যা দেখেছি যা বুঝেছি—১৭ || মনিরুল ইসলাম

অর্গানিক মানুষ

অর্গানিকবলতে বুঝিপ্রাকৃতিক স্বাভাবিক অকৃত্রিম’, যেমনঅর্গানিক ফুডবলতে বুঝি প্রাকৃতিকভাবে উৎপাদিত খাবার।অর্গানিক মানুষবলতে মানবদেহের রাসায়নিক গঠন নয়, মানুষের জন্মবর্ধনবিকাশপরিণতি যেন স্বাভাবিক প্রাকৃতিক প্রক্রিয়ায় সম্পন্ন হয়, সেকথাই বলতে চাই। যেমন বন্যপ্রাণী হলঅর্গানিক’, ফার্মে জন্মবর্ধিত প্রাণী হল কৃত্রিম। নদীসাগরের মাছ বনাম পিসিকালচারের মাছ। মানুষও কিঅর্গানিকএবংইনঅর্গানিকহতে পারে? কীভাবে, তারা কারা

আমরা ফার্মে তৈরি হাইব্রিড জেনেটিক রদবদল (জিএম) খাদ্যের কুফল চিন্তা করি, অর্গানিক খাদ্য খুঁজি সুস্বাস্থ্যের জন্য কিন্তুমানুষনিজে অর্গানিকভাবে জন্মলালনবর্ধন হচ্ছে কিনা সেই বিষয়টি নিয়ে ভাবি না। তার মানসিক স্বাস্থ্যের জন্যঅর্গানিক পরিবেশনিয়েও চিন্তা করি না। এটা না হলে পৃথিবীর জনসংখ্যার ধরন আমূল পরিবর্তিত হয়ে যাবে। উন্নত অর্থনীতিতে জনসংখ্যা হ্রাসের কারণই হচ্ছে সেখানে মানবোৎপাদনও হয় হাইব্রিড ফার্মে, বড় হয় কৃত্রিম পরিবেশে। সাময়িকভাবে একা বা সপরিবারে প্রবাসে থাকলেও মানুষঅর্গানিকহয়ে উঠতে পারে না।

এশিয়াআফ্রিকার যেসব সুস্থ মেধাবী ইমিগ্রান্ট ইউরোপআমেরিকা যাচ্ছে, তাদের প্রায় সবার জন্ম বর্ধন হয়েছে অর্গানিক পরিবেশে। এই সবঅর্গানিক মানুষ’—এর চাহিদা প্রয়োজনীয়তা থাকবে চিরকালÑশুধু ইউরোপ আমেরিকা নয়, সারা পৃথিবীকে টিকিয়ে রাখার জন্য। পৃথিবী টিকে আছে এবং উন্নতি লাভ করছে এসব অর্গানিক মানুষের বদৌলতে। শহুরেডিজিটাল মানুষপৃথিবীকে টিকিয়ে রাখতে পারবে না, এরা প্রাকৃতিক এবং মানসিক জগতকে বিকৃত করে ফেলছে, অস্থির করে তুলছে জীবনধারাকে। শহুরে সন্তান হল গ্রীনহাউজে সৃষ্ট গন্ধহীন রঙিন ফুল। আধুনিক নগর মানুষকে চালাক বানিয়েছে, দয়ালু নয়। বিত্তশালী করেছে, ধনবান নয়। মোটা করেছে, স্বাস্থ্যবান নয়। সমস্ত বিকৃতি কুরুচির আবিষ্কার হয়েছে শহুরে মানুষ কতৃর্ক। তারা স্মার্ট হয়, গ্রামীণদের মতো রিজিলিয়েন্ট হয় না। 

