বাতিঘর || জাকিয়া শিমু

উপসচিব মোঃ কামরুজ্জামান সেই সন্ধ্যা থেকে বসার ঘরের লাগোয়া ব্যালকনিতে চড়ুইপাখির মতো ছটফট করছে! একবার হাতল চেয়ারটাতে বসছে পর মুহূর্তে দাঁড়িয়ে হাত দুটো পেছনে ধরে ব্যালকনির মাথা মাথা চক্কর দিচ্ছে! লোহার গ্রিল দিয়ে ঘেরা ব্যালকনিতে দাঁড়ালে অনায়াসে সামনের রাস্তার নাড়িনক্ষত্র চোখে পড়ে। কিন্তু সেই গ্রিলের ফাঁক দিয়ে সারসপাখির মতো গলা অযথা উঁচিয়ে রাস্তার শেষ প্রান্তে চোখ রেখে জরুরি কারো ফেরার অপেক্ষায় উদগ্রীব হয়ে দাঁড়িয়ে!

তার বসার ঘরের বিদেশি দেয়ালঘড়িটি অচেনা আওয়াজে মধ্যরাতের বার্তা জানাতে সে আরও বেশি অস্থির হয়ে পড়ে! অতিরিক্ত উৎকণ্ঠায় বারান্দা থেকে উঁকি দিয়ে ঘন ঘন বসার ঘরের ঘড়িটির দিকে তাকিয়ে সময় দেখছে অথচ নিজের বাঁহাতে রোলেক্স ব্রান্ডের ঘড়ি ঝুলছে সেদিকে তার খেয়াল নেই! আদতে কামরুজ্জামান খুব কৌশলী, ঠান্ডা মাথায় কঠিন কাজ করা মানুষ কিন্তু আজকের অধীর কামরুজ্জামানের সাথে সবকিছু কেমন বেমানান লাগছে!

কামরুজ্জামান শুরুতে বুঝতে পারেনি মন্ত্রী তাকে এতবড়ো একটা ফ্যাসাদে ফেলবে! বিষয়ের গভীরে ভাবতে পারলে সে হয়তো আস্ত সচিব হওয়ার স্বপ্ন ভেস্তে দিতে এক মুহূর্ত সময় নিত না! কামরুজ্জামান যেনতেন কিছিমের উপসচিব না, পুস্তকের ভাষায় যাকে বলে জাঁদরেল সচিব! সচিবপাড়া তাকে বিশেষ আমলে রাখতে বাধ্য হয়!

উঁচুমহলে তার বিস্তর জানাশোনা! যদিও মন্ত্রীর যৎসামান্য সুনজরের জন্য সচিবের চেয়ারটি এখনো দখলে নেয়া হয়নি! চাকুরির শুরুতে কামরুজ্জামানের একটি স্বপ্ন ছিলÑসচিবের চেয়ারটিতে পাকাপোক্ত হয়ে বসার।অতিরিক্ত কিংবা উপএসব লেজুড়ে পদবি থেকে বেরিয়ে পুরোদস্তুর সচিব হওয়ার লোভ সেই কবেকার! তবে মন্ত্রীর নজরে পড়তে চেষ্টা তদবির কম করে নাই জীবনে! যদিও মন্ত্রীর ইশারা ইঙ্গিত এবং আশ্বাসের তালিকায় তার নাম ছিল কিন্তু কাজ হচ্ছিল না! এতদিন পর মন্ত্রী নিজ উদ্যোগে এগিয়ে এসে যদিও সার্বিক বিচারে অতি সহজ কাজ কিন্তু কামরুজ্জামানের জন্য ভয়ঙ্কর কঠিন কাজের ভার চাপিয়ে দিলেন

কাজটি যৎসামান্য বটে

মন্ত্রীর শ্যালিকা পরপর দুবার এসএসসি পরীক্ষায় ফেল করেছে! শহুরে স্কুলগুলোতে এখনো নকলটকলে ধকল বেশি, সে অনুপাতে গ্রামগুলো সুবিধাজনক অবস্থানে আছে! গ্রামের বেশিরভাগ স্থানে পাবলিক পরীক্ষাগুলোতে নকলের ছড়াছড়ি দেখা যায়! শুধু ছাত্রছাত্রী নকল করে বিষয়টা তা না আসলে, পরীক্ষা কমিটির অনেকেও নকলের সাথে জড়িয়ে পড়ে। এমন কী এক শ্রেণীর শিক্ষকরাও ছাত্রদের নকলে সাহায্য করে!

