আলোর দিকে তাকানোর সাহস || সজল আশফাক

নীরা বুঝে গেল, আজ আর ফজর সময়মতো হলো না।

সে অনেকক্ষণ চুপ করে শুয়ে রইল। ভাবনাগুলো একে অন্যের সঙ্গে জট পাকিয়ে গেল। 

আজান মিলিয়ে গেল বাতাসে, রয়ে গেল শুধু ঘরের ভেতর একধরনের গুমোট, শীতল নীরবতাÑ যেমন বৃষ্টি হওয়ার ঠিক আগে আকাশ চুপ করে যায়।

তারপর সে আস্তে, প্রায় নিজের কাছেই বলার মতো করে বললÑ ‘তোমার জন্য আমার নামাজটা কাজা হলো।

কথাটা বড় কিছু নয়, অথচ নীরবতার মধ্যে তা যেন একটা ছোট্ট পাথর, জলে ছুঁড়ে দেওয়াÑ ঢেউ ছড়িয়ে যায়, দেখা যায় না, তবু টের পাওয়া যায়।

রাইহান কিছু একটা বলতে চেষ্টা করল। মুখের ভেতর শব্দ খুঁজল, কিন্তু কোনো শব্দই ঠিক জায়গায় বসল না। নীরা উঠে গেল বাথরুমের দিকে। দরজা বন্ধ হওয়ার শব্দটা অস্বাভাবিক ভারী শোনাল, যেন গোটা ঘরের বাতাস একসঙ্গে কেঁপে উঠল।

আয়নায় নীরা নিজের মুখ দেখল। ঠান্ডা জলে মুখ ধুল, কিন্তু যা ধুয়ে ফেলতে চাইছিল, তা জলে ধোয়ার জিনিস নয়। নামাজ তার কাছে নিছক ধর্মীয় নিয়ম নয়Ñ নিজের অস্তিত্বের একটা অংশ, দিনের সেই একচিলতে সময় যেখানে সংসারের হাঁকডাক নেই, কারও প্রত্যাশার ভার নেই, শুধু সে আর তার স্রষ্টা। আজ সকালে সেই জায়গাটুকু হারিয়ে গিয়েছিল।

আয়নার দিকে চেয়ে নীরা ভাবলÑ আমি কি আল্লাহর কাছে যাব, নাকি মানুষের কাছে থেকে যাব?

প্রশ্নটা নিজের কাছেই অস্বস্তিকর ঠেকল। এভাবে দুটো জিনিসকে আলাদা করে ফেলা ঠিক নয়, সে নিজেই জানে। কিন্তু অপরাধবোধ কোনোদিন যুক্তির কথা শোনে না। সে নিজের মতো বাড়ে, ঘরের কোণে কোণে জমতে থাকে ধুলোর মতো।

রাইহান একা বিছানায় শুয়ে রইল। নীরার কথাগুলো মাথার ভেতর ঘুরপাক খাচ্ছিলÑ তোমার জন্য আমার নামাজ হলো না। প্রথমবার শুনে মনে হয়েছিল, নেহাতই সত্যি কথা। দ্বিতীয়বার মনে হলো, যেন অভিযোগ। আর তৃতীয়বার, যা সবচেয়ে ভয়েরÑ মনে হলো, বুঝি একটা সংজ্ঞা। সে কি নীরার কাছে এমন একজন হয়ে দাঁড়িয়েছে, যার উপস্থিতিই একটা ভালো কাজে বাধা?

এই ভাবনা মাথায় আসতেই শরীরের ভেতরকার উষ্ণতা কোথায় যেন মিলিয়ে গেল, ঠিক যেমন হঠাৎ মেঘ এসে রোদ ঢেকে দেয়।

সে জানে, ফজর ছুটে গেলে কাজা আদায়ের বিধান আছে। জীবনের প্রয়োজনে, সম্পর্কের প্রয়োজনে ধর্মেও ছাড় আছে। কিন্তু এই মুহূর্তে কথাটা নীরাকে বলল না। নীরার বিশ্বাসকে প্রশ্ন করতে তার মন সরল না, আবার নিজেকে ছোট করে দেখতেও ইচ্ছে হলো না। এই দুইয়ের মাঝখানে দাঁড়িয়ে সে বেছে নিল নীরবতা। আর সেই নীরবতাই বোধহয় তার সবচেয়ে বড় ভুল হয়ে রইল।