অর্থনৈতিক শক্তির আধিপত্যে সাংস্কৃতিক সম্পদ বিনষ্ট হয়ে যাচ্ছে অথচ একটা পূর্ণ সুখী মানুষের জন্য দুটোই দরকার। একটাঅর্গানিক ফ্যামিলিঅনেক ভাল করে, যা থেকে ডাক্তার ইঞ্জিনিয়ার আমলা হয় কিন্তু পরবতীর্ প্রজন্ম নীচে নামতে থাকে কেন? দুই/তিন জেনারেশন পরে কেন প্রজন্ম তার পূর্বপুরুষদের সামর্থ্য ধরে রাখতে পারে না? কারণ সে তাদের মতো প্রাকৃতিকভাবে বড় হয় না। পৃথিবীর বংশগত সা¤্রাজ্যগুলি ক্রমান্বয়ে পতনের দিকে ধাবিত হয়েছে, কারণ রাজবংশের পরবর্তী প্রজন্ম সুখবিলাসে রাজপ্রাসাদে বদ্ধকৃত্রিম পরিবেশে বেড়ে উঠায় সংগ্রামশীল হয়নি। 

তাই প্রকৃতির কোলে প্রাকৃতিক পরিবেশে সংগ্রাম করে বেড়ে ওঠা সেইওয়াইল্ড অর্গানিক ন্যাচারালমানুষই সমাজে টিকে থাকবে এবং পৃথিবীকেও টিকিয়ে রাখবে। অর্গানিক মানুষই পৃথিবী শাসন করবে, প্রকৃতিকে রক্ষা করবে, নতুন জিনিস আবিষ্কার করবে। যতদিন পৃথিবীতে অর্গানিক মানুষের সংখ্যাগরিষ্টতা থাকবে, অন্তত অর্ধেক থাকবে, ততদিন পৃথিবী নিরাপদে টিকে থাকবে।অর্গানিক মানুষসৃষ্টির জন্য তাহলে আমাদের কী দরকার?

. প্রকৃতির অংশ: শিশুরা বন্ধ রুমে সময় কাটাবে না, অবাধ উন্মুক্ত মাঠে ঘুরে বেড়াবে। দরকারমাটির মানুষ’, মাটির স্পর্শে গন্ধে বড় হওয়া মানুষ অকৃত্রিম প্রকৃতির মাঝে মিশে প্রকৃতির অংশ হয়ে যাবে। গ্রামে আমরা কীভাবে বেঁচে রইলাম, কে ছিল আমাদের শিক্ষক? প্রকৃতি। বেড়ে ওঠার সময় সন্তানকে নিয়ে যান নিজ বাড়িতে, একদম গ্রামে। সে অর্গানিক হয়ে উঠবে চলনে বলনে, খাদ্যাভ্যাসে, একাত্মতায়, ঐহিত্যকে ভালবাসায়। মাতৃভাষা না জানলে, গ্রামীণ মূলজীবনকে অপছন্দ করলে, ইতিহাসঐতিহ্যকে অবজ্ঞা করলে গর্বিত/খুশি হবেন না।

. নগরায়ন: অন্তত পৃথিবীর অর্ধেক মানুষ গ্রামীণ/প্রাকৃতিক পরিবেশে সংগ্রাম করে বড় হওয়া দরকার। সুতরাং নগরায়ন বর্ধনে তুষ্ট হওয়ার কিছু নেই, বরং উৎকন্ঠিত হওয়ার কারণ আছে। দ্রুত নগরায়নের ফলে আধেক আধেকের ভারসাম্য বিনষ্ট হয়ে যাচ্ছে বলেই আমার আশঙ্কা যে, পৃথিবী কতদিন টিকে থাকবে? পৃথিবীকে টিকিয়ে রাখার জন্য অন্তত অর্ধেক মানুষ অর্গানিক হওয়া দরকার।

. প্রাকৃতিক শিক্ষা: দান ত্যাগ সহিষ্ণুতা নির্ভরতা ইত্যাদি শিখবে প্রকৃতির পাঠশালায়। যৌনতা শিখবে প্রকৃতি থেকে, ব্লুফিল্ম দেখে নয়। 