মন্ত্রীর কাছে শিক্ষার এই বেহাল দশা অজানা নয়! সে নিজেও পরোক্ষভাবে হলেও এমন নিকৃষ্ট কাজে জড়িত! এবার মন্ত্রীর চাওয়া সে রকম উপায়ে গ্রামের স্কুলে শ্যালিকাকে ভর্তি দেখিয়ে এসএসসি পাশ করিয়ে আনা। যে কোনো পরীক্ষার সার্টিফিকেট একদিনের মধ্যে মন্ত্রীর সামনে হাজির করা কামরুজ্জামানের কাছে নস্যি! কিন্তু মন্ত্রী সাহেব পাকা লোক, সে পথে সে যাবে না! কামরুজ্জামানের গ্রামের বাড়ি ঢাকার অদূূরে, বিক্রমপুরে। মন্ত্রী কামরুজ্জামানের স্কুলে তার শ্যালিকাকে ভর্তি দেখাতে নির্দেশ দেয়

মন্ত্রীর এমন প্রস্তাব সে লুফে নেয় কারণ সচিবের আসনটা যে তাকে পেতে হবে! নিদেনপক্ষে মন্ত্রীকে খুশি করা ছাড়া বিকল্প কোন পথ যে নেই! তাছাড়া যৎসামান্য একটি কাজ! একটি স্কুলে ভর্তি দেখিয়ে নকলে পাশ করিয়ে আনা, তাতে বিশ্বের সবচেয়ে দুর্নীতিগ্রস্ত এদেশের কী বা এমন ক্ষতি হবে

কিন্তু কামরুজ্জামান তার স্কুলের প্রধান শিক্ষকের কথা বেমালুম ভুলে গেছে! সহজসরল অথচ পাথরের মতো দৃঢ় নীতিবিশিষ্ট সেই শিক্ষকের চেহারাটি তার ঘটনার পরে মনে পড়ে! এমন অন্যায় আবদার প্রধান শিক্ষকের কাছে নিয়ে যাওয়ার ধৃষ্টতা তার নেই! এমন কথা মনে পড়তে তার মধ্যে এক মুহূর্তের জন্যে স্থিরতা ফেরেনি! কিন্তু মন্ত্রীকে সে কথা দিয়েছে কাজটি দ্রুত কেও দেবে

প্রধান শিক্ষক, কামরুজ্জামানের বাবারও শিক্ষক ছিলেন। তিনি তার বাবাকে খুব স্নেহ করতেন। বাবা উপজেলা অফিসে কাজ করত। তিনি ছিলেন অত্যন্ত সৎ এবং সহজসরল জীবন বহনে অভ্যস্ত। কিন্তু সংসারে একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি বাবা, হঠাৎ করেই পৃথিবীর পাট চুকিয়ে পরপারে চলে যায়। কামরুজ্জামান সংসারের বড় ছেলে। চার ভাইবোনের সংসারে বাবার রেখে যাওয়া সম্পদ বলতে ভিটেমাটিটুকু। সংসারের দুর্দশায় তার পড়াশোনা বন্ধ হয়ে যায়। সংসারের হাল ধরতে পনের বছরের বালক কামরুজ্জামান স্থানীয় বাজারে কাপড়ের দোকানে কাজ নেয়। একদিন প্রধান শিক্ষকের চোখে পড়লে তিনি তাকে জোর করে স্কুলে নিয়ে যান। এবং পরবর্তীতে পড়াশোনার খরচ তিনি নিজ খরচায় চালিয়ে নেন।