কিছুক্ষণ আগে, অন্ধকার তখনো নিরেট, রাইহান কাছে এসেছিল, নীরাও সাড়া দিয়েছিলÑ ভালোবাসে বলে, স্বামীস্ত্রী বলে। এমন কিছু মুহূর্ত থাকে যেখানে যুক্তি হার মানে, সম্পর্কটাই তখন সবচেয়ে বড় সত্য হয়ে ওঠে। কিন্তু সেই মুহূর্ত পুরোপুরি ফুরোবার আগেই দূর থেকে ফজরের আজান ভেসে এল, যেন কেউ একটা পর্দা টেনে দিল দুই দৃশ্যের মাঝখানে। ভোরের আলোর তখনও চোখ পুরোপুরি ফোটেনি। জানালার পর্দাটা একটুখানি ফাঁক হয়ে ছিল, আর সেই ফাঁক দিয়ে যে আলো ঘরে ঢুকছিল, তা কোনো কিছু স্পষ্ট করে না, শুধু আভাস দেয়। ঘরটাকে মনে হচ্ছিল বহু বছর আগের কোনো পারিবারিক আলোকচিত্রের মতোÑ সবকিছু জায়গামতো আছে, তবু কোথাও প্রাণের অভাব। এই আলোয় মানুষ ঘুমায় না, আবার সজাগও থাকে না। নীরা সেই মাঝামাঝি অবস্থায় শুয়ে ছাদের দিকে তাকিয়ে ছিলÑ মানুষ যখন সত্যিই বাইরের কিছু দেখে না, নিজের ভেতরে কোথায় যেন হাতড়ে বেড়ায়, সেই দৃষ্টি।

একসময় তাদের সম্পর্ক এমন ছিল না। রাইহান বাড়ি ফিরলে নীরা দরজায় দাঁড়িয়ে থাকতশুধু দেখার জন্য নয়, অনুভব করার জন্য, যেমন করে মানুষ কারও ফিরে আসা শরীরের মধ্যে টের পায়। তখন তারা কথা বলত, ছোট ছোট কথাআজ কী রান্না হলো, রাস্তায় কোন গাছটায় ফুল ফুটেছেঅথচ সেই সাধারণ কথার ভেতরেই একটা জীবন্ত স্পন্দন থাকত।

সময় বদলে দেয় সবকিছু, ধীরে, প্রায় নিঃশব্দে, এমনভাবে যে টেরই পাওয়া যায় না কখন একটা ঘর তার আগের চেহারা হারিয়ে ফেলে। এখন ছুটির রাত আসে ক্যালেন্ডারের পাতা ওল্টানোর মতো, নির্দিষ্ট, পূর্বনির্ধারিত। কোনো বিস্ময় নেই, কোনো আকস্মিকতা নেই। দুজনেই জানে কী ঘটবেআর সেই জানাটাই যেন সবচেয়ে বড় ফাঁদ।

একদিন সন্ধ্যায় নীরা হঠাৎ জিজ্ঞেস করলÑ

তুমি কি আমাকে ভালোবাসো?’

রাইহান একটু থমকাল। 

ভালোবাসি তো।গলার স্বরে কোনো জোর ছিল না। মনে হলো, নীরাকে নয়, সে যেন নিজেকেই বোঝাতে চাইছে।

নীরা জানালার দিকে তাকিয়ে বলল, ‘ভালোবাসা কি শুধু শরীর দিয়ে বোঝা যায়?’

রাইহান কোনো জবাব খুঁজে পেল না। কারণ সে ততক্ষণে বুঝতে শুরু করেছেÑ তারা একই শব্দ ব্যবহার করে, অথচ শব্দের ভেতর দুজনে দুটো সম্পূর্ণ আলাদা জিনিস বহন করে। নীরার কাছে ভালোবাসা মানে বোঝাপড়া, স্বীকৃতি, আত্মার সংযোগ। রাইহানের কাছে ভালোবাসা মানে পাশে থাকা, দায়িত্ব, নিরাপত্তা দেওয়া। দুটোই ভালোবাসা বটে, কিন্তু যেন দুটো আলাদা ভাষায় লেখাÑ একই গল্পের দুটো অনুবাদ, কোনোটাই মূল পাঠের হুবহু নয়।

রাতে দুজন পাশাপাশি শুয়ে থাকে। কিন্তু প্রতি রাতে মাঝখানের অদৃশ্য দেয়ালটা একটু একটু করে পুরু হয়ে ওঠেÑ কেউ দেখতে পায় না, অথচ দুজনেই তার উপস্থিতি টের পায়, যেমন ঘর থেকে একটা আসবাব সরিয়ে ফেলার পরেও তার শূন্যস্থানটুকু চোখে পড়ে।

নীরা ভাবেÑ আমি কি স্ত্রী, নাকি শুধু একটা নিয়ম পালন? সে কি আমাকে চায়, নাকি শুধু আমার শরীরকে?

রাইহান ভাবেÑ আমি কি স্বামী, নাকি শুধু একটা অভ্যাস? সে কি আমাকে ভালোবাসে, নাকি শুধু সহ্য করে যায়?