. প্রাকৃতিক: প্রকৃতির বেসিক/মৌলিককে পরিবর্তন করে ফেললে পরিণতি টেকসই হবে না। মানুষের অতিরিক্ত চাহিদা মেটানোর জন্য খাদ্যবীজ, ভোজ্যপ্রাণী, মাছচাষ সবই হয়ে হচ্ছে কৃত্রিম। অতিউন্নয়ন, অতিবসতি, অতিনগরায়নের কারণে প্রাকৃতিক ভারসাম্য বিনষ্ট হয়ে এই গ্রহ ধ্বংসের দিকে এগিয়ে যাবে। পৃথিবীর সব স্বাভাবিক জন্মমৃত্যুজীবনযাপনযৌনক্রিয়াউৎপাদন অস্বাভাবিক হয়ে যাচ্ছে এবং এই অস্বাভাবিকতাই নর্ম/মডেল হয়ে উঠছে। প্রকৃতিও মাঝেমধ্যে অস্বাভাবিক আচরণ করে, তবে স্বাভাবিকতায় ফিরে আসে কিন্তু মানুষকে ফেরানো কঠিন। তাইকৃত্রিম নয়, প্রাকৃতিকরীতিনীতি অনুসরণ করতে হবে।

. সঙ্গ: যান্ত্রিক যুগে মানুষ মানুষের সঙ্গ চায় না, যন্ত্রের সাথে বসবার করে। যন্ত্রসঙ্গ মানবসঙ্গের বিকল্প হতে পারে না। অথচ সন্তান বড় হচ্ছে যন্ত্রের প্রভাবে, পারিবারিক আবহে নয়। একজন মানুষের দরকার বাইরের এক বা একাধিক মানববন্ধু, আবদ্ধঘরের ডিজিটাল ডিভাইস নয়। মানুষ তথা সকল প্রাণী যেন হয় নেচারমেড, মেশিনমেড নয়। 

. পরিবার: মানসিক খাদ্যে পরিপুষ্ট হওয়ার জন্য দরকার পারিবারিক স্নেহবন্ধনসহমর্মিতা, মাবাবা ভাইবোন কাজিন এবং বৃহৎ যৌথ পরিবারের সদস্যরা এসবের সঠিক জোগানদাতা। আর ভাল হয় তিনজন সন্তান থাকলেÑদুই নয়, এক তো নয়ই। নিউক্লিয়ার ফ্যামিলি, সিঙ্গেল প্যারেন্ট ফ্যামিলির বাচ্চারা একগুঁয়ে একঘেয়ে নিঃসঙ্গ আত্মকেন্দ্রিক পরিবেশে বড় হয়। 

. পরিবেশ: যৌথ পরিবার সম্ভব না হলে অন্ততযৌথ পরিবেশদরকার, যেমন কন্ডোমিনিয়াম, যেখানে অনেকগুলি পরিবার পাশাপাশি বসবাস করে। হোক ঝগড়াঝাঁটি, সুস্থ প্রতিযোগিতাও তো হবে। পৃথিবীর সকল প্রাণী দলবদ্ধভাবে গোষ্ঠীর সদস্য হয়ে উন্মুক্ত পরিবেশে বড় হয়, মানুষ কিভাবে চার দেয়ালে আবদ্ধ ঘরে থেকে একা একা বেড়ে উঠবে? অনেকের আফসোস, ছেলেমেয়ে কেন আমার মতো হচ্ছে না? কারণ, সে আমার মতো পরিবেশে বড় হচ্ছে না। পরিবেশ পরিস্থিতি পরিবর্তিত হয়ে যাওয়ায় সন্তানের অভ্যাসস্বভাবও অন্যরকম হচ্ছে। আমি বড় হয়েছি গ্রামীণ উন্মুক্ত প্রাকৃতিক পরিবেশে। সন্তান বেড়ে উঠছে শহুরে বদ্ধ কৃত্রিম পরিবেশে। সুতরাং সন্তানের জীবনাচরণ চিন্তাধারা কিছুতেই আমার মতো হবে না। জোর করে তাকে আমারই মতো বানাতে চাইলে সে আস্তেধীরে আমাকে তার শত্রু ভাবতে শুরু করবে। বয়ঃসন্ধিক্ষণে পিতাপুত্র মাতাকন্যা দুজনেই বিপরীতমুখী হয়ে ওঠে। সৃষ্টি হয়ঐশী’—, যে তার নিজস্ব জীবনধারাকে বজায় রাখার জন্য পিতামাতাকে হত্যা করেছিল।

