না করার কারণ হিসেবে ৬১.৩ শতাংশ উত্তরদাতা বলেছেন, ‘সেবা নেওয়ার ব্যবস্থা এমনই, তাই অভিযোগ করার প্রয়োজন মনে করিনি।’ অন্যদিকে ৪৮.৯ শতাংশ জানিয়েছেন কোথায় বা কিভাবে অভিযোগ করতে হয় তা তাঁরা জানেন না। ৩২.৩ শতাংশ ঝামেলা বা হয়রানির আশঙ্কায় অভিযোগ করেননি।
জরিপে দুর্নীতির প্রধান কারণ হিসেবে বিচারহীনতাকে দায়ী করেছেন ৭৪.৮ শতাংশ উত্তরদাতা। এ ছাড়া সচেতনতার অভাবকে কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন ৬০.৮ শতাংশ। সরকারি কর্মকর্তা—কর্মচারীদের সম্পদের হিসাব প্রকাশ না করা এবং দুর্নীতিগ্রস্ত ব্যক্তিদের পুরস্কৃত করার সংস্কৃতিকেও দুর্নীতির অন্যতম কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
তুলনামূলক বিশ্লেষণে দেখা যায়, খানাপ্রতি গড় ঘুষের পরিমাণ ২০২৩ সালের পাঁচ হাজার ৬৮০ টাকা থেকে কমে ২০২৫ সালে পাঁচ হাজার ১২৪ টাকায় নেমে এলেও সামগ্রিক দুর্নীতির বিস্তার বেড়েছে। বিশেষ করে স্বাস্থ্যসেবায় টিকিট সংগ্রহ এবং কৃষি খাতে সার প্রাপ্তির ক্ষেত্রে ঘুষের হার দ্বিগুণ থেকে প্রায় পাঁচ গুণ পর্যন্ত বৃদ্ধি পেয়েছে। শিক্ষা খাতে নিয়মবহির্ভূত অর্থ লেনদেনের হার প্রায় ১৫ শতাংশ থেকে বেড়ে ৩৫ শতাংশে পৌঁছেছে।
এনজিও খাতেও দুর্নীতি বেড়েছে। দায়িত্বে অবহেলার হার ২২.৭ শতাংশ থেকে ৩৬.৫ শতাংশ এবং অসদাচরণ ও দুর্ব্যবহারের হার ১৫.২ শতাংশ থেকে ২৩.২ শতাংশে উন্নীত হওয়ায় খাতটিতে সামগ্রিক দুর্নীতির হার ৬.৫ শতাংশ থেকে বেড়ে ১৩.১ শতাংশে দাঁড়িয়েছে।
জরিপে বলা হয়, একটি পরিবার বছরে গড়ে তাদের মোট আয়ের ১.৭ শতাংশ ঘুষ বাবদ ব্যয় করেছে। তবে সবচেয়ে দুর্নীতিপ্রবণ পাঁচটি খাতে দারিদ্র্যসীমার নিচে থাকা পরিবারের ক্ষেত্রে এই হার ৫.১ শতাংশ, যেখানে দারিদ্র্যসীমার ওপরে থাকা পরিবারের জন্য তা ৩.২ শতাংশ।
কিছু ক্ষেত্রে ঘুষের পরিমাণ পরিবারের বার্ষিক আয়ের চেয়েও বেশি। জরিপে ১৩টি পরিবারের ক্ষেত্রে দেখা গেছে, তাদের দেওয়া ঘুষের পরিমাণ বার্ষিক আয়ের পাঁচ থেকে ছয় গুণ পর্যন্ত পৌঁছেছে। দারিদ্র্যসীমার নিচে থাকা পরিবারগুলোর জন্য পাসপোর্ট সেবা গ্রহণে মোট ব্যয় মাসিক আয়ের ৭৮ শতাংশ পর্যন্ত, যার ৩৭ শতাংশই ঘুষ হিসেবে দিতে হয়েছে। একইভাবে আইন—শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর সেবা নিতে গিয়ে অনেক পরিবারকে মাসিক আয়ের ৩৪ শতাংশ পর্যন্ত ঘুষ দিতে হয়েছে।
সংবাদ সম্মেলনে টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, দুর্নীতি সমাজের সর্বস্তরের মানুষের জন্য ক্ষতিকর হলেও এর বোঝা সবচেয়ে বেশি বহন করতে হয় দরিদ্র ও নিম্ন আয়ের মানুষকে। জরিপে দেখা গেছে, গ্রামাঞ্চলের মানুষ তুলনামূলক বেশি দুর্নীতির শিকার হয়েছেন এবং নিম্ন আয়ের পরিবারের ওপর দুর্নীতির চাপ উচ্চ আয়ের পরিবারের তুলনায় প্রায় তিন গুণ বেশি।
তিনি বলেন, দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) প্রতি জনগণের আস্থার সংকট রয়েছে। জরিপে ২৯.৫ শতাংশ মানুষ দুদক সম্পর্কে জানলেও অভিযোগ করেছেন মাত্র ০.৩ শতাংশ। ফলে দুদককে আরো স্বাধীন, কার্যকর ও জন—আস্থাসম্পন্ন প্রতিষ্ঠানে পরিণত করার প্রয়োজন রয়েছে।
দুর্নীতি প্রতিরোধ ও সেবা খাতে সুশাসন প্রতিষ্ঠায় ১০ দফা সুপারিশও দিয়েছে টিআইবি। এর মধ্যে রয়েছে—সরকারের সংস্কার কর্মসূচির সঙ্গে সুশাসনকে বাধ্যতামূলক করা, দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ, সরকারি সেবাসমূহ সম্পূর্ণ ডিজিটালাইজ করা, অভিযোগ নিষ্পত্তি ব্যবস্থা ও দুদকের হটলাইন ১০৬ কার্যকর করা, তথ্য অধিকার আইনের আওতায় তথ্য প্রকাশ নিশ্চিত করা, জনবল ও লজিস্টিক সংকট দূর করা, সরকারি কর্মকর্তা—কর্মচারীদের বার্ষিক সম্পদ বিবরণী বাধ্যতামূলক করা এবং স্থানীয় পর্যায়ে সামাজিক আন্দোলন জোরদার করা।
টিআইবি জানায়, ১৯৯৭ সাল থেকে পরিচালিত ধারাবাহিক গবেষণার অংশ হিসেবে এটি তাদের ১১তম জাতীয় খানা জরিপ। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) নমুনা কাঠামো অনুসরণ করে দেশের আটটি বিভাগের শহর ও গ্রামাঞ্চলের ১৫ হাজার ৭১৫টি খানার প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে জরিপটি পরিচালনা করা হয়েছে। মাঠ পর্যায়ে তথ্য সংগ্রহ করা হয় ২০২৫ সালের ১২ নভেম্বর থেকে ২০ ডিসেম্বর পর্যন্ত।