এই শিক্ষক শুধু কামরুজ্জামানকে নয়, এমন বহু ছাত্রছাত্রীকে নিজের কষ্টের উপার্জনের টাকায় পড়াশোনা করিয়ে আসছে। একসময় কামরুজ্জামান ভালো ফলাফল করে এসএসসি পাশ করে। ঢাকা কলেজে পড়ার খরচও স্যার নিজে বহন করেন। এভাবে বিশ্ববিদ্যালয় অবধি স্যারের সাথে যোগাযোগটা বরাবরই ছিল। স্যারের পরামর্শ এবং সহযোগিতায় বিশ্ববিদ্যালয়েও ভালো ফলাফল করে সে।

মানুষের আত্মিক বোধের দরজা বন্ধ হয়ে গেলে জাগতিক মোহের জন্ম হয়! সুযোগে লোভ তাকে চীনা জোঁকের মতো খামচে ধরে! বিশ্ববিদ্যালয়ে ভাল রেজাল্টের সুবাদে কামরুজ্জামান প্রশাসনের উঁচু আসনে চাকুরি পেয়ে যায়! এরপর তার আধিপাতের শুরু হয়! সত্যকে আগাছা আর মিথ্যাকে আরাধ্য ভাবতে অভ্যস্ত হয়ে পড়ে! নিজের বিবেক কোচরে গুঁজে নির্দ্বিধায় পচেযাওয়া সমাজের সাথে হাত মেলায় সে

এমন ভ্রান্তচটকদার জীবনে জড়িয়ে নিজে ভালো থাকার অভিনয় করলেও আসলে সে ভাল নেই এমন বোধ তাকে প্রায়ই আহত করে! গভীর রাতে বিবেকের কাঠি নড়েচড়ে উঠতে জীবন নিয়ে বড়ো আফসোস হয়! কিন্তু সঠিক পথে ফিরবার তাগিদবোধও তেমন করে না সে! ভুলতে চেয়েও স্যারের কথা সবসময়ে মনে পড়ত। স্যারকে তার প্রচন্ড ভয়! তাঁর আদর্শ হাঁসের ভেজা পাখার পানি ঝাড়ার মতো করে উড়িয়ে দিয়েছে সে তার চাকুরি জীবনের শুরু থেকে!

স্যারের আদর্শ বড় বেশি পিচ্ছিল ছিল ওপরে ওঠার সিঁড়ির নাগাল পেতে। তাই নিজের বিবেক খুইয়ে, নানান বাহানায় স্যারের সাথে যোগাযোগের পথ রুদ্ধ করে নেয়! স্যার অবশ্য লোকমুখে কামরুজ্জামানের উত্থানকাহিনী জানতে পেরে খুব আহত হন! কামরুজ্জামানের কানেও স্যারের আক্ষেপ পৌঁছে। কিন্তু ততদিনে অনুশোচনাবোধের ক্ষমতা তার নষ্ট হয়ে যায়! অথচ প্রকৃতির অমোঘ নিয়মে মন্ত্রীর কথার মারপ্যাঁচে তাকে আবার স্যারের সম্মুখে দাঁড়াতে হবে নিশ্চিত সে বুঝতে পারে! পারতপক্ষে স্যারের মুখোমুখি দাঁড়ানো ছাড়া আর কোনো বিকল্প নেই! তারপর থেকে কামরুজ্জামানের জীবন দুঃস্বপ্নময় হয়ে ওঠে

মন্ত্রীর অফিস থেকে বিষয়ে ফোনে তাড়া আসে! কামরুজ্জামানের হাতে সময় নেই! এবার তার নড়বার জোগাড় নেই তা নিশ্চিত সে বুঝতে পারে! শ্যালকের বুদ্ধি মতো শ্যালক এবং তার অফিসে সদ্য যোগ হওয়া সহকর্মী রওনককে মন্ত্রীর আবদার সমন্বিতপত্র দিয়ে প্রধান শিক্ষকের ঠিকানায় পাঠিয়ে দেয় সে