. পুস্তকবহির্ভূত শিক্ষা: তীব্র প্রতিযোগিতার কারণে সারাদিন পড়ার টেবিলে বসে থাকে অনেক ছেলেমেয়ে। যার যার রুচি অনুযায়ী প্রত্যেকের দরকার খেলাধুলা, সাহিত্য, সঙ্গীত, নৃত্য, চিত্রকলা, ভ্রমণ ইত্যাদি আউটডোর কার্যক্রম। মানুষের স্বাভাবিক সহজাত প্রবৃত্তিগুলি বিকশিত হলে সে সুস্থশক্ত মানুষ হিসাবে সমাজে অবদান রাখতে পারবে।

. ডিজিটাল আসক্তি: রাতে বিছানায় ঘুমানোর আগে একটা বই নিয়ে শুতাম, এখন মোবাইল নিয়ে ঘুমাতে যাই। বইপড়ায় জ্ঞানী হতাম, এখন স্মার্ট হচ্ছি। বর্তমান প্রজন্মের সিংহভাগ মানবসন্তান ইন্টারনেট নিয়ে বসে থাকে, বাইরের বৃহত্তর জীবন প্রকৃতির বাস্তবজ্ঞান হয় না। ডিজিটাল যুগে সারাক্ষণ কিছু একটা নিয়ে বসে থাকলে মুক্তচিন্তা করার সময় কোথায়? চিন্তাভাবনা করার ভারও কি কম্পিউটার/রোবটের উপর থাকবে? সোশাল মিডিয়ার কারণে আমরা সবজান্তা হচ্ছি, যা জানার দরকার নেই, জানতে চাই না, তা জানছি। এতে কিছুই ভালমতো জানতে পারছি না। ইনফরমেশন/তথ্য এবং নলেজ/জ্ঞান যে এক জিনিস নয়, তা ভুলে যাচ্ছি। আমরা তথ্যসমৃদ্ধ হচ্ছি, জ্ঞানবান নয়। ফেসবুকপোস্ট তার প্রমাণ।

১০. খাদ্যপানীয়: পৃথিবীতে স্থূলকায় মানুষের সংখ্যা ক্রমান্বয়ে বাড়ছে, এটা কি স্বাস্থ্যোন্নতির লক্ষণ? মানুষ এখন কৃত্রিম প্রক্রিয়াজাত খাবার খেয়ে অস্বাভাবিক লম্বামোটা হচ্ছে। এসব মানুষের রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা কম, বৈরী পরিবেশে বেঁচে থাকার সক্ষমতা কম। ইউরোপআমেরিকায় করোনা আক্রমণে মৃত্যুর হার তা প্রমাণ করে। আর আপনার স্ত্রী বা স্বামী বা উভয়েই যদি হোন শতভাগ শহুরে, তাহলে তো সন্তান অর্গানিক পথে যাবেই নাÑমাছে পাবে স্মেল, সবজিতে ইঊ! ফাস্টফুডে ওয়াও, পশ্চিমা কালচারে ব্রাভো। এরা গায়ের গন্ধ দূর করার জন্য গোসল না করে পারফিউম মাখে, পানি না ধরে ব্যবহার করে টিসূ। তাই ভাবতে হবে কাদের নিয়ে আমরা বাঁচব ?


Related Posts