গানের ভেলায় স্মৃতির খেয়ায়— আঠারো গ্রামোফোনের চাকতিতে বাংলা গানের প্রথম সম্রাজ্ঞী আঙুরবালা দেবী

জীবন বিশ্বাসঃ কলকাতার গলিঘুঁজি বেয়ে যখন ট্রামের ক্লান্ত ঘণ্টা বাজত আর গোধূলির আলোয় একে একে জ্বলে উঠত চিৎপুর বা হাতিবাগানের থিয়েটারপাড়ার গ্যাসবাতি, ঠিক তখনই কোনো এক বনেদি অন্দরে ঘুরতে শুরু করত গ্রামোফোনের কালো চাকতি। একটা অতিকায় পেতলের চোঙা থেকে একটি ভারী, অথচ মায়াবী কুহকিনী কণ্ঠ ছড়িয়ে দিত এক আশ্চর্য হাহাকার। সেই গান শুনতে শুনতে বিদগ্ধজনেরা গড়গড়ায় শেষ টান দিতেন, আর অন্দরের অবগুণ্ঠিতা বধূটি ঘুলঘুলি দিয়ে চেয়ে থাকত একলা বিকেলের শেষ আলোর দিকে। সেই কণ্ঠটি কোনো সাধারণ সুরের প্রকাশ ছিল না, তা ছিল এক শতাব্দীর সন্ধিক্ষণ। বিদ্যুৎবিহীন সেই মায়াবী কলকাতায় যখন থিয়েটারের কাঠের তক্তায় রূপালী আলো এসে পড়ত, তখন এক রহস্যময়ী নারীর ছায়াশরীর সুরের জাদুতে সবাইকে আচ্ছন্ন করে রাখত। তিনি আঙুরবালা দেবী, যিনি আঙুরবালা নামেই সমধিক পরিচিত ছিলেন। তাঁর সুরেলা  শ্রুতিমধুর কন্ঠে কোথাও যেন একটু গভীর ক্ষতের আভাস ছিল যা শ্রোতাকুলকে অনায়াসেই আকর্ষণ করত। অত্যন্ত পরিশ্রমী শিল্পী আঙুরবালার সাংগীতিক লড়াই যেন বাংলা গানের এক অবিনাশী যুগের জীবন্ত দলিল।

উত্তর কলকাতার সেই সমাজসংস্কৃতির আলোছায়ায় প্রভাবতী দেবী নাম নিয়ে আঙুরবালার জন্ম ২৩ জুলাই ১৯০৬  সালে (মতান্তরে ১৯০০ সাল), কাশীপুরের এক সাধারণ পরিবারে। তবে বিশ্বসংসার থেকে তাঁর চলে যাওয়ার দিনটি নিয়েও মহাকালের খাতায় কিছুটা ধোঁয়াশা রয়ে গেছে। কেউ বলেন ১৯৮৪ সালের জানুয়ারি, কেউ বা দাবি করেন তার পরের দিনটি। পিতার নাম বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় নাকি সুধীরকুমার বন্দ্যোপাধ্যায়Ñএই তর্কেও গবেষকদের বিস্তর সময় ব্যয় করতে দেখা গেছে, তবে মা হরিমতী দেবীর সেই স্নেহময়ী কোলটি ছিল তাঁর পরম আশ্রয়। প্রভাবতীর আসল ঐশ্বর্য লুকিয়ে ছিল তাঁর মেধায়। শৈশবে তাঁর কান ছিল এক অদ্ভুত শ্রুতিধরের মতো। একবার কোনো গান শুনলে, কোনো গুরুকে রেওয়াজ করতে দেখলে, সেই সুর তিনি মনের অতল গভীরে এমনভাবে গেঁথে নিতেন যে তা আর কখনোই হারিয়ে যেত না। সাত বছর বয়সে পারিবারিক বন্ধু অমূল্য মজুমদারের হাত ধরে তাঁর সঙ্গীতের হাতেখড়ি। তবে সুরের আসল গভীর জল ছুঁয়েছিলেন তিনি বিভিন্ন নামকরা ওস্তাদদের কাছে তালিম নিয়ে।

বহু সুরের সমন্বয়ে এক স্বতন্ত্র কণ্ঠরসায়ন

জিতু ওস্তাদের খেয়াল ঠুংরির সেই জটিল অলঙ্কার, রামপ্রসাদের মার্গ সঙ্গীতের গাম্ভীর্য, জমিরউদ্দিন খাঁর গজল আর দাদরার সেই মায়াবী মন্থর বেদনা, পেয়ারু কাউয়ালের কাওয়ালি আর ঈশান ওস্তাদের কীর্তনের সেই অশ্রুভেজা ব্যাকুলতাÑএই সবকিছু মিলে প্রভাবতীর গলা যেন এক মহাসমুদ্রের মোহনায় পরিণত হয়েছিল। সেখানে উত্তরভারতীয় ক্লাসিক্যাল সংগীতের রাজকীয় আভিজাত্য আর বাংলার কীর্তনের মাটির সুবাস এসে অবলীলায় একে অপরকে আলিঙ্গন করত। তিনি কোনো একরৈখিক গায়িকা ছিলেন না। তাঁর কণ্ঠে একাধারে বাস করত দরবারি মহলের রাজকীয়তা এবং কলকাতার লাল ইটের থিয়েটারের সেই নাটকীয় তীব্রতা। সুরের এই বিচিত্র মিশ্রণই তাঁকে সমসাময়িক অন্য সব শিল্পীদের থেকে সম্পূর্ণ আলাদা এক উচ্চতায় দাঁড় করিয়েছিল।

প্রভাবতীর অন্তরাল আঙুরবালার মোহময়ী সুর

প্রভাবতী থেকেআঙুরবালাহয়ে ওঠার সেই রূপান্তর এক মস্ত বড় ট্র্যাজেডি। স্টার থিয়েটারের নৃত্যপরিচালক ললিতমোহন যখন এই কৃশকায় মেয়েটির গলায় সেই সুরের আশ্চর্য তেজ শুনলেন, তখনই তাঁকে মঞ্চের আলোর নীচে নিয়ে আসার সিদ্ধান্ত নেন। কিন্তু বিজ্ঞাপনের পোস্টারেপ্রভাবতীনামটি নাকি বড্ড বেশি আটপৌরে শোনাত তাই ললিতমোহনই একদিন নাম দিলেন—‘আঙুরবালা দর্শক সেই নাম লুফে নিল, কিন্তু এই নামের আড়ালে প্রভাবতী নামের সেই ছোট্ট মেয়েটি যেন আড়ালে হারিয়ে গেল। শিল্পের জগৎ তো এমনই, সে শিল্পীর চোখের জলটুকু আড়াল করে কেবল তাঁর বাহ্যিক কর্মের দিকটিকেই করতালি দিয়ে বরণ করে নেয়। কিংবদন্তী নাট্যব্যক্তিত্ব রসরাজ অমৃতলাল বসু তাঁর কলকাতার বাড়িটির নাম দিয়েছিলেনদ্রাক্ষাকুঞ্জ’—যা ছিল তাঁর মঞ্চের নামআঙুর’—এরই এক আভিজাত্যপূর্ণ প্রতিশব্দ। আঙুরবালার নামের ভেতরেও যেন মিশে ছিল এক দ্বৈত অস্তিত্বের করুণ নীরবতা।

Related Posts