ঢাকা থেকে বিক্রমপুরের দূরত্ব অনতিদূর হলেও যাতায়াত ব্যবস্থা এখনো পুরনো ধাঁচের। বাস ধরে গেলেও ফেরি করে দুতিনটে নদী পেরিয়ে নির্দিষ্ট বাসঘাটে পৌঁছতে সূর্য মাথার ওপর দাঁড়িয়ে যায়। এরপর আরও প্রায় দুই মাইল পায়ে হাঁটাপথ পেরিয়ে স্যারের বাড়ি। বর্ষাকালে অবশ্য নৌকোপথের ব্যবস্থা থাকে। ওরা বাস থেকে নেমে সরুপথ ধরে হাঁটতে শুরু করে। পথের একপাশে আঁকাবাঁকা শান্ত কোমল ইছামতি নদী। অন্যপাশে অঞ্চলের ঐতিহ্য টিনকাঠের দুচালা, চৌচালা ঘরসমেত বাড়ি

বৈশাখ মাসের সঁ্যাতসঁ্যাতে গরমেভাবের প্রকৃতি! খাঁ খাঁ রোদ্দুরে তপ্ত বাতাসের আঁচ গায়ে এসে লাগে! পথঘাটে মানুষজন প্রায় নেই! নীরব নিস্তব্ধ! ওরা গ্রামের অবহেলিত পথে নানান দৃশ্যে চোখ রেখে গন্তব্যে দ্রুত হেঁটে এগিয়ে যায়। কামরুজ্জামানের শ্যালক শহুরে মানুষ, তবে রওনকের বেড়ে ওঠা গাঁয়ে। শ্যালক এই তপ্ত পথের দুধারের অপরিচিত দৃশ্যে মোহিত হয়। রওনক ওর আগ্রহ মেটাতে এসব গ্রামীণ গাছগাছড়া পরিচয় করিয়ে দেয়।

ঝোপপঝাড়ে ঢোলকলমির বেগুনি ফুলগুলো চোখ মেলে তাকিয়ে আছে। কোথাও কোথাও মান্দার, মূতরা, পিটালি, জিগা, বাঁশের সারি। মেঠোপথ, দূর্বাঘাসে ছেয়ে মনে হয় যেন সবুজ চাদরে ঢাকা দিয়ে আছে। অচেনা গাঁয়ের মেঠোপথে মাঝে মাঝে ঘূর্ণি হাওয়ায় ধূলোকণা উড়ে বেড়ায়; বাতাসে উড়েপড়া গাছের শুকনো ঝরা হলুদপাতায় ঢেকে আছে পায়েহাঁটা পথ। ঝরাপাতা পায়ে দুমড়ে বুনো গন্ধ ছড়ানো অচেনা পথে হাঁটতে ওদের মন্দ লাগে না। 

প্রায় ঘণ্টা দুই হাঁটাপথ শেষে প্রায় বিকেলে এসে এরা স্যারের বাড়ির দেখা পায়। কামরুজ্জামান স্যারের ঠিকানা কাগজে লিখে দিয়েও নিজ মুখে স্যার এবং তার বাড়ি নিয়ে বিস্তর বলে দেয়। রওনক খেয়াল করে, এসময় কামরুজ্জামানের চোখ দুটো কেমন জলে টলমল করছিল! বাড়ির কাছে পৌঁছে সেকথা রওনকের স্মরণ হয়। তবে কামরুজ্জামানের বর্ণনার সাথে হুবহু মিলে যায়, স্যারের বাড়ি। প্রকৃতির কোলে ঘুমিয়ে আছে তার স্যারের বাড়ি। রওনক মনে মনে হাসে, কামরুজ্জামানের বাকি কথা যাহোক স্যারের বাড়ির বর্ণনায় একবর্ণ মিছা নেই