কোনো ঝগড়া নেই তাদের মধ্যে। ঝগড়ার চেয়েও ভয়ংকর একটা কিছু আছেÑ কোনো প্রশ্ন নেই। কারণ উত্তরটা না জানাই এখন অনেক বেশি নিরাপদ মনে হয়। তাই তারা সেই নিরাপদ নীরবতার মধ্যে পাশাপাশি শুয়ে থাকে, যেমন দুটো দ্বীপ একই সমুদ্রের জলে ভাসে, অথচ কখনো একে অন্যের তীর স্পর্শ করে না।

কয়েকদিন পর আবার একইরকম আরেকটা ভোর এলো।

নীরা জায়নামাজ বিছাল, কাজা নামাজ পড়ল। নামাজের শেষে মোনাজাতে চোখ বুজে খানিকটা হালকা হওয়ার চেষ্টা করলগভীর ঘুম আজ তাকে ফজরের সময় জাগতে দেয়নি, এবার আর কোনো অন্য কারণ ছিল না, শুধু ক্লান্তি, শুধু ঘুম, নিরীহ একটা মানবিক ব্যর্থতা।

রাইহান আধবোজা চোখে বিছানায় শুয়ে সবটা দেখল। কিছু জিজ্ঞেস করল না। কারণ যে প্রশ্ন তার ভেতরে জমে আছে, তার উত্তর নামাজে পাওয়া যায় না। পাওয়া যায় কথায়অথচ কথাটাই এখন তাদের মধ্যে সবচেয়ে দুর্লভ জিনিস হয়ে দাঁড়িয়েছে।

রাইহান রান্নাঘরে গিয়ে চা বানাল। নীরার জন্য একটা কাপ পাশে রাখল, কিছু না বলেযেন একটা কথা, যা মুখে বলা যায় না, চায়ের ধোঁয়ার ভেতর দিয়ে পাঠিয়ে দেওয়া গেল।

নীরা কাপটা হাতে তুলে নিল। তারপর এক মুহূর্তের জন্য রাইহানের দিকে তাকালশুধু এক মুহূর্ত, তার বেশি নয়। সেই দৃষ্টিতে ক্ষোভ ছিল, ক্লান্তি ছিল। কিন্তু তার আরও গভীরে, প্রায় অদৃশ্য একটা স্তরে, একটুখানি ভালোবাসাও উঁকি দিলশীতের সকালে কুয়াশার আড়ালে সূর্যের মতো, যাকে দেখা যায় না ঠিকমতো, তবু বোঝা যায় সে আছে।

রাইহান সেই ক্ষোভের কারণ বোঝে। কিন্তু কিছু করার উপায় তার হাতে নেই। সেদিন থেকে তাদের ভালোবাসার যে অংশটুকু কারও চোখে পড়ে না, সেই অদেখা অংশটুকু এখন তাদের নিজেদের কাছেও অদেখা হয়ে গেছেযেন একটা ঘর, যার একটা দরজা তারা নিজেরাই কবে বন্ধ করে দিয়েছে, আর চাবিটা কোথায় রাখা আছে, তাও ভুলে গেছে।

রাইহান এসে পাশে বসল। জানালার বাইরে ভোরের আলো এসে পড়েছে পাশের বাড়ির ছাদে, ঠিক যেমন প্রতিদিন পড়ে, অথচ আজকের আলোটা কেন যেন একটু বেশি স্থির মনে হলো, যেন সেও অপেক্ষা করছে কিছুর জন্য।

দুজনেই চুপ। ঘরের ভেতর শুধু চায়ের ভাপ ওঠে, ধীরে, কোনো তাড়া ছাড়াই।

তারপর রাইহান আস্তে করে বললÑ ‘তোমার সাথে কথা বলতে চাই।

নীরা চায়ের কাপটা দুহাতে ধরে রইল, তার উষ্ণতাটুকু যেন এই মুহূর্তে তার একমাত্র নিশ্চিত সত্য। সে কিছু বলল না। কিন্তু সরেও গেল না।

দূরে কোথাও একটা কাক ডেকে উঠল, তারপর নিজেই থেমে গেল, যেন ভুল করে কাউকে ডেকে ফেলেছে। জানালার আলো একটুখানি বেড়ে গেল ঘরের মেঝেয়, নিঃশব্দেপৃথিবীর সব ভোরের মতোই সে নিজের নিয়মে আসে, কারও দুঃখ বা নীরবতার হিসেব রাখে না।

হয়তো এইটুকুই যথেষ্ট। একটা বাক্য, একটা কাপ চা, একটা মুহূর্ত যেখানে কেউ সরে যায়নি।

আর কিছু কিছু গল্পের শুরু ঠিক এভাবেই হয়কোনো ঘোষণা ছাড়া, কোনো নাটকীয়তা ছাড়া। শুধু দুজন মানুষ, একটা জানালার আলো, আর সেই আলোর দিকে ফিরে তাকানোর সাহসটুকু।

Related Posts