মূল রাস্তা থেকে সরু ঢোরাসাপের মতো এঁকেবেঁকে পাট, ধঞ্চে ক্ষেতের আল ধরে খানিকটা পথ যেতে প্রকৃতির সবুজ সমুদ্রে ভেলার মতো ভেসে আছে বাড়িটি। রওনক মুগ্ধ হয়ে বাড়ির দিকে তাকিয়ে থাকে! ক্যালেন্ডারে দেখা কোনো কল্পনায় আঁকা ছবি যেন! বাড়ির চারদিকে যত দূরে চোখ যায় মাঠের পর মাঠ দিগন্তছোঁয়া সবুজে ফসলের ক্ষেত। শেষ বিকেলের বৈশাখী বাতাসে ফসলের মাঠ দুলে উঠতে চোখে ভ্রম ঠেকে; যেন গভীর সমুদ্র থেকে উঠে আসা সবুজ ঢেউ, দূরযাত্রার কোনো জাহাজকে ভাসিয়ে নিয়ে যাচ্ছে! বাড়িটাকে সবুজসমুদ্রে ভেসে থাকা জাহাজ বলে মনে হয়!

দুপাশে জমির আল ধরে খানিকটা পথ এগোতে স্যারের সাথে দেখা হয়। কামরুজ্জামানের বর্ণনায় তার স্যারের কথা জানা ছিল বলে যাত্রায় রক্ষা মেলে! নাহলে স্যারের বেশভূষায় তাঁকে ঠাহর করা বেশ কঠিন ছিল! স্যারের পরনে সাধারণ সুতির পাড়হীন ধূসর সবুজরঙা লুঙ্গি, কাঁধে লালসবুজে ডোরাকাটা গামছা। লম্বা, সুঠামদেহী, টিকালো নাকের দুপাশের চোখ দুটো থেকে ঠিকরে পড়ছে সততার উজ্জ্বল দ্যুতি। পাটক্ষেতে নিড়ানির কাজ করছেন। শরীরে শিশির দানার মতো বিন্দু বিন্দু ঘাম জমে আছে। হাতপা প্যাককাদার মাখামাখি হয়ে আছে

রওনকদের দেখে কাঁধের গামছায় গা মুছতে মুছতে সহাস্যে এগিয়ে আসেন। রওনক, একদৃষ্টিতে স্যারের দিকে তাকিয়ে থাকে। তাঁকে দেখা মাত্র সে মোহাচ্ছন্ন হয়ে পড়ে। অতি সাধারণ মানুষটির অসাধারণত্ব রওনকের ভেতরটা ভেঙ্গেচুড়ে গুলিয়ে দেয়! তিনি যেন কোনো মানুষ নন, সাক্ষাৎ দেবতা! যার সামনে দাঁড়ালে পৃথিবীর সবচেয়ে পাপী লোকটিও সমস্ত অকাজ ছেড়েছুঁড়ে সত্য, সুন্দরের পথ খুঁজতে বাধ্য হবে। স্যার ওদেরকে সস্নেহে এগিয়ে নিয়ে তাঁর বাড়ির দক্ষিণের উঠোনে পাতা বাঁশের মাচানে বসতে দেন

স্যার সদালাপী মানুষ! কিন্তু কামরুজ্জামানের শ্যালক এবং রওনকের অবস্থা আলাপের পর্যায়ে নেই। দুজনের শরীর বেঁয়ে অবিরত বিব্রতঘাম ঝরছে! কামরুজ্জামানের অন্যায় আবদারপত্র এমন একজন শিক্ষকের কাছে দেওয়ার দুঃসাহস স্যারকে দেখা মাত্র তাদের উবে গেছে। যদিও রওনক কামরুজ্জামানকে কথা দেয় সে কাজটি তার স্যারের কাছ থেকে করিয়ে নিতে পারবে! কিন্তু স্যারের সংস্পর্শে আসা মাত্র রওনক তো বটে কামরুজ্জামানের ন্যায়নীতিহীন শ্যালকও গুছানো সব কথাবার্তা ভুলে তোতলাতে থাকে

কিন্তু একদিকে সামরিক সরকারের জাঁদরেল মন্ত্রী অন্যদিকে তাদের সন্মুখে দাঁড়ানো প্রধান শিক্ষক। ওরা গভীর বিপদসমুদ্রে দাঁড়িয়ে থাকে। ওদের চোখেমুখে স্বাভাবিকভাবে ভেসে ওঠে অসহায়ত্বের ছায়া! স্যার অবশ্য তাদের আগমনের কারণ কিছুটা হলেও আঁচ করতে পারেন। এবং তিনি ওদের সমূহবিপদ থেকে পরিত্রাণ দিতে নিজেই আলাপে কামরুজ্জামানের বিষয়ে জানতে চান। কামরুজ্জামানের শ্যালক সুযোগে পত্রটি কাঁপাহাতে স্যারের দিকে এগিয়ে দেয়! স্যার যত্ন করে পত্রের ভাঁজ খুলে পড়তে শুরু করেন। 

রওনক শেষ দৃশ্য দেখার অপেক্ষায় স্থির দৃষ্টিতে স্যারের দিকে তাকিয়ে থাকে। সামরিক সরকারের মন্ত্রীর নির্দেশনামা বলে কথা! স্যারের কথা ভেবে ভয়ে তার নিজের শরীর কেঁপে ওঠে! কী করবেন স্যার এমন ভয়ঙ্কর সমস্যার সমাধানে! সে নিজে বিব্রত হয় এমন কাজে নিজেকে জড়িয়ে! এমন একজন মানুষকে কামরুজ্জামান কীভাবে এমন বিপদে ঠেলে দিল! ভাবতেই কামরুজ্জামানের প্রতি তার তীব্র ক্ষোভ হয় এবং নিজেকে নিকৃষ্ট গোবরে পোকার মতো মনে হয়। কারণ সে নিজেও যে এমনতর কুকর্মের ভাগিদার

স্যার গভীর মনোযোগে পত্রপাঠ শেষে উন্মুক্ত আকাশের দিকে তাকিয়ে দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেলেন! তাঁর মুখে শূন্যতার নিস্পৃহ ঢেউ খেলানো হাসি ছড়িয়ে পড়ে। কপালের দুপাশের রগের শিরায় স্পষ্ট টান দৃশ্যমান হয়!

বৈশাখী বিকেলের পুঞ্জিভূত মেঘদল আকাশময় ওড়াওড়ি করছে। তারপরও পৃথিবীর কোথাও সূর্যের আলোর কমতি পড়ে নাই! তিনি মাথা নিচু করে খানিকক্ষণ কী যেন ভাবেন। 

তারপর কামরুজ্জামানের পত্রের উল্টোপাতায় একটানে দুলাইনের একটা চিরকুট লেখেন। চিরকুটটি রওনকের হাতে ধরিয়ে দিয়ে, তাদের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে পাটক্ষেতের আল ধরে হেঁটে সবুজ অরণ্যে মিলিয়ে যান। 

রওনক খোলা চিঠি বলে সহজেই পড়তে পারে।বাঘ না খেয়ে মরে গেলেও কুকুরের মতো উচ্ছিষ্ট মুখে তোলে না। তোমার কিংবা মন্ত্রীর অন্যায় আবদার আমার পক্ষে রাখা সম্ভব নয়। তোমার মতো মেরুদন্ডহীনকে শিক্ষার আলোতে আলোকিত করার প্রচেষ্টা ছিলো আমার শিক্ষকজীবনের চরম ব্যর্থতা!’—— মাত্র দুলাইনের চিরকুটটি শক্তিশালী অ্যাটম বোমার চেয়েও শতগুণে ভারি। রওনকের চোখে জল জমে। সে ফিরতিপথে হাঁটা দেয়

এসব ঘটনা কুড়ি বছর আগেকার। তবে সেই বৈশাখী বিকেলের ঘটনা রওনকের জীবন বদলে দিয়ে তাকে ভিন্ন মানুষ হয়ে বাঁচতে শিখিয়েছে। ওর বোধের শিকড়ে তুমুল বেগে নাড়া দিয়েছিলো প্রধান শিক্ষকের দুলাইনের চিরকুটটি। স্যারের আদর্শ নিজের মধ্যে ধারণ করে সমস্ত অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে সমাজে আজ সে বিশেষ অবস্থানে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। এবং তাঁকে সততার স্বীকৃতিস্বরূপ রাষ্ট্রীয় সর্বোচ্চ পুরস্কার দেওয়া হয়েছে

Related Posts